মাহবুবা মিতু
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬ ১৭:৪৭ পিএম
গৃহসজ্জায় এক টুকরো অরণ্য বায়োফিলিক ডিজাইন
ইটের পর ইট গেঁথে আমরা যে নগরসভ্যতা গড়ে তুলেছি, তা আমাদের চার দেয়ালের মাঝে সুরক্ষিত রাখলেও সাথে দিয়েছে এক অদ্ভুত একাকিত্ব। চারপাশের কংক্রিটের দেয়াল আর প্রযুক্তির অতি-ব্যবহার আমাদের ক্রমশ বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে প্রকৃতি থেকে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা চোখ দুটো যখন একটুখানি সবুজের খোঁজ করে, তখনই মনে হয় ‘ইশ, যদি ঘরের ভেতরেই এক টুকরো অরণ্য থাকত!’ এই আকুতি থেকেই ইন্টেরিয়র ডিজাইনের দুনিয়ায় তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বায়োফিলিক ডিজাইন।
‘বায়োফিলিয়া’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো- প্রকৃতির প্রতি মানুষের সহজাত ভালোবাসা। আর বায়োফিলিক গৃহসজ্জা মানে শুধু ঘরের কোণে একটা মানিপ্ল্যান্ট রেখে দেওয়া নয়; বরং ঘরের ভেতরের পরিবেশকে এমনভাবে সাজানো যাতে প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের একাত্মতা তৈরি হয়।
ঘরের ভেতরের অরণ্য কেন প্রয়োজন
যান্ত্রিক জীবনের মানসিক চাপ বা স্ট্রেস কমানোর জন্য বায়োফিলিক ডিজাইন কাজ করে জাদুর মতো। গবেষণায় দেখা গেছে, সবুজের ছোঁয়া এবং প্রাকৃতিক উপাদানের উপস্থিতি আমাদের মস্তিষ্কে ‘ফিল-গুড’ হরমোন নিঃসরণ বাড়ায়। এটি রক্তচাপ কমায়, মন শান্ত করে এবং ঘরের ভেতরের বাতাসের মান উন্নত করে। এক টুকরো সবুজ ঘরের ক্লান্তি দূর করে মনকে নিমেষেই সতেজ করে তোলে।
বায়োফিলিক গৃহসজ্জার মূল চাবিকাঠি
আপনার চেনা ঘরটিকে কীভাবে রূপান্তর করবেন এক টুকরো অরণ্যে? এর জন্য খুব বড় বড় পরিবর্তন বা বিপুল খরচের প্রয়োজন নেই। কয়েকটি মূল উপাদানের দিকে নজর দিলেই চলবে:
ইনডোর প্ল্যান্টসের জাদুকরি ছোঁয়া
বায়োফিলিক ডিজাইনের প্রধান স্তম্ভ হলো গাছ। বসার ঘরের সোফার পাশে রাখুন বড় পাতার মনস্টেরা বা অ্যালোকেসিয়া। ঘরের কোণগুলোকে প্রাণবন্ত করতে স্নেক প্ল্যান্ট, জেড প্ল্যান্ট বা স্পাইডার প্ল্যান্ট দারুণ অপশন। যদি ঘরের মেঝেতে জায়গা কম থাকে, তবে দেয়াল জুড়ে তৈরি করতে পারেন ‘ভার্টিক্যাল গার্ডেন’ বা ঝুলন্ত লতানো গাছের ঝালর। মানিপ্ল্যান্ট বা পথোস ঘরের সিলিং থেকে ঝুলিয়ে দিলে মনে হবে যেন কোনো বুনো লতার নিচে বসে আছেন।
আলো বাতাসের অবাধ খেলা
প্রকৃতির সবচেয়ে বড় উপহার হলো আলো আর বাতাস। বায়োফিলিক ডিজাইনে ভারী পর্দার বদলে হালকা, ব্যবহার করা হয় সুতি বা লিনেনের পর্দা, যাতে সূর্যের আলো সহজেই ঘরে প্রবেশ করতে পারে। সকালে বা বিকালে জানালাগুলো খুলে দিন, যাতে বাইরের হাওয়া ঘরের ভেতরের গুমোটভাব দূর করে প্রকৃতির ছোঁয়া এনে দিতে পারে।
প্রাকৃতিক উপাদানের টেক্সচার
প্লাস্টিক বা কৃত্রিম আসবাবের বদলে ঘরে জায়গা দিন বাঁশ, বেত, কাঠ এবং মাটির তৈরি জিনিসের। বসার ঘরের মেঝেতে বিছিয়ে দিতে পারেন পাটের তৈরি কার্পেট বা শতরঞ্জি। বেতের সোফা, কাঠের টেবিল, মাটির টব এবং সুতি কাপড়ের কুশন কভার আপনার ঘরকে এক চিলতে মাটির কাছাকাছি নিয়ে যাবে।
প্রকৃতির রঙে ঘর রাঙানো
ঘরের দেয়ালে বা আসবাবে এমন রঙ ব্যবহার করুন- যা প্রকৃতিতে সচরাচর দেখা যায়। একে বলা হয় ‘আর্থ টোন’, যেমনÑ পাতার মতো নরম সবুজ, মাটির মতো বাদামি বা টেরাকোটা, আকাশের হালকা নীল কিংবা বালুর মতো অফ-হোয়াইট। এই রঙগুলো চোখে প্রশান্তি এনে দেয় এবং ঘরকে অনেক বেশি বড় ও উন্মুক্ত দেখায়।
জলের মৃদু গুঞ্জন
যদি সম্ভব হয়, ঘরের একটি কোণে ছোট একটি কৃত্রিম ঝরনা বা ফাউন্টেন বসাতে পারেন। পাথরের ওপর দিয়ে জল বয়ে যাওয়ার মৃদু শব্দ ঘরের ভেতরের সমস্ত কোলাহলকে শান্ত করে দেয়। এটি কাজ করে চমৎকার থেরাপি হিসেবে।
আপনার অরণ্য তৈরির কিছু সহজ টিপস
রান্নাঘর ও বাথরুম
শুধু শোবার ঘর বা বসার ঘর নয়, রান্নাঘরের জানালায় রাখতে পারেন ছোট ছোট হার্ব বা পুদিনার টব। বাথরুমের আর্দ্র পরিবেশে ভালো বাঁচে এমন কিছু গাছ (যেমন- ফার্ন বা মানিপ্ল্যান্ট) সেখানে ঝুলিয়ে দিন।
প্রকৃতির রূপক
যদি সরাসরি গাছ রাখার সুযোগ কম থাকে, তবে দেয়ালে প্রকৃতির ছবি, ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টিং বা পাতার মোটিফযুক্ত ওয়ালপেপার ব্যবহার করতে পারেন।
সুগন্ধির ছোঁয়া
ঘরকে পুরোপুরি অরণ্যের আমেজ দিতে ব্যবহার করুন লেমনগ্রাস, ইউক্যালিপটাস বা চন্দনের অ্যাসেনশিয়াল অয়েল।
ঘর কেবল রাতে ঘুমানোর বা চার দেয়ালে বন্দি থাকার জায়গা নয়; ঘর হলোÑ আমাদের মনের রিচার্জ স্টেশন। সারা দিনের খাটুনি শেষে যখন আপনি ঘরে ফিরবেন, তখন কৃত্রিম এসির বাতাসের চেয়ে জানালার পাশে রাখা একটি গাছের পাতার দুলুনি আপনার মনকে বেশি শান্ত করবে।
বায়োফিলিক ডিজাইন কোনো সাময়িক ফ্যাশন বা ট্রেন্ড নয়, এটি প্রকৃতির কোলে ফিরে যাওয়ার এক শৈল্পিক প্রয়াস। আজই আপনার ঘরের একটি কোণ বেছে নিন। সেখানে একটি কাঠের চেয়ার পাতুন, পাশে রাখুন প্রিয় কিছু গাছ, আর জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিন। দেখুন নাগরিক কোলাহলের মাঝেও কেমন চমৎকারভাবে ডানা মেলছে আপনার নিজস্ব, এক টুকরো ব্যক্তিগত অরণ্য।