গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
মৃত্যু উপত্যকা
শিবলী মোকতাদির
পথের দু’পাশে গোলাপ ফোটেনি কখনো
প্রেম নেই, পাঁচালি নেই, প্রীতিরসে নাস্তানাবুদ
প্রোপাগান্ডায় অভিশপ্ত এই পথ
বাংলা গানের সুরে পাকদণ্ডী বেয়ে নেমে আসো
আলিঙ্গন নয়,
আমাকে পাবে ব্রহ্মাণ্ডের চার মাত্রায়।
পরিণতি পরখ করে পাহাড়ে বেড়াতে যাবে
এই সূত্রে গলদ লুকিয়ে আছে
সোনার মতো ঝলকালেও, সোনার কেল্লা ভয়ংকর ভ্রাতৃঘাতী।
ত্রিমাত্রিক দেশের তিতকুটে বালক তুমি
এখানে অধ্যাপনার আর্টই হচ্ছে,
কাউকে চিন্তা না করিয়ে পণ্ডিত করে তোলা।
সৃজনী হও, বহুবর্ণী রঙিন ইশারায়
কালের সমন্বিত রূপে যোগ করো এক মাত্রা
যতই হাতছানি দিক গোল্ড রাশ, কাউবয়ের কৃপণতা
সামুদ্রিক ঘোড়া সে-ও জানে, ডেথ ভ্যালি যার অপর নাম!
দুমিনিট
তোফায়েল তফাজ্জল
ঊর্ধ্বাকাশ পড়ে পড়ে হেঁটে চলছো পথ
না তাকিয়ে নিচে, বামে-ডানে,
যে শাখায় বসা মারছো কুড়োল-করাত
দুমিনিট না ভেবে সেখানে?
সাধারণ চৈতন্যবোধের ঘোড়াটিকে
পাঠিয়ে দিয়েছো পাহাড়ের পাদদেশে?
সমরে গিয়েছো অমর হওয়ার জন্য,
অথচ অস্ত্রাদি ধরতেই গিয়েছো ফেঁসে?
দ্বিতীয় রূপায়ণ
শামীম হোসেন
ঝাঁ ঝাঁ রোদে নিজেকে আঁকতে চেয়েছিলাম
তুমি পাখির পালক এনে দিলে, সঙ্গে ষড়ঋতুর রঙ
রোদপোড়া তামাটে শরীরের ভাঁজ ফুটে উঠতেই
তুমি বললে, ‘থামো। নাভির রেখা ধরে
ধীরে ধীরে নিচে নামো।’
আমি পায়ের পাতার কাছে এসে থামলাম। মাটিগন্ধে
বুক ভরে শ্বাস নিয়ে তোমার দিকে তাকালাম
তোমার শরীরে ষড়ঋতুর রঙ, ঝড়ের আভা
ফাটা মাটির ক্যানভাসে
ছাইরঙা লম্বা হাত, রশিতে বাঁধা পা।
আমার বাবার কোনো ছবি নেই
সানি মহারথী
আমার বাবা ঘরে ফিরতেন, কখনও কখনও তার পায়ের সঙ্গে কয়েকটি অদেখা সিঁড়ি লেগে থাকত। রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে তিনি সেগুলো খুলে উঠানে রেখে দিতেন। সকালবেলা আমি দেখতে পেতাম আমার উচ্চতা অকারণে অনেকটা বদলে গেছে।
আমার বাবা এক ধরনের নীরবতা সংগ্রহ করতেন,
পুরনো ট্রাঙ্কের ভেতর ভাঁজ করে রাখা থাকত সেগুলো। কখনও কখনও সংসারে অভাব নামলে তিনি একটি নীরবতা বের করে আনতেন,
আর আশ্চর্যজনকভাবে সেদিন আমাদের ক্ষুধা একটু কম লাগত।
আমার বাবা আয়নার সামনে দাঁড়াতেন না। তিনি জানতেন প্রতিটি আয়না মানুষের কাছ থেকে একটু একটু ভবিষ্যৎ চুরি করে। তাই তিনি নিজের ভবিষ্যৎগুলো আমার জন্য জমিয়ে রাখতেন।
এক দিন দেখি বাবার ডান কাঁধে একটি জানালা গজিয়েছে।
সেই জানালা দিয়ে শীতকালের বহু দূরের বিকাল দেখা যায়।
আমি তখনও বুঝিনি,
একটি মানুষের শরীরে জন্ম নিতে পারে আরেকটি মায়ার শরীর।
আমার বাবা কখনও ঘুমের ভেতর স্বপ্ন দেখতেন না। স্বপ্নগুলো তার শরীরের বাইরে জন্মাত।
রাতে তারা এসে দরজার পাশে সারিবদ্ধ বসে থাকত। ভোরে বাবা বের হলে একটি-দুটি স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন,
বাকিগুলো আমার শৈশবে রেখে যেতেন।
আজকাল কানে আসে বাবার ভেতরে বহু দিন ধরে আটকে থাকা একটি বন্ধ দরজার ধীরে ধীরে খুলে যাওয়ার শব্দ।
বাবা নেই কত কত দিন তবু ক্রমাগত সে শব্দের আওয়াজ বাজতে থাকে কানের ভেতর, যেন খুলতে থাকে আমার নিজেরই বাবা হয়ে ওঠার নতুন দিগন্ত।
আমার বাবা যিনি নিজের সময়কে ধাতুর মতো গলিয়ে আমার নামের অক্ষরগুলো ঢালাই করেছিলেন
আমার সন্তান জন্মানোর সময় এক দিন হঠাৎ দেখি সেই বাবার ছায়ার ভেতর একটি ক্ষুদ্র কারখানা চালু হয়েছে।
সেখানে অদৃশ্য শ্রমিকরা রাতভর বাবার পুরনো ভঙ্গিগুলো তৈরি করে।
ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখি বাবার হাড়ের ভেতর
থেকে একটি শিশু জন্মেছে।
শিশুটি যখন প্রথম আমার আঙুল ধরল, পৃথিবীর নিচে চাপা পড়ে থাকা কয়েকটি পুরনো ঋতু নড়ে উঠল।
তখন বুঝলাম, বহু বছর আগে বাবা যে নীরবতাগুলো ট্রাঙ্কের ভেতর ভাঁজ করে রেখেছিলেন, সেগুলো আসলে এখনও শেষ হয়নি।
একটি নীরবতা আমার সন্তানের বুকের কাছে গিয়ে ধীরে ধীরে দোলনা হয়ে গেল।
আরেকটি নীরবতা আমার কণ্ঠের ভেতর বাসা বাঁধল, যাতে তাকে ডাকলে শব্দের চেয়ে বেশি নিরাপত্তায় দৌড়ে আসে।
আজকাল মাঝরাতে সন্তানের ঘুমন্ত মুখের পাশে বসলে দেখি বাবার সেই কাঁধের জানালাটি আমার শরীরেও গজাতে শুরু করেছে।
তবে জানালার ওপাশে এখন দূরের কোনো শীতের বিকাল নয়
একটি অদেখা মানুষ হেঁটে বেড়ায়,
তার পায়ের কাছে আমার সন্তানের আগামী বসন্তগুলো ছোট ছোট পশুর মতো ঘুমিয়ে থাকে
মাঝে মাঝে ঘুম ভাঙলে সে ফিরে তাকায়।
তার মুখ দেখা যায় না।
২১ জুন ২০২৬