× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নারী পোশাকে পকেট

ফ্যাশনে মুক্তির স্বাদ

আবিদা জান্নাত নিশা

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬ ১৮:১৬ পিএম

নারী পোশাকে পকেট                   মডেল : রায়া, অনন্যা     ছবি : ঈহা

নারী পোশাকে পকেট মডেল : রায়া, অনন্যা ছবি : ঈহা

‘বাহ! এই জামাটাতে তো পকেটও আছে!’ যেকোনো শপিং মল, ট্রায়াল রুম কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় কোনো মেয়ের মুখে এই কথাটা শুনলে লক্ষ্য করবেন, তাদের চোখে-মুখে এক দারুণ স্বস্তি আর আনন্দের ঝলক দেখা যায়। আপাতদৃষ্টিতে কাপড়ের টুকরো দিয়ে বানানো একটা অতি সাধারণ পকেটকে কেন এতটা উদযাপন করতে হবে? পুরুষদের পোশাকে পকেট থাকাটা যেখানে সবসময়ই খুব স্বাভাবিক আর সাধারণ একটা বিষয়, সেখানে মেয়েদের পোশাকে পকেটের উপস্থিতি কেন ২০২৬ সালেও একটু আনকমন বা পরম আনন্দের বিষয় হয়ে ধরা দেয়?

এর উত্তর কোনো সাধারণ ফ্যাশনের নিয়মে লুকিয়ে নেই। এর পেছনে আছে সমাজ, অর্থনীতি আর মেয়েদের অধিকারের এক দীর্ঘ ইতিহাস। ফ্যাশন দুনিয়ায় মেয়েদের পোশাকে পকেটের অনুপস্থিতি বা ইদানীং সময়ে সগৌরবে ফিরে আসা এর কোনোটিই স্রেফ ডিজাইন বা খামখেয়ালিপনা না। এর পেছনে রয়েছে নারীর স্বাধীনতা ও স্বনির্ভরতার এক গল্প। পশ্চিমা ধাচ পেরিয়ে আজ যখন বাঙালি নারীর শাড়িতেও পকেট জায়গা করে নিচ্ছে, তখন বুঝতে হবে এই বদল ছড়িয়ে যাচ্ছে সবখানেই।

নারীর পোশাকে পকেট রাখা হতো না কেন

ইতিহাসের চাকাটা একটু পেছন দিকে ঘোরানো যাক। তিন-চারশ বছর আগে পুরুষদের পোশাকে স্থায়ীভাবে পকেট সেলাই করা শুরু হয়। পুরুষরা খুব অনায়াসে তাদের টাকা-পয়সা, জরুরি নথিপত্র সেই পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারতেন। কিন্তু একই সময়ে মেয়েদের পোশাকের চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে যুগে মেয়েদের জামার সঙ্গে সরাসরি কোনো পকেট সেলাই করা থাকত না। তাই ঘরের বাইরেও অর্থ ও প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য পুরুষের উপর নির্ভরশীল থাকতে হতো। আবার অনেক নারীই ব্যবহার করতেন আলাদা করে কোমরে বেঁধে রাখার মতো একজোড়া কাপড়ের থলি। এগুলো ফিতে দিয়ে কোমরের চারপাশে বেঁধে রাখা হতো এবং ঘাগরার নিচে স্তরে স্তরে লুকিয়ে থাকত। ড্রেসের পাশে ছোট একটা চেরা অংশ থাকত, যা দিয়ে হাত গলিয়ে মেয়েরা সেই গোপন পকেটে পৌঁছতেন। এমন এক সময়ে এই পকেটগুলোর প্রচলন ছিল যখন বিবাহিত মেয়েদের নিজস্ব কোনো সম্পত্তির অধিকার ছিল না। আইনত তারা নিজেরাও ছিলেন পিতা বা স্বামীর অধীনে। সেই অন্ধকার যুগে এই গোপন পকেটগুলো ছিল মেয়েদের সম্পূর্ণ নিজস্ব, ব্যক্তিগত একটা চিলতে জায়গা। যেখানে স্বামী বা বাবার নজর এড়িয়ে তারা রাখতে পারতেন নিজের ভালোবাসার মানুষের দেওয়া চিঠি, জমানো কিছু মুদ্রা, সুগন্ধির শিশি কিংবা ঘরের চাবি।

এই পকেটগুলো আকারে কিন্তু আজকের মতো এত ছোট ছিল না। এগুলো এতটাই বড় হতো যে আস্ত একটা বই বা খাবারও অনায়াসে রাখা যেত। ঘরের কোণে বসে রঙিন সুতোয় মেয়েরা এই গোপন পকেটে ফুটিয়ে তুলতেন চমৎকার নকশা। কাপড়ের এই ছোট টুকরোটি হয়ে উঠেছিল তাদের স্মৃতি আর অস্তিত্বের এক গোপন দলিল।

পকেটহীন ফ্যাশন ও হাতব্যাগ শিল্পের ব্যবসায়িক স্বার্থ

দুইশ বছর আগে ফ্যাশন দুনিয়ায় একটা বড় বদল এলো। মেয়েদের ভারী, চওড়া ঘাগরা বাদ দিয়ে শরীরঘেঁষা, স্লিম আর একদম ফিট করা পোশাকের চল শুরু হলো। পোশাকের এই পরিবর্তনের প্রধান শিকার হলো সেই বড় বড় পকেটগুলো। শরীরঘেঁষা পোশাকে অত বড় থলি লুকিয়ে রাখার কোনো কায়দা রইল না। রাতারাতি উধাও হয়ে গেল মেয়েদের পকেট। তার জায়গায় ফ্যাশনে যুক্ত হলো ছোট্ট ও সাজানো হাতব্যাগ। এই ব্যাগগুলো দেখতে সুন্দর হলেও এর ব্যবহার বাস্তবসম্মত ছিল না। বড়জোর একটা রুমাল আর একটা কয়েন রাখার পর সেখানে আর কিছু ধরত না। 

এখান থেকেই শুরু হলো আসল বৈষম্য। পুরুষরা তাদের পকেটে চাবি, টাকা আর দরকারি কাগজ নিয়ে স্বাধীনভাবে বাইরে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন, আর মেয়েরা হয়ে পড়লেন হাতবন্দি। কারণ বাইরে বের হতে গেলেই হাতব্যাগ সামলাতে হবে, এক হাত সবসময় ব্যস্ত থাকবে। কাজেই পকেটের অভাব মেয়েদের পরোক্ষভাবে এই বার্তাই দিচ্ছিল যে, ঘরের বাইরের দুনিয়া বা কর্মক্ষেত্র তাদের জন্য নয়। পুরুষের পকেটে থাকত ক্ষমতা, আর নারীর হাতব্যাগটি হয়ে রইল তার পরনির্ভরশীলতার চিহ্ন। 

তাছাড়া এর পেছনে কাজ করেছে ফ্যাশন ব্যবসার বিশাল মুনাফাও। পোশাক থেকে পকেট বাদ দিলে মেয়েরা বাধ্য হয়ে হাতব্যাগ কিনবে। কোটি কোটি টাকার এই হ্যান্ডব্যাগ ইন্ডাস্ট্রি টিকিয়ে রাখার জন্য মেয়েদের জিন্স বা ড্রেসের পকেটগুলোকে হয় পুরোপুরি সেলাই করে বন্ধ করে দেওয়া হলো, নয়তো এমন ছোট করা হলো যেখানে একটা চাবিও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

নারীর পোশাক যেভাবে পকেট ফিরে পেল

কালের নিয়মে মেয়েরা এখন ঘরের চার দেয়াল ভেঙে সবখানেই নিজেদের কাজের প্রমাণ দিয়েছেন। নিজেদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হবার পাশাপাশি নারীরা এই অবাস্তব ও বৈষম্যমূলক পোশাকের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। যুগের এই দাবি মেনে বিভিন্ন ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি ও নামি ব্র্যান্ডগুলোও এখন মেয়েদের পোশাকে পকেট যোগ করে সেগুলোকে আরও বাস্তবসম্মত ও আধুনিক করে তুলছে। এর ফলে অফিসের ল্যাপটপ, ডায়েরি বা ফাইল সামলানোর পাশাপাশি ফোন বা আইডি কার্ডটি রাখার জন্য নারীদের আর বাড়তি ব্যাগের ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে না। পোশাকের এই ছোট্ট বদলটি কর্মক্ষেত্রে নারীদের কাজের গতি যেমন বাড়িয়েছে, তেমনি নিশ্চিত করেছে দুই হাতের বাঁধনহীন মুক্তি ও স্বস্তি।

দেশি ফ্যাশনে পকেট এনেছে বড় বদল

পশ্চিমা পোশাকের পাশাপাশি দেশীয় পোশাকেও এসেছে পরিবর্তন, যুক্ত করা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের পকেট। যেগুলো ব্যবহারের পাশাপাশি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দনও বটে। আজকের তরুণী বা কর্মজীবী নারীদের আলমারি খুললে দেখা যাবে সুতি বা লিনেনের কুর্তি, কটি এমনকি থ্রি-পিস বা শাড়িতেও পকেটের ব্যবহার। আর এই পোশাকগুলোর ডিজাইনে এখন অত্যন্ত চতুরতার সাথে যোগ করা হচ্ছে অদৃশ্য বা সাইড পকেটও। 

কুর্তি ও টিউনিকে পকেট

আজকের ফ্যাশনে লং কুর্তি বা শার্ট- স্টাইল কুর্তির দুই পাশে এখন পকেট থাকাটা প্রায় নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্যামজট আর ব্যস্ততার এই শহরে রিকশায় চড়ে যাতায়াত করার সময় বা সুপারশপে কেনাকাটার সময় চট করে টাকা বা ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে নেওয়া যে কত বড় স্বস্তির, তা প্রতিদিনের জীবনে মেয়েরা টের পাচ্ছেন। কুর্তির পকেটগুলো সাধারণত এমনভাবে তৈরি করা হয় যা পোশাকের মূল ফিটিংসে কোনো সমস্যা তৈরি করে না। এটি একদিকে যেমন ক্যাজুয়াল ও ট্রেন্ডি লুক দেয়, অন্যদিকে রিকশায় ভাড়া দেওয়া কিংবা ঝটপট ফোন রিসিভ করার কাজটিকে করে তোলে একদম ঝামেলাহীন।

কটি ও শ্রাগে বাহারি পকেট

কামিজ বা কুর্তির ওপর যে কটি বা ও শ্রাগগুলো পরা হয়, সেগুলোতে এখন ভেতরে বা বাইরে বেশ বড় আকৃতির পকেট দেওয়া হচ্ছে। সুতি বা খাদি কাপড়ের কটিতে পকেটের এই ব্যবহার পোশাকে একটা স্মার্ট ও মডার্ন লুক এনে দেয়। কর্মজীবী নারীদের জন্য এটি একটি আশীর্বাদ। অফিসের ডেস্কে বসার সময় বা মিটিংরুমে ঢোকার সময় কলম, ভিজিটিং কার্ড কিংবা ছোট পেনড্রাইভটি অনায়াসে এই কটির পকেটে রেখে দেওয়া যায়। ফলে বারবার হ্যান্ডব্যাগ হাতানোর দরকার পড়ে না, যা কাজের ক্ষেত্রে মেয়েদের অনেক সুবিধা বাড়িয়ে দেয়।

থ্রি-পিসের সালোয়ার ও ট্রাউজার্সে পকেট

মেয়েদের পোশাকের নিচের অংশে পকেটের সংযোজন পুরো ফ্যাশনের চেনা রূপটাই বদলে দিয়েছে। এখনকার আধুনিক সালোয়ার, ধুতি প্যান্ট বা সোজা কাটের ট্রাউজার্সেও ডান পাশে একটি চেইনযুক্ত পকেট রাখা হচ্ছে। একহাতে ওড়না সামলানোর পাশাপাশি অন্য হাতে ফোন বা চাবির গোছা ধরে রাখার যে চিরন্তন কসরত, তা থেকে মুক্তি মিলেছে এই ট্রাউজার্স পকেটের কল্যাণে। হাঁটার সময় বা তাড়াহুড়ো করে বাসে ওঠার সময় ফোন হাত থেকে পড়ে যাওয়ার ভয়টা এখন চিরতরে দূর হয়েছে। প্যান্টের এই পকেটগুলো বেশ গভীর হওয়ায় বড় স্ক্রিনের স্মার্টফোনও এখানে নিরাপদে রাখা যায়।

শাড়িতে পকেট বা পকেটশাড়ি

বাঙালি ফ্যাশনে পকেটের এই জয়যাত্রায় সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং সাহসী অধ্যায়টি হলো শাড়িতে পকেট! শাড়িকে আমরা সবসময়ই চিনি বাঙালি নারীর চিরন্তন সৌন্দর্য আর মায়াবী রূপের প্রতীক হিসেবে। বারো হাত কাপড়ের এই জাদুকরী পোশাকে কোনো পকেট থাকবে, তা আজ থেকে কয়েক বছর আগেও কেউ ভাবেনি। টাকা বা চাবি রাখার জন্য দাদি-নানিদের যুগের সেই আঁচলে গিঁট দেওয়ার দিন এখন ফুরিয়েছে। আজকের আধুনিক বাঙালি নারী শাড়ি পরে বাইক চালাচ্ছেন, অফিসে প্রেজেন্টেশন দিচ্ছেন, আবার দরকার হলে বাসে-মেট্রোতেও ছুটছেন। এই গতিময় জীবনের সাথে খাপ খাওয়াতেই শাড়িতে পকেটের আগমন।

আজকের রেডি-টু-ওয়্যার বা কুঁচি দেওয়া সুতি, খাদি ও লিনেন শাড়ির ঠিক কুঁচির পাশেই নিখুঁতভাবে পকেট তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। শাড়ি পরার পর বাইরে থেকে বোঝার উপায় থাকে না যে সেখানে একটা পকেট আছে, অথচ হাত গলালেই মিলবে এক চিলতে ভরসার জায়গা। এই পরিবর্তনটি শুধু আরামদায়কই নয়, এটি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন এবং আধুনিকও বটে। এটি প্রমাণ করে যে, ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ন রেখেও কীভাবে সময়ের প্রয়োজনে তাকে আরও বেশি সহজ ও বাস্তবিক করে তোলা যায়। 

এ ছাড়া স্কার্ট বা গ্রাউনেও আজকাল পকেটের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। দিনশেষে নারীর পোশাকে এই পকেট শুধু ফ্যাশনই না বরং নারীর স্বনির্ভরতা ও স্বাধীনতার একটি উপাদান। সব আড়ষ্টতা ঝেড়ে ফেলে দুই হাত মুক্ত করে সবটা সামলানোর কাজে এক বন্ধু আমাদেরই পোশাকে থাকা পকেটটি। ফ্যাশন কেবল সুন্দরের পূজাই করে না বরং অনেক বাস্তবিক চাহিদা মিটিয়েও জীবনকে করে সুন্দর, সহজ ও সাবলীল। 


শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা