লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
কর্মক্ষেত্রে নারীর দ্বিতীয় অধ্যায়ের সংগ্রাম
আমাদের সমাজে একজন পুরুষের কর্মজীবনে সাময়িক বিরতি নেওয়াকে অনেক সময়ই ‘সাবাটিকেল’ বা নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার সময় হিসেবে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়। কিন্তু একজন নারীর ক্ষেত্রে চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাতৃত্ব, সংসার বা অন্য কোনো পারিবারিক কারণে একবার কর্মক্ষেত্র থেকে ছিটকে পড়লে, ধরে নেওয়া হয় তার পেশাজীবনের সেখানেই ইতি ঘটেছে। পুনরায় কর্মক্ষেত্রে ফেরার চেষ্টা করলে সমাজ, এমনকি নিয়োগদাতারাও বাঁকা চোখে তাকান। ছুড়ে দেওয়া হয় তীক্ষ্ণ প্রশ্নÑ ‘এত দিন কোথায় ছিলেন?’, ‘কাজের দক্ষতা কি আর আগের মতো আছে?’ নারীর এই ‘ক্যারিয়ার ব্রেক’ বা কর্মজীবনের বিরতি যেন এক অলিখিত অপরাধ।
এই অদৃশ্য শেকল আর সামাজিক নেতিবাচকতার অচলায়তন ভেঙে নারীরা যখন পুনরায় ফিরতে চান, তখন তাদের লড়তে হয় বহুমুখী ফ্রন্টে। কখনও নিয়োগদাতার বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে, কখনোবা নিরাপদ ডে-কেয়ারের অভাবে খোদ নিজের মাতৃত্বের বিবেকের সঙ্গে।
কর্মজীবী নারীদের সংগ্রামের বাস্তব গল্প
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা জান্নাতুল লাবণী। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেশ সুনামের সঙ্গেই কাজ করছিলেন তিনি। কিন্তু সন্তান গর্ভে আসার পর শারীরিক জটিলতা এবং মাতৃত্বকালীন ছুটির সীমাবদ্ধতায় বাধ্য হয়ে চাকরি ছাড়েন। লাবণীর সন্তানের বয়স এখন ২ বছর ৯ মাস। সন্তান একটু বড় হওয়ায় সংসারের আর্থিক সচ্ছলতা ও নিজের ক্যারিয়ারের কথা ভেবে সম্প্রতি তিনি পুনরায় একটি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু এই ফেরাটা মোটেও স্বাভাবিক ছিল না।
চাকরিতে যোগ দেওয়ার কয়েক দিনের মাথায়ই বাচ্চার প্রচণ্ড জ্বর আসে। অফিসে বসে লাবণীর মন পড়ে থাকে বাসায়। সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দেয় বাচ্চা রাখার নিরাপদ জায়গা নিয়ে। ঢাকা শহরে বিশ্বস্ত এবং নিরাপদ কোনো মানুষের কাছে সন্তানকে রেখে নিশ্চিন্তে অফিস করবেন, এমন পরিবেশ তিনি পাননি। বাড়ির আশপাশের ডে-কেয়ারগুলোর মান নিয়েও তিনি সন্দিহান ছিলেন। একদিকে পেশাগত দায়িত্ব, অন্যদিকে অসুস্থ সন্তানের জন্য মায়ের ব্যাকুলতাÑ এই দুইয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে থাকেন লাবণী। শেষ পর্যন্ত কোনো উপায় না দেখে পুনরায় চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। লাবণীর ভাষায়, ‘অফিসে বসে যখন শুনতাম বাচ্চাটা জ্বরে কাঁদছে, আর ওকে দেখার মতো বিশ্বস্ত কেউ নেই, তখন মনে হতো ক্যারিয়ার দিয়ে কী করব? কিন্তু দিন শেষে নিজের একটা পরিচয়ের অভাব আমাকে কুরে কুরে খায়।’
অর্থনীতিতে নারীর অবস্থান
বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য এটি একটি অশনিসংকেত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপের দিকে তাকালে হতাশার চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়। দেশে শ্রমশক্তিতে পুরুষের অংশগ্রহণের হার যেখানে প্রায় ৭৯ শতাংশ, সেখানে নারীর অংশগ্রহণ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২০ শতাংশে। অথচ ২০২৩ সালেও এই হার ছিল প্রায় ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ নারীরা কর্মমুখী হওয়ার বদলে উল্টো শ্রমবাজার থেকে ছিটকে পড়ছেন।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ২০২৪ সালের জুনে প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক জেন্ডার অসমতা’ প্রতিবেদন বলছে আরও ভয়াবহ কথা। অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ, শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নÑ এই চার সূচকে গত পাঁচ বছরে শ্রমশক্তিতে নারী-পুরুষের বৈষম্য তো কমেইনি, বরং আয়ের ক্ষেত্রে এই অসমতা বেড়েছে প্রায় পাঁচগুণ! নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া একটি রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন যে নিছকই কথার কথা, তা এই পরিসংখ্যানগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
করপোরেট জীবনের বাস্তবতা
পুরান ঢাকার চানখাঁরপুর এলাকার বাসিন্দা বুশরা। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির বয়স্ক সদস্যদের দেখভাল এবং সংসারের পুরো দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে গিয়ে প্রতিশ্রুতিশীল ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে ইতি টানতে হয়েছিল তাকে। প্রায় চার বছর পর সংসারের চাপ কিছুটা কমলে তিনি পুনরায় চাকরিতে ফেরার চেষ্টা করেন। কিন্তু বুশরার জন্য করপোরেট দুনিয়ার দরজাগুলো যেন ভেতর থেকে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
একাধিক ইন্টারভিউ বোর্ডে তাকে শুনতে হয়েছে রূঢ় সব কথা। ‘চার বছর তো শুধু রান্নাঘরেই ছিলেন, এক্সেলের কাজ কি আর মনে আছে?’, ‘নতুনদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টার্গেট পূরণ করতে পারবেন তো?’Ñ এমন সব তির্যক মন্তব্যে বুশরার আত্মবিশ্বাস তলানিতে ঠেকে যায়। অভিজ্ঞতা ও মেধা থাকা সত্ত্বেও কেবল চার বছরের একটি ‘ব্রেক’-এর কারণে তাকে অযোগ্য হিসেবে সাব্যস্ত করা হচ্ছিল। অবলীলায় ধরে নেওয়া হয়, মেয়েটি হয়তো মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছেন।
উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের সাম্প্রতিক একটি জরিপের উপাত্ত বলছে, আবেদনকারীদের ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশই জানিয়েছেন, পারিবারিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তারা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। মাতৃত্বকালীন সময়ের জটিলতা ও সন্তান লালন-পালনের জন্য চাকরি ছেড়েছেন ৩৬ শতাংশ নারী। অর্থাৎ সমাজের অবৈতনিক পরিচর্যার সিংহভাগ দায়ভার কেবল নারীর কাঁধেই বর্তায়।
কাকলি সাহা কাজ করতেন একটি আইটি ফার্মে। কিন্তু অফিসের কর্মপরিবেশ নারীবান্ধব না হওয়ায় এবং দীর্ঘ সময় কাজ করার চাপে নিজের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে তিনি স্বেচ্ছায় বিরতি নেন। ব্র্যাকের তথ্যমতে, ৮.৫ শতাংশ নারী বিরূপ কর্মপরিবেশের কারণে এবং ৪.৭ শতাংশ সামাজিক চাপের কারণে ক্যারিয়ারে বিরতি নেন। কাকলি সেই তালিকারই একজন।
প্রায় তিন বছর পর তিনি যখন ফিরতে চাইলেন, তখন তার প্রধান লক্ষ্য শুধু অর্থ উপার্জন ছিল না। তথ্য বলছে, বিরতির পর কাজে ফেরার ক্ষেত্রে নারীদের মূল অনুপ্রেরণা হলোÑ ক্যারিয়ারে উন্নতি (৭৬.৫ শতাংশ), নিজস্ব আত্মপরিচয় বা আইডেন্টিটি তৈরি (৬২.২ শতাংশ), আর্থিক স্বাধীনতা (৫৬.৫ শতাংশ) এবং হারানো আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার (৫৭.৭ শতাংশ)। কাকলি বলেন, চাকরি ছাড়ার পর প্রথম কয়েক মাস ভালো লাগলেও পরে মনে হতে থাকে সমাজে আমার নিজস্ব কোনো পরিচয় নেই। আমি কারও স্ত্রী, কারও মা, কিন্তু ‘আমি’ কে? এই আত্মপরিচয় ফিরে পেতেই আমি আবার কাজে ফিরতে চাই। কিন্তু কাকলির এই চাওয়াকে সম্মান জানানোর মতো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বড় অভাব আমাদের সমাজে।
আশার আলো
এই অন্ধকার সময়ে আশার আলো দেখাচ্ছে ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠানের ‘ব্রিজ রিটার্নশিপ’ কর্মসূচি। দীর্ঘ আট বছর চাকরি করার পর একান্তই পারিবারিক কারণে ক্যারিয়ারে ইস্তফা দিয়েছিলেন ফারাহ মাহবুব। আট বছর করপোরেট দুনিয়া থেকে দূরে থাকা মানে একটি যুগের পরিবর্তন। এক বছরের কিছু বেশি সময় পর তিনি নিজের হারানো আত্মপরিচয় খুঁজতে পুনরায় চাকরিতে ফেরার চেষ্টা করেন। কিন্তু অভিজ্ঞতা থাকার পরও বিরতির কারণে ডাক পাচ্ছিলেন না কোথাও।
অবশেষে ব্র্যাকের ব্রিজ রিটার্নশিপ তাকে সেই সুযোগ করে দেয়। বর্তমানে তিনি ব্র্যাকের ‘সোশ্যাল ইনোভেশন ল্যাব’-এ ডেপুটি ম্যানেজার হিসেবে নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রাখছেন। ফারাহ বলেন, ‘নারীদের চাকরিতে বিরতির বিষয়টিকে আমাদের সমাজে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। রিটার্নশিপ কর্মসূচি আমাকে সেই অদৃশ্য বাধা পেরোতে সাহায্য করেছে। আমি নিজের কাজ দেখানোর একটি সুষ্ঠু প্লাটফর্ম পেয়েছি।’
ব্র্যাকের এই উদ্যোগ আক্ষরিক অর্থেই একটি ‘সেতু’ হিসেবে কাজ করছে। সর্বশেষ আসরে মাত্র ২৬টি পদের জন্য আবেদন জমা পড়েছিল ১২০০-এর বেশি! এটি প্রমাণ করে যে, কত বিশালসংখ্যক নারী পুনরায় কাজে ফিরতে উদগ্রীব হয়ে আছেন। এটি নিছক কোনো অবৈতনিক ইন্টার্নশিপ নয়, বরং সম্মানজনক বেতনের পাশাপাশি এখানে দেওয়া হয় মেন্টরশিপ, পেশাগত কাউন্সেলিং এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান হালনাগাদ করার প্রশিক্ষণ।
ব্র্যাকের চিফ পিপল অ্যান্ড কালচার অফিসার মৌটুসী কবীর বিষয়টির একটি চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কাজ থেকে বিরতি নেওয়া কোনো দুর্বলতা নয়। বরং একটি প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ার থেকে সরে দাঁড়ানো অনেক বড় সিদ্ধান্ত এবং সাহসের ব্যাপার। পেশায় বিরতি মানেই দক্ষতার অভাব বা মেধার মৃত্যু নয়।’
নারীর কর্মজীবনের বিরতি কোনো পূর্ণচ্ছেদ নয়, এটি কেবলই একটি কমা। দরকার শুধু একটুখানি বিশ্বাস, একটু সুযোগ, পর্যাপ্ত ডে-কেয়ার সুবিধার মতো রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পলিসি এবং একটি শক্ত সাঁকো। ‘গিভ টু গেইন’ বা ‘অর্জনের জন্য বিনিয়োগ’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে এখন সময় এসেছে রাষ্ট্রের অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এগিয়ে আসার। কারণ নারীকে ঘরবন্দি করে অর্থনৈতিক মুক্তি ও অগ্রগতি কোনোভাবেই সম্ভব নয়।