আহমদ ছফার ‘অগ্রন্থিত’ রচনা
আহমদ ছফা
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ১ ঘণ্টা আগে
আহমদ ছফা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
সংগ্রহ ও ভূমিকা: মুহিত হাসান
বৃহদাকৃতির আট খণ্ডে আহমদ ছফার (৩০ জুন ১৯৪৩২৮ জুলাই ২০০১) রচনাবলি প্রকাশ পাবার পর পরবর্তীকালে প্রাপ্ত অগ্রন্থিত লেখাজোখা নিয়ে আরেকটি ‘উত্তরখণ্ড’ও বেরিয়েছে। তবু দেখা যাচ্ছে, এখনও তার কিছু রচনা গ্রন্থভুক্ত হয়নি। ছফার লেখা তেমনই অগ্রন্থিত দুটি বই আলোচনা পাঠকদের জন্য এখানে হাজির করা গেল। দুটি গ্রন্থালোচনাই প্রকাশ পেয়েছিল গত শতকের ষাটের দশকে, দৈনিক সংবাদ-এর সাপ্তাহিক সাময়িকীর ‘গ্রন্থ-পরিচিতি’ বিভাগে। যে দুটি বই নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন তার একটি সত্যেন সেনের অবিভক্ত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস সংক্রান্ত বই ‘অভিযাত্রী’ (১৯৬৯), আরেকটি হাসান আজিজুল হকের বহুল আলোচিত গল্পগ্রন্থ ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ (১৯৬৭)।
ষাটের দশকের দৈনিক সংবাদ ও এর সাহিত্য সাময়িকীর সঙ্গে ছফার লেখালেখির যে নিবিড় সংযোগ তৈরি হয়েছিল, তা বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাসের প্রেক্ষিতে সঙ্গত কারণেই গুরুত্ববহ। সেই সময়ের সংবাদকে আহমদ ছফা যে কতটা গুরুত্ব দিতেন তা তার নিজের বয়ানেও জানা যায়। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে অন্যসব পত্রিকায় ‘ইনভেস্ট করা’ বন্ধ করে দিলেও সংবাদ-এ তিনি টানা কয়েক বছর ধরে ‘বিপ্লবী লেখা’ লিখে গেছেন। এ দৈনিকের মর্যাদা ছফার কাছে ছিল অন্যরকম কেননা ‘তখন সংবাদ-এ খুব ভালো সাহিত্যপাতা বের হতো’ এবং রাজনৈতিক আদর্শের বিচারেও পত্রিকাটি ছিল তার মনমানসিকতার নিকটবর্তী। একুশ বছর বয়সে লেখা তার প্রথম উপন্যাস ‘সূর্য তুমি সাথী’-এর কিছু অংশ ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয় সংবাদ সাময়িকীতেই। ছফার একটি ব্যতিক্রমী রচনা ‘কর্ণফুলীর ধারে’ও সংবাদ সাময়িকীতে কয়েক কিস্তিতে প্রকাশ পায়। এ প্রসঙ্গে একটি সংশ্লিষ্ট কৌত‚ হলোদ্দীপক ঘটনারও উল্লেখ করা যায়; তখনকার ঢাকার ফিল্ম সোসাইটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি জামাল খান ছফার সঙ্গে রীতিমতো বাজিই ধরেছিলেন সূর্য তুমি সাথী যদি সংবাদ-এ প্রকাশ পায়, তাহলে তিনি ছফাকে পুরো একশ টাকা দেবেন। ছফা যথারীতি উপন্যাসের প্রথম কিস্তি জমা দিলেন ও সংবাদ সাময়িকীর তদানীন্তন বিভাগীয় সম্পাদক মনীষী রণেশ দাশগুপ্ত তা ছাপালেন। শুধু তা-ই নয়, পত্রিকা থেকে নানা কারণে সম্মানী দেওয়ার ব্যবস্থা তখন অপ্রতুল হলেও স্বয়ং রণেশ দাশগুপ্ত নিজের মাসিক ১১৭ টাকা বেতন থেকে উপন্যাসের সম্মানী বাবদ ২৭ টাকাও দিয়েছিলেন। এই ঘটনার পরও তিনি ‘নিজের থেকে অনেক টাকা’ অকাতরে ছফাকে দিয়ে গেছেন, কেননা সংবাদ-এর মালিকপক্ষ লেখকদের অর্থ প্রদানে সদয় ছিলেন না (আহমদ ছফার সাক্ষাৎকার সমগ্র, পৃষ্ঠা ২৯)। বলে রাখা ভালো, প্রথম প্রকাশের সময় পত্রস্থ বই-আলোচনা দুটির কোনো আলাদা শিরোনাম ছিল না।
হাসান আজিজুল হকের ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’
আলোচ্য গ্রন্থে স্থান পেয়েছে আটটি গল্প। সূচনাতেই নাম গল্পটির অধিষ্ঠান। এক হতভাগ্য বুড়ো বাবার নির্লজ্জ নির্মম প্রাণ ধারণের কাহিনী। মেয়ের সম্ভ্রম বিক্রি করে তাকে বেঁচে থাকতে হয়। গ্লানিকর জীবনের কুশ্রীতার মধ্যে বুড়ো আটকে আছে আগর্দান। কিন্তু বিবেকের নিঃশব্দ দহনের বিরতি নেই। চরম অসম্মানের সঙ্গে আপস করে বেঁচে থাকার নিষ্ঠুর দণ্ড ভোগ করতে হচ্ছে তাকে। গল্পের শেষে এসেছে একটি করবী গাছ। তার ফল খেয়ে আত্মহত্যা করার তীব্র ইচ্ছার ধ্বনিতে অসহায় জনকের ঘনীভূত দুঃখ বিস্মিত। ঘটনা সংস্থাপনের মধ্যে দেশবিভাগের বাস্তব সত্যটি গøসিঅরের মতো বর্তমান। এ পটভূমি পেছনে রেখে লেখা আরও দুটি গল্পকে কোল দিয়েছে আলোচ্য গ্রন্থটি। ‘পরবাসী’ গল্পটি জনৈক কিষাণের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার খণ্ড ইতিহাস। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, স্ত্রী-পুত্র এবং পাড়াপড়শিদের করুণমৃত্যুর জলছবি বুকে নিয়ে নতুন দেশে, নব জন্ম নিতে যাচ্ছে বশির। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, মনোবেদনায় সে কাতর, বিপদের ভয়ে সন্ত্রস্ত। পাকিস্তানের মাটিতে পা দিয়েছে অনেক দিনের পরে। রাতের বেলায় সে দেখে বোঁচকাবুঁচকি বেঁধে একজন মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে বশির যে দেশ থেকে আসছে সেদেশে যাচ্ছে। পরনের মোটা ধুতি জানিয়ে দিল সে হিন্দু। তার চোখের সামনে অর্ধদগ্ধ স্ত্রী, বুকে বল্লমবিদ্ধ শিশু এবং নিহত ওয়াজদ্দি চাচার মুখ মনে পড়ল। কুড়ালের এক আঘাতে সে লোকটাকে হত্যা করে। যেহেতু সে হিন্দু, সেও তারই মতো দেশ ছেড়ে যাচ্ছে। হত্যা করার পর মানুষটির চোখ-মুখের দিকে চেয়ে দেখে। পড়শি ওয়াজদ্দির মতো। সেও নিহত। অপরাধ মুসলমান। ‘মারী’ও একই পটভূমিকায় লেখা একটু ভিন্ন ধরনের গল্প। দেশবিভাগের দরুন রিফিউজিরা আসছে ও দেশ থেকে। সহায়হীন, সম্বলহীন, ক্ষুধা-তৃষ্ণায় প্রাণ ওষ্ঠাগত। সরকারি ব্যবস্থা অপ্রতুল, সরকার উদাসীন। মনুষ্যত্ব ধুলোয় লাঞ্ছিত। বিত্তবানেরা দাঁও মারার ফিকিরে মশগুল। করুণার শীর্ণ ধারা অবসিত। সব ছেড়ে আসা, সব ফেলে আসা মানুষগুলোকে করুণা করেছে মারী। গল্পটি তারই একটি ছবি।

‘সারা দুপুর’ গল্পে একটি কিশোর মনের ভাবনা, অনু-ভাবনা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কাঁকন তার নাম। বাবা আরেকটি স্ত্রীলোক নিয়ে বিদেশে উধাও। মা অন্যের প্রণয়াসক্তা। দাদু মরণের দিন গুনছে। বয়স্ক মানব-মানবীর জটিলতার জটাজাল একটি কিশোর মনকে চারদিক থেকে জড়িয়ে ধরছে। মনের নরম দাবি, আবদার, আশ্রয় খসে যাচ্ছে। কাঁকনের ঘা খাওয়া আহত অভিমান জীবনের কাছে মৃত্যুবর প্রার্থনা করছে। ‘অন্তর্গত নিষাদ’ একটি দুস্থ কেরানির কাহিনী। বেচারির বড় দুঃখের জীবন। স্বাচ্ছন্দ্য সচ্ছলতা কী জিনিস কোনোদিন চোখে দেখতে পারেনি। একদিন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে ফুলের গন্ধ নিল, কোকিলের ডাক শুনল। মনমতো সিনেমা দেখল। সিংহের স্মৃতি বুকে নিয়ে বাসায় এলো। সারা মাসের মাইনে দিয়ে বউয়ের জন্য শাড়ি কিনল, ছেলেমেয়ের বায়না মিটাল। রাতে স্ত্রীর সঙ্গে প্রেয়সীর মতো ব্যবহার করল এবং তার পরদিন করল আত্মহত্যা। ‘উটপাখী’, জনৈক লেখকের চেতনায় বিধৃত মৃত্যুবোধের বর্ণনা। জীবনের ফাঁক-ফাঁকির ফিরিস্তি। প্রেম-অপ্রেমের অসারতা। অন্তিমের উপলব্ধি দিয়ে চরাচর দেখার প্রয়াস। এ লেখকের এক ধরনের মানস উপলব্ধির ঘটনা এবং শব্দরূপ। ‘সুখের সন্ধানে’ মানুষের চিরন্তন সুখ অন্বেষণ প্রবৃত্তির বেদনাবিহ্বল ক্ষিপ্রমধুর চিত্র।
‘আমৃত্যু আজীবন’ দৈনন্দিন রোমাঞ্চহীন জীবন সংগ্রামের নিস্তেজ সৈনিক করমালীর পরাজয় এবং মৃত্যুর ধীর বিলম্বিত দৈবনিয়ন্ত্রিত কাহিনী। দৈবের প্রতীক হয়ে গোক্ষুর সাপটি এসেছে। সে ধলা বলদটিকে কেটে যায়। চাষের জমিতে জীবন্ত অমঙ্গলের মতো শুয়ে থাকে। সমস্ত গাঁয়ের লোক মিলেও মারতে পারে না। ও যেন তাদের ‘নেমেসিস’। তার হাত থেকে কারও মুক্তি নেই। চাষি করমালী বর্গা ভুঁই চষার আশায় নিজের শেষ জমিখণ্ডটুকু বেচে টাকা নিয়ে ঘরে ফিরতে পারে না। ভাগ্যদেবতা অলক্ষ্যে তার ওপর বজ্র ছুড়ে মারে। এ দুর্ভাগ্যের বোঝা বইতে হবে তার ছেলেকে। তারপর রক্তের ধারার মধ্য দিয়ে সঞ্চারিত হবে অনাগত বংশলতিকায়।
দৈনিক সংবাদ, ২৯ জুন ১৯৬৯
সত্যেন সেনের ‘অভিযাত্রী’
‘অভিযাত্রী’ গ্রন্থে শ্রী সত্যেন সেন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের কতক অনুক্ত অধ্যায় সতেজ সহজ সরল ভাষায় তুলে ধরেছেন। গ্রন্থটিতে স্থান পেয়েছে ষোলোটি কাহিনী। প্রতিটি সংক্ষিপ্ত আলেখ্যে লেখক আন্তরিকভাবে স্বদেশপ্রেমিক বীর-বীরাঙ্গনার স্বদেশসাধনা, ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং অবিচল আদর্শনিষ্ঠার উজ্জ্বল পরিচয়লিপি উৎকীর্ণ করেছেন।
বিষয় নির্বাচনে উদার দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন লেখক। অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের জলন্ত স্বদেশপ্রেম, কংগ্রেস খেলাফত আন্দোলনের কর্মীদের প্রগাঢ় আদর্শনিষ্ঠা, মার্কসবাদী বিপ্লবীদের অসাধারণ কষ্টসহিষ্ণুতা এবং সেসঙ্গে বর্ণনা করেছেন স্বদেশপ্রেমে নিবেদিত জীবন, ইতিহাসে লেখা হয়নি, হবে না যাদের নাম তেমনি সাধারণ মানব-মানবীর জীবনের অসাধারণ আত্মত্যাগের কাহিনী। সেবায়, ত্যাগে, সংগ্রামে, মমতায় তাদের সকলেই অনুপম। তাদেরই সাধনায় ইতিহাসের গতিপথ হয়েছে প্রসর।
গ্রন্থে বর্ণিত কাহিনীগুলো এক ছাঁচের, এক ধাঁচের হয়। কাহিনীতে কাহিনীতে মত-পথের বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু সবগুলোর সম্পর্কে একটি কথা সত্য গ্রন্থোক্ত সব বীর-বীরাঙ্গনার জীবন স্বদেশ স্বজাতির প্রেমে উৎসর্গীকৃত ছিল। দেশ জাতিকে তারা জ্ঞান, বুদ্ধি এবং আবেগের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসতেন। এই নিরেট খাদহীন ভালোবাসাই তাদেরকে অসাধ্যসাধনের প্রেরণা দিয়েছিল। আজকের যুগের মানুষ অতীতের বিপ্লবীদের ধ্যানধারণা এবং কর্মপদ্ধতির বিচার অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে করতে পারে। কিন্তু স্বদেশকে যারা যারা ভালোবাসতেন, স্বজাতির স্বাধীনতার বেদিমূলে যারা জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য নিবেদন করেছেন, তারা আমাদের শ্রদ্ধার পাত্র। তাদের সম্পর্কে বিস্মৃতির ঘোর যত শিগগির কাটে দেশ এবং জাতির পক্ষে ততই মঙ্গল।

১৯১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে পরিকল্পিত ব্যর্থ অভ্যুত্থানের কাহিনীটি বর্ণিত হয়েছে। গদর পার্টির নেতৃবৃন্দের অসাধারণ সংগঠন কৌশল, অস্ত্রবলে স্বদেশের স্বাধীনতা জেনে নেওয়ার দুর্ধর্ষ সংকল্প এবং ষড়যন্ত্রের কথা, ফেঁসে যাওয়ায় উদ্যোক্তাদের কীভাবে ফাঁসিকাষ্ঠে প্রাণ দিতে হয়েছে, ভিনদেশে নির্বাসিতের জীবনযাপন করতে হয়েছে সবকিছু লেখক অল্প কথায় ব্যক্ত করেছেন।
অগ্নিযুগের বিপ্লবী তরুণদের সম্পর্কে একটা কথা বাজারে প্রচলিত আছে যে, তারা কোনোরকমের পরিকল্পনা ছাড়াই দুয়েকটি বোমা-বন্দুকমাত্র সম্বল করে এদেশ থেকে ইংরেজ তাড়াতে পারবেন মনে করতেন। অভিযোগ কিছু অংশে যুক্তিসঙ্গত, তাতে দ্বিমতেরও অবকাশ নেই। কিন্তু তাদেরকে হ্রস্ব-দীর্ঘ জ্ঞানহীন, অকারণে প্রাণবলিদানে উৎসুক বেপরোয়া যুবক বলে মোহর মেরে দেওয়ার যে একটা প্রবণতা কোথাও কোথাও পরিলক্ষিত হয় এ সরলীকরণের মধ্যে উপযুক্ত বিচারবুদ্ধির অভাব রয়েছে। লেখক অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের দুয়েকটা টুকরো দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে তা স্পষ্ট করেছেন। এতে রয়েছে যশোরের বীর সন্তান বাঘা যতীন, ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের তিনজন তরুণ যুবক বিনয় বসু, সুধীর গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত যারা রাইটার্স বিল্ডিংয়ে আক্রমণ চালিয়ে স্বদেশবাসীর শ্রদ্ধা পেয়েছিলেন এবং ইংরেজ সরকারকে চমকে দিয়েছিলেন তাদেরই কাহিনী।
‘অভিযাত্রী’ গ্রন্থটিতে যে সকল মরণবিজয়ী দেশপ্রেমিক বীর-বীরাঙ্গনার কথা স্থান পেয়েছে, তারা কেউ কংগ্রেসের লোক, কেউ খেলাফতের, কেউ ফাঁসিকাষ্ঠে প্রাণ দিয়েছেন, কেউবা গেছেন দ্বীপান্তরে, কেউ কেউ মারা গেছেন, বেঁচে আছেন কেউ কেউ। কেউ মতাদর্শ পাল্টে মার্কসবাদে দীক্ষা নিয়ে শ্রমিক কৃষকের সংগঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন। তা ছাড়া গ্রন্থে স্থান পেয়েছে কতক বীর-বীরাঙ্গনার ত্যাগ, তিতিক্ষা এবং নীরব সহিষ্ণুতার কাহিনী। পড়তে পড়তে শ্রদ্ধায় মন আপনিই নুয়ে আসে। এ অগ্নিগর্ভ কথামালায় এমন কয়েকজন জীবিত আদর্শনিষ্ঠ পূর্ব বাংলার গণসংগ্রামে এখনও সক্রিয় বিপ্লবী পুরুষ মহিলার জীবনের ফেলে আসা সংগ্রামমুখর লোকচক্ষুর অন্তরালের অধ্যায় তুলে ধরেছেন। তার মধ্যে আছেন কৃষক সমিতির নেতা শ্রী জিতেন ঘোষ, সর্বজনশ্রদ্ধেয়া মনোরমা বসু (মাসীমা), বরিশালের বানারিপাড়ার কুমুদ গুহঠাকুরতা এবং দিনাজপুরের কমরেড গুরুদাস তালুকদার প্রমুখ।
শ্রী মাহাংগু বানিয়া, চারুবোন, আবদুল করিম গোলাম জিলানী, রাজা জুম্মন, জহিরুদ্দীন, মুস্তফা সাহেব, গণি মোল্লা এদের সকলেই আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ। তারা আদর্শনিষ্ঠা এবং আত্মত্যাগের যে জলন্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা আমাদের দেশের জনগণের ভাবী সংগ্রামের প্রেরণার উৎসস্থল হিসেবে চিহ্নিত হবে। যেকোনো দেশ, কোনো জাতি সে দৃষ্টান্তের জন্য গর্ব করতে পারে। তারা হিন্দু নয়, মুসলমান নয় তারা মানুষ, আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ ভাবী ইতিহাসের পথচারী, দৃঢ় তাদের পদক্ষেপ, বীরত্বব্যঞ্জক তাদের কণ্ঠস্বর, শতবর্ষের ওপারেও তার আবেদন ম্লান হওয়ার নয়।
শ্রী সত্যেন সেনের ভাষা সরল। সহজ কথা সহজভাবে বলতে তিনি জানেন। অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসের বেগ, আন্তরিকতা কোথাও লঘু করতে পারেনি। বর্ণনাভঙ্গি এতই হৃদয়গ্রাহী যে গ্রন্থোক্ত চরিত্রাবলির হৃদস্পন্দন আমাদের সংবেদনকে আলোকিত করে। বইটি পড়ে ব্যক্তিগতভাবে আমি লাভবান হয়েছি। এ উপলক্ষে শ্রী সত্যেন সেনকে শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।
দৈনিক সংবাদ, ২৮ ডিসেম্বর ১৯৬৯