রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার একটি বনে পরিযায়ী পাখি বনসুন্দরী। ছবি: রানা মাসুদ
আমাদের দেশে সাধারণত শীতকালেই পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনা বেশি দেখা যায়। তবে এর চমৎকার এক ব্যতিক্রম হলো ‘বনসুন্দরী’। শীতের বদলে গ্রীষ্মের পরিযায়ী হয়ে এদেশে আসে এরা। ৯টি রঙের অপূর্ব মিশ্রণে গড়া এই পাখির রূপ সত্যিই অতুলনীয়; যেন আক্ষরিক অর্থেই সে বনের অলংকার। সম্প্রতি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার একটি বন থেকে দুর্লভ এই পাখির ছবি ক্যামেরাবন্দি করেছেন বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ও লেখক রানা মাসুদ।
ভারতে এটি ‘নওরং’ বা বহুরঙা পাখি হিসেবে পরিচিত। রানা মাসুদ জানান, বনসুন্দরী আমাদের দেশে ‘দেশি শুমচা’ নামেও পরিচিত। শুমচা পাখির বেশ কয়েকটি প্রজাতি রয়েছে। তিনি বলেন, ‘শরীরের নানা রঙের কারণে বনসুন্দরী অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ঘন বন ছাড়া এদের খুব একটা দেখা যায় না। বর্তমানে চোরাশিকারিরা দুর্লভ এই পাখি শিকারে তৎপর রয়েছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য ও বাস্তুসংস্থানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এসব পাখি রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে।’
প্রজনন ও জীবনযাপন
ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় বনসুন্দরীর বসবাস। এদের প্রজনন মৌসুম মূলত বর্ষাকাল। মে থেকে আগস্টের দিকে এরা মাটি থেকে ৩-৪ মিটার উঁচুতে গাছের ডালে ছোট রাগবি বলের আকৃতির বাসা বোনে। ডালপালা, বাঁশপাতা, ঘাস ও শিকড় দিয়ে তৈরি বাসার চারপাশে থাকে সূক্ষ্ম পাতার আস্তরণ। স্ত্রী ও পুরুষ মিলে ডিমে তা দেয় এবং ছানা ফোটার পর সমানভাবে যত্ন নেয়। ছানারা ২০ দিনের মাথায় উড়তে শিখলেই এরা তাদের নিয়ে আদি নিবাসে ফিরে যায়। ভেজা মাটির পাতা উল্টে কেঁচো, পোকামাকড় ও ছোট শামুক শিকার করাই এদের প্রধান কাজ।
দেখতে যেমন
স্ত্রী ও পুরুষ বনসুন্দরী দেখতে প্রায় একই রকম। মাত্র ১৮ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের পাখিটির ওজন ৪৭ থেকে ৬৬ গ্রাম। ফিকে বাদামি পা, কালো মোটা ঠোঁট এবং মাথার তালুতে হালকা বাদামির মাঝে কালো ডোরাÑ এসব মিলিয়ে এর রূপ অনন্য। পিঠের দিকটা সবুজ, পেছনের অংশ উজ্জ্বল লাল আর কাঁধে থাকে চমৎকার নীল ছোপ। গোধূলি ও ভোরে জোরালো শিস দিয়ে ডাকে এরা।
বনসুন্দরীর মতো দুর্লভ পাখি সংরক্ষণের তাগিদ দিয়ে বন বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাখিদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। পাখি হত্যা নিরুৎসাহিত করতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে; তবেই দেশের পরিবেশ সুন্দর থাকবে।’