× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রম্যগল্প

যাপিত জীবন

সাঈদ বারী

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

অলংকরণ: ফারজানা ফাহিম

অলংকরণ: ফারজানা ফাহিম

ঈদের ছুটির মধ্যে জেসমিন একদিন বলল, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সে তার দুই বান্ধবী নিয়ে একটি ডে-আউটিংয়ে যাবে।

আমি বললাম, ‘বেশ তো, নিশ্চিন্তে যাও। ঘুরো, আড্ডা দাও, ছবি তোলো, ভালো খাওয়াদাওয়া করো। তবে একটা ছোট্ট অনুরোধ আছে’।

জেসমীন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী অনুরোধ?’

আমি বললাম, ‘দোহাই লাগে, তোমরা যা-ই করো না কেন, সারা দিনের আড্ডা-গল্পে নিজেদের হাসবেন্ডদের বদনাম করো না! পৃথিবীর সব স্বামীর প্রতিনিধি হিসেবে এই আবেদনটুকু রইল’।

আমার কথা শুনে জেসমীন হেসে ফেলল, ‘আচ্ছা, চেষ্টা করব। তবে কোনো গ্যারান্টি দিতে পারছি না!’

তখন বুঝলাম, বিপদ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। কারণ নারী বিশেষ করে স্ত্রীদের আড্ডা যখন জমে ওঠে, তখন পৃথিবীর অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, এমনকি মহাকাশ গবেষণাও আলোচনার বাইরে চলে যেতে পারে; কিন্তু স্বামী নামক প্রাণীটি কোনো না কোনোভাবে আলোচনার টেবিলে চলে আসবেই।

তবু আশায় বুক বাঁধি। হয়তো সেদিন তারা পুরনো স্মৃতি নিয়ে গল্প করবে, সন্তানদের নিয়ে কথা বলবে, স্কুল-কলেজ-ভার্সিটি জীবনের মজার ঘটনা মনে করবে, কিংবা ভবিষ্যতের নানা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করবে। শুধু বেচারা স্বামীদের নামে যেন কোনো বিশেষ অধিবেশন না বসে!

কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে, এমন আশা করা অনেকটা মেঘ দেখে রোদ খোঁজার মতো। তাই জেসমীন বের হওয়ার আগে আবারও স্মরণ করিয়ে দিলাম, ‘দেখো, আড্ডা দিও, আনন্দ করো, মন খুলে হাসো। শুধু আমাদের বদনামের খাতাটা সেদিন একটু বন্ধ রেখো!’

সে শুধু মুচকি হেসে উত্তর দিল। আর সেই হাসির অর্থ উদ্ধার করার ক্ষমতা এখনও আমার হয়নি।

দুই. অন্যান্য দিনের মতোই আজও জেসমীন আমার বিরুদ্ধে একগাদা অভিযোগপত্র দাখিল করছিল। তার ভাষ্যমতে, আমি একজন নিরীহ, বোকাসোকা এবং পৃথিবীর সবচেয়ে সহজে ঠকে যাওয়া মানুষদের একজন। এমন একজন মানুষ, যাকে দেখে প্রতারক চক্রের সদস্যদেরও মায়া হওয়ার কথা, কিন্তু তারা মায়া না করে বরং নতুন উদ্যমে কাজে নেমে পড়ে।

জেসমীন বলল, ‘তোমাকে সবাই ঠকায়। বন্ধুবান্ধব ঠকায়, আত্মীয়স্বজন ঠকায়, রিকশাওয়ালা ঠকায়, এমনকি পাড়ার মুদি দোকানদার পর্যন্ত ঠকায়’।

আমি প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু জেসমীন তখন প্রসিকিউটরের ভঙ্গিতে একের পর এক প্রমাণ হাজির করতে লাগল।

‘এইতো সেদিন বাজারে গেল। দুই কেজি আপেল কিনে আনল। প্যাকেট খুলে দেখি, অর্ধেক আপেলই নরম। আরেকদিন মাছ কিনে আনল। মাছওয়ালা নাকি বলেছে টাটকা, আজই জালে ধরা পড়েছে। অথচ বাসায় আনার পর দেখা গেল-তারা অন্তত দুদিন আগেই ডাঙ্গায় উঠে পটোল তুলেছে!’

আমি চুপচাপ শুনছিলাম।

জেসমীন আরও উৎসাহ পেল।

‘আর ওজনে কম দেওয়ার কথা তো বাদই দিলাম। তোমার কাছে মনে হয় দোকানদারদের একটা বিশেষ তালিকা আছে। তারা সবাই ঠিক করে রেখেছে, এই লোকটা এলে পাঁচশ গ্রামের জায়গায় চারশ গ্রাম দিলেও বুঝবে না’।

আমি বললাম, ‘অতটা না’।

সে বলল, ‘ভাঙতি টাকা ফেরত দেওয়ার সময়ও দোকানদাররা নতুন চকচকে নোট কাউকে কাউকে দেয়, আর তোমাকে দেয় এমন একটা ছেঁড়া নোট, যেটা দেখে মনে হয় তিন প্রজন্ম ধরে মানুষের পকেট ঘুরে এখন অবসরের অপেক্ষায় আছে’।

আমি যুক্তি দেখাতে গেলাম, ‘আরে, সব সময় এমন হয় না।' জেসমীন বলল, 'হয়। তুমি শুধু বুঝতে পারো না’।

তার আত্মবিশ্বাস দেখে আমার মনে হলো, সে যদি আদালতে আইনজীবী হতো, তাহলে আমি ইতোমধ্যে যাবজ্জীবন সাজা পেয়ে যেতাম।

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, ‘আচ্ছা, তোমার কথার সঙ্গে একমত। আমি ঠকি। মানুষ আমাকে ঠকায়। বাজারে ঠকি, দোকানে ঠকি, ভাঙতি টাকায় ঠকি। এসব সত্যি’।

জেসমীন বিজয়ীর হাসি হাসল।

আমি বললাম, ‘তবে জীবনে একবার কিন্তু আমি ঠকিনি। বরং বেশ ভালোই জিতেছি’।

জেসমীন ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘সেটা আবার কখন? কোন জন্মে?’

আমি গম্ভীর মুখে বললাম, ‘তোমাকে পছন্দ করে বিয়ে করার সিদ্ধান্তে আমি কিন্তু ঠকিনি। বরং জীবনের সবচেয়ে বড় লাভটা সেখানেই হয়েছে। এখন তুমি বলো, আমি কি ঠকেছি?’

জেসমীন প্রথমে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তার মুখের কঠোরতা একটু একটু করে নরম হয়ে এলো। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল।

সে বলল, ‘বাদ দাও এসব’।

আমি বললাম, ‘না, উত্তরটা তো দিলে না’।

সে এবার আরও মুচকি হেসে বলল, ‘চা খাবে?’ ‘খাব’।

‘তাহলে চা করে আনি। তুমি বসো’।

এই বলে সে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।

আমি চুপচাপ বসে রইলাম। মনে হলো, পৃথিবীর সব বিতর্কের শেষ উত্তর হয়তো যুক্তি দিয়ে হয় না। কিছু কিছু বিতর্কের সবচেয়ে সুন্দর সমাপ্তি ঘটে এক কাপ চায়ের মধ্যে।

অবশ্য চা হাতে নিয়ে ফিরে আসার পর জেসমীন যদি আবার বলে, তাহলেও তুমি বোকাসোকা মানুষই আছো, তাহলে সেই যুক্তির বিরুদ্ধে আপিল করার কোনো আদালত আজও আবিষ্কার হয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা