× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মৃত্তিকার কবি আল মুজাহিদী

কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতি ও কবিতার কথা

শাহেদ কায়েস

প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ১ ঘণ্টা আগে

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

চলে গেলেন ‘হেমলকের পেয়ালা’র কবি আল মুজাহিদী। স্মৃতিরা একে একে ভিড় জমাচ্ছেÑ ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদকের সেই কক্ষ, রামকৃষ্ণ মিশন রোডের বাসা, ললাটির পথ, কলেজ স্ট্রিটের আকস্মিক সাক্ষাৎ কিংবা শেষ জীবনের ক্লান্ত শরীরÑ সবকিছু যেন এক অদ্ভুত বিষণ্ন আলোয় ভেসে উঠছে।

১৯৮৮ সালে লেখালেখির সূত্রে তার সঙ্গে আমার পরিচয়। তখন আমি এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। বয়সে অনেক ছোট হওয়া সত্ত্বেও তিনি আমাকে আপন করে নিয়েছিলেন। রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রশ্নে আমাদের অবস্থান এক ছিল না। রাজনৈতিক বিশ্বাসে আমাদের মধ্যে দূরত্ব থাকলেও মানবিক গুণাবলির দিক থেকে তিনি ছিলেন এক অনন্য মানুষ। ব্যক্তিজীবনে তার সততা, স্পষ্টভাষিতা এবং দৃঢ় আত্মমর্যাদাবোধ আমাকে সব সময় মুগ্ধ করেছে।

একসময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা আল মুজাহিদী পরবর্তীকালে নিজেকে পুরোপুরি সাহিত্যের জগতে সমর্পণ করেছিলেন। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে তিনি কাজ করেছেন। তার কক্ষটি ছিল যেন কবি-লেখকদের এক অনানুষ্ঠানিক আড্ডাঘর। সেখানে প্রায়ই যেতাম। সেই আড্ডাতেই কবি ত্রিদিব দস্তিদার, কবি রেজাউদ্দীন স্টালিন এবং গল্পকার হামিদ কায়সারের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়। তার কক্ষের সামনের চেয়ারগুলো প্রায় সব সময়ই ভরা থাকত। অনেকে দাঁড়িয়েও অপেক্ষা করতেন। কখনও কখনও এমনও হতো যে, তার সামনে উপস্থিত কবি-লেখকদের তিনি নিজেই নিজের লেখা কবিতা পাঠ করে শোনাতেন। তার গম্ভীর ও ভরাট কণ্ঠস্বর ছিল অসাধারণ; সম্পূর্ণ প্রমিত বাংলায় কথা বলতেন তিনি।

মুজাহিদী ভাইকে আমি সব সময় পাজামা-পাঞ্জাবি পরা অবস্থায় দেখেছি। শিরদাঁড়া সোজা রেখে মাথা উঁচু করে তার হাঁটার ভঙ্গি ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিত্বময়। তখন অনেকেই তাকে সমীহ করতেন, কেউ কেউ ভয়ও পেতেন। কিন্তু আমার মধ্যে কোনো ভয় কাজ করত না, সেই সময় আমি কিছুটা বেপরোয়া স্বভাবের ছিলাম। সাহিত্যের নানা বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে আমার বহুবার মতবিরোধ হয়েছে, তর্ক হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনও বিরক্ত হতেন না। বরং ধৈর্যের সঙ্গে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করে বোঝানোর চেষ্টা করতেন। ক্রমে মুজাহিদী ভাইয়ের সঙ্গে পারিবারিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

মুজাহিদী ভাইয়ের ছেলে শাবিবকে আমি পড়াতাম, সপ্তাহে তিন দিন রামকৃষ্ণ মিশন রোডের বাসায় যেতাম। ভাবি ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক মানুষ। তাদের ছোট মেয়ে পরমা তখন একেবারেই ছোট্ট, আমার প্রতি তার এমন অদ্ভুত এক টান জন্মেছিল যে, এক-দুই দিন না গেলেই কান্নাকাটি করতÑ ‘শাহেদ আঙ্কেল আসে না কেন?’ পরে মুজাহিদী ভাই পরমা আর আমাকে নিয়ে একটি শিশুতোষ গল্প লিখেছিলেন। গল্পের নাম ‘লালবাড়ি’।

একবার তিনি আমাদের সোনারগাঁয়ের ললাটি গ্রামে বেড়াতে এসেছিলেন। দুই দিন ছিলেন আমাদের বাড়িতে। তাকে নিয়ে পানামনগর, লোকজ জাদুঘর, শীতলক্ষ্যা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদ, লাঙ্গলবন্দ ঘুরেছি। ভীষণ আনন্দ পেয়েছিলেন তিনি। আমার আব্বা-আম্মাও তাকে খুব পছন্দ করতেন। আজ যখন আম্মাকে তার মৃত্যুসংবাদ দিলাম, শুনে তিনিও গভীরভাবে ব্যথিত হয়েছেন।

লিখতে বসে মুজাহিদী ভাইয়ের সঙ্গে অনেক স্মৃতির কথা মনে পড়ছে। তার অনুরোধ সত্ত্বেও আমি কোনোদিন ইত্তেফাকের সাহিত্য পাতার জন্য কবিতা দিইনি। তখন আমার মধ্যে প্রবল প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাব, দৈনিক পত্রিকায় কবিতা লিখব না, এমন মনস্থির করেছিলাম। সেই সময়ে যুক্ত ছিলাম লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের সঙ্গে। সাইমুম রাজুর সম্পাদনায় ‘সূচক’, সরকার আমিনের ‘মঙ্গলসন্ধ্যা’, মঈন চৌধুরীর ‘প্রান্ত’ এবং শামীম শাহানের ‘গ্রন্থি’তে নিয়মিত লিখতাম। পত্রিকায় ছাপতে না দিলেও নিজের কবিতা আমি তাকে শুনিয়েছি, তার কাছ থেকেও অসংখ্য কবিতা শুনেছিÑ কখনও ইত্তেফাক অফিসে, কখনও তার বাসায়।

নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে জাপানের একজন কবি ঢাকায় এসেছিলেন, এখন আর নামটা ঠিক মনে করতে পারছি না, ইউসু মুসুগুজু এই জাতীয় একটা নাম। তিনি উঠেছিলেন হোটেল শেরাটনে। মুজাহিদী ভাই আমাকে সঙ্গে নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। সেদিন হোটেলের লবিতে বসে দীর্ঘ সময় আলাপ হয়েছিল। সেই দিন মুজাহিদী ভাইয়ের ইংরেজি ভাষার ওপর দখল এবং পূর্ব এশিয়ার সাহিত্য সম্পর্কে তার বিস্তৃত পড়াশোনা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। তিনি খুব ভালো উর্দু জানতেন, তখন পার্শি ভাষা শিখছিলেন।

এরপর আমি দক্ষিণ ভারতের চেন্নাইয়ে পড়তে চলে যাই। দেশ-বিদেশের ব্যস্ততায় দীর্ঘদিন আর দেখা হয়নি। ১৯৯৭ সালের দিকে এক দিন কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে হাঁটছি। হঠাৎ দেখি পাজামা-পাঞ্জাবি পরা দীর্ঘদেহী একজন মানুষ দ্রুত হেঁটে যাচ্ছেন। চিনতে এক মুহূর্তও লাগেনি। আমি চিৎকার করে উঠলামÑ ‘মুজাহিদী ভাই!’ তিনি ফিরে তাকিয়ে আমাকে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন। সেদিন অনেকক্ষণ আড্ডা হয়েছিল।

এরপর আবার দীর্ঘ বিরতি। তার সঙ্গে আমার শেষ দেখা করোনার পর, ২০২২ সালে, কালের কণ্ঠ অফিসে। সেদিন আমি খায়রুল বাশার শামীম ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম, দেখি রিসেপশনের সামনে বসে আছেন। চিনতে কষ্ট হচ্ছিল। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শরীর ভেঙে পড়েছে, হাতে লাঠি। কিন্তু আমাকে দেখেই উঠে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর তার স্বভাবসুলভ প্রমিত বাংলায় বিরক্তি প্রকাশ করলেনÑ ‘দেখো, আমি আগে থেকেই জানিয়ে এসেছি, অথচ সম্পাদক আমাকে দুই ঘণ্টা বসিয়ে রেখেছেন।’ সেদিন তাকে দেখে মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল।

আল মুজাহিদী মূলত মৃত্তিকার কবিÑ এই দেশের মাটি, মানুষ, লোকজ জীবন ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যার গভীর আত্মিক সম্পর্ক ছিল। তার কাব্যে দেশপ্রেম কখনও স্লোগানে পরিণত হয়নি; বরং তা প্রকাশ পেয়েছে মানুষের প্রতি গভীর মমত্ব, মাটি ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং ইতিহাস-সচেতন এক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে। প্রেম তার কবিতায় কেবল ব্যক্তিগত আবেগের বিষয় নয়, অনেক সময় তা পরিণত হয়েছে অস্তিত্বের গভীর অন্বেষণে। আবার আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রেও তিনি কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় বোধের আশ্রয় নেননি; বরং মানুষের অন্তর্গত জগৎ, জীবন ও মৃত্যুর রহস্য এবং মহাবিশ্বের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে তিনি অনুসন্ধান করেছেন এক ধরনের অন্তর্মুখী সংবেদনশীলতার মধ্য দিয়ে। লোক-ঐতিহ্য, ইতিহাস, পুরাণ, প্রেম, আধ্যাত্মিকতা এবং মানুষের গভীর অস্তিত্ববোধÑ এই বহুমাত্রিক উপাদানগুলো তার কবিতায় এক অনন্য শিল্পভাষায় রূপ লাভ করেছে। শব্দ ও চিত্রকল্প ব্যবহারে তিনি ছিলেন সংযমী অথচ গভীরভাবে ব্যঞ্জনাময়। তার কবিতায় যেমন রয়েছে ব্যক্তিমানুষের নিঃসঙ্গতা, তেমনি আছে সমষ্টিগত স্মৃতি ও জাতিসত্তার অনুসন্ধান।

‘হেমলকের পেয়ালা’, ‘ধ্রুপদ ও টেরাকোটা’, ‘মৃত্তিকা অতি মৃত্তিকা’সহ অর্ধশতাধিক কাব্যগ্রন্থে তিনি গ্রিক পুরাণ, মৃত্তিকার আহ্বান এবং দেশপ্রেমকে এক অসাধারণ কাব্যভাষায় রূপ দিয়েছেন। তার একটি পঙক্তি আজ বারবার মনে পড়ছেÑ

‘হে আমার অগ্নিদ্রোহী মৃত্তিকা, তুমি চিরকাল মুক্ত থাকো।’

এই একটি পঙক্তিতেই যেন তার সমগ্র কাব্যজীবনের সারমর্ম নিহিত। মাটি, মানুষ এবং স্বাধীনতার প্রতি তার গভীর প্রেমেরই কাব্যিক উচ্চারণ এটি। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তার সাহিত্য ও সম্পাদনার প্রতিটি স্তরে গভীরভাবে উপস্থিত। 

দুঃখের বিষয়, সমকালীন বাংলা কবিতার আলোচনায় তার নামটি যতটা গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হওয়ার কথা ছিল, ততটা হয়নি। ষাটের দশকের কবিদের মধ্যে আল মুজাহিদীর যথাযথ মূল্যায়ন হয়েছে বলে আমার কখনোই মনে হয়নি। অথচ সমকালীন বাংলা কবিতায় তিনি ছিলেন এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর, যার কবিতার নিজস্ব একটি ভূগোল, নিজস্ব নন্দনচেতনা এবং আলাদা শিল্পভাষা আছে। বাংলা কবিতার ইতিহাসে তার অবদান আরও গভীর ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নের দাবি রাখে। 

আল মুজাহিদী চলে গেছেন। কিন্তু তার কবিতা, তার হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য লেখক, তার ব্যক্তিত্ব, তার স্নেহ এবং তার সেই ভরাট কণ্ঠস্বর আমাদের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে। বাংলা সাহিত্যের একটি দীপ্তিমান বাতিঘর নিভে গেল, কিন্তু মৃত্তিকার এই কবি তার সৃষ্টির ভেতর দিয়ে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকবেন। আজ তিনি ফিরে গেলেন সেই মৃত্তিকাতেই, যাকে তিনি সারা জীবন এত গভীরভাবে ভালোবেসেছিলেন।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা