× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পাহাড় পেরিয়ে নদীর বুকে

সায়মন রহমান আকিব

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

গন্তব্য ছিল পাহাড়ি জনপদ, দুর্গম শৃঙ্গ, ঝরনা আর নদীপথ পেরিয়ে আমতলী ঘাট পর্যন্ত এক রোমাঞ্চকর ভ্রমণ

গন্তব্য ছিল পাহাড়ি জনপদ, দুর্গম শৃঙ্গ, ঝরনা আর নদীপথ পেরিয়ে আমতলী ঘাট পর্যন্ত এক রোমাঞ্চকর ভ্রমণ

পাহাড়ের রূপের কথা প্রায় সবারই জানা। এ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বারবার মানুষ পাহাড়ের কাছে ছুটে যায়। বান্দরবানের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আঁকাবাঁকা রাস্তা, সবুজ পাহাড়, মেঘে ঢাকা চূড়া, ঝরনার কলকল ধ্বনি আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। তবে বান্দরবানের অনেক সৌন্দর্যই এখনো সাধারণ পর্যটকদের চোখের আড়ালে রয়ে গেছে। এমনই কিছু অচেনা-অজানা সৌন্দর্যের খোঁজে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল আলীকদম থেকে। গন্তব্য ছিল পাহাড়ি জনপদ, দুর্গম শৃঙ্গ, ঝরনা আর নদীপথ পেরিয়ে আমতলী ঘাট পর্যন্ত এক রোমাঞ্চকর ভ্রমণ।

বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলার চিম্বুক পর্বত রেঞ্জের চূড়া ক্রিসতং থেকে নাকি দেশের শীর্ষ পর্বতগুলোর চূড়া দেখা যায়। এই পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আর সব পাহাড়ের দৃশ্য দেখার লোভ আর সামলানো গেল না। তাই রীতিমতো হুটহাট পরিকল্পনা করেই যেতে হলো ক্রিসতং পাহাড়ের দিকে। 

বান্দরবানের চিম্বুক পর্বত রেঞ্জের চূড়া ক্রিসতং ও রুংরাং। ক্রিসতং-এর উচ্চতা প্রায় ২ হাজার ৯৮৯ ফুট। ওয়ার্ল্ডঅ্যাটলাসের এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের শীর্ষ পর্বতের তালিকায় ক্রিসতং দশম। ক্রিসতং-এর চেয়ে মাত্র ৩০০ ফুট ছোট পর্বত রুংরাং। পাশাপাশি অবস্থিত পর্বত দুটি ট্রেকিংয়ের জন্য আদর্শ।

সকাল ১০টায় আমরা আলীকদম বাজার থেকে চাঁদের গাড়িতে চড়ে রওনা দিলাম। পাহাড়ের গায়ে সাদা মেঘের চাদর জড়ানো, চারদিকে এক অপার্থিব নীরবতা। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে গাড়ি যত সামনে এগোতে লাগল, ততই প্রকৃতির নতুন নতুন রূপ চোখের সামনে উন্মোচিত হতে লাগল। কখনো গভীর খাদ, কখনো পাহাড়ের ঢালে জুম চাষের ক্ষেত, আবার কোথাও ছোট ছোট পাহাড়ি বসতি। মনে হচ্ছিল, যেন প্রকৃতির আঁকা কোনো জীবন্ত ছবির ভেতর দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। 

চাঁদের গাড়িতে ২১কি.মি যাওয়ার পর আমাদের ট্র্যাকিং শুরু হয়, প্রথম গন্তব্য ছিল ক্রিসতং পাহাড়। পাহাড়টির দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে দেখা মিলল পাহাড়ি মানুষের সরল জীবনযাত্রার। ছোট ছোট বাঁশের ঘর, আর জুমক্ষেতে কাজ করা মানুষ- সব মিলিয়ে এক ভিন্ন জগতের অনুভূতি। ক্রিসতং পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে আমরা যেন প্রকৃতির এক বিশাল দর্শনমঞ্চে দাঁড়িয়ে গেলাম। এই পাহাড়ে এখনো রয়েছে শতবর্ষী বিশাল বিশাল গাছ এবং রয়েছে ঘন জঙ্গল যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছাতেও বেগ পেতে হয়। চারদিকে যতদূর চোখ যায়, শুধু পাহাড় আর পাহাড়। দূরের পাহাড়গুলো নীলাভ রঙে মিশে গেছে আকাশের সঙ্গে। নিচে ছড়িয়ে থাকা সবুজ বনভূমি আর পাহাড়ি জনপদকে দেখে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর কোলাহল থেকে বহু দূরে কোনো শান্ত রাজ্যে এসে পড়েছি।

দীর্ঘ ৬-৭ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে আমরা পৌঁছাই খেমচং পাড়ায়। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই ছোট্ট পাড়াটি ছিল আমাদের রাতযাপনের স্থান। শহুরে কোলাহল থেকে বহু দূরে, প্রকৃতির একেবারে কাছে কাটানো সেই রাত আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে নেমে আসে এক গভীর নীরবতা। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, পাহাড়ি বাতাসের শব্দ আর আকাশভরা অসংখ্য তারাÑ মনে হচ্ছিল যেন প্রকৃতি নিজেই আমাদের জন্য এক বিশেষ আয়োজন করেছে। রাতে দূরের অন্ধকার পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব ব্যস্ততা যেন অনেক দূরে কোথাও হারিয়ে গেছে।

পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভাঙে পাখির ডাক আর পাহাড়ি বাতাসের ছোঁয়ায়। খেমচং পাড়ার সকাল ছিল সত্যিই অসাধারণ। সূর্যের প্রথম আলো যখন পাহাড়ের চূড়ায় পড়ছিল, তখন মেঘগুলো ধীরে ধীরে পাহাড়ের বুক ছেড়ে ভেসে যাচ্ছিল। এরপর আমরা এগিয়ে যাই রুংরাং পাহাড়ের দিকে। রুংরাং এর নামকরণ হয়েছে ধনেশ পাখি থেকে। একসময় এখানে অনেক ধনেশ পাখি দেখা গেলেও কালের পরিক্রমায় তা এখন বিলুপ্ত প্রায়। এই পাখির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বড় বড় ঠোঁট। রুংরাং পাহাড়ের উচ্চতা প্রায় ২৭০০+ ফিট। এই পাহাড়ের পথ ছিল দুর্গম, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল নতুন অভিজ্ঞতায় ভরা। পাহাড়ি পথের সৌন্দর্য, মেঘের আনাগোনা এবং চারপাশের নৈসর্গিক পরিবেশ আমাদের বারবার থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করছিল। সেখান ২-৩ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে চলে গেলাম মেনিয়াং পাড়াতে। চারদিকে সবুজ পাহাড়ে ঘেরা ছোট্ট এই পাড়াটি যেন প্রকৃতির কোলে লুকিয়ে থাকা এক শান্ত স্বর্গ। দিনের শেষ আলো যখন পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছিল, তখন পুরোপাড়া জুড়ে নেমে আসে এক অন্যরকম প্রশান্তি। শহরের মতো কোনো যানবাহনের শব্দ নেই, নেই কোলাহল কিংবা ব্যস্ততা। শুধু পাহাড়ি বাতাসের মৃদু শব্দ, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূরের পাহাড় থেকে ভেসে আসা প্রকৃতির সুর। বিদ্যুৎ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার সীমাবদ্ধতা থাকলেও সেখানে ছিল এক ধরনের মানসিক শান্তি, যা শহুরে জীবনে খুব কমই পাওয়া যায়।

পরদিন খুব ভোরে ঘর থেকে বের হয়েই দেখতে পেলাম পাহাড়ের বুকজুড়ে ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘ। সূর্যের প্রথম আলো ধীরে ধীরে পাহাড়ের চূড়াগুলোকে সোনালি রঙে রাঙিয়ে দিচ্ছিল। মেনিয়াং পাড়ার সেই সকাল ছিল পুরো ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোর একটি। মেঘ, পাহাড় আর সকালের নির্মল বাতাস যেন নতুন এক শক্তি ও প্রশান্তি এনে দিয়েছিল। মেনিয়াং পাড়ায় কাটানো সেই একটি দিন আমাদের শিখিয়েছে, সুখ সবসময় আধুনিকতার মধ্যে নয়; কখনও কখনও প্রকৃতির কাছাকাছি, সরল জীবনের মাঝেও গভীর আনন্দ ও শান্তি খুঁজে পাওয়া যায়। আজও সেই পাড়ার নীরব রাত, তারাভরা আকাশ এবং মেঘে মোড়া সকালের স্মৃতি হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে।

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য থানকোয়াইন ঝরনা। মেনিয়াংপাড়া থেকে অনেক নিচু পথ পাড়ি দিতে হয়। দীর্ঘ ৩ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে আমরা পৌঁছাই জগচন্দ্রপাড়ায়। পাহাড়ি এই পাড়াটি ছিল শান্ত, নিরিবিলি এবং অত্যন্ত মনোরম। স্থানীয় মানুষের আন্তরিকতা ও সরলতা আমাদের মুগ্ধ করেছিল। তাদের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি এবং প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকার অসাধারণ ক্ষমতা আমাদের নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার মাঝে আমরা যে সরলতা হারিয়ে ফেলেছি, তা যেন এই পাহাড়ি জনপদে এখনো অক্ষত রয়েছে।

এরপর শুরু হলো ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণীয় অংশ- থানকোয়াইন ঝরনার পথে যাত্রা। ঝরনার কাছে যাওয়ার আগেই দূর থেকে পানির গর্জন শোনা যাচ্ছিল। ঘন জঙ্গলের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যখন ঝরনার সামনে পৌঁছালাম, তখন মনে হলো প্রকৃতি যেন তার সব সৌন্দর্য এখানে উজাড় করে দিয়েছে। পাহাড়ের উঁচু বুক চিরে নেমে আসা স্বচ্ছ পানির ধারা, চারপাশে শ্যাওলা ঢাকা পাথর আর সবুজ বনভূমিÑ সব মিলিয়ে এক স্বর্গীয় পরিবেশ। ঠান্ডা পানিতে পা ডুবিয়ে বসে থাকার সেই মুহূর্তগুলো আজও মনে পড়ে। ঝরনার গর্জন, পাখির ডাক আর বনভূমির নীরবতা মিলেমিশে এক অপূর্ব সুর সৃষ্টি করেছিল। তারপর ট্রলারে করে চলে আসলাম আমরা দুসুরিবাজারে। এখান থেকেই শুরু হলো যাত্রার আরেক ভিন্ন অধ্যায়। পাহাড়ি পথ ছেড়ে এবার আমরা ট্রলারে চড়ে নদীপথে যাত্রা শুরু করলাম। নদীর দুই তীরে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়গুলো যেন আমাদের বিদায় জানাচ্ছিল। ট্রলার ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছিল শান্ত জলের ওপর দিয়ে। চারপাশের দৃশ্য এতটাই মনোমুগ্ধকর ছিল যে সবাই নীরবে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম। নদীর বুকে ভেসে চলা সেই মুহূর্তগুলো ছিল পুরো ভ্রমণের সবচেয়ে প্রশান্তিময় সময়। মনে হচ্ছিল, সময় যেন থমকে গেছে। অবশেষে সন্ধ্যার আগে আমরা পৌঁছালাম আমতলী ঘাট-এ। দীর্ঘ ৩ দিনের ভ্রমণ শেষে ক্লান্তি থাকলেও মন ছিল পরিপূর্ণ। এই যাত্রায় আমরা শুধু পাহাড়, ঝরনা কিংবা নদী দেখিনি; আমরা দেখেছি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্ক, অনুভব করেছি পাহাড়ি জীবনের সরল সৌন্দর্য, আর নিজের ভেতর খুঁজে পেয়েছি এক অদ্ভুত প্রশান্তি। 

“কিছু পথ শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য নয়; কিছু পথ মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী স্মৃতি হয়ে থাকার জন্য সৃষ্টি হয়। আলীকদমের এই পথ তেমনই এক পথ।” আলীকদম থেকে ক্রিসতং পাহাড়, খেমচংপাড়া, রুংরাং পাহাড়, মেনিয়াংপাড়া, জগচন্দ্রপাড়া, থানকোয়াইন ঝরনা, দুসুরিবাজার হয়ে আমতলী ঘাট পর্যন্ত এই যাত্রা ছিল শুধুমাত্র একটি ভ্রমণ নয়; এটি ছিল প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য অভিজ্ঞতা। পাহাড়ের নীরবতা, ঝরনার গর্জন, নদীর শান্ত স্রোত এবং মানুষের আন্তরিকতা মিলিয়ে এই ভ্রমণ আজীবন হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা