প্রবন্ধ
ড. হাফিজ রহমান
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৩ ঘণ্টা আগে
অলংকরণ: তানভীর মালেক
কাজী নজরুল ইসলামের বর্ষার গানগুলোতে প্রেমের ব্যাপ্তি সুবিস্তৃত ও বহুমাত্রিক শিল্পরূপে প্রতিফলিত হয়েছে। কবির কাছে বর্ষা কেবল একটি ঋতু নয়; এটি প্রেম, বিরহ, আকাঙ্ক্ষা, সৌন্দর্য, আবেগ ও মিলনের প্রতীক। প্রকৃতির রূপের সঙ্গে মানব মনের অনুভূতিকে মিলিয়ে তিনি বর্ষাকে এক অনন্য রোমান্টিক আবহে উপস্থাপন করেছেন।
প্রকৃতি ও প্রেমের মেলবন্ধন, নজরুল গানের অতিসাধারণ ও পরিচিত একটি রূপ। নজরুলের কাব্যসংগীত : আষাঢ়-শ্রাবণের মেঘ, বৃষ্টি, বিদ্যুৎ, কদমফুল, নদী ও বাতাস, প্রেমিক-প্রেমিকার অনুভূতির সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে যুক্ত। তার গানে প্রকৃতি যেন মানুষের মতো করে মানুষের হৃদয়ের ভাষায় কথা বলে। অন্যপক্ষে বিরহ ও অপেক্ষার আবেগ, বর্ষার দিনে প্রিয়জনের অনুপস্থিতি, তার গানে গভীর বেদনার সৃষ্টি করে। বৃষ্টিধারা বিরহের অশ্রুর প্রতীক হয়ে ওঠে, আর মেঘলা আকাশ প্রতীক্ষার দীর্ঘশ্বাস বহন করে। তবে শুধু বিরহ-ই নয়, সাথে সাথে মিলনের আকাঙ্ক্ষাও অনেক তীব্র হয়ে ধরা দেয়। বর্ষা পর্যায়ের অনেক গানে প্রেমিক-প্রেমিকার মিলনের উপযুক্ত সময় হিসেবে ধরা দিয়েছে। ঝরঝর বৃষ্টির সুর, শীতল বাতাস ও সজীব প্রকৃতি, প্রেম আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এই ধরনের গানে সংগীতধর্মিতা ও আবেগময় ভাষা, সাবলীল সুর ও রোমান্টিক কথার অসাধারণ মেলবন্ধন মানুষের জীবনেরই কথা বলে যেন। নজরুলের বর্ষার গানে অলংকার, উপমা ও চিত্রকল্পের ব্যবহার অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তার ভাষা সুরেলা এবং আবেগপূর্ণ, যা রোমান্টিক অনুভূতিকে গভীরভাবে প্রকাশ করে। মানবিক অনুভূতির সার্বজনীনতাও এসব গানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে ওঠে এসেছে। তার বর্ষার গান কেবল ব্যক্তিগত প্রেমের কথা বলে না; বরং মানুষের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা, একাকিত্ব ও ভালোবাসার সর্বজনীন অনুভূতিকেও চিত্রকল্পের মাধ্যমে আয়নার মতো তুলে ধরে।
প্রেমের শাশ্বত রূপ ও সাহিত্যমান
কাজী নজরুল ইসলামের বর্ষার গান বাংলা কাব্যসংগীতের অনন্য সম্পদ। এই গানগুলোতে বর্ষা প্রেম, বিরহ, প্রতীক্ষা, স্মৃতি, আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা, পুরাণচেতনা এবং প্রকৃতির নান্দনিক রূপের প্রতীক। বর্ষাকেন্দ্রিক গানের মধ্যে কিছু গান ব্যক্তিগত প্রেমকেন্দ্রিক, কিছু বৈষ্ণব ভাবধারার, কিছু শাক্ত ভাবনার, আবার কিছু প্রকৃতির বিজয়গাথা। ফলে সবগুলোকে একই ধরনের প্রেমের গান হিসেবে বিচার করা যায় না। বিরহ: প্রেমের সর্বজনীন ও শাশ্বত রূপ প্রায় প্রত্যেকটি গানে লক্ষ্য করা যায়। নজরুলের বর্ষার গানের প্রধান সুর বিরহ। কিন্তু এই বিরহ আত্মবিলাপ নয়; এটি প্রেমকে গভীর ও মহিমান্বিত করে। যেমন: ‘শাওন-রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে, বাহিরে ঝড় বহে, নয়নে বারি ঝরে।’ এখানে ঝড় ও মানুষের অশ্রু সমান্তরাল বেদনার প্রতীক। আবার এই প্রেম এতটাই নিঃস্বার্থ যে, প্রেমিক নিজের দুঃখের কথা বললেও প্রিয়ার মঙ্গলই কামনা করে-‘দু’ হাতে ঢেকো আঁখি যদি গো জলে ভরে।’ এই বাক্য সৃষ্টির মাধ্যমে। এটি আত্মত্যাগী প্রেমের উৎকৃষ্ট প্রকাশ। পক্ষান্তরে, ‘বরষ মাস যায়Ñ সে নাহি আসে’ শিরোনামের গানটিতে ‘সেই চাঁদ ওঠে নভে, ফুলবনে ফুল ফোটে বৃথায়।’ প্রকৃতির পুনরাবৃত্তি হলেও প্রেমিক ফিরে আসে না। চাঁদ ও ফুল এখানে অপূর্ণ প্রেমের প্রতীক। আবার ‘শাওন আসিল ফিরে সে ফিরে এলো না’ গানে কবি বলেন ‘বরষা ফুরায়ে গেল, আশা তবু গেল না।’ এখানে সময়ের প্রবাহ প্রেমের প্রতীক্ষাকে পরাজিত করতে পারে না। এই আশাই প্রেমকে শাশ্বত করে।
বর্ষা পর্যায়ের গানগুলিতে প্রকৃতি ও প্রেমের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়। নজরুল প্রকৃতিকে প্রেমের সক্রিয় চরিত্রে রূপ দিয়েছেন। ‘আবার কি এলো রে বাদল’ এই গানে কবি বলেন, ‘ল’য়ে পিঠভরা এলোচুল, চোখভরা জল।’ এখানে, বাদলকে বিরহিণী নারীর রূপে কল্পনা করা হয়েছে। আরও গভীর চিত্র লক্ষ্য করা যায়, যখন তিনি বলেন, ‘কে গেল অভিসারে, কে কাঁদে ভবনে/কা’র দীপ নিভে গেল দুরন্ত পবনে।’ প্রিয়জন হারানোর বেদনা এখানে ভবন থেকে পবনের সাথে জড়িয়ে গেছে। প্রেমের দীপ নিভে গেল বলেই সুরম্য ভবনেও মানুষ কাঁদছে। একই বর্ষা কারও কাছে মিলন, কারও কাছে বিচ্ছেদ। ‘বরষা ঐ এলো বরষা’ এই গানটিতে কবি বলেন, ‘ঘন দেয়া দমকে/ দামিনী চমকে/ঝঞ্ঝার ঝাঁঝর ঝমঝম ঝমকে/মনে পড়ে সুদূর মোর প্রিয়তমকে’। এখানে প্রকৃতি স্মৃতির উদ্দীপক। বর্ষা ব্যক্তিগত প্রণয়কে জাগিয়ে তোলে। নজরুলের প্রেম কখনও অধিকার চায় না; অপেক্ষা করে। এমনই একটি আকুতি ‘শ্রাবণ রাতের আঁধারে’ গানে দেখা যায়। ‘বিরহী যক্ষ কাঁদে একাকী কোথায় কোন্ দূর চিত্রকূটে।’ এখানে মেঘদূত-এর যক্ষের অনুষঙ্গ এনে ব্যক্তিগত প্রেমকে শাস্ত্রীয় উচ্চতায় উন্নীত করা হয়েছে। প্রিয়জনের প্রতীক্ষায় থেকে থেকে অবশেষে সে যখন আসে তখন কেমন অনুভূতির সৃষ্টি হয়, সেটিও ফুটে উঠেছে, ‘বরষা মাস যায়-সে নাহি আসে’ গানের ‘মরমর ধ্বনি শুনি’ পল্লবে চমকিয়া উঠি সখি, ভাবি বুঝি বঁধূ মোর আসিল।’ বস্তুত প্রতীক্ষা এখানে প্রেমের স্থায়ী রূপ।
বৈষ্ণব প্রেমের আধুনিক রূপ-ও কবির কয়েকটি বর্ষা পর্যায়ের গানেও দেখা যায়। কয়েকটি গানে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম আধুনিক অনুভূতিতে ফিরে এসেছে। যেমন: ‘আবার শ্রাবণ এলো ফিরে’ এই গানটিতে ‘বৃষ্টি ধারায় টাপুর টুপুর, শুনব তাহার পায়ের নূপুর।’ কৃষ্ণের আগমনের প্রত্যাশা প্রকৃতির শব্দের সাথে মিলেমিশে একাকার এখানে। ‘বরষার দিন তো হয়ে গেছে সারা’ গানে কবি হৃদয়ের অমর আকৃতি- ‘ও সই কৃষ্ণ তো গেছে কবে মথুরায়, কেন বৃন্দাবনে চাঁদ ওঠে হায়।’ এখানে রাধার বিরহ ব্যক্তিগত প্রেমের উৎকৃষ্ট প্রতীক। এভাবে প্রেমের আধ্যাত্মিক বিস্তার নজরুলের গানের বেশ পরিচিত বিষয়। হিন্দি-বাংলা মিশ্রিত একটি গান হলো- ‘বরষা মে বাজে সখিরী’। গানটি হিন্দুস্তানি ঠুমরির প্রভাবযুক্ত। এই গানের একটি চরণ- ‘চঞ্চল চপল বিজলি চমকে, উনকে হাসি দেখায়ে আজ ঘনশ্যাম আয়ে।’ এখানে কৃষ্ণ কেবল মানবপ্রেমিক নন; তিনি ঈশ্বরীয় প্রেমেরও প্রতীক। ভক্তি ও রোমান্টিকতা এখানে একাকার।
কাজী নজরুল ইসলামের বর্ষার এই গানগুলি সমৃদ্ধ শিল্পসম্মত। গানগুলিতে চিত্রকল্প, প্রতীক, অনুপ্রাস, পুরাণ প্রভৃতি অলংকার লক্ষ্য করা যায়। ‘বিজলী দীপ-শিখা খুঁজিবে তোমায় প্রিয়া।’ এখানে বিদ্যুৎকে দীপশিখা হিসেবে কল্পনা অসাধারণ কাব্যিকতার প্রকাশ। চিত্রকল্প এখানে বিদ্যুতের মতোই প্রখর প্রদীপ্ত। আবার, রূপক বা প্রতীকের ব্যবহারও বেশ উল্লেখযোগ্য। যেমনÑ ঝড়, অন্তরের অস্থিরতা; বৃষ্টি, অশ্রু; কদম, প্রেম; দোলনা, মিলনের আশা; যমুনা, চিরন্তন প্রেম; মেঘ, দূত ও স্মৃতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বর্ষা পর্যায়ের গানে এরকম বহু রূপক লক্ষ্য করা যায়। এই গানগুলিতে বিভিন্ন প্রকারের অনুপ্রাসের ব্যবহার গানগুলিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। যেমন: ‘চঞ্চল চপল বিজলি চমকে’ ‘ঘন দেয়া দমকে দামিনী চমকে/ঝঞ্ঝার ঝাঁঝর ঝমঝম ঝমকে।’ ‘বিরহী কুহু-কেকা গাহিবে নীপ-শাখে’ ‘বরষা ঋতু এলো এলো বিজয়ীর সাজে’/‘বাজে গুরু গুরু আনন্দ ডম্বরু অম্বর মাঝে’ ‘ভীত বন-উপবন লুটায়ে লুটায়ে,/প্রণতি জানায় সেই বিজয়ীর পায়ে’। এই সমস্ত অনুপ্রাস ও ধ্বনির অনুকৃতি বর্ষার রিমঝিম রিমঝিম শব্দকে শ্রুতিমধুর করে তুলেছে। কিছু গানে পুরাণ ও শাস্ত্রীয় অনুষঙ্গ যেমনÑ রাধা-কৃষ্ণ, যক্ষ, চিত্রকূট, যমুনা এসব অনুষঙ্গ গানের ভাবকে গভীরতা দিয়েছে।
কাজী নজরুলের বর্ষার গানগুলিতে প্রেম কখনও ব্যক্তিগত, কখনো বৈষ্ণব, কখনও আধ্যাত্মিক, আবার কখনও স্মৃতিনির্ভর। তবে সব ধরনের প্রেমের মধ্যেই একটি অভিন্ন সত্তা ও সত্য বিদ্যমান। তা হলো-প্রতীক্ষা, বিরহ, স্মৃতি ও আশার মধ্য দিয়েই প্রেম শাশ্বত হয়ে ওঠা। গানের ভাষা চিত্রময়। প্রতীক-রূপকসমৃদ্ধ। সুরেলা, সুমিষ্ট ও সাঙ্গীতিক। গানগুলিতে বর্ষার প্রকৃতি, কখনও প্রেমিকার চোখের জল, কখনও মিলনের দূত, কখনও বিরহের সঙ্গী, আবার কখনও ঈশ্বরীয় প্রেমের আবাহক হিসেবে রূপায়িত। এই বহুমাত্রিকতা এবং উচ্চাঙ্গ কাব্যরীতি নজরুলের বর্ষার গানকে বাংলা কাব্যসংগীতের অন্যতম সার্থক ও শিল্পমানসম্মত সংগীত পর্যায়ে স্থান করে দিয়েছে।