× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কাকের ছা আর বকের ছা

জহিরুল ইসলাম

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

আঁকা : মেহেরুন্নিসা, অষ্টম শ্রেণি, রানী নীহার দেবী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মানিকছড়ি, খাগড়াছড়ি

আঁকা : মেহেরুন্নিসা, অষ্টম শ্রেণি, রানী নীহার দেবী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মানিকছড়ি, খাগড়াছড়ি

সুন্দর একটি গ্রাম। সেই গ্রামের একপাশে বিস্তীর্ণ জলাভূমি, কাশবন আর সবুজ ধানের ক্ষেত। সেখানে নানা রকম পাখির বাস। কেউ থাকে গাছে, কেউ ঝোপে, কেউ আবার পানির ধারে।

জলাভূমির পাশে এক বিশাল কড়ই গাছে বাস করে এক কাক পরিবার। সেই বাসায় আছে এক ছোট্ট ছানা। তার নাম কালু। কালুর গায়ের রঙ কুচকুচে কালো।

বিলের ধারে থাকে এক বক পরিবার। তাদের ছানার নাম ধলু। তার গায়ের পালক দুধের মতো সাদা।

একদিন সকালে কালু বাসা থেকে উড়ে উড়ে বিলের ধারে গেল। নতুন উড়তে শিখেছে সে। চারপাশের সবকিছুই তার কাছে নতুন আর মজার। হঠাৎ সে দেখতে পেল এক সাদা পাখির ছা পানির ধারে দাঁড়িয়ে আছে।

কালু কাছে গিয়ে বলল, এই যে, তোমার নাম কী?

সাদা ছানাটি হেসে বলল, আমার নাম ধলু। আমি বকের ছা। আর তুমি?

আমি কালু। আমি কাকের ছা।

সেদিন থেকে তাদের বন্ধুত্ব হয়ে গেল। দুজন মিলে কখনও কাশফুলের ভেতর লুকোচুরি খেলে, কখনও বাতাসে ওড়ার প্রতিযোগিতা করে, কখনও নদীর পাড়ে বসে মেঘ দেখে।

কালু বলে, ওই মেঘটা দেখো। হাতির মতো লাগছে। ধলু বলে, না না, ওটা তো বিশাল জাহাজ! তারপর দুজন হেসে গড়িয়ে পড়ে। তারা একসঙ্গে খায়, একসঙ্গে ঘোরে, একসঙ্গে গল্প করে।

কিন্তু তাদের এই বন্ধুত্ব সবাই ভালো চোখে দেখল না। এক বিকালে ধলু বাসায় ফিরতেই তার মা বলল, তুমি নাকি এক কাকের ছার সঙ্গে সারা দিন ঘুরে বেড়াও?

ধলু হাসিমুখে বলল, হ্যাঁ মা। ওর নাম কালু। ও খুব ভালো বন্ধু।

বক বাবা ভুরু কুঁচকে বলল, কাকের সঙ্গে বন্ধুত্ব? দেখেছ তার গায়ের রঙ? কুচকুচে কালো! তার ওপর পচাবাসি খাবার খায়। ওদের সঙ্গে মিশতে নেই।

ধলু অবাক হয়ে বলল, কিন্তু বাবা, কালু তো খুব ভালো!

মা বলল, ভালো হলেই হবে না, নিজের মতো বন্ধু বানাও।

এদিকে কালুও সেদিন বাসায় ফিরে একই রকম কথা শুনল। কাক মা বলল, তুমি নাকি বকের ছার সঙ্গে খেলছ?

হ্যাঁ মা। ধলু আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু।

কাক বাবা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, বকও একটা পাখি! কী বিচ্ছিরি লম্বা ঠ্যাং! সারা দিন খালি পানির দিকে তাকিয়ে থাকে। সুযোগ পেলেই মাছ ধরে খায়।

সেদিন রাতে কালু আর ধলু দুজনেরই মন খারাপ হলো। পরদিন দেখা হতেই ধলু বলল, আমার বাবা-মা চায় না আমি তোমার সঙ্গে মিশি।

কালু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমার বাবা-মাও তাই বলেছে।

দুজন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর কালু বলল, আমরা কি তাহলে আর বন্ধু থাকব না?

ধলু মাথা নেড়ে বলল, অবশ্যই থাকব। কারণ আমি জানি তুমি ভালো।

কয়েক দিন পরের কথা। নদীর পাড়ে অনেক মানুষ পিকনিক করতে এলো। খাওয়াদাওয়ার পর তারা অনেক উচ্ছিষ্ট খাবার ফেলে চলে গেল।

পরদিন ধলু তার বাবাকে বলল, ওই দেখো, কালু আর তার বন্ধুরা খাবারের টুকরোগুলো খেয়ে জায়গাটা পরিষ্কার করছে।

বক বাবা তাকিয়ে দেখল, সত্যিই তাই।

আরেক দিন কালু বিলের ধারে গিয়ে দেখল ধলু আর তার আত্মীয়রা পানির মধ্যে নানা পোকামাকড় আর ছোট প্রাণী খুঁজছে। সেদিন সন্ধ্যায় কালু তার বাবা-মাকে বলল, তোমরা কি জানো, বকেরা শুধু মাছই খায় না। তারা অনেক ক্ষতিকর পোকামাকড়ও খায়। তারা না থাকলে এসব পোকা অনেক বেড়ে যেত। কৃষকদের সমস্যা হতো।

এমনিভাবেই কাটতে লাগল দিন। একদিন ঝড় এলো। প্রচণ্ড বাতাসে গাছের অনেক ডালপালা ভেঙে পড়ল। ঝড় থামার পর পাখিরা নিজ নিজ বাসা গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কালু আর ধলুও সাহায্য করতে বের হলো। তারা কঞ্চি এনে দিল, শুকনো ঘাস কুড়িয়ে দিল, ছোট ছানাদের নিরাপদ জায়গায় নিয়ে গেল।

বক বাবা দূর থেকে দেখল, কালু শুধু নিজের পরিবারের জন্য নয়, অন্যদের জন্যও কাজ করছে।

কাক বাবা দেখল, ধলু একটি আহত শালিকছানাকে ঠোঁটে করে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দিল। দুজনের মনেই একটু একটু করে পরিবর্তন আসতে লাগল।

একদিন বিকালে কড়ই গাছের নিচে কাক পরিবার আর বক পরিবার পাশাপাশি বসে ছিল। প্রথমে সবাই একটু অস্বস্তি বোধ করছিল। তারপর ধলু বলল, বাবা, তুমি কি এখনও মনে করো কাকেরা কোনো কাজের না?

বক বাবা হেসে বলল, না, এখন আর তা মনে করি না।

কালু তার বাবা-মাকে বলল, তোমরা কি মনে করো বকেরা শুধু দাঁড়িয়ে থাকে?

কাক বাবা হেসে ফেলল। না। এখন বুঝেছি, তাদেরও গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে।

বক মা বলল, আসলে আমরা শুধু পার্থক্যগুলো দেখেছিলাম। গুণগুলো দেখিনি।

কাক বাবা বলল, সবার কাজ এক রকম নয়, কিন্তু তাই বলে কেউ অপ্রয়োজনীয় নয়।

সেদিন সবাই মিলে দীর্ঘক্ষণ গল্প করল। সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ল। বিলের পানি সোনালি হয়ে উঠল। কাশফুলগুলো বাতাসে দুলতে লাগল। কালু আর ধলু পাশাপাশি বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। তাদের খুব ভালো লাগছিল। কারণ তারা শুধু নিজেদের বন্ধুত্বই রক্ষা করেনি, বড়দেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে।

সবাই বুঝল, এই পৃথিবীতে কেউ শুধু কালো বলে খারাপ নয়, কেউ শুধু সাদা বলে ভালো নয়। কেউ লম্বা পা নিয়ে জন্মায়, কেউ ছোট পা নিয়ে। কেউ মাছ খায়, কেউ অন্য খাবার খায়। কিন্তু প্রকৃতির বিশাল সংসারে প্রত্যেক প্রাণীরই কোনো না কোনো কাজ আছে। আর আমরা যখন অন্যের দোষের বদলে গুণগুলো দেখতে শিখি, তখনই পৃথিবীটা আরও সুন্দর হয়ে ওঠে।


শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা