শাহ্ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান
প্রকাশ : ৪ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৩ ঘণ্টা আগে
প্রতিকৃতি: তানভীর মালেক
কবি কাজী নজরুল ইসলামের রচনার মধ্যে ফুটে উঠেছে সমকালীন সংকটময় মুহূর্ত। তার তেমনই একটি কবিতা ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’। যা রচিত হয়েছিল আজ থেকে শতবর্ষ আগে। কবিতাটিকে ধরা হয় গভীর রাজনৈতিক ও জাতীয় চেতনার প্রতীক হিসেবে। কবির এই কবিতার মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে নেতৃত্ব, সাহস, ঐক্য এবং আত্মত্যাগ। তাই এটি শুধু একটি কবিতা নয়, বরং সময়ের ডাক, বিপ্লবের এক আহ্বান। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে এ কবিতাটি এক অনন্য, অদ্বিতীয় এবং যুগান্তকারী সৃষ্টি। কবিতাটি শুধু সাহিত্যকর্ম হিসেবেই নয়, বরং পরাধীন জাতির আত্মজাগরণের এক বজ্রনিনাদ। কবিতাটির ঐতিহাসিক পাঠ-বিশ্লেষণ করে লিখেছেন শাহ্ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান।
আজ থেকে শতবর্ষ আগে ১৯২৬ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) আলোচিত ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ শীর্ষক দেশাত্মবোধক ও মানবতাবাদী এই কবিতাটি লিখেছিলেন। রচনাটি একই সঙ্গে জনপ্রিয় গান ও কবিতা হিসেবে পরিচিত। এ রচনাটি তিনি ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ৬ই জ্যৈষ্ঠ (ইংরেজি, মে-জুন ১৯২৬) রচনা করেন এবং রচনার কয়েকদিনের মধ্যে মাসিক ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায় ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের পঞ্চম বর্ষ জ্যৈষ্ঠ প্রথমার্ধ চতুর্থ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়। পরে ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ জ্যৈষ্ঠ ৫০ বর্ষ ২য় সংখ্যায় ‘ভারতী’সহ অনেক সাময়িকীতে এ লেখা প্রকাশিত হয়েছে। কবিতাটি ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ শিরোনামে গান হিসেবে সমধিক পরিচিতি পায়। গানটি ‘কালি-কলম’ পত্রিকার আশ্বিন ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ সংখ্যায় কাজী নজরুল-কৃত স্বরলিপিসহ প্রকাশিত হয়েছিল।
‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ রচনাটিকে নানা রকম দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার বিশ্লেষণ করা হয়। অসাম্প্রদায়িক ভূমিকা কবির সাহিত্যজীবনের উন্মেষকাল থেকেই প্রতিফলিত হয়েছে। পরবর্তীতে তা অসংখ্য কবিতা ও গানে, প্রবন্ধ, উপন্যাস, সাংবাদিকতায় ও রাজনৈতিক শ্রমিক সংগঠন (১৯২৫-২৬) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অব্যাহত রেখেছিলেন। এ কথা বারবার উচ্চারিত হয় যে, ব্রিটিশ শাসনের আগে ভারতীয় উপমহাদেশ তথা বাংলায় হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় ছিল। এই সম্প্রীতির নানা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক গ্রন্থে পাওয়া যায়। কবি অতীত সম্পর্কে গৌরববোধ করতেন এবং বর্তমান সম্পর্কে গভীর আত্মবিশ্বাস রাখতেন। আর্থ-সামাজিক ধ্যানধারণার ক্ষেত্রে এসবই ছিল তার উত্তরাধিকার। কিন্তু ব্রিটিশ কলোনিয়াল স্বার্থবাদী শাসক-শোষকদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির কারণে তা নষ্ট হয়। ব্রিটিশ আমলে উপমহাদেশে গরু-কোরবানি এবং মসজিদ-মন্দিরের সামনে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান-মহররম, পূজার মিছিলকে কেন্দ্র করে কলকাতা, বিহার, নোয়াখালীসহ পূর্ব বাংলার বিভিন্ন স্থানে পুনঃপুন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটেছে। কাজী নজরুল চোখের সামনে সাম্প্রদায়িকতা দেখেছেন, যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে সেই হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্কে তিনি তার লেখায় সাধারণভাবে বলার চেষ্টা করেছেন। সৃষ্টিকর্মে প্রধান গুরুত্ব হিসেবে মানুষকেই বেছে নিয়েছেন। তিনি কখনও সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশ বিভাজন সমর্থন করতেন না। তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম কবি যিনি হিন্দু-মুসলমানের ঐতিহ্যকে একসূত্রে গেঁথে গান ও কবিতা রচনা করেছেন।
আলোচ্য ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ রচনাটি বুঝতে হলে তার সমকালকে সর্বাগ্রে বুঝতে হবে। ব্রিটিশ শাসনের চিরাচরিত শঠতার নীতি যা ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ সৃষ্টি করে তাদের শাসন-শোষণ দীর্ঘায়িত করা। উপমহাদেশের এই হিন্দু-মুসলিম সমস্যা কাজী নজরুলকে ভাবিয়ে তুলত। তিনি এ সমস্যা নিয়ে বারবার লিখেছেন। তার ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ রচনাটি প্রকাশের ফলে অবিভক্ত বাংলায় তরুণ ছাত্র, যুবক, রাজনীতিবিদসহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। সমকালে অনেক পত্রিকায় এ কবিতাটি পুনঃমুদ্রিত এবং নানা সম্মেলন ও অনুষ্ঠানে গীত হয়। রচনাটির জন্য কবিকে নানা অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট ব্যক্তি-স্বেচ্ছাসেবক-ছাত্র-যুবক উষ্ণ অভ্যর্থনায় বরণ করে নেন। কবি নজরুল সে সময় হয়ে উঠেছিলেন সারা বাংলায় তারকা কবি।
রচনাটি প্রসঙ্গে মাহবুবুল হক তার ‘নজরুল তারিখ অভিধান’ শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন :
গানটি ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ২২ মে কৃষ্ণনগরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধন-সংগীতরূপে কবি-কর্তৃক গীত হয়েছিল। ১৩৩৩ আশ্বিনের (সেপ্টেম্বর ১৯২৬) কালি-কলমে এই গানটি কবিকৃত স্বরলিপিসহ প্রকাশিত হয়। পরে এটি সর্বহারা কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয়। [উদ্ধৃত: নজরুল তারিখ অভিধান।। মাহবুবুল হক ।। বাংলা একাডেমি, ঢাকা।। প্রথম প্রকাশ জুন ২০০৯।। পৃ. ১০৩]
কাজী নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ শীর্ষক কবিতাটির প্রেক্ষাপট অতি দীর্ঘ। এ রচনার সমকালে বাংলার তথা ভারতবর্ষ এক বিক্ষুব্ধ সময়। তখনকার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে কাজী নজরুলের মানসপট তৈরি হয়েছে। রচনাটির পূর্বাপর ইতিহাস পাঠে বলতে হয়, ব্রিটিশদের ‘ভাগ কর শাসন কর’ নীতির কথা। ব্রিটিশ সরকার এ দেশের মানুষের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে ধর্ম, বর্ণ, জাতি এবং অঞ্চলভেদে বিভেদ সৃষ্টি করে। তাদের পুরো শাসনামলই ছিল উপমহাদেশের মানুষের জন্য সংকটময় এক দুঃসময়। যদিও তারা নিজেদের ক্ষমতাকে একচেটিয়া করার জন্য উপমহাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা, আইন ও শাসন কাঠামোর বিন্যাস, ইংরেজি শিক্ষাবিস্তার, রেলপথ নির্মাণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, সমাজ সংস্কারমূলক কাজ ইত্যাদি কল্যাণ সাধন করলেও তাদের নিষ্ঠুর শাসন ও শোষণ আজও কালের সাক্ষ্য হয়ে রয়েছে।
কাজী নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ রচনার পূর্বাপর কালে গোটা ভারতবর্ষের রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল অস্থির। এ সময় রাজনৈতিক পরিস্থিতির ঘটে ব্যাপক বিপর্যয়। এর কারণ আর কিছু নয়, ইংরেজ সরকারের শাসন, শোষণ, নির্যাতন, দমন, নিপীড়ন। ভারতবর্ষে এ সময়ে যে অগ্নিমূর্তি ধারণ করেছিল বঙ্গভঙ্গের (১৯০৫) সময়েও তা হয়নি। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। এই অগ্নিযুগের চালচিত্র ঔপনিবেশিক দলিলপত্রে প্রমাণ পাওয়া যায়। উত্তাল এ সময়ে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতির তালিকায় রয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর (১৯১৪-১৯১৮) ভারতবর্ষে প্রভাব, খিলাফত আন্দোলন (১৯১৮-১৯২০), অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০-১৯২২), রাওলাট আইন, ১৯১৯; ভারত শাসন আইন, ১৯১৯; জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ড (১৩ই এপ্রিল, ১৯১৯), চৌরিচৌরার ঘটনা (৪ঠা ফেব্রুয়ারি ১৯২২), আইন অমান্য আন্দোলন, প্রজা-আন্দোলন ইত্যাদি।
পরাধীন ভারতবর্ষের রাজনীতির এই টালমাটাল সময়ে কবি নজরুল সদ্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক জীবন থেকে দেশে ফিরে আসার পর সাংবাদিকতা ও লেখালিখিতে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ছিলেন সক্রিয় জাতীয়তাবাদী প্রত্যয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ একজন রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তি। তিনি মনে করতেন রাজনৈতিক মুক্তির মধ্যেই অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিকসহ সকল মুক্তি নিহিত। কাজী নজরুল কিশোর বয়স থেকে জীবনের প্রত্যেকটি পর্যায়ে দারিদ্র্য, সামাজিক প্রতিকূলতা, পরাধীনতা, অত্যাচার, নির্যাতন, শোষণ, বঞ্চনা, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে বেড়ে উঠেছেন। বিদ্রোহ ও সংগ্রামী জীবন তার ধমনিতে মিশে ছিল গভীরভাবে
দুই.
বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ব্রিটিশ ভারতে সাম্প্রদায়িক সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। কলকাতায় বারবার হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা হতো। এই দাঙ্গার প্রভাব, সাম্প্রদায়িক বিষ ঢাকাসহ পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে পড়ে। কাজী নজরুল ধর্মীয় বিভাজন, সামাজিক কুসংস্কার, জাতপাতের বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিরুদ্ধে গান, কবিতা, বক্তৃতা উপস্থাপন করেন। রাজনৈতিক এই অস্থিরতার সময়ই কবি নজরুল তার ২৬ পঙ্ক্তি বিখ্যাত ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতাটি রচনা করেন। তিনি তার ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে জাতি, ধর্ম ও বিভেদের ঊর্ধ্বে ওঠে মানবতার বার্তা দিয়েছেন। কবিতাটির কয়েকটি বিখ্যাত পঙক্তির উদ্ধৃতি নিচে দেওয়া হলো :
অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ,
কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পণ।
‘‘হিন্দু না ওরা মুসলিম?” ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কান্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!
[উদ্ধৃতি: নজরুল রচনাবলি।। রফিকুল ইসলাম ও অন্যান্য (সম্পা.)।।, বাংলা একাডেমি, অক্টোবর ২০১৮।। দ্বিতীয় খণ্ড।।সর্বহারা। পৃ. ১২২]
এ কবিতা যেন তার নিজেরই প্রতিরূপ। চরণগুলোতে মানবতার এক শক্তিশালী বার্তা বহন করে। এ বার্তা এক গভীর রাজনৈতিক ও জাতীয় চেতনার প্রতীক। এটি শুধু একটি কবিতা নয়, এটি একটি সময়ের ডাক, একটি বিপ্লবের আহ্বান।
এ প্রসঙ্গে করুণাময় গোস্বামী তার ‘নজরুল গীতি প্রসঙ্গ’ শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন :
১৯২৬ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতায় হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা হয়। এতে কবি নজরুল অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন। তখন তিনি কৃষ্ণনগরে থাকতেন। পরের মাসে কৃষ্ণনগরে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেগুলো হচ্ছে : বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলন, অর্থাৎ প্রাদেশিক কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলন, ছাত্র সম্মেলন ও যুব সম্মেলন। প্রাদেশিক কংগ্রেসের সম্মেলন ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নজরুল ইসলাম এই তিনটি সম্মেলনের আয়োজনের ব্যাপারেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতির তাৎপর্যকে বিষয়বস্তু করে নজরুল কংগ্রেস সম্মেলনের উদ্বোধনী সংগীত রচনা করেন : দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার/লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার। নিজেই তিনি সভায় এই উদ্বোধনী সংগীতটি গেয়েছিলেন।
‘ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান/আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা দিবে কোন বলিদান’ চরণ দুটিতে সমকালীন একটি আত্মোৎসর্গের ঘটনা বিধৃত আছে।
সন্ত্রাসবাদী দলীয় গোপীনাথ সাহা টেগার্ট সাহেবকে মারতে গিয়ে ভুল করে গুলি চালালেন ডে সাহেবের ওপর। টেগার্ট সাহেবকে খুব ভালো করে চিনতেন না গোপীনাথ। সকাল বেলায় ডে সাহেব বেড়াতে বেরিয়ে চৌরঙ্গীর মোড়ে একটা দোকানের শোকেসে একটা কিছু কী দেখছেন, এমন সময় তাকে টেগার্ট মনে করে গুলী চালালেন গোপীনাথ। ডে সাহেব মারা গেলেন। এই হত্যাকাণ্ডের দায়ে ফাঁসির আদেশ হলো গোপীনাথের। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত লিখছেন: হলে হবে ফাঁসি, গোপীনাথ সে তোয়াক্কা করে না। সে দেশমুক্তির যজ্ঞে ইন্ধন জোগাতে পেরেছে এই তো তার আনন্দ। ফল-অফল, ভুল-অভুল সমস্ত অবান্তর। ফাঁসির আগের দিন সে কোর্তায় সাবান দিল, চুল ছাঁটল, খেল পেটভরে। দেখা গেল পাঁচ পাউণ্ড ওজন বেড়েছে। হাসতে হাসতে মঞ্চে গিয়ে উঠল। বললে, মা আমাকে ডেকেছে তার বুকে মাথা রেখে এখন ঘুমুব। এই অকুতোভয় দেশপ্রেমিকের কথাই ধ্বনিত হয়েছে চরণ দুটিতে :
ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান
আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা দিবে কোন বলিদান?
[উদ্ধৃত: নজরুল গীতি প্রসঙ্গ।। করুণাময় গোস্বামী।। বাংলা একাডেমি, ঢাকা।। প্রথম পুনর্মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬।। পৃ. ৩৩৭-৩৩৮]
এ কবিতায় রূপক অর্থে বেশ কিছু শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যেমনÑ বিখ্যাত কয়েকটি পঙক্তি:
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ,
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ?
কে আছ জোয়ান, হও আগুয়ান, হাঁকিছে ভবিষ্যত।
এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার!!. . .
অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ,
কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ!
[উদ্ধৃতি: নজরুল রচনাবলি।। রফিকুল ইসলাম ও অন্যান্য (সম্পা.)।। বাংলা একাডেমি, অক্টোবর ২০১৮।। দ্বিতীয় খণ্ড।।সর্বহারা। পৃ. ১২২]
কাজী নজরুল এখানে বাংলার নেতাদের (নৌকার কাণ্ডারী) সতর্ক করছেন। তিনি বলেছেন, জাতি এক গভীর সংকটে আছে, তরী (দেশ) দুলছে, মাঝি (নেতা) দিশেহারা, আর জাতি ডুবে যাচ্ছে। এই সময়ে সাহসী, অগ্রগামী, সত্যিকারের নেতৃত্ব প্রয়োজন। দেশকে একটি নৌকা হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। মাঝি বা কাণ্ডারী হলো নেতা বা পথপ্রদর্শক। এ রচনা ধর্ম, জাতি ও বর্ণের ভেদাভেদ দূর করার এক অমোঘ বাণী, অসাম্প্রদায়িকতার বাণী প্রচার করার এক শানিত অস্ত্র।
তিন.
১৯২৬ সালের ১৯শে জানুয়ারি ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত প্রগতিশীল সাহিত্য সংগঠন ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজের ঢাকায় একাধিক অধিবেশন ও বার্ষিক সম্মেলনে কাজী নজরুল ইসলাম নিমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি সে সময় একদল তরুণ-তুর্কীকে উৎসাহিত করেছেন। জানা যায়, কবি নজরুল ভারতীয় কেন্দ্রীয় আইন সভার নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচারণার কাজে ১৯২৬ সালের ২৪শে জুন প্রথম ঢাকায় আগমন করেন।
১৯২৬ সালের ২৭-২৮শে জুন মুসলিম হলে অনুষ্ঠিত সাহিত্য সমাজের বিশেষ অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন তিনি। সাহিত্য সমাজের কর্মীদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সময় সাহিত্য সমাজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হলের বর্ধমান হাউস ছাত্রাবাসের [বর্ধমান হাউস তখন মুসলিম হলের অন্তর্ভুক্ত] হাউস টিউটর তরুণ শিক্ষক কাজী মোতাহার হোসেনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পরবর্তীতে কবি বর্ধমান হাউসে বেশ কয়েকবার তার আতিথেয়তা গ্রহণ করেন এবং সাহিত্য সমাজের সম্মেলনে কবিতা আবৃত্তি ও জাগরণী গান গেয়ে তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। উদীয়মান অনেক কবি ও লেখককে কবিতা ও গান লিখে দিয়ে তিনি প্রেরণাও জুগিয়েছেন। তরুণ সাহিত্যসেবীদের তিনি প্রাণভরে ভালোবাসতেন ও উৎসাহ দিতেন। সাহিত্য সমাজের নিমন্ত্রণে এসে কত তরুণ সাহিত্যসেবীদের যে কতভাবে উৎসাহিত করেছিলেন তার কোনো ইয়ত্তা নেই। পূর্ব বাংলায় তার সৃষ্টিকর্ম এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। এই প্রভাব জাতির অগ্রগতি ও ইতিহাস বিনির্মাণে যথেষ্ট অবদান রেখেছে। এ প্রসঙ্গে আবদুল কাদির তার ‘নজরুল-প্রতিভার স্বরূপ’ শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন :
১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসের শেষ সপ্তাহে কাজী নজরুল ইসলাম তার বন্ধু পরলোকগত শ্রী হেমন্ত কুমার সরকার এম এ এম এল সি মহোদয়কে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় প্রথম এসেছিলেন। তারা তখন উঠেছিলেন স্বরাজ্য দলের প্রখ্যাত সদস্য পরলোকগত চাঁদসীর ডাক্তার শ্রীমোহনী মোহন দাসের বাস-ভবনে। মোহনীবাবু থাকতেন ঢাকার কাছারির কাছে একটা বাড়িতে। কবির ঢাকা আগমনের খবর পেয়ে বন্ধুবর মোহাম্মদ কাশেম ও আবদুল মাজীদ সাহিত্যরত্নকে সঙ্গে নিয়ে তাকে দেখতে যাই। কবির সঙ্গে আমার সেই প্রথম সাক্ষাৎ। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে জানুয়ারি প্রধানত ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়; এই প্রতিষ্ঠানের প্রবর্তিত ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলন ইতোমধ্যেই দেশের বুদ্ধিজীবী মহলে কিছু ঔৎসুক্যের সৃষ্টি করেছিল : কবিও তার খবর রাখতেন দেখা গেল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন কাজী আবদুল ওদুদ ও আবুল হুসেন সাহেবের কথা। মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রগতিশীল চিন্তাধারার কথা শুনে খুব আনন্দ প্রকাশ করলেন। কিন্তু সেই আনন্দ প্রকাশের মধ্যে কবির স্বাভাবিক ও স্বতঃফূর্ত উচ্ছলতা বেশি দেখতে পেলাম না। আলোচনা প্রসঙ্গে বুঝতে পারলাম সারা দেশে সাম্প্রদায়িক বিরোধ যেভাবে বাড়ছে তার পরিণাম-চিন্তাই কবির মনের স্বতোৎসারিত উল্লাস অনেকখানি হরণ করেছে। মাত্র একমাস আগে, ২২শে ও ২৩শে মে তারিখে কৃষ্ণনগরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধন করেছিলেন কবি তার রচিত ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ গানটি গেয়ে। কিন্তু সেই হুঁশিয়ারি হয়েছে ব্যর্থ, প্রতিক্রিয়াশীল কংগ্রেস কর্মী সংঘের সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের তৎপরতায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের হিন্দু-মুসলিম প্যাক্ট গেছে বাতিল হয়ে; সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের আগুন উস্কিয়ে দেওয়া হচ্ছে সর্বত্র। কবি এজন্য দুঃখ করে বললেন, প্রগতিপন্থী তরুণদের এগিয়ে আসতে। শুধু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নয়, হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির যুগ-সম্মত সমন্বয়-সাধন মুসলিম সাহিত্য-সমাজের প্রধান কর্মীদের বিশেষ ভাবনার বিষয়, আমার মুখে এই কথা শুনে কবি ও হেমন্ত বাবু আগ্রহ প্রকাশ করলেন সাহিত্য-সমাজের এক বৈঠকে মিলিত হতে।
অতঃপর কবির সঙ্গে পরামর্শ করে ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ২৭শে জুন রবিবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে সাহিত্য-সমাজের চতুর্থ বৈঠক আহত হয়। উক্ত বৈঠকে কবি একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন এবং ‘কাণ্ডারী হুশিয়ার’, ‘আমরা ছাত্রদল’, ‘কৃষাণের গান’, ‘জেলেদের গান’ প্রভৃতি জন-জাগরণমূলক কয়েকটি গান গেয়ে সকলকে অপরিমেয় আনন্দ দান করেন। নজরুল মধুকণ্ঠ ছিলেন না, কিন্তু সুকণ্ঠ ছিলেন। তিনি স্বরে এমন অলঙ্করণ ও আন্তরিক আবেগ দিয়ে তার বাণীর বিস্তার করতেন যে, তার প্রভাবে সহজেই শ্রোতার চিত্ত হতো অভিভূত। সেদিন নজরুলের কণ্ঠে জাগরণী গানগুলি কথার অতীত অর্থে শ্রোতাদের প্রাণের অতল করে উদ্দীপিত। [উদ্ধৃত : নজরুল-প্রতিভার স্বরূপ ।। আবদুল কাদির ।। নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা।। প্রথম প্রকাশ, ১৯৮৯।। পৃ. ৫৮-৫৯]
আজকের দিনে ধর্মীয় আদর্শকে বিকৃত করে যখন হিংসা, বিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন কাজী নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ সমাজকে সতর্ক হওয়ার বার্তা দেয়। এ কবিতায় তিনি সকল মানুষকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে প্রতিহত করার, রুখে দাঁড়াবার আহ্বান জানিয়েছেন। ১৯২৯ সালের ১৫ই ডিসেম্বর কলকাতা অ্যালবার্ট হলে (বর্তমানে ইন্ডিয়ান কফি হাউস নামে পরিচিত যা কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীতে অবস্থিত ) এক অনুষ্ঠানে বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে মাত্র ৩০ বছর বয়সী কাজী নজরুল ইসলামকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। উক্ত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কাজী নজরুল ইসলাম যখন বজ্রকন্ঠে তার বিখ্যাত কবিতা ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ আবৃত্তি করে শোনাচ্ছিলেন, সেসময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। তিনি কাজী নজরুলের কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন : ‘‘ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্যে আমি সারা ভারতবর্ষ ঘুরেছি কিন্তু ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’র মতো কোনো গান আমি খুঁজে পাইনি। এই গানের ওপরে ভর করেই আমি ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে আসব। নজরুলের গান ও কবিতা আমাদের বিপ্লবী চেতনাকে আরও শক্তিশালী করেছে।’’ তিনি এ গানকে জাতীয় সংগীতের মর্যাদায় অভিসিক্ত করেছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে নেতাজি আরো বলেনÑ “যেদিন দেশ স্বাধীন হবে সেদিন বাঙালির ‘জাতীয় কবি’ হবেন কাজী নজরুল ইসলাম।”
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শক্তি ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করার পর বিশ্বের মুক্তিকামী জনগণের যুদ্ধজয়ের অবশ্যম্ভাবী হাতিয়ার হিসেবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ২৬শে মার্চ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে। পরে কালুরঘাট বেতার প্রক্ষেপণ কেন্দ্রে এই বেতার কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হয়। পাকিস্তানি হামলার আগ পর্যন্ত এই বেতার কালুরঘাটেই ছিল। পরে তদানীন্তন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে ভারত সরকার ৫০ কিলোওয়াট শক্তিসম্পন্ন মধ্যম তরঙ্গের একটি ট্রান্সমিটারের ব্যবস্থা করেছিল। তাই নিয়ে ২৫শে মে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিনে কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের একটি বাড়িতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপিত হলো। এ বেতার কেন্দ্রের অনেক গান বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। তার মধ্যে কাজী নজরুলের কোরাস (সমবেত) ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ গানটি প্রতিদিনের অধিবেশন উদ্বোধনী সংগীত হিসেবে বিপুল জনপ্রিয়তা পায় ।
আমরা মনে করি ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতার প্রতিটি পঙক্তির আবেদন অনিঃশেষ, অফুরন্ত ও সময়োপযোগী। এ রচনার মর্মবাণী বিশেষ কোনো দেশ, কোনো সময়, কোনো জাতির উদ্দেশ্যে উচ্চারিত ধ্বনি নয়, এ ধ্বনি অতীত, বর্তমান কিংবা অনাগত ভবিষ্যতের জন্য। যতদিন মানুষে মানুষে হিংসা, বিদ্বেষ ও ঘৃণা থাকবে, ততদিনই ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য নিঃশেষ হবে না। এই কবিতা রচনাকালে নিপীড়িত পরাধীন ভারতবাসীর ক্ষেত্রে যেমন প্রাসঙ্গিক ছিল তেমনি আজ এ কবিতার শতবর্ষপূর্তি কালেও এর প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। অন্যের ধর্ম, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে এই গান সবসময়ই সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এ রচনা আমাদের জাতির চেতনার অংশ হয়ে আছে।