খালিদ আহমেদ রাজা
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
ছিন্নমূল শিশুদের সঙ্গে পুলিশ কনস্টেবল মো. দোলন
পুলিশ শব্দটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কঠোর অনুশাসন, অপরাধী দমন আর খাকি পোশাকের এক গম্ভীর প্রতিচ্ছবি। চোর-পুলিশ খেলা আর আইন রক্ষার ব্যস্ততায় মোড়ানো এই জীবনে সাধারণ মানুষের সঙ্গে পুলিশের দূরত্বটা যেন একটু বেশিই। কিন্তু এই চেনা বৃত্তের বাইরেও এমন কিছু মানুষ থাকেন, যারা ইউনিফর্মের কঠোরতাকে ছাপিয়ে এক টুকরো মানবিক বাতিঘর হয়ে ওঠেন। তেমনই একজন অনন্য মানুষ হলেনÑ বাংলাদেশ পুলিশের কনস্টেবল মো. দোলন (যিনি দোলন নামেই সমধিক পরিচিত)। তার জীবনের ব্রত আইন রক্ষার পাশাপাশি সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) থেকে শুরু করে পাহাড়-সমতলের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে তার এই নীরব মানবিক বিপ্লবের গল্প।
শৈশবের লালিত স্বপ্ন ও খাকি পোশাকে পদার্পণ
মো. দোলনের বেড়ে ওঠা লক্ষ্মীপুর জেলায়। ছোটবেলা থেকেই তার মনের কোণে সুপ্ত একটা ইচ্ছে ডানা মেলতÑ সমাজের অসহায় ও পিছিয়েপড়া মানুষের জন্য কিছু করার। কিন্তু মধ্যবিত্ত বা সাধারণ পরিবারের নানাবিধ সীমাবদ্ধতার কারণে ছাত্রজীবনে সেই স্বপ্নগুলোকে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ২০১৬ সালে তিনি যখন বাংলাদেশ পুলিশে একজন সাধারণ কনস্টেবল হিসেবে যোগদান করেন, তখন তার সামনে খুলে যায় এক নতুন দিগন্ত। পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করার পাশাপাশি তিনি লক্ষ্য করেন, তৃণমূল পর্যায়ের পুলিশিং নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে কিছু নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। দোলন সিদ্ধান্ত নেন, তিনি তার কাজের মাধ্যমে এই ধারণাকে বদলে দেবেন এবং খাকি পোশাকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আসল ‘জনগণের বন্ধু’রূপটি ফুটিয়ে তুলবেন।

পাহাড়ের বুকে শিক্ষার আলো : বান্দরবানের ‘মানবিক পাঠশালা’
কনস্টেবল দোলনের চাকরি জীবনের শুরুটা হয়েছিল দেশের অন্যতম দুর্গম অঞ্চল পার্বত্য জেলা বান্দরবানে। পাহাড়ি অঞ্চলের অপার সৌন্দর্যের আড়ালে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত শত শত শিশুর করুণ দশা দোলনের হৃদয়কে নাড়া দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, কেবল অন্ন-বস্ত্রের জোগান সাময়িক স্বস্তি দিলেও শিক্ষার অভাব একটি প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। এই ভাবনা থেকেই স্থানীয় কিছু উদ্যমী স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন ‘মানবিক পাঠশালা’। বান্দরবান সদর উপজেলার মুসলিম পাড়ায় শুরু হওয়া এই পাঠশালায় প্রায় ৬৮ জন পাহাড়ি ও বাঙালি সুবিধাবঞ্চিত শিশু শিক্ষার সুযোগ পায়। নিজের বেতনের একটি বড় অংশ দিয়ে তিনি এই শিশুদের বই, খাতা, কলম ও অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রীর জোগান দিতে থাকেন। ডিউটির কঠিন সূচির মাঝেও যখনই সময় পেতেন, দোলন নিজেই বসে যেতেন শিশুদের শিক্ষক হিসেবে। পাহাড়ের দুর্গম উপত্যকায় খাকি পোশাক পরিহিত একজন পুলিশ সদস্যকে পরম মমতায় অক্ষরজ্ঞান দিতে দেখে স্থানীয় মানুষরা পুলিশের এক নতুন রূপ প্রত্যক্ষ করেন।
কংক্রিটের অরণ্যে আলোর ছোঁয়া
বান্দরবান ও চট্টগ্রাম পর্ব শেষ করে দোলনের কর্মস্থল যখন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে (ডিএমপি) নির্ধারিত হয়, তখন শহরের চাকচিক্যের আড়ালের অন্ধকার তাকে নতুন করে ভাবিয়ে তোলে। ঢাকার ব্যস্ত সড়ক, ফুটপাত ও রেলস্টেশনে বেড়ে ওঠা পথশিশুরা যখন মাদক, চুরি বা ভিক্ষাবৃত্তির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছিল, তখন দোলন আবারও এগিয়ে আসেন। ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত এলাকা পলাশীর মোড়ে তিনি শুরু করেন তার ‘মানবিক পাঠশালা’র দ্বিতীয় অধ্যায়। ফুটপাতে ধুলোবালি মেখে বড় হওয়া ২৬ জন পথশিশুকে নিয়ে এই ভ্রাম্যমাণ পাঠশালার যাত্রা শুরু হয়। ঢাকার এই ব্যস্ততম জীবনে যেখানে মানুষের নিজের দিকে তাকানোর সময় নেই, সেখানে দোলন তার ডিউটি শেষ করে ক্লান্ত শরীরে ছুটে যেতেন এই পথশিশুদের কাছে। কখনো নিজে ক্লাস নিতেন, আবার কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ স্বেচ্ছাসেবীদের সহায়তায় শিশুদের বর্ণমালার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেন। এই শিশুদের কাছে দোলন কেবল একজন পুলিশ অফিসার নন, বরং একজন পরম নির্ভরযোগ্য ‘দোলন ভাই’।
ভিক্ষাবৃত্তি থেকে স্বাবলম্বনের পথে : জীবনের চাকা ঘুরিয়ে দেওয়ার গল্প
কনস্টেবল দোলন কেবল সাময়িক করুনা বা খাদ্য বিতরণের মধ্যে নিজের মানবিকতাকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি বিশ্বাস করেন, কোনো মানুষকে স্থায়ীভাবে সাহায্য করতে হলে তাকে উপার্জনের পথ তৈরি করে দিতে হবে। তার কর্মজীবনে এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যেখানে তিনি অসহায় মানুষকে স্থায়ী বা ভ্রাম্যমাণ ব্যবসার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
এমনই একটি হৃদয়স্পর্শী উদাহরণ হলেন ৪৫ বছর বয়সী নূর ইসলাম। এক মর্মান্তিক ট্রেন দুর্ঘটনায় দুই পা হারিয়ে নূর ইসলামের জীবন যখন পুরোপুরি অন্ধকারে নিমজ্জিত এবং পরিবার যখন অনাহারে দিন কাটাচ্ছিল, তখন তার জীবনে দেবদূতের মতো আবির্ভূত হন দোলন। দোলন তার বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় নূর ইসলামকে একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা কিনে দেন। এই একটি উপহার নূর ইসলামের জীবনকে ভিক্ষাবৃত্তির অভিশাপ থেকে মুক্ত করে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার পথ দেখায়। অনুরূপভাবে, বহু বিধবা ও অসহায় নারীকে সেলাই মেশিন বিতরণ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ভ্রাম্যমাণ মুদি দোকানের ব্যবস্থা করে দিয়ে তিনি তাদের সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তার এই সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা অনেক পরিবারকে দারিদ্র্যের চরম কষাঘাত থেকে মুক্তি দিয়েছে।
উষ্ণতার ফেরিওয়ালা ও ছিন্নমূলের আশ্রয়
শীতের কনকনে ঠান্ডায় যখন সাধারণ মানুষ লেপ-কম্বলের ওমে ওম খোঁজে, তখন ঢাকার ফুটপাতে বা রেললাইনে শুয়ে থাকা ছিন্নমূল মানুষের কষ্ট দোলনকে ঘুমাতে দেয় না। প্রতি বছর শীতকালে তিনি গভীর রাতে চাদর বা কম্বল কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন শহরের অলিতে-গলিতে। ঘুমে মগ্ন থাকা কোনো শীতার্ত বৃদ্ধ বা শিশুর গায়ে আলতো করে কম্বলটি জড়িয়ে দিয়ে তিনি নীরবে চলে যান। প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে এই যে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, এটাই তাকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন উৎসবে বা করোনাকালীন দুর্যোগের সময়ে ছিন্নমূল মানুষের মাঝে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ ও জরুরি ওষুধ সরবরাহ করার কাজেও দোলন ছিলেন সর্বদা অগ্রগামী।
পেশাগত দায়িত্ব ও মানবিকতার অপূর্ব সমন্বয়
অনেকেই মনে করতে পারেন, পুলিশের মতো একটি সার্বক্ষণিক ও চাপযুক্ত চাকরিতে থেকে কীভাবে এত বড় সামাজিক কাজ পরিচালনা করা সম্ভব? দোলনের জীবন এই প্রশ্নের সবচেয়ে বড় উত্তর। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সদিচ্ছা থাকলে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশিও সমাজের জন্য অসামান্য অবদান রাখা যায়। তিনি কখনো তার ওপর অর্পিত সরকারি দায়িত্বে অবহেলা করেননি। বরং, দিনের বা রাতের ডিউটি যথাযথভাবে শেষ করে তার পর যে অবসর সময়টুকু পেতেন, তা তিনি ঘুমিয়ে বা বিনোদনে না কাটিয়ে ব্যয় করতেন সুবিধাবঞ্চিতদের কল্যাণে। তার এই নিষ্ঠা ও সততা দেখে তার ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারাও তাকে বিভিন্ন সময়ে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন।
প্রচারবিমুখ এক নিঃস্বার্থ যোদ্ধা
বর্তমান যুগে সামান্য ভালো কাজ করেই যেখানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারের ঝড় তোলার প্রতিযোগিতা চলে, সেখানে দোলন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তিনি তার কাজের কোনো ঢাকঢোল পেটান না। বিভিন্ন সময়ে দেশের মূলধারার গণমাধ্যমে তার এই মানবিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর সাধারণ মানুষ এই নীরব নায়কের খোঁজ পায়। এই প্রচারের ফলে তার কাজের পরিধি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, কারণ অনেক সহৃদয় ব্যক্তি এখন তার এই মানবিক উদ্যোগে শামিল হতে এগিয়ে আসছেন।