আর্জেন্টিনার রূপকথা
ভাষান্তর : মৃত্যুঞ্জয় রায়
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
অলংকরণ : মেহেরুন্নিসা অষ্টম শ্রেণি, রানী নীহার দেবী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মানিকছড়ি, খাগড়াছড়ি
অনেক দিন আগের কথা। এক বনে বাস করত এক সজারু আর এক শিয়াল। ওদের ছিল ভারি বন্ধুত্ব। সারা দিন শুধু খেলা আর খেলা। বনের মধ্যে দুজনের বেশ আনন্দেই দিনগুলো কেটে যেত। এভাবেই ওদের বেশ চলছিল। কিন্তু সজারুর মনে হলো, এভাবে কেন সে সময় নষ্ট করছে? কিছু কাজ তো তার করা উচিত। যেই ভাবা সেই কাজ। সজারু সত্যি সত্যিই এক খণ্ড জমিতে খামার করবে বলে ঠিক করল। জমিটাকে খুব কষ্ট করে বেড়া দিয়ে ঘিরল। কিন্তু শিয়াল সজারুর এ কাজে মোটেই সন্তুষ্ট হলো না। বেড়া দিতে দেখে শিয়াল সজারুকে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন তুমি বেড়া দিচ্ছ বন্ধু?’ সে ভাবল, আহা সজারু যদি খামারে কাজ করে, তাহলে তার সাথে খেলবে কে?
শিয়াল বলল, ‘কেন কাজ করবে বন্ধু? কি দরকার তোমার? তারচেয়ে এসো আমরা এভাবে খেলাধুলা করে আনন্দেই দিনগুলো কাটিয়ে দিই।’ সজারু বলল, ‘ঘিরছি কারণ ওখানে আমি ফসল চাষ করব, ফসল বেচে টাকা আনব।’
শিয়াল খুব অবাক হলো তার কথা শুনে, ভাবল, কেন সজারু টাকা আয় করতে চাইছে? সে কি বনের মধ্যে সবচেয়ে ধনী আর বিখ্যাত হতে চাইছে? সে কি চাইছে যে বনের অন্য প্রাণীরা ওকে সমীহ করুক? শিয়ালের মনে সন্দেহ হলো। তাই সে সজারুর এসব কাজ দেখে মনে মনে এক ফন্দি আঁটল। তারও টাকা দরকার, সজারুর চেয়ে বেশি টাকা। তাই শিয়াল মনে মনে ঠিক করল, সবচেয়ে ভালো কাজ হবে তার বন্ধুর সঙ্গে কাজে নামা, তার ফসল চাষে বিনিয়োগ করা, চাষবাদে তাকেই খাটানো আর শেষে সে ফসলের সুফল ভোগ করা। এভাবে সে সজারুর চেয়ে বেশি টাকার মালিক হতে পারবে।
শিয়াল দেখে, খেত চষতে চষতে আর বেড়া দিতে দিতে তার বন্ধু ঘেমে উঠেছে। শিয়াল কাছে গিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে বলল, ‘আহারে বন্ধু, তুমি তো খেটেই মরে যাচ্ছ। কী যে কষ্ট করছ। কিন্তু তুমি তো জমি কিনে আর বেড়া দিয়েই সব টাকা ফুরিয়ে ফেলেছ। বীজ কিনবে কী দিয়ে? তার চেয়ে আমাকে সাথে নাও, আমি তোমাকে বীজের টাকা দেব।’
সজারু ভাবল, সত্যিই তো। আমার হাতে তো আর বীজ কেনার টাকা নেই। তাই শিয়ালের প্রস্তাবে সে রাজি হয়ে বলল, ‘ঠিক বলেছ বন্ধু। এই না হলে তুমি আমার সেরা বন্ধু? বিপদেই তো বন্ধুত্বের আসল পরিচয়। আহা, কী যে হতো আমার! তুমি না এলে আমার সব পরিশ্রম যে জলে যেত।’
শিয়াল ভাবল, ‘আহা! বোকাটা আমার ফাঁদে পা দিয়েছে।’ শিয়াল সজারুকে বলল, ‘ঠিক আছে বন্ধু, তাহলে মন দিয়ে শোন। আমি যা বলব তুমি তাই করবে, বুঝলে?’
সজারুটি মাথা নাড়তেই শিয়াল বলল, ‘তাহলে শোন, এই প্রথমবার মাটির নিচে যা জন্মাবে তা হবে তোমার, আর ওপরে যা জন্মাবে তা হবে আমার।’ লোভী শিয়ালের কথায় সজারু শঙ্কিত হয়ে উঠল, কিন্তু মুখে কিছু না বলে সায় দিল। মনে মনে বলল, ‘সে লাভ আমি কিছুতেই তাকে নিতে দেব না, লোভী শুয়োরটাকে একটা উচিত শিক্ষা দেব।’
পরদিন খুব ভোরে সজারু জমি চাষ দিয়ে বীজ বুনল। কিসের বীজ, বুঝতে পেরেছ? আলু! তা দেখে শিয়ালটার প্রচণ্ড রাগ হলো। যখন ফসল তোলা হলো তখন সব আলু চলে গেল সজারুর ঘরে, শিয়ালের জন্য পড়ে রইল গাছপাতা। সহজে হার মানতে শিয়ালটা রাজি না, বলল, ‘বন্ধু, এবার আমার ফসল খারাপ হয়েছে। পরের বার তুমি নেবে ওপরেরটা, আর আমি নেব মাটির নিচেরটা।’
সজারু যথারীতি এবার গম বুনল। চুক্তিমতো সজারু এবারও পেল গমের দানা, আর মাটির নিচের শিকড়-বাকড় পড়ে রইল শিয়ালের জন্য। শিয়াল এবারও ঠকল, রাগলেও কিছু বলতে পারল না।
এবার শিয়াল বলল, ‘বন্ধু, আমার কপালটা এবারও মন্দ। কিছুই পেলাম না, যা বিক্রি করে কিছ টাকা আনা যায়। তাই এবার ফসল চাষ করলে আমি নেব মাটির নিচের ও ওপরের অংশ, মাঝের অংশ নেবে তুমি।’ ভাবত, সজারু এবার কিসের চাষ করল? ভুট্টা। যখন ফসল উঠল, শিয়াল পেল মাটির নিচে ভুট্টাগাছের শিকড় আর গাছের মাথার পাতা। মাঝখানের অংশ থেকে ভুট্টার মোচা তুলে নিয়ে এলো সজারু। শিয়াল সজারুর ওপর এতটাই রেগে গেল যে, রাগে থুত ছিটিয়ে সে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল আর কান ধরে প্রতিজ্ঞা করল যে, আর কখনও সে সজারুর সাথে কাজ করবে না। তাতে সজারুর বয়েই গেল। এখন সজারুর কাছে অনেক টাকা, যা দিয়ে সে বীজ কিনতে পারবে, শিয়ালকে আর তার দরকারই হবে না।