ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ৭ ঘণ্টা আগে
চা-শ্রমিক বিষ্ণু হাজরা
সেবা বা মানবতার কল্যাণের জন্য মানুষের আন্তরিক ইচ্ছা ও প্রবল সদিচ্ছাই যথেষ্ট। এর জন্য প্রয়োজন নেই বিপুল সম্পদ ও বড় কোনো ডিগ্রি। সমাজে কিছু-কিছু মানুষ আছেন যারা নিজেদের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও অর্থ, পরিশ্রম ও সেবা করার মানসিকতার মাধ্যমে সমাজের পরিবর্তনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তেমনই এক আত্মপ্রত্যয়ী ব্যক্তি হলেন ৪৩ বছর বয়সী বিষ্ণু হাজরা রাজু।
রাজুর বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৮ নম্বর কালীঘাট ইউনিয়নের ভাড়াউড়া চা বাগানে। পেশায় চা-বাগানের সাধারণ শ্রমিক ও ভ্যানগাড়িতে করে চটপটি বিক্রেতা। বিষ্ণু হাজরা নিজের সীমিত উপার্জনের টাকার একটি অংশ ব্যয় করে রোপণ ও বিতরণ করে চলেছেন ফলদ, বনজ, ঔষধিসহ নানা জাতের বৃক্ষের চারা। সবুজ পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে বিষ্ণু হাজরার নিরন্তর প্রচেষ্টা চলছে সেই ছোটবেলা থেকেই। ১১ বছর বয়সে ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত থাকাবস্থাতেই বৃক্ষের প্রতি অসাধারণ এক মমত্ববোধ জন্ম নেয় তার হৃদয়ে। সে সময় থেকেই টিউশনি করে নিজের বাড়ি, আশপাশের বাড়িতে বৃক্ষরোপণ করা শুরু করেন। পরবর্তীতে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, স্কুল, কলেজের আঙিনা, কবরস্থান, হাসপাতাল, শ্মশান, বিভিন্ন চা বাগান, সড়কের দুই পাশ, বনাঞ্চল, বাড়ি-ঘর, পতিত জমিতে এ পর্যন্ত তিনি রোপণ করেছেন প্রায় ১৭ সহস্রাধিক বিভিন্ন জাতের গাছের চারা। এছাড়া বিভিন্ন জনের আর্থিক সহযোগিতায় জাতীয় দিবস, পরিচিত জনদের বিয়েতে বর-কনেকে, জন্মদিন, সৌজন্য সাক্ষাৎ থেকে শুরু করে নবজাতকের জন্মের পর উপহার হিসেবে বিতরণ করেছেন আরও প্রায় ৭ সহস্রাধিক গাছের চারা।

শুধু গাছের চারা রোপণ ও বিতরণ করেই ক্ষান্ত হননি বিষ্ণু। ২০২০ সালে তিনি বাগানের আরও কিছু প্রত্যয়ী ও সেবাকর্মে আগ্রহী তরুণ-যুবকদের নিয়ে গড়ে তুলেন ‘ভাড়াউড়া সমাজকল্যাণ যুব সংগঠন’। নিজে দরিদ্র হলেও ওই সংগঠনের উদ্যোগে প্রতি বছর শীতকালে দরিদ্র মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ, অসহায় মানুষদের চিকিৎসা সেবায় অর্থনৈতিক সহায়তা ও সেবা প্রাপ্তিতে সহযোগিতা প্রদান, স্বেচ্ছায় রক্তদান, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং করোনা মহামারির সময়ে সমাজের সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করেন বিষ্ণু হাজরা রাজু। এছাড়া প্রাণীদের বিশেষ করে পাখিদের প্রতি মমত্ববোধ থেকে চা বাগানের গাছে গাছে মাটির কলস বেঁধে নিরাপদ আবাসের ব্যবস্থা ও পাখির পানীয়জলের ব্যবস্থা করে চলেছেন তিনি। কাজ করছেন নারীদের পিরিয়ডকালীন স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়েও। একজন সাধারণ চা শ্রমিক হলেও তার নিজের কর্মগুণে পরিচয়ের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে চা বাগানের গণ্ডি পেরিয়ে উপজেলা, উপজেলা থেকে জেলা, জেলা থেকে বিভাগ, বিভাগ থেকে সারা দেশে। দারিদ্রের কারণে লেখাপড়া বেশিদূর করতে না পারলেও সমাজের এক আলোকিত মানুষ হয়ে উঠেছেন তিনি। গাছ রোপণ এখন তার দিন-রাতের এক নেশা। যেখানেই যান তার নিজের দ্বি-চক্রযানের সামনে ও পেছনের অংশে স্টিল দিয়ে তৈরিকৃত বড় ক্যারিয়ারে থাকে কোনো না কোনো গাছের চারা। এমনকি সারা দিন ক্লান্তির পর রাতে ঘুমানোর সময়ও খাটের পাশে কোনো না কোনো গাছের চারা রেখে শান্তির ঘুম দেন। নিজের দুই পুত্র সন্তানের প্রতি বিষ্ণু হাজরা যতটুকু মমত্ব ও দায়িত্ববোধ ঠিক ততটুকুই মমত্ব ও দায়িত্ববোধ গাছের প্রতিও। প্রতিটি গাছ রোপণের পর সেটিকে রক্ষণাবেক্ষণের কাজও করেন নিজ হাতে। কোনো গাছ নষ্ট হলে বা মানুষের জিঘাংসার বলি হলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
কে এই বিষ্ণু হাজরা
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৮ নম্বর কালীঘাট ইউনিয়নের ভাড়াউড়া চা বাগানের রামপাড়া শ্রমিক বস্তির বাসিন্দা বিষ্ণু হাজরা রাজু। বাবা প্রেমলাল হাজরা এক সময় ছিলেন চা বাগানের শ্রমিক। বর্তমানে অবসরে রয়েছেন। মা নমিতা হাজরা গৃহিণী। দুই ভাই, এক বোনের মধ্যে সবার বড় বিষ্ণু হাজরার জন্ম ১৯৮৩ সালে। ছোটভাই বিকাশ হাজরা পুঠিয়াছড়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও বোন বিচিত্রা হাজরা বিবাহিত। দশ বছর ও সাড়ে তিন বছর বয়সী দুই সন্তানের জনক বিষ্ণু হাজরার স্ত্রী রীনা হাজরা গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র পরিবারটির নিত্যসঙ্গী ছিল। এক বেলা খেলে পরের বেলা খাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল না পরিবারে। যেন ‘নুন আনতে পান্তা পুরোয়’অবস্থা। স্থানীয় প্রাইমারি স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণি উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৯৪ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন শ্রীমঙ্গলের ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পরপরই জীবনযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন তিনি। সংসারের অনটনের কারণে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিউশনি করা শুরু করেন। মাত্র ১১ বছর বয়সে টিউশনি থেকে মাস শেষে যে সামান্য আয় হতো সে আয়কে তিনি ভাগ করতেন তিনটি ভাগে। ওই তিন ভাগের এক ভাগ তিনি তুলে দিতেন দরিদ্র বাবার হাতে, এক ভাগ ব্যয় করতেন নিজের শিক্ষাগ্রহণের কাজে। বাকি এক ভাগ টাকা থেকে সে সময়েই স্থানীয় নার্সারি থেকে ৫-১০টি করে গাছের চারা কিনে রোপণ করতে থাকেন। বাগানের বা এলাকার অন্য শিশুরা যখন লেখাপড়ার পাশাপাশি অবসরে খেলাধুলায় সময় কাটাতো, সে সময়ে বিষ্ণু হাজরা নিজের অভাবী পরিবারকে সহায়তা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও নিজের লেখাপড়া অব্যাহত রাখতে টিউশনি করতে থাকেন। মাত্র ১১ বছর বয়সে মাস শেষে টিউশনির টাকার অংশে কেনা গাছ নিয়ে সুযোগ পেলেই বাইসাইকেলে বা পায়ে হেঁটে বেরিয়ে পড়তেন তা রোপণে। তবে সমাজের কল্যাণে মাত্র ১১ বছর বয়সেই পরিপক্ব চিন্তা চেতনার বিষ্ণু শুধুমাত্র অভাবের কারণেই এসএসসি পরীক্ষার পূর্ব মুহূর্তে লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে নিতে বাধ্য হন। অর্থাভাবে লেখাপড়ার পাঠ চুকাতে বাধ্য হয়ে মনের মধ্যে যে আক্ষেপ ছিল বর্তমানে তার রোপণকৃত গাছগুলোর অধিকাংশের নিচে তপ্ত গরমে শ্রমজীবী ও কর্মজীবী মানুষের বিশ্রাম নিতে দেখলে তার মন আনন্দে আন্দোলিত হয়।
বিষ্ণু হাজরার পরিপূর্ণ বৃক্ষপ্রেম
বিষ্ণু হাজরা রাজু ১৯৯৪ সাল থেকেই নিজের টিউশনির টাকায় অল্প গাছের চারা কিনে তা নিজের বাড়ি, আশপাশের বাড়িতে রোপণ করলেও ১৯৯৭ সালে পুরোপুরি বৃক্ষপ্রেম জাগ্রত হয় তার মনের মণিকোটায়। ওই সালে যখন বিষ্ণু নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন তখন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বৃক্ষ বন্দনা’কবিতাটি পাঠ করেন। ওই শ্রেণিতে তার ঐচ্ছিক বিষয় ছিল কৃষিশিক্ষা। সেখান থেকেই তিনি রাস্তার পাশে বনায়ন কর্মসূচি, পুকুরপাড়ে বনায়ন কর্মসূচিসহ বৃক্ষের গুরুত্ব উপলব্ধি করে আরও ব্যাপকভাবে বৃক্ষ রোপণে অনুপ্রাণিত হয়ে ওঠেন। তখন থেকে নিজের উপার্জিত অর্থে শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন মসজিদ, মন্দির, গির্জা, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, শ্মশান, বিভিন্ন চা বাগান, বনাঞ্চল, বাড়ি-ঘর, পতিত জমিতে গাছের চারা রোপণ করতে থাকেন। যা এখনো অব্যাহত আছে। একটানা গত ২৯ বছরে তিনি রোপণ করেছেন প্রায় ১৭ সহস্রাধিক গাছের চারা।

জীবন সংগ্রামী বিষ্ণু
অভাব খুব কাছ থেকে দেখা বিষ্ণু হাজরা শুধুমাত্র অর্থাভাবে এসএসসি পরীক্ষা দিতে পারেননি। সেই থেকে কঠিন জীবন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় তাকে। কখনো পত্রিকা বিলির কাজ করেছেন, কখনো চা বাগানের বিভিন্ন শ্রমিক বস্তিতে ভ্যানগাড়িতে করে চটপটি বিক্রি করেছেন আবার চা বাগানে শ্রমিকের কাজও করে চলেছেন। প্রতিটি কাজের উপার্জিত অর্থের একটি অংশ শুরু থেকে অদ্যাবধি ব্যয় করে চলেছেন বৃক্ষরোপণ ও সামাজিক কাজে। নিজের পরিবার অনেক সময় অভাব-অনটনে পড়লেও তার বৃক্ষরোপণে ছেদ পড়তে দেয়নি। দিনের পর দিন মাছ-মাংশ পরিবারটির পাতে না জুটলেও পরিবারের সদস্যদের কোনো আক্ষেপ ছিল না, এখনো নেই। বাবা, মা, ভাই, বোন শুরু থেকেই তাকে উৎসাহ দিয়ে আসছে। এমনও দিন গেছে যখন বিষ্ণু তার নিজের উপার্জনের টাকা শেষ করার পর আরও কিছু গাছ কেনা বাকি, তখন পরিবারের বাজার না করে অর্ধাহারে-অনাহারে থেকেও বাবা প্রেমলাল হাজরা সানন্দে ও বিনা বাক্য ব্যয়ে বাজারের টাকা তুলে দিয়েছেন বিষ্ণুর হাতে। বিয়ের পর স্ত্রী রীনা হাজরাও একইভাবে উৎসাহ-উদ্দীপনা দিয়ে চলেছেন বিষ্ণুকে। বর্তমানে বিষ্ণু চা-বাগানে কঠোর শ্রমের পাশাপাশি ভ্যান গাড়িতে করে চটপটি বিক্রি করে নিজের সংসার ও বৃক্ষরোপণের টাকা সংগ্রহ করেন। একবেলা চা বাগানের শ্রমিকের কাজ করার পর পরের বেলা ভ্যানে করে চটপটি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।
গাছ যা দিয়েছে বিষ্ণুর পরিবারকে
ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াবস্থায় বিষ্ণু টিউশনি করে নিজের বাড়ি ও আশপাশের বাড়িগুলোতে বৃক্ষরোপণ করে চলেছেন। সে সব গাছ ডালপালা মেলে বিশাল বৃক্ষে পরিণত। ২০১৭ সালে একমাত্র বোন বিচিত্রা হাজরার বিয়ের সম্বন্ধ আসে। হবু স্বামীর পরিবারও একই বাগানের বাসিন্দা। পরিবারটি পুরো বাগানবাসীর কাছে মার্জিত ও পরিপাটি পরিবার হিসেবে পরিচিত। দুই পরিবারের আলোচনায় বিয়ের তারিখও নির্ধারিত হয়। দরিদ্র বিষ্ণু হাজরা পরিবারের বড় ছেলে। অনেক বেশি দায়িত্ব তার কাঁধে। একমাত্র বোনের বিয়ের খরচের টাকা সংগ্রহ করতে বিভিন্ন স্থানে চেষ্টা করেন। এমনকি ঋণের চেষ্টাও করেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা সংগ্রহ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এ অবস্থায় নিজের বাড়ির পুকুরপাড়ে বিষ্ণুর নিজের হাতে রোপণকৃত বিভিন্ন জাতের আটটি বড় সাইজের গাছ বিক্রি করে বোনের বিয়ের কাজ শেষ করেন। এরপর নিজের ঘর তৈরির সময়ও আরও আটটি গাছ বিক্রি করে ঘর তৈরি করা হয়েছে। এ ব্যাপারে বিষ্ণু হাজরার বক্তব্য হলো ‘চরম বিপদের সময় মানুষ পাশে এসে না দাঁড়ালেও আমার রোপণকৃত গাছগুলো নীরবে পাশে দাঁড়িয়েছে।
নিজের কর্ম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বৃক্ষপ্রেমী বিষ্ণু হাজরা রাজু বলেন, ‘বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা দিন দিন বাড়ছে। আর এ তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে আজকে বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। অসময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। ঝড়, অধিক বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বজ্রপাত, ভূমিধ্সসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছেÑ এগুলো থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদেরকে বেশি করে গাছ লাগাতে হবে। কারণ কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি হওয়ায় কিন্তু আজকে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। কার্বন ডাই অক্সাইডকে একমাত্র গাছই খাদ্য হিসেবে শোষণ করে থাকে সূর্যের আলোর সাহায্যে। তাই আমাদেরকে বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে হলে, বিশ্বকে আবাদযোগ্য করে গড়ে তুলতে হলে, পরবর্তী প্রজন্মের সুরক্ষার কথা নিশ্চিত করতে হলে আমাদেরকে বেশি করে গাছ রোপণ করতে হবে।’