স্মরণ
মোহাম্মদ আজম
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
প্রতিকৃতি: তানভীর মালেক
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক পেশায় ছিলেন অধ্যাপক। অধ্যাপনা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়িয়েছেন সাহিত্য এবং বাংলা সাহিত্য। এ তথ্যগুলো সম্ভবত তাকে বুদ্ধিজীবী ও লেখক হিসেবে বুঝতে সাহায্য করবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কিছু পেশাগত দিক আছে : পেশাদার শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের স্কিল সরবরাহ করা এবং প্রয়োজনীয় বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান উৎপাদন করা। দুটোই তার কাছে তুলনামূলক কম গুরুত্ব পেয়েছে। লেখায় কখনও কখনও এবং বলায় অসংখ্যবার তিনি শেখানোয় এবং গবেষণায় পেশাদার-মনোভাবের কুফল সম্পর্কে বলেছেন। এমন নয় যে, তিনি পড়াতেন না বা তার পড়ানো থেকে ছাত্রছাত্রীরা স্কিল অর্জন করত না। তিনি যত্নের সাথেই পড়াতেন এবং এও বলা যাবে, তিনি ক্লাসে পড়াতে পছন্দ করতেন। অন্যদিকে তার নিজের লেখায় আর্কাইভাল গবেষণার পরিমাণ বেশ কম হলেও তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে রচনাকে নির্ভরযোগ্য করে তোলার ঝোঁক, অন্তত প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে খুব দেখা গেছে। কিন্তু দুনিয়াজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান-উৎপাদন বলতে সাধারণভাবে যে পদ্ধতিমাফিক গবেষণা বোঝায়, তার রচনাবলিকে তা বলা যাবে না। অন্যের ক্ষেত্রেও তিনি একে উৎসাহ দিতেন না।
অন্তত স্নাতক-পর্যায়ের শিক্ষাকে ‘স্কিল’ হিসেবে না-দেখা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চাকে পেশাদার গবেষকের দৃষ্টিকোণ থেকে না-দেখার এ প্রবণতা সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু এ দৃষ্টিভঙ্গি তার নিজের অবস্থান বুঝতে আমাদের গভীরভাবে সাহায্য করে। ক্লাসে পাঠদান তার কাছে মুখ্যত জাগিয়ে তোলা ও সচেতন করার উপায়। ব্যক্তি-শিক্ষক তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে প্রণোদনাধর্মী কায়দায় কাজটি করবেন। তিনি নিজে চালিত হবেন কল্যাণ-আকাঙ্ক্ষায়, আর ছাত্রছাত্রীদের মাঝেও ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করবেন সে আকাঙ্ক্ষা। তার প্রায় তাবত গদ্যও একই উদ্দেশে লেখা। একজন ব্যক্তি কোন অবস্থান থেকে এ দুই কাজ করতে পারেন? শুধু বয়সজনিত জ্যেষ্ঠতা এজন্য মোটেই যথেষ্ট নয়। বরং জ্ঞান ও প্রজ্ঞাই এর ভিত্তি ও বৈধতা। জ্ঞান ও প্রজ্ঞা এবং সম্ভবত অভিজ্ঞতাওÑ এ ধরনের সক্ষম ব্যক্তি সম্ভব করবে। তিনি বয়োকনিষ্ঠদের জন্য এবং অচেতন-ব্যক্তিদের জন্য বক্তৃতা ও লেখা-আকারে তা পরিবেশন করবেন। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের অধ্যাপনা ও লেখালেখিতে আমরা এভাবে লিবারেল কাঠামোর খুব অন্তরঙ্গ প্রতিফলন দেখি।
এখন সাহিত্য-সংশ্লিষ্টতা এবং বিশেষত, বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক হওয়া কীভাবে তার বুদ্ধিজীবী ও লেখক-সত্তাকে প্রভাবিত করেছে, সে খবর নেওয়া যাক।
বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর আধুনিক জমানার ইতিহাস বেশ সাহিত্য-মগ্ন। এ ইতিহাসের সাথে কলোনিয়াল প্রক্রিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। কলোনিতে রাষ্ট্র-পরিচালনার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে জনগোষ্ঠী বেশ সংস্কৃতিপ্রবণ হয়ে ওঠে। জ্ঞান ও নৈতিকতা সাধারণভাবে আমদানি হয় ঔপনিবেশকদের এলাকা থেকে। ফলে সেগুলো পরিবেশন করে জনগণ পর্যন্ত পৌঁছানোর চেষ্টাই থাকে প্রধান শিক্ষা-সাংস্কৃতিক তৎপরতা। এ কাজের জন্য ‘সাহিত্য’Ñ শব্দটির একটু প্রসারিত অর্থে সবচেয়ে যোগ্য মাধ্যম। স্বভাবতই, উনিশ শতকের কলকাতায় সাহিত্য এবং সাহিত্যিক খুব উঁচু মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছিল। অন্য বিপুল চর্চার মধ্যেও এ প্রাধান্য সহজে শনাক্ত করা যায়।
বাঙালি জনগোষ্ঠীর এই-যে সাহিত্য-প্রাণতা ও সাহিত্য-কেন্দ্রিকতা তা আবুল কাসেম ফজলুল হক বিশেষভাবে শনাক্ত করেছিলেন এবং একে তিনি ক্ষতিকর প্রবণতা বলে মনে করতেন। বিশেষত দর্শন ও বিজ্ঞান বর্গে আমাদের চর্চার দীনতা এবং সামাজিক স্বীকৃতির অভাব সম্পর্কে তিনি বহুবার আক্ষেপ করেছেন। তা সত্ত্বেও তার নিজের লেখালেখি নানা গভীর অর্থে সাহিত্য-গোত্রে পড়বে। এর এক কারণ, তার রচনাবলির রেফারেন্স। দেশ-বিদেশের বিচিত্র উপাদান ব্যবহার করলেও বাংলা সাহিত্যই তার বরাতের প্রধান এলাকা। উনিশ-বিশ শতকের কলকাতায় ‘বাংলাবিদ্যা’র যে-বিকাশ ঘটেছিল, আর পরে ঢাকার পাকিস্তান ও বাংলাদেশ পর্বে যার অনুসৃতি দেখা যায়, তিনি মুখ্যত তার আওতায় কাজ করেছেন। বাংলা সাহিত্যের ছাত্র ও অধ্যাপক হওয়া এভাবে তার লেখালেখিতে খুব বড় ভূমিকা পালন করেছে।
কিন্তু আমরা যে বলেছি, তার লেখালেখি ‘সাহিত্য-গোত্রে’ পড়বে, তার আরও গভীর কারণ আছে। বিজ্ঞান-চর্চা এক জিনিস, আর বিজ্ঞান সম্পর্কে পাঠককে জানাতে চাওয়া আরেক। গবেষণাকর্ম ‘বিষয়ে’র স্বরূপ উন্মোচন করে; অন্যদিকে সাহিত্য তার যেকোনো ফর্মে মুখ্যত পাঠকের সাথে সম্পর্কিত হতে চায়। পাঠককেই সম্বোধন করে। তৈরি করতে চায় প্রধানত ইম্প্রেশন। আবুল কাসেম ফজলুল হক প্রথম ধারার লেখালেখি করেন নাই এমন নয়। তার মুক্তিসংগ্রাম (১৯৭২), একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন (১৯৭৬), উনিশ শতকের মধ্যশ্রেণি ও বাংলা সাহিত্য (১৯৭৯) ইত্যাদি রচনা কম-বেশি গবেষণার ধারায় পড়বে। কিন্তু বিপুল-অধিকাংশ রচনা সরাসরি পাঠকের সাথে প্রকাশমূলকভাবে সম্পৃক্ত হতে চেয়েছে। এজন্যই আমরা একে সাহিত্যধর্মী বলেছি।
একজন প্রাবন্ধিক-সাহিত্যিক হিসেবে তিনি স্বাধীনতার আগেই সুনাম ও স্বীকৃতি অর্জন করেছিলেন। সেকালের প্রভাবশালী তরুণ ও প্রবীণ সাহিত্যিকদের সাথে তার অন্তরঙ্গতা ছিল। কিন্তু কি গদ্য-ভঙ্গিতে, কী বিষয় ও দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি প্রথম থেকেই সমকালীন প্রভাবশালী সাহিত্যধারা থেকে নিজের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে চলেছেন। গদ্যের কথাই ধরা যাক। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত বর্তমান ধারার প্রবন্ধ নামের সংকলনে তার প্রবন্ধ গৃহীত হয়েছে। এ সংকলনের গদ্যকে আমরা ঢাকার ষাটের দশকের প্রতিনিধিত্বশীল গদ্য বলতে পারি। কণ্ঠস্বর গোষ্ঠী এবং এর বাইরেও অনেকে তখন সংস্কৃতবহুল প্রমিত বাংলাকে জাতীয়তাবাদী ও শিল্পবাদী অবস্থান থেকে নতুন উদ্যমে চর্চা শুরু করেছিলেন। স্বভাবতই সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বহুজনের কাছে গদ্যচর্চার আইডল হয়ে ওঠেন। তার প্রতিফলন আমরা দেখি সাম্প্রতিক ধারার প্রবন্ধ সংকলনে। এ চর্চাই বাংলাদেশের বাংলা বিভাগগুলোতে খুব জোরদার হয়েছিল পরের দশকগুলোতে।
আবুল কাসেম ফজলুল হক ষাটের তরুণ-প্রাবন্ধিক হিসেবে নিশ্চয়ই ওই আবহের মধ্যেই ছিলেন। আবার বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ও শিক্ষক হিসেবে খুব কাছ থেকে তিনি এ ধরনের গদ্যের চর্চা দেখেছেন। কিন্তু কোনোটিই তাকে বিন্দুমাত্রও প্রভাবিত করতে পারে নাই। তরুণ বয়সে লেখার রূপ ও রীতির প্রতি যখন লিখিয়েদের অধিকতর মনোযোগ থাকে, তখনও নয়; আর পরে তো নয়ই। মনে হয়, তিনি প্রথম থেকেই নিজের গদ্যচর্চার উদ্দেশ্য ও উপায় সম্পর্কে মোটামুটি স্থির-সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছিলেন। কী সে সিদ্ধান্ত? প্রথম থেকেই তার লক্ষ্য ছিল গদ্যকে বার্তা-বহনের উপযোগী করে গড়ে তোলা। এ কারণেই তার লেখায় এমন কসরত প্রায় কখনোই দেখা যায় নাই, যেখানে বার্তার বদলে খোদ বাহকই নিজের দিকে পাঠকের মনোযোগ গভীরভাবে আকৃষ্ট করবে। কথাগুলো সুন্দর করে বলার প্রতি তার আগ্রহ ছিল; কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহ ছিল বুঝিয়ে বলার দিকে। এ কারণেই আবুল কাসেম ফজলুল হকের গদ্য পরিচ্ছন্ন এবং প্রকাশক্ষম। তিনি যথাসম্ভব উদাহরণ জুড়ে দেন; কথাটা বিভিন্নভাবে বলেন; আর পাঠকের সাথে যোগাযোগে যেকোনো বাধা বাড়তি শব্দ-প্রয়োগ করে দূর করতে চান। আভিধানিক শব্দ তার লেখায় নাই বললেই চলে। বলা যায়, পাঠককে বুঝিয়ে বলতে চান এবং মানাতে চানÑ এমন একজন লেখকের গদ্য যেরকম হওয়ার কথা, তার গদ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো মোটের ওপর সেরকমই।
আবুল কাসেম ফজলুল হকের গদ্য-প্রসঙ্গে এ বয়ান যথেষ্ট নয়। আমরা এখানে কেবল একটি দিকেই দৃষ্টি-আকর্ষণ করতে চাইছিÑ বৃহত্তর অর্থে সাহিত্য-বলয়ের মধ্যে কাজ করলেও প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি তার দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থানের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে পেরেছেন। বাংলা সাহিত্যের পঠন-পাঠনেও তার সে অবস্থান খুব স্পষ্ট এবং এ ক্ষেত্রে তার পক্ষ-বিপক্ষের বিভাজন-রেখা অত্যন্ত জোরালো। তিরিশের কাব্যধারা এবং কাব্যাদর্শ কখনোই তার সমর্থন পায়নি। বস্তুত, তিনি সাহিত্যে নাস্তি-প্রচারকে অত্যন্ত ক্ষতিকর মনে করেন। পাঠকের ওপর সাহিত্য-শিল্পের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে Ñ এ লিবারেল সাহিত্যাদর্শই তার এরকম অবস্থানের মূল। সাহিত্যচিন্তা (১৯৯৫) নামে যে-বই তিনি প্রচার করেছেন, তাতে বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-প্রণীত সাহিত্যিক আদর্শের প্রতি তার পক্ষপাত প্রকাশিত হয়েছে। আরেকটু পেছন দিকে গেলে রামমোহন রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকেও এ তালিকায় আনা যাবে। ওই দুজনের সাথে তার ব্যক্তিগত আত্মীয়তা তুলনামূলক বেশি। কারণ তারা দুজনই সাহিত্যকর্ম বা গদ্য-রচনাকে ব্যবহার করেছেন কাজের অংশ হিসেবে। একই কথা বলা যাবে কাজী নজরুল ইসলাম ও বেগম রোকেয়া সম্পর্কে। প্রথম চৌধুরীর সাহিত্য-রুচির প্রতি তার আগ্রহ থাকলেও ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ মতবাদের প্রতি স্বভাবতই সমর্থন ছিল না।
এ তালিকাকে যদি বিশ্বসাহিত্যের দিকে প্রসারিত করি, তাহলে তার সাহিত্যদৃষ্টি ও পক্ষপাতের মানচিত্রটা আরও খোলাসা হবে। তার বিশেষ পছন্দের সাহিত্যিক ও সাহিত্যতাত্ত্বিক ছিলেন লিও টলস্টয়। টলস্টয়ের শিল্প-বিষয়ক রচনা তিনি অনুবাদ করেছেন এবং প্রচার করেছেন। অনুবাদ করেছেন সাঁত বভের ‘হোয়াট ইজ এ ক্লাসিক’ নামের বিখ্যাত রচনা। এ দুই অনুবাদ কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয়। এর সাথে তার নিজের রুচি ও পক্ষপাতের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক আছে। বিশ শতক নয়, উনিশ শতকের লিবারেল ঘরানার শিল্পদৃষ্টি ও সাহিত্যাদর্শই তার প্রবণতা ও ভাব-বলয়ের সাথে অধিক সঙ্গতিপূর্ণ। মানুষের জীবনের বিচিত্র উপস্থাপন এবং বৃহৎ-মহৎ জীবনদৃষ্টির প্রতিফলন হিসেবেই তিনি সাহিত্যকে দেখেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত ভট্টাচার্য কিংবা মাও সেতুংয়ের সাহিত্যকর্ম এবং তত্ত্বও তার চর্চার সীমায় এসেছে। তবে শিল্পকলার তত্ত্বীয়-প্রায়োগিক যে-স্কুলগুলো বিপ্লবী প্রণোদনার উৎস হিসেবে সাহিত্য-শিল্পকে বিবেচনা করে, সেগুলোর সাথে তার আত্মীয়তা বস্তুত ক্ষীণ। লেখালেখির কেজো দিককে গুরুত্ব দিতেন বলে এ ধারা তার বড় আওতার বাইরে পড়ে না। কিন্তু অন্তর্গত মেজাজের দিক থেকে আধুনিক যুগের ধ্রুপদি সাহিত্যধারাইÑ বাংলা ভাষার ও বিশ্বসাহিত্যের মূলত তার সাহিত্যরুচির অনুকূল।
বাংলা সাহিত্যের অত্যন্ত প্রভাবশালী তিরিশের দশকের এবং ঢাকার ষাটের দশকের সাহিত্যকর্মে মনোযোগ দিতে না-পারা আপাতদৃষ্টিতে আবুল কাসেম ফজলুল হকের সাহিত্যদৃষ্টির ঊনতা বলেই প্রতীয়মান হবে। কিন্তু প্রবল নাস্তির বিপরীতে ইতিবাচক বহু প্রস্তাব এক্ষেত্রে তার অবস্থানের পুনর্মূল্যায়নে আমাদের বাধ্য করে। তার প্রস্তাবের এবং দৃষ্টিভঙ্গির শক্তিমত্তা প্রমাণিত হয়, এমন একটা উদাহরণ দিই। জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে তিনি একটি ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বই লিখেছেন আধুনিকতা ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা (২০০৩) নামে। নাস্তির প্রচারের দিক থেকে জীবনানন্দ দাশ তিরিশের দশকের কবিদের মধ্যেও প্রবলতম ছিলেন। কিন্তু নাস্তিকে কাব্যধর্ম বিবেচনা করে সাহিত্য-পাঠের যে-রেওয়াজ সুপ্রতিষ্ঠিত, তাকে এড়িয়ে এ পুস্তিকায় আবুল কাসেম ফজলুল হক জীবনানন্দ পড়ার এক নতুন তরিকা প্রস্তাব করেন। তিনি আবহমান সাহিত্যকর্মে মানুষের দুঃখবোধ, হতাশা ও নাস্তিবোধ প্রকাশের একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণী তুলে ধরেন এবং তার ধারাবাহিকতায় জীবনানন্দকে স্থাপন করেন। তিনি দেখান, জীবনের জন্য প্রবল আকুতি এ কবির কবিতায় বিপরীতক্রমে প্রকাশিত হয়েছে এবং মানুষের অনিঃশেষ বিষাদগ্রস্ত জীবন-আবিষ্কারের অভ্যন্তর-প্রেরণাই তার ওই নাস্তিবাদী কাব্যমালার মূল উৎস। এভাবে জীবনানন্দের কবিতায় শেষ পর্যন্ত জীবনের জন্য উৎকণ্ঠাই বড় হয়ে উঠেছে। রচনাটি একদিকে আবুল কাসেম ফজলুল হকের সাহিত্যদৃষ্টির ব্যক্তিত্ব নিশ্চিত করে, অন্যদিকে জীবনানন্দ-পাঠে এক ভিন্ন তরিকার দিশা দেয়।