সারাহ নাজ হায়দার প্রাণন
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
অলংকরণ : মেহেরুন্নিসা অষ্টম শ্রেণি, রানী নীহার দেবী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মানিকছড়ি, খাগড়াছড়ি
রিনথীর মন খারাপ। বন্ধু জয়ীর সাথে আজ সে আড়ি নিয়েছে। সামান্য কথাতেই রেগে যায় জয়ী। আর রিনথী তো একদম রাগ পছন্দ করে না। ‘রাগ করলে মানুষকে পচা দেখায়’ এটাই বলেছিল রিনথী। আর এতে করে জয়ী মনে করেছে রিনথী জয়ীকে বিশ্রী বলেছে। শিলা টিচারের বাংলা ক্লাসে জয়ী ওর নামে নালিশ করে বলেছে, রিনথী নাকি ওকে পেঁচা বলেছে। কেমন মিথ্যা কথা! টিচার অবশ্য পুরো গল্প শুনে জয়ীকে বলেছে, রিনথী তো ঠিক বলেছে মা। রাগ করা ভালো নয়। আর পেঁচাও যে বলেনি তা শুনে বলেছে ‘মিথ্যা কথা বলতে হয় না মা।’
এতে করেই আরও রেগে গেল জয়ী। আড়ি নিয়ে নিলো ওর সাথে। ওর খুব কান্না পাচ্ছে। ছুটির পর স্কুলের গেটের পাশে ও ড্রাইভার আঙ্কেলের জন্য অপেক্ষা করছিল। আশপাশে দু-তিনজন বড় ক্লাসের আপু আর ভাইয়ারা গল্প করছে। ছোটরা সবাই চলে গেছে। হঠাৎ ও দেখল গেটের পাশেই একটা ছোট্ট বিড়ালবাচ্চা। ও বাইরে এসে বিড়ালের বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই ও চোখ বন্ধ করে আদর নিতে লাগল। গত কয়েক মাস ধরেই রিনথী বাবা মায়ের কাছে একটা বিড়াল চাচ্ছিল। বাবা বলেছিল সঠিকভাবে যত্ন না নিতে পারলে বিড়ালের কষ্ট হবে। যত্ন নিতে শিখলে এনে দিবে। মা বলেছিল ক্লাস থ্রিতে উঠলেই এনে দেবে। রিনথী সাহস পাচ্ছে না ওকে বাসায় নেওয়ার। মা-বাবা দুজনই অফিসে এখন। মমতা খালা বাসায় আছে। মমতা খালা বহু বছর ধরে ওদের বাসায় থাকে। আশপাশে তাকায় রিনথী। কোথাও বিড়ালের বাচ্চাটার মাকে দেখা যাচ্ছে না। ড্রাইভার আঙ্কেল এসে দাঁড়ায় গেটে। রিনথীর হাতে বিড়ালের বাচ্চাটিকে দেখেই বলে, নামিয়ে দাও মা। দেরি হচ্ছে চলো। রিনথী বলে, ওকে নিয়ে যাব বাসায়। অনেক বুঝিয়েও ওকে রাজি করানো গেল না। ড্রাইভার আংকেল তখন আশপাশে বিড়ালের মা’ টাকে খুঁজলো কিছুক্ষণ। গেটের দারোয়ান চাচাও খুঁজলো। অবশেষে না পেয়ে রিনথীকে নিয়ে যেতে বলল। মহাখুশি সে।
ওকে নিয়ে বাসায় রওনা করল। পথেই রিনথী নাম ঠিক করে ফেললÑ তুনতুন। আদর করে হাত বুলিয়ে দিলেই শরীর এলিয়ে দিচ্ছে। ড্রাইভার আঙ্কেলের মতোই কিছুক্ষণ রাজি হলো না মমতা খালা ওকে বাসায় ঢোকাতে। রিনথী বললোÑ ‘প্লিজ প্লিজ খালা। তুমিই তো বাবা-মাকে রাজি করাবা। আমি আজ থেকে তোমার কথামতো সব খাবার খেয়ে নেব।’ আরও অনেকক্ষণ অনুনয়ের পর মমতা খালা কোলে করে নিল ওকে। তারপর দুধ বাটিতে এনে একটা ড্রপার দিয়ে ওর মুখের কাছে ধরতেই ও চুক চুক করে খেতে লাগল। মমতা খালা বলল, আহারে পেটে কত্তো খিদা। খাও গো ময়না, বেশি করে খাও। রিনথীকে ময়না করে ডেকে ডেকে অভ্যাস হয়ে গেছে বলে ময়না খালা একটা বিড়ালছানাকেও ময়না বলছে। ফিক করে হেসে ফেলে রিনথী।
এরপর তুনতুন শুধুই ঘুমাতো লাগল। রিনথী আজ তাড়াতাড়ি ওর সব হোমওয়ার্ক করে রাখল। মা-বাবা বাসায় ফিরে তুনতুনকে দেখে আর সব শুনে বলল, নিয়ে এসেছ যখন, তখন ভালোভাবে যত্ন নিতে হবে। রিনথীর সব ভয় কেটে মুহূর্তে মন আনন্দে ভরে উঠল। এক মাসের মধ্যেই তুনতুন বেশ বড় হয়ে গেল। ওকে ছাড়া ওদের কারোরই চলে না। সারাক্ষণ রিনথীর পাশে পাশে ঘুরে বেড়াবে। ও পড়তে বসলে তুনতুনকেও পড়তে হবে। বাবা ওর জন্য বড় বড় ছবিওয়ালা রঙিন বই নিয়ে এলো। প্রথম দিনই বইয়ের একটা অংশ খামচে নষ্ট করে দিলো। রিনথী খুব করে বকে দিল। তখন মাথা এলিয়ে শুয়ে পড়ল। যেন খুব মন খারাপ! স্কুলে জয়ীর সাথেও আবার বন্ধুত্ব হয়ে গেছে রিনথীর। ও বলেছে আর কখনও রিনথীর সাথে রেগে কথা বলবে না। একদিন জয়ীর মা-বাবা সহ জয়ী বেড়াতে এসে তুনতুনের বন্ধু হয়ে গেল।
মা-বাবা বাসায় ফিরলেই রিনথী আর তুনতুন একসাথে দৌড়ে গিয়ে মা-বাবাকে জড়িয়ে ধরে। এটা ওদের দুজনের কম্পিটিশন। যেন কে আগে ছুটে যেতে পারে! মা বাবাও দুজনকে খুব করে আদর করে। আগে রিনথীর খুব একা লাগত। এখন ওর একটুও একা লাগে না।
চতুর্থ শ্রেণি, সরকারি প্রমথনাথ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, রাজশাহী