মুস্তাফা মনোয়ার
মইনুদ্দীন খালেদ
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
মুস্তাফা মনোয়ার। ফাইল ছবি
প্রতিভাবান মানুষের মৃত্যু হলে আমরা দীর্ঘ অন্তিম গান রচনা করি, স্মরণের বিচিত্র আসর জমাই। কিন্তু যে-মানুষ চলে গেল তার কীর্তি কি আমরা সংরক্ষণ করি! মুস্তাফা মনোয়ার শিল্পী ছিলেন।
না, শুধু চিত্রকর নন। তিনি বহুমুখী পথ-পরিক্রম করেছেন সৃজনের তাগিদে। তার সৃজন ফসল কোথাও সংরক্ষিত হয়েছে বলে আমার জানা নেই। প্রতিভার ধরন পরিমাপ করলে তাকে কামরুল হাসানের সঙ্গে তুলনা করা চলে। তারা দুজনেই দ্রোহীÑ মাতৃভূমির মাতৃভাষার শত্রুর বিরুদ্ধ লড়তে গিয়ে তুলিকে করেছেন অস্ত্র বিবেকে শান দিয়ে। কামরুল হাসানের মতোই এই শস্য-শ্যামলা, সুজলা-সুফলা রূপসী স্বদেশ বাংলাকে স্বপনে ও জাগরণে নিরন্তর অনুভব করেছেন মুস্তফা মনোয়ার। আর স্লোগান মুখরিত বিদ্রোহী জনতার সঙ্গে হেঁটেছেন রাজনীতিতপ্ত রাজপথে। আবার জয়নুল আবেদিনের মতোই জলরঙে জলসচল স্বদেশের রূপ এঁকে বাংলার চিত্র রসিকদের মন উতরোল করে দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠান অবশ্য তাকে স্বর্ণপদক দিয়ে ঐতিহাসিক স্বাক্ষর রেখেছিল। ১৯৫৯ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে কলকাতার চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাসে আরও একটি সুবর্ণ পালক সংযোজন করেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার।
তবে শৈশব থেকেই তিনি অতি সংবেদীÑ তার চোখের তারায় নৃত্য করে ছবির পৃথিবী, সুরের অনুরণন তাকে সচকিত করে রাখে। অতি শৈশবে তার মধ্যে জাগরণ এসেছিল। অনুভব করেছিলেন এ পৃথিবী দৃশ্যময়, সুরময়। পিতা বিখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফা। পিতার সখ্য বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল, আব্বাস উদ্দিন, জসীম উদ্দীন, এমনই সব দেশাত্মবোধে প্রদীপ্ত প্রতিভার সঙ্গে। বংশগত রক্তবীজ আর গৃহের পরিবেশ শিশু মুস্তাফা মনোয়ারের চৈতন্যে বিচিত্র আলোড়ন তুলেছিল। বাড়িতে ছিল গ্রামোফোন রেকর্ডে গান শোনার আয়োজন। আধো বোলে কথা-বলা শিশুটি সহজেই শনাক্ত করতে পারতেন গানের সুর ও কথা। জীবনের সেই ভোর বেলাতে ছবি আঁকার বাসনা-বীজও উন্মীলিত হয়। অক্ষর জ্ঞানের আগেই শিশুর চোখ রঙিন দৃশ্যে আকুলিত হয়, সুরধ্বনিতে কম্পিত হয় তার কোমল মন। কবি পিতা সন্তানদের নাচ গানের চর্চায় উৎসাহিত রাখতেন। বিশ্বনবী গ্রন্থের প্রণেতা গোলাম মোস্তফা ঠিকই জানতেন সংগীত ও চিত্রের সঙ্গে ধর্মের কোনো বিরোধ নেই। এমনই এক উদার পারিবারিক আবহে শিল্পীসত্তা বিকশিত হয়ে চলে মুস্তাফা মনোয়ারের। গ্রামোফোন রেকর্ডের গান শোনা, ক্যামেরা হাতে পৃথিবীর রূপ ফ্রেমবন্দি করা আর চিত্রচর্চা তো আছেই। বিখ্যাত ওস্তাদ সন্তোষ রায়ের কাছে তিন বছর উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম নিয়েছেন। সন্তোষ রায় আবার ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁর ছাত্র। প্রতিবেশী ছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী। এই বিস্ময়কর লেখকের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল মনোয়ারের অগ্রজ মোস্তফা আনোয়ারের সঙ্গে। পরিবেশটা ছিল মেধা ও আনন্দের বাতাবরণে অভূতপূর্ব জীবন যাপনের অনুকূল। মুজতবা আলী আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ বিখ্যাত শিক্ষক ও শিল্পী রমেন চক্রবর্তীর কাছে মনোয়ারকে নিয়ে যান ভর্তি করানোর জন্য। কলকাতায় অবস্থিত বিশাল সেই ভিক্টোরিয়ান দালানের আর্ট কলেজের ব্যাপ্ত পরিসরে এসে মুস্তাফা মনোয়ারের চিত্র-সাধনা কাঙ্ক্ষিত গতিবেগ পায়। চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের প্রতিভার পথরেখা বুঝতে হলে রমেন চক্রবর্তীর শিক্ষার কথা বলতে হয়। তিনি তো শিক্ষা দেননিÑ শিক্ষার্থীদের দীক্ষিত করেছেন। এই গুরুতুল্য শিক্ষক জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসানকেও তালিম দিয়েছেন চিত্রের বীজমন্ত্র উপলব্ধির। শিল্পী সফিউদ্দিন আহমেদও গুরু রমেন চক্রবর্তীকে আনত হয়ে স্মরণ করতেন।
এই গুরুর কাছে বাংলাদেশের ঋণ অনেক। রমেন চক্রবর্তী প্রকৃতির সান্নিধ্যে কী করে এই জগত সংসারের লীলার চিত্ররূপ দিতে হয় শিক্ষার্থীদের সেই তালিম দিয়েছিলেন। সতত সচল তুলির টানে প্রকৃতির স্বতঃস্ফূর্তিকে অনূদিত করার নান্দনিক শিক্ষা মুস্তাফা মনোয়ার পেয়েছিলেন এই গুরুর কাছে । শিল্পী ও শিল্প রসিকরা জানেন, জল রঙের চিত্রের চিত্রকর হিসেবে মুস্তাফা মনোয়ার অতুলনীয়। রফিকুন নবী কিংবা মনিরুল ইসলাম জল রঙের প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই উচ্চারণ করেন মনোয়ার স্যারের নাম। এই প্রবীণ শিল্পীরা তাদের তরুণ দিনে ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটে (বর্তমানে চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) মুস্তাফা মানোয়ারকে পেয়েছিলেন শিক্ষক হিসেবে। এই প্রতিষ্ঠানে কিছুদিন শিক্ষকতার পর সব্যসাচী মুস্তাফা মনোয়ার নাটক, চলচ্চিত্র, টেলিভিশনসহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নির্মাণে নিজেকে ব্যস্ত রাখলেন। টেলিভিশন, চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা, শিল্পকলা একাডেমিসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় এদেশের সংস্কৃতিচর্চা বিশেষ রুচিশীলতার মাত্রা লাভ করেছে।
জল রঙের গুরু মনোয়ার বিষয়ে আলোকপাত করার শুরুতে তার জীবনের অভিজ্ঞতার আদি উৎসের কথা বলতে হয়। তিনি তখন স্কুলের ছাত্র। তাদের বাড়ি নদীর ধারে হুগলিতে। বিশাল পাকা বাড়ি নদীপাড় ঘেঁষে। কিশোর মুস্তাফা মনোয়ার দেখতেন নদীর জলের বিচিত্র প্রকাশÑ ষড়ঋতুর দোলায় কী করে বদলে যায় প্রকৃতি, মানুষ ও প্রাণিকুলের জীবন ধারা। জলসচল দেশ, ঋতুচক্রের আবর্তন আর নিত্য পরিবর্তনশীল দৃশ্যমালা পর্যবেক্ষণ ছাড়া এদেশের নিসর্গ প্রকৃতি শুধু নয়Ñ মানুষের অন্তর বোঝাও সম্ভব নয়। মনোয়ারের সিক্ত তুলি সতত সচল থেকেছে তার অভিজ্ঞতার রস পুষ্টিতে।
তবে এই জল রঙের ছবি তার প্রধান অর্জন নয়। ইতি ও নেতির দোলাচলে সময় পাঠ করে তিনি বুঝতে চেয়েছেন রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের চালক যন্ত্রের মানুষের বিচিত্র প্রবৃত্তি। তাই কিশোর বয়স থেকে বিশেষ অনুধ্যান ছিল মানুষের মুখ আঁকার। তুলি-কলম বিষাক্ত বাণে রূপান্তরিত করে পাকিস্তান নামক দুষ্ট রাষ্ট্রের দুষ্ট কুশীলবদের ঘায়েল করার প্রতিজ্ঞা জন্ম নিয়েছিল অন্তরে।
১৯৫২ সাল। মুস্তাফা মানোয়ার ১৭ বছরের তরুণ। থাকেন নারায়ণগঞ্জে। খবর রাখেন রাজনীতির। দ্রোহের চেতনা আগ্নেয় হয়ে ওঠে রাষ্ট্রভাষা উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার সংবাদ শুনে। তখন থেকেই আঁকতে থাকেন পাকিস্তান রাষ্ট্রবিরোধী পোস্টার ও কার্টুন। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই বলে ব্যানার ও ফেস্টুন লেখেন। পুলিশ গ্রেপ্তার করে, প্রহার করে এবং রাষ্ট্র তাকে সাজা দেয়Ñ এক মাসের কারাবাস। জেল থেকে মুক্তি লাভের পর মনোয়ারের মনে হয় দেশ থাকে অন্তরের গভীরে। দেশটা শুধু মাটির নয়। দেশটা চিন্ময়। হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ আরও গভীরতর অনুভবে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন, চেতনায় নজরুল হয়ে ওঠেন আরও দ্রোহী। কামরুল হাসানের সঙ্গে বন্ধুত্বের সান্নিধ্যের কারণে শপথ নিয়েছিলেন ব্রতচারী আন্দোলনে। সেই থেকে বাংলার লোকজীবন পাঠ হয়ে যায় জীবন উপলব্ধির প্রধান ঔষধি। সেই থেকে গণমানুষের সঙ্গে হাঁটা, লোকজীবনের সঙ্গে জীবনকে আবর্তিত করে রাখা।
এ দেশে পাপেট শিল্পের জনক মুস্তাফা মনোয়ার। লোকজীবনের পথে হেঁটে গ্রামীণ শিল্পীদের পুতুলনাচ পর্যবেক্ষণ করে সৃষ্টির নতুন প্রেরণা পেয়েছেন নিরীক্ষানিষ্ঠ এই শিল্পী। লোকশিল্পের পুতুলনাচ সময়ের প্রয়োজনে মনোয়ারের হাতে বিচিত্র অভিব্যক্তির চরিত্র হয়েছে।
জয়নুল, কামরুল ও মনোয়ারের পথ অভিন্ন। তীক্ষ্ণ নৈতিক বোধ, দেশের প্রতি গভীরতর ভালোবাসা, গণমানুষের জীবনঘনিষ্ঠ থাকাÑ এসব বিবেচনায় এই গুণী শিল্পীরা একই কাতারে দাঁড়িয়ে আছেন। লোকশিল্প গভীরতর ধ্যানে উপলব্ধি করে এবং সময়ের প্রয়োজনে তা রূপান্তরিত করে সংগ্রামশীল জীবনের নব নব আয়ুধ আবিষ্কার করেছেন তারা। তারা চেয়েছিলেন শিশুদের মানবিক আদর্শের আলো-পথে পরিচালিত করতে। এই ভাবনায় এই তিন শিল্পীর সঙ্গে স্মরণীয় এস এম সুলতান।
তবে কামরুল হাসান ও মুস্তাফা মনোয়ার বিশেষভাবে রাজনীতি সচেতন শিল্পী। ১৯৭১-এ পাক হানাদার বাহিনীর আক্রমণের আগেই কামরুল এঁকেছিলেন রক্ত পিপাসু জেনারেল ইয়াহিয়ার মুখ। আর মুস্তাফা মানোয়ার ২৩ মার্চ রাত্রে টেলিভিশনে দায়িত্ব পালনকালে এক ভয়ংকর ঘটনা ঘটালেন। তখন নিয়ম ছিল রাত দশটায় টেলিভিশন সম্প্রচারের সমাপ্তি ঘোষণার এবং তারপরে পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত শোনানো হতো। তখন টেলিভিশন সেন্টারে অবস্থান করছে পাকিস্তানি সৈনিকরা। দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মনোয়ার দশটার পরও অনুষ্ঠান চালিয়ে গেলেন। পাহার আলো তো সৈনিকরাও একবার জানতে চেয়েছিল টেলিভিশন প্রোগ্রামের সমাপ্তি ঘোষণা হচ্ছে না কেন। বিচক্ষণ মনোয়ার বললেন, ২৩ তারিখ তো পাকিস্তানের জাতীয় দিবস। তাই প্রোগ্রাম দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ২৩ মার্চ শেষে ২৪ মার্চের দিকে ঘড়ির কাঁটা নড়লো। দুঃসাহসী শিল্পী মনোয়ার পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত না বাজিয়ে টেলিভিশন বন্ধ করে দিলেন। সেই থেকেই এই শিল্পীর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সূচনা। তারপর তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতে গিয়েছেন। ছবি এঁকেছেনÑ পাকিস্তানিদের বিদ্রূপ করে ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসের বয়ান পরিবেশন করার জন্য তৈরি করেছেন নানা কুশীলবের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পুতুল। পুতুল নাচ দেখিয়েছেন তিনি শরণার্থী শিবিরে ও মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে। মুস্তাফা মনোয়ারের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক পুতুল নাচ আমাদের শিল্পের ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন। মুক্তিকামী বাংলাদেশের মানুষের জীবনে শৈল্পিক মহৌষধ। কিন্তু আমরা কি তার এই কীর্তি সংরক্ষণ করেছি ? আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং সর্বোপরি এদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাস রচনার জন্য এই শিল্পের সংরক্ষণ আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।