কানাডায় আন্ডারওয়াটার রোবটিক্স প্রতিযোগিতা
ফারহাত মাইশা অর্পা
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
আন্ডারওয়াটার রোবটিক্স প্রতিযোগিতা মেট রোভ প্রতিযোগিতা ২০২৬-এ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে এমআইএসটির রোবট ম্যাভিরিও আরওভি
আন্তর্জাতিক রোবটিক্সের মঞ্চে বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক গৌরবগাথা রচনা করল ঢাকার মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) একদল তরুণ শিক্ষার্থী।
কানাডায় অনুষ্ঠিত বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্ডারওয়াটার রোবটিক্স প্রতিযোগিতা মেট রোভ প্রতিযোগিতা ২০২৬-এ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) আন্ডারওয়াটার রোবট ম্যাভিরিও আরওভি। প্রতিযোগিতার পাইওনিয়ার শ্রেণিতে মেট রোভ ২০২৬ ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটির এ দল।

কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ড অ্যান্ড ল্যাব্রাডরে ২৩ থেকে ২৭ জুন অনুষ্ঠিত এ প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ১৮টি দেশের ৭৭টি দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সর্বোচ্চ সম্মিলিত স্কোর অর্জনের মাধ্যমে এমআইএসটির ম্যাভিরভ দল সামগ্রিক চ্যাম্পিয়নের গৌরব অর্জন করে। ‘এমআইএসটি ম্যাভিরভ’ মূলত রিমোটলি অপারেটেড ভেহিকল (ROV), স্বায়ত্তশাসিত আন্ডারওয়াটার ভেহিকল (AUV), বায়োনিক্স এবং উন্নত মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে কাজ করা একটি গবেষণা-ভিত্তিক দল।
এমআইএসটির শিক্ষার্থীদের নিজস্ব উদ্যোগে এবং একজন একাডেমিক সুপারভাইজারের নির্দেশনায় গড়ে ওঠা এই সংগঠনে বর্তমানে মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এবং পিআর অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের ২৬ জন সদস্য কাজ করছেন। এর আগে ‘লেভিয়াথান ১.০’, ‘লেভিয়াথান ২.০’ এবং ৫০ কিমি রেঞ্জের স্বায়ত্তশাসিত ড্রোন ‘ক্রিপার ১.০’ তৈরির ধারাবাহিক অভিজ্ঞতার আলোকেই তারা এই বিশ্ব আসরের টিকিট পেয়েছিল।
শিক্ষার্থীদের পরিকল্পনা, নকশা প্রণয়ন এবং নিজস্ব প্রযুক্তিতে রোবট তৈরির দক্ষতার ফলেই এ সাফল্য এসেছে। ম্যাভিরিও আরওভি একটি রিমোটলি অপারেটেড আন্ডারওয়াটার রোবট (আরওভি), যা পানির নিচে জটিল প্রকৌশলভিত্তিক বিভিন্ন কাজ সম্পাদনের জন্য তৈরি করা হয়েছে। সমুদ্র অনুসন্ধান, সামুদ্রিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, পানির নিচের অবকাঠামো পরিদর্শন এবং মেরামতের মতো কাজে এটি ব্যবহার করা যায়। মেরিন টেকনোলজি সোসাইটি (এমটিএস) আয়োজিত মেট রোভ প্রতিযোগিতা বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্ডারওয়াটার রোবটিক্স প্রতিযোগিতা। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের দলগুলো বাস্তবধর্মী সামুদ্রিক প্রকৌশল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও প্রকৌশল দক্ষতার প্রদর্শন করে।

চ্যাম্পিয়ন রোবট ‘ম্যাভিরিও’ (MAVIRIO)- বিশ্বজয়ী এই দলটির ফ্ল্যাগশিপ সাবসি ড্রোনের নাম ‘ম্যাভিরভ’। এটি গভীর সমুদ্র এবং বরফে ঢাকা বৈরী পরিবেশে কাজ করার উপযোগী করে তৈরি।
সামুদ্রিক কচ্ছপের হাইড্রোডাইনামিক প্রোফাইল বা শারীরিক গঠন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এর বায়ো-ডিজাইন করা হয়েছে, যা পানির নিচে তীব্র স্রোতের বিপরীতেও কম শব্দ তৈরি করে চলতে পারে। ৬-ডিওএফ প্রপালশন সিস্টেমযুক্ত এই রোবটে রয়েছে ২-ডিওএফ রোবটিক আর্ম বা মেকানিক্যাল হাত, অ্যালুমিনিয়াম চেসিস, বরফ-প্রতিরোধী স্মার্ট সেন্সর অ্যারে, হাই-ইনটেনসিটি লাইট এবং নিখুঁত ক্যামেরা।
জাতিসংঘের ‘ওশেন ডিকেড চ্যালেঞ্জস’ থিমের ওপর ভিত্তি করে এবারের প্রতিযোগিতায় বরফে ঢাকা ফ্লুম ট্যাংক এবং উন্মুক্ত লবণাক্ত পানির তীব্র স্রোতের মধ্যে কোরাল গার্ডেনের স্যাম্পল সংগ্রহ, সাবসি অবজারভেটরি সার্ভিসিং এবং অফশোর উইন্ড প্লাটফর্মের সংযোগ মেরামতের মতো বাস্তবসম্মত ও জটিল সব মিশন সফলভাবে সম্পন্ন করে ম্যাভিরভ। প্রোডাক্ট ডেমোনেস্ট্রেশন, ইঞ্জিনিয়ারিং কমিউনিকেশন (টেকনিক্যাল রিপোর্ট ও প্রেজেন্টেশন) এবং সেফট- এই তিন পিলারের মূল্যায়নে বিশ্বসেরা নির্বাচিত হয় বাংলাদেশের এই দল।
পাঁচ দিনব্যাপী প্রতিযোগিতার শুরুতেই অনুষ্ঠিত হয় কঠোর নিরাপত্তা পরিদর্শন। এতে একমাত্র বাংলাদেশি দল হিসেবে এমআইএসটি ম্যাভিরোভ (MIST Mavirov) একেবারেই সব নিরাপত্তা পরীক্ষা সফলভাবে উত্তীর্ণ হয় এবং সর্বোচ্চ ‘ওয়ার্কম্যানশিপ’ স্কোর অর্জন করে।
এরপর দলটি সফলভাবে ওয়েভ ট্যাংক, আইস ট্যাংক ও ফিউম ট্যাংক-সংক্রান্ত পণ্য প্রদর্শনী সম্পন্ন করে। পাশাপাশি ‘ওমনিস্ক্যান ইন্টিগ্রেশন’ এবং টেস্ট ট্যাংক পর্বে অংশ নেয়, যেখানে পানির নিচে মানচিত্রায়ন ও পরিদর্শনে ব্যবহৃত উন্নত সাইড-স্ক্যান সোনার প্রযুক্তিসমৃদ্ধ রোবট মোতায়েন করা হয়।

প্রতিযোগিতায় এমআইএসটি ম্যাভিরোভ বিশ্বের খ্যাতনামা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এর মধ্যে ছিল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর, ইউনিভার্সিটি অব হংকং, ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটন, পারডু ইউনিভার্সিটি এবং মেমোরিয়াল ইউনিভার্সিটি অব নিউফাউন্ডল্যান্ড। বিচারক প্যানেলেও ছিলেন সামুদ্রিক প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মধ্যে আধুনিক সাইড-স্ক্যান সোনার প্রযুক্তির উদ্ভাবক মার্টিন ক্লেইনও ছিলেন।
প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব নকশার জন্যও বিশেষভাবে প্রশংসিত হয় ম্যাভিরোভ। দলটি সম্পূর্ণ অ্যালুমিনিয়ামের চ্যাসিস নিজস্বভাবে তৈরি ও ওয়েল্ডিং করে, যা আরওভিকে (ROV) আরও স্থিতিশীল করে তোলে। পাশাপাশি প্লাস্টিকের জিপ টাইয়ের পরিবর্তে পাটের তন্তু এবং প্লাস্টিক ফোমের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করে ভাসমান সক্ষমতা নিশ্চিত করা হয়।
এমআইএসটির ম্যাভিরভ দলে ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মঈনুল হাসানের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ দলে ১১ জন কোর সদস্য এবং ২৪ জন সাধারণ সদস্য রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং দলের কানাডা সফরে গোল্ড স্পনসর হিসেবে সহযোগিতা করেছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই) এবং পূবালী ব্যাংক পিএলসি। পাশাপাশি বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডও দলটিকে বিভিন্নভাবে সহায়তা প্রদান করেছে।