আনিফ রুবেদ
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
ভাস্কর চৌধুরী। ফাইল ছবি
গত ২৮ জুন রাতে সকল মায়ার ডুরি কেটে চলে গেলেন কবি ও কথাকার ভাস্কর চৌধুরী। তিনি চলে গেলেন কিন্তু তার চলাচলের ছাপ গভীরভাবে রেখে গেলেন এই বাংলার লাল মাটিতে; এই বাংলার অজ¯্র পাঠকের হৃদয়েও রয়ে গেলেন তিনি তার হৃদয়ের রসে রচিত নানামুখী সাহিত্য-রসের ধারা প্রবাহিত করে।
ভাস্কর চৌধুরী ১৯৫২ সালের ১৭ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সদরের ভবানীপুর গ্রামে। তার সাহিত্যের নাড়িনক্ষত্র বা সাহিত্যনদীর প্রবাহ বুঝতে গেলে তার জন্মাঞ্চলের আবহাওয়া, আবহ, জীবনযাপন, ভূমি প্রকৃতি ও ভূমির সন্তানদের ভালো করে বুঝে নিতে হবে। অবশ্য এসব বুঝে নেওয়ার জন্য আলাদা কোনো কসরতের দরকার নেই, তার লেখার ভেতরেই ছড়িয়ে আছে বুঝে নেওয়ার রস ও রসদ।
ভাস্কর চৌধুরীর শিশুকাল আর কৈশোরকাল কেটেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবং শিক্ষাকাল কেটেছে পার্শ্ববর্তী জেলা রাজশাহীতে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং রাজশাহী আবহের দিক থেকে প্রায় একই। ফলে ধরে নেওয়া যায় তার মানস গঠনের মূল সময়টুকু একটা নির্দিষ্ট এলাকায়ই পরিপুষ্ট ও সমৃদ্ধ হয়েছে এবং খুব সহজভাবেই তার রচিত সাহিত্যকর্মে উঠে এসেছে।
ভাস্কর চৌধুরী রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় চল্লিশটি। তিনি কবিতা ও কথাসাহিত্যে সমান শক্তির পরিচয় দিয়েছেন; সমান মর্মের পরিচয় দিয়েছেন। অজ¯্র কবিতা তিনি লিখেছেন এবং সেগুলো বেশ জনপ্রিয়ও হয়েছে, কিন্তু তার সমস্ত কবিতার মধ্যে একটি কবিতা এপার বাংলা ওপার বাংলার মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে, মুখে মুখে ঠাঁই পেয়েছে সেটি হলোÑ ‘আমার বন্ধু নিরঞ্জন’। অসাধারণ এ কবিতাটি ধারণ করে আছে বিরাট এক ভাব, যেখানে বন্ধুত্বকে এক অপার মহিমায় তুলে ধরা হয়েছে এবং এখানেই থেমে থাকেনি কবিতাটির প্রভা বরং আরও বেশি এগিয়ে গেছে এবং কবিতাটি হয়ে গেছে সমগ্র বিশ্বের মানুষের মূল্যের, মানুষের গুরুত্বের, মানুষের সম্মানের প্রতিনিধি। কবিতার শেষ দিকে তিনি বলছেনÑ
‘মানুষকে এত ক্ষুদ্রার্থে নেবেন না,
মানুষ এত বড় যে,
আপনি যদি “মানুষ” শব্দটি
একবার উচ্চারণ করেন
যদি অন্তর থেকে করেন উচ্চারণ
যদি বোঝেন এবং উচ্চারণ করেন ‘মানুষ’
তো আপনি কাঁদবেন।’
এই কবিতা পড়লে, এই কবিতা শুনলে প্রতিটি মানুষের হৃদয় আর্দ্র হবেই, মথিত হবেই।
ভাস্কর চৌধুরী লেখার প্রয়োজনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দ্র অঞ্চলের লাল মাটির পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছেন। খুব কাছ থেকে দেখেছেন গ্রীষ্মের লাল মাটি ধূলি, দেখেছেন বর্ষার পিচ্ছিল লাল মাটির কর্দম। এসব অঞ্চলে সাঁওতালদের বাস। তারাই এখানের আদি বাসিন্দা। ভাস্কর চৌধুরী সাঁওতালদের জীবনযাপনের কথা, বসতি গড়ে তোলার কথা, ত্যাগ আর কষ্টের কথা, বৈচিত্র্যময় উৎসবের কথা খুব গভীরভাবে তুলে ধরেছেন তার কথাসাহিত্যে; বিশেষ করে ‘লাল মাটি কালো মানুষ’ ও ‘ধনসা মাতি ও তার জীবনবৃক্ষ’ উপন্যাসে। ভাস্কর চৌধুরী তার কথাসাহিত্যে যে বয়ানভঙ্গি ব্যবহার করেছেন, তা তার নিজস্ব। তিনি তার ভাষা যেমন ব্যবহার করেছেন সঙ্গে সঙ্গে চরিত্রের প্রয়োজনে চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তাদের বয়ানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষা ও সাঁওতালদের সাঁওতালি ভাষার প্রয়োগও বেশ সফলভাবে করেছেন।
‘ধনসা মাতি ও তার জীবনবৃক্ষ’ উপন্যাসের মূল চরিত্র ধনসা মাতি। একটা প্রতিকূল পরিবেশে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর বসতি স্থাপন এবং টিকে থাকা, তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির টিকে থাকা বিরাট চ্যালেঞ্জের। এই চ্যালেঞ্জ তারা কীভাবে মোকাবিলা করেছে এবং করছে তারই এক উৎকৃষ্ট ভাষ্যধারা এই উপন্যাস। মূলত এই উপন্যাস এগিয়ে গেছে ধনসা মাতির স্মৃতি খুঁড়ে বের করা কথার ওপর ভিত্তি করে। সাঁওতালদের উত্তরপুরুষেরা যখন জানতে পারে এসব অঞ্চলে যারা প্রথম সাঁওতাল বসতি স্থাপন করেছিল তাদের একজন এখনও বেঁচে আছেন এবং তিনি ধনসা মাতি। তখন বিভিন্ন জায়গা থেকে এসব উত্তরপুরুষের কেউ কেউ ধনসা মাঝির কাছে আসে তাদের পূর্ব ইতিহাস জেনে নেওয়ার জন্য। ওই সময়ে ধনসা মাতি একটি হাসপাতালে প্রায় মরণোন্মুখ অবস্থায় রয়েছে।
উপন্যাসটির আঁকেবাঁকে জীবন বৈচিত্র্য রয়েছে, সংগ্রাম বৈচিত্র্য রয়েছে, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও রয়েছে। উপন্যাসের ভেতর প্রচুর পরিমাণে গীতের ব্যবহার রয়েছে; যা উভয় ভাষাতেই অর্থাৎ বাংলা ও সাঁওতালি ভাষায় রচিত। এগুলোর অনেকগুলো বিশেষ করে বাংলা গীতগুলো লেখকের নিজেরই লেখা। তিনি এই গীতগুলো লিখতে গিয়ে এমনই মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন যে, এগুলো পাঠ করার সময় কোনোভাবেই মনে হবে না এগুলো অবান্তর, কখনোই মনে হবে না এগুলোর ব্যবহার খাপছাড়া হয়েছে। বরং নতুন রসের সন্ধান পেয়ে পাঠক আরও বেশি করে লেপটে যাবেন বইয়ের কাহিনীর সঙ্গে, চরিত্রদের সঙ্গে। এই গীতগুলোর দুয়েকটি এ রকমÑ
‘ধনসা মাতি কয়
জাত মাইনো পাত মাইনো
মানুষ ভাইঙ্গো না।’
প্রতিটা লেখকের নিজের প্রকাশ-ভাষার মধ্যে যেমন একটা মিল আছে, তেমনি ভাবনা-ভাষার ভেতরেই একটা মিল আছে। এবং এই মিলটাই একজন লেখককে স্বাতন্ত্র্য দান করে। উল্লিখিত গীতটি পড়ে আমরা মিলিয়ে নিতে পারি যে, আমার বন্ধু নিরঞ্জনেও মানুষকে বিরাট করে তোলার একটা ব্যাপার রয়েছে এবং এখানেও রয়েছে।
প্রথম দিকেই বলা হয়েছে, ভাস্কর চৌধুরীর গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় চল্লিশটি। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্যÑ ‘রক্তপাতের ব্যাকরণ’, ‘কৃষ্ণপুরাণ’, ‘ভূমি’, ‘টান’, ‘ময়নাবিলাস’, ‘আমার ভেতরে আঁধার’ ইত্যাদি।
কবি ও কথাকার ভাস্কর চৌধুরী আমাদের মধ্যে জেগে থাক চিরকাল।