ঘরে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন প্রকারের আসবাবপত্র যদি বাঁশের তৈরি এবং চকচকে রঙের প্রলেপযুক্ত হয় তবে দেখতে লাগবে অসাধারণ, থাকবে আধুনিকতার ছোঁয়া। সে ভাবনা থেকে কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ না থাকা সত্ত্বেও নিজের প্রচেষ্টায় ১৯৯৮ সালে পরিবারের ব্যবহারের জন্য বাঁশ-বেত দিয়ে কিছু ফার্নিচার তৈরি করেন মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার বড়চেগ গ্রামের নার্সারি ব্যবসায়ী আমির হোসেন সিরাজ। তার বাড়িতে ও নার্সারিতে অতিথি বা বৃক্ষের চারা কিনতে যারা আসতেন এসব ফার্নিচার দেখে তারা তা কেনার আগ্রহ দেখাতে থাকেন। সেই থেকেই নার্সারি ব্যবসার অবসরে নিজের বাড়িতে ক্ষুদ্র পরিসরে বাঁশ-বেতের ফার্নিচার বানানো শুরু করেন। এলাকায় এসব ফার্নিচার নিয়ে ব্যাপক সাড়া পাওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে বাঁশের ফার্নিচারের ব্যবসা শুরু করেন তিনি। ২০০৩ সালে মাত্র ২০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে প্রাথমিকভাবে গড়ে তুলেন একটি ক্ষুদ্র কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠান। নিজ বাড়ির পাশে শমশেরনগর-শ্রীমঙ্গল প্রধান সড়ক সংলগ্ন স্থানে গড়ে তোলেন কারখানা ও বিক্রয়কেন্দ্র। খুবই ছোট পরিসরে শুরু করা প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করেন ‘সিরাজ কুটির শিল্প’।
নিজে একাই কাজ করতেন সে প্রতিষ্ঠানে। আস্তে আস্তে বানাতে থাকেন আধুনিক ডিজাইনের খাট, সোফাসেট, টি টেবিল, ডাইনিং টেবিল, ড্রেসিং টেবিল, রিডিং টেবিল, আলনা, চেয়ার, ফুলের টব, সাধারণ টেবিল, পেন স্ট্যান্ড, টেবিল ল্যাম্প থেকে শুরু করে রিসোর্ট-হোটেল-মোটেল-অফিস-রেস্টুরেন্টের ফার্নিচারসহ নানা আসবাবপত্র। প্রতিষ্ঠানটির পরিধি বড় হতে থাকে। এক সময় তার তৈরিকৃত বাঁশ-বেতের আসবাবপত্রের সুনাম নিজ উপজেলা ও জেলা ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে গেলে বাড়তে থাকে চাহিদা। ফলে নিয়োগ করেন বাঁশ-বেত শ্রমিক। এক সময় শ্রমিকের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫ জনে। বর্তমানে কারখানা ও বিক্রয় কেন্দ্রের ব্যাপ্তি বেড়েছে। পরে চট্টগ্রামের বন গবেষণাগারে গিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। বর্তমানে বছরে তিনি বিক্রি করেন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার বাঁশ-বেতের ফার্নিচার। তার তৈরিকৃত ফার্নিচার দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে পর্যটন নগরী হিসেবে খ্যাত মৌলভীবাজারের অসংখ্য রিসোর্ট, কটেজ, রেস্টুরেন্ট। শুধু ফার্নিচার নয়, বাঁশ-বেতের আধুনিক ডিজাইনের গৃহ নির্মাণও করেন সিরাজ কুটির শিল্পের কর্মীরা।
প্রায় দুই যুগের ব্যবধানে নিভৃত গ্রামের একটি কুটির শিল্পজাত তৈরির প্রতিষ্ঠানের পরিচিতির ব্যাপ্তি ছড়িয়েছে গ্রাম থেকে উপজেলা, উপজেলা থেকে জেলা, জেলা থেকে বিভাগ, বিভাগ থেকে সারা দেশে। সর্বত্র এখন সিরাজ কুটির শিল্পের আসবাবপত্রের সুনাম। এমনকি দেশের বাইরেও যাচ্ছে নিভৃত গ্রামের এক পরিশ্রমী ও উদ্যমী মানুষের নিরন্তর প্রচেষ্টার বাঁশ-বেতের ফার্নিচার। প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকলে মানুষ যে বহুদূর এগিয়ে যেতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন উদ্যোক্তা আমির হোসেন সিরাজ। এখন তিনি এলাকার বেকার যুবকদের অনুপ্রেরণার এক নাম, এক পথপ্রদর্শক।
সিরাজ কুটির শিল্পের কর্ণধার কমলগঞ্জের সফল ব্যবসায়ী আমির হোসেন সিরাজ জানান, এক সময় মাত্র ২০ হাজার টাকা দিয়ে এই ব্যবসা শুরু করলেও বর্তমানে কর্মচারীদের বেতনসহ আনুষাঙ্গিক খরচ হয় প্রতি মাসে প্রায় সোয়া লক্ষাধিক টাকা। এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কুরিয়ারের মাধ্যমে গ্রাহকদের হাতে পৌঁছে সিরাজ কুটির শিল্পের পণ্যসামগ্রী। অনেকেই এখান থেকে আসবাবপত্র সংগ্রহ করে অনলাইনে ব্যবসা করছেন। বিদেশেও যাচ্ছে এসব সামগ্রী। একজন প্রবাসীর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে বিক্রির জন্য প্রতিনিয়তই যাচ্ছে বিভিন্ন মালামাল। ফার্নিচারগুলো তৈরির জন্য তিনি কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে ঘুরে বাঁশ-বেত সংগ্রহ করেন। বাঁশ সংগ্রহের পর এটি রোদে শুকিয়ে সিজনিং করে তারপর পোকামাকড় থেকে বাঁশের তৈরি আসবাবপত্রকে মুক্ত রাখতে ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। এরপর বাঁশ কেটে প্রস্তুত করা হয় নানা সামগ্রী। তার তৈরিকৃত ফার্নিচার দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে।
নিজের কুটির শিল্পের আয় দিয়ে প্রায় দুই যুগ আগেও দিন এনে দিন খাওয়া সিরাজের পরিবারটিতে এসেছে স্বচ্ছলতা। নিজের বসবাসের জন্য তিনি বাঁশ দিয়ে তৈরি করেছেন অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন ও মনোমুগ্ধকর দুই তলাবিশিষ্ট একটি বাড়ি। তার এ বাড়িটি দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিনই ভিড় করেন অসংখ্য মানুষ। তার বাড়িটিও এখন একটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পর্যটকদের কাছে পরিচিত।