আব্দুল বারী দুলাল, গঙ্গাচড়া (রংপুর)
প্রকাশ : ৭ ঘণ্টা আগে
হাঁস খামারেও সফল শিক্ষক জোবেদ আলী
সকালের প্রথম আলো ফুটতেই শুরু হয় দিনের প্রস্তুতি। হাতে খাতা-কলম নিয়ে ছুটে যান মাদ্রাসায়। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, প্রশ্নের উত্তর, পরীক্ষা আর দায়িত্ব পালন সবকিছু শেষ হতে না হতেই যেন তার আরেকটি পরিচয় সামনে আসে। শিক্ষকতার পোশাক বদলে তিনি হয়ে ওঠেন একজন খামারি। শত শত হাঁসের ডাক, খাবার ছড়িয়ে দেওয়া, পরিচর্যা আর খামারের ব্যস্ততায় কেটে যায় দিনের বাকি সময়।
এভাবেই দুই ভিন্ন জগতকে এক সুতোয় গেঁথে প্রায় দেড় যুগ ধরে এগিয়ে চলেছেন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার গজঘণ্টা ইউনিয়নের হাবু তাঁতীপাড়ার বাসিন্দা মৃত নোবের উদ্দিনের ছেলে জোবেদ আলীর কথা। পেশায় তিনি উপজেলার চেংমারী আদর্শ দাখিল মাদ্রাসার একজন শিক্ষক।
শিক্ষকতা তার পেশা, আর হাঁস পালন তার ভালোবাসা। এই দুইয়ের সমন্বয়েই তিনি গড়ে তুলেছেন স্বাবলম্বিতার এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প।

ছাত্রজীবন থেকেই পশুপাখির প্রতি ছিল তার গভীর অনুরাগ। সেই ভালোবাসা থেকেই একসময় গরুর খামার গড়ে তুলেছিলেন। প্রায় পাঁচ থেকে সাত বছর ধরে চেষ্টা করেও আশানুরূপ লাভের মুখ দেখেননি। খামার পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমিকের সংকট, গরুর খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ বন্ধ করে দিতে হয়।
অনেকেই হয়তো তখন নতুন করে আর শুরু করার সাহস পেতেন না। কিন্তু জোবেদ আলী থেমে থাকেননি। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেন। মাত্র ৩০০টি হাঁস নিয়ে শুরু করেন নতুন পথচলা। ধীরে ধীরে সেই ছোট উদ্যোগই পরিণত হয় এক হাজার হাঁসের সুপরিকল্পিত খামারে। গত ১৪ থেকে ১৫ বছর ধরে নিষ্ঠা, ধৈর্য ও ভালোবাসা দিয়ে পরিচালনা করছেন এই খামার।
বর্তমানে নেত্রকোণা ও ময়মনসিংহ থেকে তিন মাস বয়সী হাঁসের বাচ্চা সংগ্রহ করেন তিনি। এক হাজার বাচ্চা কিনতেই ব্যয় হয় প্রায় আড়াই লাখ টাকা। খাদ্য, ওষুধ, পরিচর্যা ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে বছরে প্রায় ২১ লাখ ৯০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। সব ব্যয় মিটিয়ে বছরে তিন থেকে চার লাখ টাকা লাভ হয়। এই লাভের অর্থেই ধীরে ধীরে বদলে গেছে তার পরিবারের আর্থিক অবস্থার চিত্র। এই আয়ের টাকায় তিনি নির্মাণ করেছেন নিজের বাড়ি, কিনেছেন জমি এবং সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যয় নির্বাহ করছেন। এক ছেলে ও তিন মেয়ের জনক জোবেদ আলীর বড় মেয়ে নার্সিংয়ে অধ্যয়ন করছেন। দ্বিতীয় মেয়ে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে, ছোট মেয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে এবং ছেলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ছে। সন্তানদের শিক্ষাই তার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ বলে মনে করেন তিনি।
তার খামারের হাঁসগুলো রাখা হয় ৮৫ ফুট দীর্ঘ ও ১৭ ফুট প্রশস্ত একটি ঘরে। প্রতিদিন সকালে হাঁসগুলোকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়। সারা দিন বাঁশঝাড়ের ছায়াঘেরা পরিবেশে বিচরণ করে তারা। সন্ধ্যা হলে আবার ফিরে আসে নিজেদের ঘরে। প্রকৃতিনির্ভর এই ব্যবস্থাপনার কারণে হাঁসগুলো তুলনামূলক সুস্থ থাকে বলে জানান তিনি। একসময় তার এক হাজার হাঁসের মধ্যে প্রায় ৯০০টি হাঁস নিয়মিত ডিম দিত। প্রায় ছয় মাস ভালো উৎপাদন থাকলেও পরে ডিমের পরিমাণ অর্ধেকে নেমে আসে। উৎপাদন কমে গেলে লাভও কমে যায়। তখন পুরো হাঁসের দল বিক্রি করে নতুন তিন মাস বয়সী বাচ্চা এনে আবার নতুন চক্র শুরু করেন। এই পদ্ধতিই তার খামারকে লাভজনক রাখতে সহায়তা করছে।
খামারের বিষয়ে জোবেদ আলী বলেন, পশুপাখির প্রতি ভালোবাসা থেকেই এই পথচলা। শিক্ষকতা আমার দায়িত্ব, আর খামার আমার নেশা। পরিশ্রম করলে কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ থেকেও সম্মানজনক আয় করা সম্ভব।