× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার

এদেশে গদ্যচর্চা শুরু পশ্চিমা ধারণাকে অবলম্বন করে

ড. মো. আশরাফুর রহমান ভূঞা

প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৬ ১৪:৪০ পিএম

আপডেট : ২৬ জুন ২০২৬ ১৪:৪০ পিএম

 আল মুজাহিদী। প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল

আল মুজাহিদী। প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল

১৯ জুন ২০২৬ প্রয়াত হলেন মৃত্তিকালগ্ন কবি আল মুজাহিদী। বাংলা কবিতা রচয়িতাদের মধ্যে নানাবিধ কারণে তিনি একটা বিশেষ স্থান দখল করে আছেন। তিনি শুধু কবি নন, কবি নির্মাতা। প্রায় চার দশক দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী তিনি সম্পাদনা করেছেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা সাহিত্যের ভিত গড়ার এক নির্মোহ কারিগর তিনি।

১৯৪০ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার নারুচি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই কবি। ১৯৫৮ সালে এসএসসি ও ১৯৬০ সালে করটিয়া সাদত কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে তিনি চলে আসেন ঢাকায়। জগন্নাথ কলেজ থেকে স্নাতক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয় নিয়ে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। বাংলা সাহিত্যে অবদান রাখায় ২০০৩ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। এ ছাড়া জীবনানন্দ দাশ একাডেমি পুরস্কার, কবি জসীমউদ্‌দীন একাডেমি পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন একাডেমি পুরস্কারসহ নানাবিধ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেনে বরণ্যে এই কবি। তার উল্লেখ্যযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘হেমলকের পেয়ালা’, ‘যুদ্ধ নয় শান্তি, মৃত্তিকা অতি মৃত্তিকা, প্রিজন ভ্যান, ‘সন্ধ্যার বৃষ্টি’, ‘কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’র পাশাপাশি উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, শিশুতোষ গ্রন্থ ইত্যাদিও রচনা করেছেন। দৈনিক সংবাদ ও দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী নিয়ে গবেষণা করেছেন লেখক ও গবেষক ড. মো. আশরাফুর রহমান ভূঞা। ওই সময়ে কবির সঙ্গে সাহিত্য ও সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে আলাপ করেন গবেষক ড. মো. আশরাফুর রহমান ভূঞা। ২০০৮ সালের ১৮ নভেম্বর তিনি কবি আল মুজাহিদীর এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। সাক্ষাৎকারটি কবির জীবদ্দশায় কোথাও প্রকাশিত হয়নি। কবির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কবির সঙ্গে কথোপকথনের কিছু অংশ ধানসিড়ির পাঠকের কাছে তুলে ধরা হলো।

ড. মো. আশরাফুর রহমান ভূঞা: আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন? 

আল মুজাহিদী: ভালো আছি। বলুন কী কথা জানতে চান?

প্রশ্ন: দৈনিক পত্রিকা মূলত সংঘটিত ঘটনার বিবরণ বা সংবাদ বা তথ্য পাঠকদের কাছে তুলে ধরবে। সাহিত্য সাময়িকীর প্রয়োজন পড়ল কেন?

আল মুজাহিদী: দেখুন, এককথায় এর কোনো জবাব হয় না। আমরা পড়তে বা লিখতে শিখেছি কবে থেকে? সব মিলিয়ে একশ বছর হবে। কোম্পানি শাসনের পর বাংলাদেশ ব্রিটিশ রাজাধীন হলো। ব্রিটিশরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করল। বই রচনা করল। কেন? স্থায়ীভাবে এই দেশটাকে শাসন করার জন্য। 

আকাশে সূর্য থাকলে আলো প্রসারিত হবেই। শিক্ষাও তেমনি। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তারা শিক্ষিত হলেন। ফলে শিক্ষার সম্প্রসারণ প্রয়োজন এটা বুঝতে পারলেন। পড়ার বই বা পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি তারা সমাজ সংস্কারের জন্য কিছু গ্রন্থ রচনা করলেন। কিন্তু পাঠক তৈরির জন্য শুধু বিষয়ভিত্তিক গ্রন্থ রচনা যথেষ্ট নয়, এটা তারা অনুধাবন করে গল্পের অবতারণা করলেন। এরই ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মীর মোশাররফ হোসেন, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন প্রমুখের আবির্ভাব হলো। বস্তুত পশ্চিমা ধারণাকে অবলম্বন করে এদেশে গদ্যচর্চা শুরু হলো। গদ্যচর্চার অভিনবত্ব বাংলা কাব্য সাহিত্যকে প্রভাবিত করল প্রচণ্ডভাবে এবং আমাদের দীর্ঘদিনের প্রচলিত কাব্যচর্চায় গড়নে, বিষয়ে অলংকরণে নতুনত্ব লাভ করল। কবির কবিতা প্রকাশ না পেলে তো কবিতাই হয় না। অনুসন্ধান শুরু হলো মুদ্রণশালার। উনবিংশ বা বিংশ শতাব্দীতে মুদ্রণযন্ত্রের অপ্রতুলতা অজানা নয় কারোর। এ ছাড়া প্রকাশনার অর্থমূল্যও সামান্য নয়। অনিবার্যভাবে বহু কবি তার পাণ্ডুলিপি জনসমক্ষে প্রকাশ পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আজও এর খুব উন্নতি হয়েছে বলা যায় না। কিন্তু সুকুমার বৃত্তির চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। সাহিত্য পত্রিকার সীমিত পরিসর বিবেচনায় দৈনিক পত্রিকাগুলো প্রকাশনার বৈচিত্র্য আনতে সাহিত্য সাময়িকী প্রকাশ শুরু করে আমার ধারণা।

প্রশ্ন: আপনার সাহিত্য সম্পাদক হয়ে ওঠার গল্পটা যদি একটু বলতেন। 

আল মুজাহিদী: জীবন তো যাপন করতে হবে! প্রথাগত চাকরি তো করতে পারছি না। এটা আইয়ুব খানের প্রভাব। 

প্রশ্ন: একটু পরিষ্কার করলে ভালো হতো। 

আল মুজাহিদী: ’৬২-এর আন্দোলন থেকেই সক্রিয় ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছি। এই সময়ের সব ছাত্র নেতার সঙ্গেই আমার সম্পর্ক ছিল গভীর। ছয় দফার আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান আমার ধমনিতে বইছে। আইয়ুবকে বিতাড়িত করার পরই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম স্বাধীনতা অত্যাসন্ন। মুক্তিযুদ্ধ হলো। দেশ স্বাধীন হলো। মনও স্বাধীন। তাই চাকরি করা হলো না। 

প্রশ্ন: বিশ শতকের আশির দশকের দৈনিক ইত্তেফাক ও সংবাদ পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে লক্ষ করেছি দেশের প্রথিতযশা কবি-সাহিত্যিকদের পাশাপাশি অনেক নবীন কবি-লেখকও আপনার পাতায় লেখার সুযোগ পেয়েছেন। এক্ষেত্রে মান না যোগাযোগ কোনটা বিবেচনায় এসেছে? 

আল মুজাহিদী: দুটোই। শামসুর রাহমানের স্ট্যান্ডার্ড আপনি মাহমুদ শফিকের কাছে প্রত্যাশা করতে পারেন না। লিখতে থাকুক। টিকে গেলে টিকবে। 

প্রশ্ন: একটা ভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে চাই। 

আল মুজাহিদী: বলুন?

প্রশ্ন: গোটা আশির দশকে এরশাদ একটা স্বৈরাচারী শাসন চালাল। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে জাতীয় কবিতা পরিষদ গঠিত হলো। আমরা দেখলাম আপনার পত্রিকায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কবিতা প্রকাশ পেতে।

আল মুজাহিদী: জটিল বিষয়। রাজসভায় কবি থাকা নতুন কিছু নয়। আলাওল ছিল। আজকে আর একজন থাকলে ফিরাবেন কী করে? 

প্রশ্ন: আমরা দেখেছি সাহিত্য বরাবরই অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সমুন্নত রাখে। দৈনিক সংবাদ পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে ইসলামী ভাবধারার কবিতা প্রকাশ পেতে খুব একটা দেখিনি। কিন্তু আপনার পাতায় তা লক্ষ করেছি। 

আল মুজাহিদী: কী রকম? 

প্রশ্ন: যেমন সৈয়দ আলী আহসানের ‘তোমার অস্তিত্বের সুগন্ধি’ কবিতাটি। কবিতায় কবি তার আরাধ্য পাওয়ার আশায় উন্মুখÑ ‘তোমাকে আবিষ্কার করে/ একটি জয়োল্লাসকে বক্ষে লালন করবো চিরদিন।’

কিন্তু তার এই আরাধনা শেষ হয় না। তাই বলে হতোদ্যম নন কবি। তিনি বলে ওঠেনÑ ‘তুমি আমাকে শক্তি দাও/ বিপুল অন্ধকারে আমার হাত/ না দেখা গেলেও/ তোমার অস্তিত্বের সুগন্ধ/ আমাকে স্পর্শ করে।’ অথবা ইখতিয়ারউদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয় উপলক্ষে লেখা ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ কবিতাটি? 

আল মুজাহিদী: এটা আপনার মতামত হতে পারে। সৈয়দ আলী আহসান বা আল মাহমুদের নয়। মানুষ মাত্রই নশ্বর। কেউ যদি নান্দনিকভাবে তার ঈশ্বরকে স্মরণ করে আমাদের তো বাধা দেওয়ার কিছু থাকে না।

প্রশ্ন: এবার কবি আল মুজাহিদ সম্পর্কে কিছু জানতে চাই। 

আল মুজাহিদী: বলুন?

প্রশ্ন: ‘হে আমার অগ্নিদ্রোহী মৃত্তিকা, তুমি চিরকাল মুক্ত থাকো।’ কেনো?

আল মুজাহিদী: দেখুন, সভ্যতার অপরিহার্য অগ্রগতি রোধবার নয়। ব্যক্তির বিনাশ আছেÑ প্রজন্মের নয়। তাই এই লাল মাটিতে আমার উত্তর পুরুষ অবাধে বিচরণ করুকÑ এই স্বপ্ন আমি দেখতে পারি।

প্রশ্ন: আশির দশকের শেষের দিকে আপনার একটা কবিতা ছাপা হয় ‘সশস্ত্র ঈশ্বর’ নামে। এই নামকরণে একটা জঙ্গম ভাব অনুরণিত হয় না কি?

আল মুজাহিদী: না। কবি তার ঈশ্বরকে আমি কীভাবে দেখব, এটা নিতান্তই তার ব্যপার। আল্লাহ বা ঈশ্বর কেমন আমরা জানি? জানি না। ঈশ্বর কী করেন? প্রতিনিয়ত ভাঙেন আবার গড়েন।

প্রশ্ন: ‘জলপাই রঙের বেয়াড়া কবিতায় আমরা দেখি বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি উঠে এসেছে। আপনি বলছেন, ‘আমি উঠে দাঁড়ালাম/মাতৃ গহ্বর থেকে, উঠে দাঁড়ালাম শিরদাঁড়া টান করে।’ এটা একটু ব্যাখ্যা করবেন?

আল মুজাহিদী: কবিরা মানুষকে স্বপ্ন দেখায়। সাহস জোগায়। যুগে যুগে তাই হয়ে এসেছে। আমরাও এর বাইরে নই।

প্রশ্ন: একটা বিষয় লক্ষণীয়। আপনার কবিতাসমূহে অবয়ব একটু বড় কেন?

আল মুজাহিদী: এতে কবিতার গতি কি কমেছে মনে হয়। ভাব প্রকাশে পাঠকদের যতদূর নেওয়া যায় চেষ্টা করেছি। 

প্রশ্ন: আপনার শব্দচয়নে আমরা দেখছি একটা মিশ্রণ আছে। যেমন স্টিলথ বিনান, আগুনের ইউনিফর্ম, রাডার চোখ, ফ্রিজ শরীর। ইত্যাদি।

আল মুজাহিদী: শব্দ তো চলমান। পাঠক যা বুঝবে তাই লিখতে হবে। এটাই যুগের দাবি। 

প্রশ্ন: স্মৃতির ভেতরে আজও জেগে উঠে সেই কালো দিন, বাতাস বারুদে অন্ধ, আকাশ হয়েছে রক্তে নীল।

যেখানে সবুজ ছিল, ছিল কত শিশুর কলতান, নিমেষেই পুড়ে ছাই মানুষের স্বপ্ন আর প্রাণ।

বুঝতে পারছেন আমি ‘কাঁদো হিরোশিমা আজ কাঁদো তবে নাগাসাকির কথা বলছি। যদি একটু বলতেন। 

আল মুজাহিদী: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এখনও প্রাসঙ্গিক। সেই যুদ্ধের স্মৃতি এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে। কবিরা মানবতার ধ্বংসযজ্ঞের এই ভয়াবহতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দেবেÑ এটাই বিবেকের তাড়না। কেবল আমি নই, অনেকেই এই যুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন, লিখছেন, লিখবেন।

প্রশ্ন: সমসাময়িক অনেক কবি আপনার সান্নিধ্যে এসেছেন। বলা হয় উত্তরÑ আধুনিকতা বর্তমান কবিতাকে দুর্বোধ্য করে তুলছে। এই প্রজন্মের কবিদের মধ্যে এই উত্তর-আধুনিকতা প্রভাব কেমন দেখছেন? 

আল মুজাহিদী: দেখুন পশ্চিমা বুর্জোয়া চেতনা পৃথিবীর সামগ্রিক সমাজব্যবস্থাকে এখন আচ্ছন্ন করে রেখেছে। মানবতাবাদ সামষ্টিক জনগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হচ্ছে। একটা অস্থিরতা চারপাশকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে মনে হয়। নবীন কবিদের মধ্যে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। মূল বিষয়টি হলো জানা। জানতে হলে পড়তে হবে ইতিহাস। শিকড়কে জানতে হবে। তবেই কবিতা আসল স্বরূপ খুঁজে পাবে। সেটা যেই ফর্মেই হোক। কবিতা মানুষের জন্য। মানুষ কবিতা বুঝবে এভাবেই লিখতে হবে।

প্রশ্ন: ধন্যবাদ আপনাকে। শেষ প্রশ্ন। কেমন আগামী দেখতে চান?

আল মুজাহিদী: একই কথা। 

হে আমার পিতৃভূমি, তোমার অস্তিত্ব এবং অস্তিত্বের সমগ্রতায় আমি অস্তিমান।

প্রশ্ন: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। 

আল মুজাহিদী: আপনাকেও ধন্যবাদ।


১৯ জুন ২০২৬ প্রয়াত হলেন মৃত্তিকালগ্ন কবি আল মুজাহিদী। বাংলা কবিতা রচয়িতাদের মধ্যে নানাবিধ কারণে তিনি একটা বিশেষ স্থান দখল করে আছেন। তিনি শুধু কবি নন, কবি নির্মাতা। প্রায় চার দশক দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী তিনি সম্পাদনা করেছেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা সাহিত্যের ভিত গড়ার এক নির্মোহ কারিগর তিনি।

১৯৪০ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার নারুচি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই কবি। ১৯৫৮ সালে এসএসসি ও ১৯৬০ সালে করটিয়া সাদত কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে তিনি চলে আসেন ঢাকায়। জগন্নাথ কলেজ থেকে স্নাতক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয় নিয়ে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। বাংলা সাহিত্যে অবদান রাখায় ২০০৩ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। এ ছাড়া জীবনানন্দ দাশ একাডেমি পুরস্কার, কবি জসীমউদ্‌দীন একাডেমি পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন একাডেমি পুরস্কারসহ নানাবিধ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেনে বরণ্যে এই কবি। তার উল্লেখ্যযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘হেমলকের পেয়ালা’, ‘যুদ্ধ নয় শান্তি, মৃত্তিকা অতি মৃত্তিকা, প্রিজন ভ্যান, ‘সন্ধ্যার বৃষ্টি’, ‘কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’র পাশাপাশি উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, শিশুতোষ গ্রন্থ ইত্যাদিও রচনা করেছেন। দৈনিক সংবাদ ও দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী নিয়ে গবেষণা করেছেন লেখক ও গবেষক ড. মো. আশরাফুর রহমান ভূঞা। ওই সময়ে কবির সঙ্গে সাহিত্য ও সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে আলাপ করেন গবেষক ড. মো. আশরাফুর রহমান ভূঞা। ২০০৮ সালের ১৮ নভেম্বর তিনি কবি আল মুজাহিদীর এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। সাক্ষাৎকারটি কবির জীবদ্দশায় কোথাও প্রকাশিত হয়নি। কবির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কবির সঙ্গে কথোপকথনের কিছু অংশ ধানসিড়ির পাঠকের কাছে তুলে ধরা হলো।

ড. মো. আশরাফুর রহমান ভূঞা: আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন? 

আল মুজাহিদী: ভালো আছি। বলুন কী কথা জানতে চান?

প্রশ্ন: দৈনিক পত্রিকা মূলত সংঘটিত ঘটনার বিবরণ বা সংবাদ বা তথ্য পাঠকদের কাছে তুলে ধরবে। সাহিত্য সাময়িকীর প্রয়োজন পড়ল কেন?

আল মুজাহিদী: দেখুন, এককথায় এর কোনো জবাব হয় না। আমরা পড়তে বা লিখতে শিখেছি কবে থেকে? সব মিলিয়ে একশ বছর হবে। কোম্পানি শাসনের পর বাংলাদেশ ব্রিটিশ রাজাধীন হলো। ব্রিটিশরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করল। বই রচনা করল। কেন? স্থায়ীভাবে এই দেশটাকে শাসন করার জন্য। 

আকাশে সূর্য থাকলে আলো প্রসারিত হবেই। শিক্ষাও তেমনি। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তারা শিক্ষিত হলেন। ফলে শিক্ষার সম্প্রসারণ প্রয়োজন এটা বুঝতে পারলেন। পড়ার বই বা পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি তারা সমাজ সংস্কারের জন্য কিছু গ্রন্থ রচনা করলেন। কিন্তু পাঠক তৈরির জন্য শুধু বিষয়ভিত্তিক গ্রন্থ রচনা যথেষ্ট নয়, এটা তারা অনুধাবন করে গল্পের অবতারণা করলেন। এরই ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মীর মোশাররফ হোসেন, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন প্রমুখের আবির্ভাব হলো। বস্তুত পশ্চিমা ধারণাকে অবলম্বন করে এদেশে গদ্যচর্চা শুরু হলো। গদ্যচর্চার অভিনবত্ব বাংলা কাব্য সাহিত্যকে প্রভাবিত করল প্রচণ্ডভাবে এবং আমাদের দীর্ঘদিনের প্রচলিত কাব্যচর্চায় গড়নে, বিষয়ে অলংকরণে নতুনত্ব লাভ করল। কবির কবিতা প্রকাশ না পেলে তো কবিতাই হয় না। অনুসন্ধান শুরু হলো মুদ্রণশালার। উনবিংশ বা বিংশ শতাব্দীতে মুদ্রণযন্ত্রের অপ্রতুলতা অজানা নয় কারোর। এ ছাড়া প্রকাশনার অর্থমূল্যও সামান্য নয়। অনিবার্যভাবে বহু কবি তার পাণ্ডুলিপি জনসমক্ষে প্রকাশ পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আজও এর খুব উন্নতি হয়েছে বলা যায় না। কিন্তু সুকুমার বৃত্তির চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। সাহিত্য পত্রিকার সীমিত পরিসর বিবেচনায় দৈনিক পত্রিকাগুলো প্রকাশনার বৈচিত্র্য আনতে সাহিত্য সাময়িকী প্রকাশ শুরু করে আমার ধারণা।

প্রশ্ন: আপনার সাহিত্য সম্পাদক হয়ে ওঠার গল্পটা যদি একটু বলতেন। 

আল মুজাহিদী: জীবন তো যাপন করতে হবে! প্রথাগত চাকরি তো করতে পারছি না। এটা আইয়ুব খানের প্রভাব। 

প্রশ্ন: একটু পরিষ্কার করলে ভালো হতো। 

আল মুজাহিদী: ’৬২-এর আন্দোলন থেকেই সক্রিয় ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছি। এই সময়ের সব ছাত্র নেতার সঙ্গেই আমার সম্পর্ক ছিল গভীর। ছয় দফার আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান আমার ধমনিতে বইছে। আইয়ুবকে বিতাড়িত করার পরই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম স্বাধীনতা অত্যাসন্ন। মুক্তিযুদ্ধ হলো। দেশ স্বাধীন হলো। মনও স্বাধীন। তাই চাকরি করা হলো না। 

প্রশ্ন: বিশ শতকের আশির দশকের দৈনিক ইত্তেফাক ও সংবাদ পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে লক্ষ করেছি দেশের প্রথিতযশা কবি-সাহিত্যিকদের পাশাপাশি অনেক নবীন কবি-লেখকও আপনার পাতায় লেখার সুযোগ পেয়েছেন। এক্ষেত্রে মান না যোগাযোগ কোনটা বিবেচনায় এসেছে? 

আল মুজাহিদী: দুটোই। শামসুর রাহমানের স্ট্যান্ডার্ড আপনি মাহমুদ শফিকের কাছে প্রত্যাশা করতে পারেন না। লিখতে থাকুক। টিকে গেলে টিকবে। 

প্রশ্ন: একটা ভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে চাই। 

আল মুজাহিদী: বলুন?

প্রশ্ন: গোটা আশির দশকে এরশাদ একটা স্বৈরাচারী শাসন চালাল। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে জাতীয় কবিতা পরিষদ গঠিত হলো। আমরা দেখলাম আপনার পত্রিকায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কবিতা প্রকাশ পেতে।

আল মুজাহিদী: জটিল বিষয়। রাজসভায় কবি থাকা নতুন কিছু নয়। আলাওল ছিল। আজকে আর একজন থাকলে ফিরাবেন কী করে? 

প্রশ্ন: আমরা দেখেছি সাহিত্য বরাবরই অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সমুন্নত রাখে। দৈনিক সংবাদ পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে ইসলামী ভাবধারার কবিতা প্রকাশ পেতে খুব একটা দেখিনি। কিন্তু আপনার পাতায় তা লক্ষ করেছি। 

আল মুজাহিদী: কী রকম? 

প্রশ্ন: যেমন সৈয়দ আলী আহসানের ‘তোমার অস্তিত্বের সুগন্ধি’ কবিতাটি। কবিতায় কবি তার আরাধ্য পাওয়ার আশায় উন্মুখÑ ‘তোমাকে আবিষ্কার করে/ একটি জয়োল্লাসকে বক্ষে লালন করবো চিরদিন।’

কিন্তু তার এই আরাধনা শেষ হয় না। তাই বলে হতোদ্যম নন কবি। তিনি বলে ওঠেনÑ ‘তুমি আমাকে শক্তি দাও/ বিপুল অন্ধকারে আমার হাত/ না দেখা গেলেও/ তোমার অস্তিত্বের সুগন্ধ/ আমাকে স্পর্শ করে।’ অথবা ইখতিয়ারউদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয় উপলক্ষে লেখা ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ কবিতাটি? 

আল মুজাহিদী: এটা আপনার মতামত হতে পারে। সৈয়দ আলী আহসান বা আল মাহমুদের নয়। মানুষ মাত্রই নশ্বর। কেউ যদি নান্দনিকভাবে তার ঈশ্বরকে স্মরণ করে আমাদের তো বাধা দেওয়ার কিছু থাকে না।

প্রশ্ন: এবার কবি আল মুজাহিদ সম্পর্কে কিছু জানতে চাই। 

আল মুজাহিদী: বলুন?

প্রশ্ন: ‘হে আমার অগ্নিদ্রোহী মৃত্তিকা, তুমি চিরকাল মুক্ত থাকো।’ কেনো?

আল মুজাহিদী: দেখুন, সভ্যতার অপরিহার্য অগ্রগতি রোধবার নয়। ব্যক্তির বিনাশ আছেÑ প্রজন্মের নয়। তাই এই লাল মাটিতে আমার উত্তর পুরুষ অবাধে বিচরণ করুকÑ এই স্বপ্ন আমি দেখতে পারি।

প্রশ্ন: আশির দশকের শেষের দিকে আপনার একটা কবিতা ছাপা হয় ‘সশস্ত্র ঈশ্বর’ নামে। এই নামকরণে একটা জঙ্গম ভাব অনুরণিত হয় না কি?

আল মুজাহিদী: না। কবি তার ঈশ্বরকে আমি কীভাবে দেখব, এটা নিতান্তই তার ব্যপার। আল্লাহ বা ঈশ্বর কেমন আমরা জানি? জানি না। ঈশ্বর কী করেন? প্রতিনিয়ত ভাঙেন আবার গড়েন।

প্রশ্ন: ‘জলপাই রঙের বেয়াড়া কবিতায় আমরা দেখি বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি উঠে এসেছে। আপনি বলছেন, ‘আমি উঠে দাঁড়ালাম/মাতৃ গহ্বর থেকে, উঠে দাঁড়ালাম শিরদাঁড়া টান করে।’ এটা একটু ব্যাখ্যা করবেন?

আল মুজাহিদী: কবিরা মানুষকে স্বপ্ন দেখায়। সাহস জোগায়। যুগে যুগে তাই হয়ে এসেছে। আমরাও এর বাইরে নই।

প্রশ্ন: একটা বিষয় লক্ষণীয়। আপনার কবিতাসমূহে অবয়ব একটু বড় কেন?

আল মুজাহিদী: এতে কবিতার গতি কি কমেছে মনে হয়। ভাব প্রকাশে পাঠকদের যতদূর নেওয়া যায় চেষ্টা করেছি। 

প্রশ্ন: আপনার শব্দচয়নে আমরা দেখছি একটা মিশ্রণ আছে। যেমন স্টিলথ বিনান, আগুনের ইউনিফর্ম, রাডার চোখ, ফ্রিজ শরীর। ইত্যাদি।

আল মুজাহিদী: শব্দ তো চলমান। পাঠক যা বুঝবে তাই লিখতে হবে। এটাই যুগের দাবি। 

প্রশ্ন: স্মৃতির ভেতরে আজও জেগে উঠে সেই কালো দিন, বাতাস বারুদে অন্ধ, আকাশ হয়েছে রক্তে নীল।

যেখানে সবুজ ছিল, ছিল কত শিশুর কলতান, নিমেষেই পুড়ে ছাই মানুষের স্বপ্ন আর প্রাণ।

বুঝতে পারছেন আমি ‘কাঁদো হিরোশিমা আজ কাঁদো তবে নাগাসাকির কথা বলছি। যদি একটু বলতেন। 

আল মুজাহিদী: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এখনও প্রাসঙ্গিক। সেই যুদ্ধের স্মৃতি এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে। কবিরা মানবতার ধ্বংসযজ্ঞের এই ভয়াবহতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দেবেÑ এটাই বিবেকের তাড়না। কেবল আমি নই, অনেকেই এই যুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন, লিখছেন, লিখবেন।

প্রশ্ন: সমসাময়িক অনেক কবি আপনার সান্নিধ্যে এসেছেন। বলা হয় উত্তরÑ আধুনিকতা বর্তমান কবিতাকে দুর্বোধ্য করে তুলছে। এই প্রজন্মের কবিদের মধ্যে এই উত্তর-আধুনিকতা প্রভাব কেমন দেখছেন? 

আল মুজাহিদী: দেখুন পশ্চিমা বুর্জোয়া চেতনা পৃথিবীর সামগ্রিক সমাজব্যবস্থাকে এখন আচ্ছন্ন করে রেখেছে। মানবতাবাদ সামষ্টিক জনগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হচ্ছে। একটা অস্থিরতা চারপাশকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে মনে হয়। নবীন কবিদের মধ্যে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। মূল বিষয়টি হলো জানা। জানতে হলে পড়তে হবে ইতিহাস। শিকড়কে জানতে হবে। তবেই কবিতা আসল স্বরূপ খুঁজে পাবে। সেটা যেই ফর্মেই হোক। কবিতা মানুষের জন্য। মানুষ কবিতা বুঝবে এভাবেই লিখতে হবে।

প্রশ্ন: ধন্যবাদ আপনাকে। শেষ প্রশ্ন। কেমন আগামী দেখতে চান?

আল মুজাহিদী: একই কথা। 

হে আমার পিতৃভূমি, তোমার অস্তিত্ব এবং অস্তিত্বের সমগ্রতায় আমি অস্তিমান।

প্রশ্ন: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। 

আল মুজাহিদী: আপনাকেও ধন্যবাদ।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা