সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা শিল্প
মো. আশরাফ উদ্দীন, সীতাকুণ্ড (চট্রগ্রাম)
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৬ ১৩:৩০ পিএম
আপডেট : ২৪ জুন ২০২৬ ১৩:৫২ পিএম
বাণিজ্য বাড়লেও কমছে শ্রমিকদের নিরাপত্তা
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে গড়ে ওঠা জাহাজ ভাঙা শিল্প আজ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভারী শিল্প খাতে পরিণত হয়েছে। দেশের নির্মাণ শিল্প, স্টিল উৎপাদন, পুনর্ব্যবহার, অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানের বড় অংশ এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ ও পুরনো জাহাজ এনে এখানে ভেঙে পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাঁচামালে রূপান্তর করা হয়। একসময় ছোট পরিসরে শুরু হওয়া এই শিল্প বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিপ রিসাইক্লিং অঞ্চলের স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
সীতাকুণ্ডের দীর্ঘ উপকূলজুড়ে গড়ে ওঠা শতাধিক শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখছে। দেশের রড ও স্টিল শিল্পের প্রধান কাঁচামাল আসে এই শিল্প থেকে পাওয়া স্ক্র্যাপ লোহা থেকে। শুধু তাই নয়, পুরনো জাহাজ থেকে পাওয়া বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, কেবল, বৈদ্যুতিক মোটর, জেনারেটর, আসবাবপত্র ও ধাতব উপাদান স্থানীয় বাজারে পুনর্ব্যবহার করা হয়। ফলে এই শিল্পকে কেন্দ্র করে একটি বিশাল পুনর্ব্যবহার অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। তবে অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি এই শিল্প ঘিরে রয়েছে নানা বিতর্ক ও চ্যালেঞ্জ। শ্রমিক নিরাপত্তাহীনতা, পরিবেশ দূষণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনা দীর্ঘদিন ধরে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং’ ধারণার মাধ্যমে শিল্পটিকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে বর্তমানে সীতাকুণ্ডের শিপ রিসাইক্লিং শিল্প একদিকে যেমন অর্থনীতির চালিকাশক্তি, অন্যদিকে তেমনি পরিবেশ ও মানবাধিকারের বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
সীতাকুণ্ড : ভৌগোলিক অবস্থান ও শিল্প গড়ে ওঠার পেছনের কারণ
চট্টগ্রাম জেলার উত্তরাংশে অবস্থিত সীতাকুণ্ড বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। ফৌজদারহাট থেকে কুমিরা পর্যন্ত বিস্তৃত উপকূল জুড়ে গড়ে উঠেছে দেশের প্রধান শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলো। এই অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য জাহাজ ভাঙা শিল্পের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় এখানে দ্রুত শিল্পটি বিকশিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীতাকুণ্ডে শিপ রিসাইক্লিং শিল্প গড়ে ওঠার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, উপকূলীয় এলাকা ঢালু হওয়ায় জোয়ারের সময় বিশাল জাহাজ সহজেই সৈকতে তুলে আনা যায়। দ্বিতীয়ত, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় পরিবহন ও যোগাযোগ সুবিধা সহজ হয়েছে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশে শ্রম ব্যয় তুলনামূলক কম হওয়ায় আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীরা এটিকে লাভজনক বাজার হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম অঞ্চলে আগে থেকেই স্টিল ও রি-রোলিং মিল থাকায় জাহাজ থেকে পাওয়া স্ক্র্যাপ সহজেই শিল্পকারখানায় ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে। এসব কারণ মিলিয়ে সীতাকুণ্ড ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিপ রিসাইক্লিং কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
একটি দুর্ঘটনা থেকে শিল্পের সূচনা
বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙা শিল্পের সূচনা ঘটে মূলত একটি দুর্ঘটনার মাধ্যমে। ১৯৬০-এর দশকে একটি গ্রিক জাহাজ ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে সীতাকুণ্ড উপকূলে আটকে যায়। পরে স্থানীয় মানুষ ও চট্টগ্রাম স্টিল মিলের শ্রমিকরা জাহাজটি কেটে লোহা সংগ্রহ শুরু করেন। সেই ঘটনাই পরবর্তীতে জাহাজ ভাঙা শিল্পের ভিত্তি তৈরি করে।
১৯৭০-এর দশকে বিদেশ থেকে পুরাতন জাহাজ আমদানি শুরু হয়। ধীরে ধীরে ব্যবসায়ীরা বুঝতে পারেন যে পুরনো জাহাজের স্টিল, কপার, যন্ত্রাংশ ও বিভিন্ন ধাতব উপাদান অত্যন্ত লাভজনকভাবে বিক্রি করা সম্ভব। ফলে বাণিজ্যিকভাবে জাহাজ ভাঙার কার্যক্রম দ্রুত সম্প্রসারিত হয়।
১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে শিল্পটি আরও বড় আকার ধারণ করে। দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন বাড়তে থাকায় স্টিল ও রডের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। সেই চাহিদা পূরণে সীতাকুণ্ডের শিপ ব্রেকিং শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে শুরু করে। কয়েক দশকের মধ্যেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শিপ রিসাইক্লিং বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে।
জাহাজ ভাঙার প্রক্রিয়া : বিচিং মেথডের বাস্তবতা
বাংলাদেশে অধিকাংশ জাহাজ ‘বিচিং মেথডে’ ভাঙা হয়। এই পদ্ধতিতে জোয়ারের সময় বিশাল জাহাজকে উপকূলের দিকে আনা হয় এবং সৈকতে আটকে দেওয়া হয়। এরপর শ্রমিকরা ধাপে ধাপে জাহাজ কেটে বিভিন্ন অংশ আলাদা করেন।
প্রথমে জাহাজের ভেতরের আসবাবপত্র, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ, তেল ও অন্যান্য উপকরণ সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর অক্সিজেন গ্যাস কাটার ব্যবহার করে বিশাল স্টিল প্লেট কাটা হয়। ভারী অংশগুলো ক্রেন ও ট্রাকের মাধ্যমে বিভিন্ন কারখানায় পাঠানো হয়।
উন্নত দেশগুলোতে আধুনিক ড্রাই ডক পদ্ধতিতে জাহাজ ভাঙা হলেও বাংলাদেশে এখনও বিচিং পদ্ধতি বেশি প্রচলিত। কারণ এতে খরচ কম হয়। তবে এই পদ্ধতিতে দুর্ঘটনা ও পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
অর্থনীতিতে বিশাল অবদান
সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। দেশের মোট স্টিল চাহিদার বড় অংশ এই শিল্প থেকে পাওয়া স্ক্র্যাপ লোহা দিয়ে পূরণ হয়। রড উৎপাদনকারী রি-রোলিং মিলগুলো মূলত জাহাজ থেকে পাওয়া স্টিল ব্যবহার করে।
বাংলাদেশের নির্মাণ শিল্পÑ যেমন বহুতল ভবন, সেতু, ফ্লাইওভার, কারখানা ও শিল্প এলাকা নির্মাণে ব্যবহৃত রডের বড় অংশ আসে এই শিল্প থেকে। ফলে নির্মাণ ব্যয় কম রাখতে শিপ ব্রেকিং শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
এ ছাড়া নতুন কাঁচামাল আমদানির প্রয়োজন কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়। পুরনো জাহাজ থেকে পাওয়া কপার, পাইপ, কেবল, মোটর, জেনারেটর ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ স্থানীয় বাজারে বিক্রি হওয়ায় বিশাল পুনর্ব্যবহার অর্থনীতি গড়ে উঠেছে।
কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ
এই শিল্পকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। জাহাজ কাটার শ্রমিক, ওয়েল্ডার, গ্যাস কাটার অপারেটর, ক্রেন চালক, ট্রাকচালক, অক্সিজেন সরবরাহকারী, যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় দোকানদারসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ এই শিল্পে জড়িত।
শুধু সরাসরি কর্মসংস্থান নয়, পরোক্ষভাবেও অসংখ্য মানুষ এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় পরিবহন ব্যবস্থা, আবাসন, খাবারের দোকান ও ছোট ব্যবসাগুলোও এই শিল্পের কারণে বিকশিত হয়েছে। ফলে সীতাকুণ্ড অঞ্চলের অর্থনীতি অনেকাংশে শিপ ব্রেকিং শিল্পকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে।
শ্রমিকদের জীবনসংগ্রাম
জাহাজ ভাঙা শিল্পে কর্মরত অধিকাংশ শ্রমিক দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে জীবিকার সন্ধানে আসেন। দারিদ্র্য ও বেকারত্বের কারণে অনেক মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ এই পেশায় যোগ দেন। প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কঠোর পরিশ্রম করতে হয় তাদের। অতীতে শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল ছিল। অনেক শ্রমিক হেলমেট, গ্লাভস বা সুরক্ষা বুট ছাড়াই কাজ করতেন। বর্তমানে কিছু উন্নতি হলেও এখনও অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঘাটতি রয়েছে।
অনেক শ্রমিকের অভিযোগ, দুর্ঘটনায় আহত হলে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়া কঠিন। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় কঠোর পরিশ্রমের কারণে শারীরিক সমস্যাও দেখা দেয়।
দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তাহীনতার ভয়
জাহাজ ভাঙা শিল্প দীর্ঘদিন ধরেই দুর্ঘটনাপ্রবণ খাত হিসেবে পরিচিত। গ্যাস বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড, ভারী স্টিল প্লেট পড়ে যাওয়া এবং উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়ার মতো দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটে। বিশেষ করে জাহাজের ভেতরে জমে থাকা গ্যাস বিস্ফোরণের অন্যতম কারণ। অতীতে বহু শ্রমিক এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই নিরাপত্তাহীন পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। বর্তমানে অনেক ইয়ার্ডে ফায়ার সেফটি ইউনিট, জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ চালু করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনও আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
পরিবেশদূষণ : উপকূলের জন্য বড় হুমকি
সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা শিল্প পরিবেশ দূষণের জন্য দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত। পুরনো জাহাজে থাকা তেল, ভারী ধাতু, রাসায়নিক পদার্থ এবং বিষাক্ত বর্জ্য সমুদ্রের পানিতে মিশে সামুদ্রিক পরিবেশের ক্ষতি করে। জাহাজ কাটার সময় নির্গত ধোঁয়া ও ধুলাবালি বায়ুদূষণ সৃষ্টি করে। উপকূলীয় মাটিতেও বিষাক্ত পদার্থ জমা হয়। পরিবেশবিদদের মতে, এর ফলে সামুদ্রিক মাছ, জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় বাস্তুসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে অ্যাসবেস্টস, তেল ও রাসায়নিক বর্জ্য সঠিকভাবে অপসারণ না করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ পরিবেশগত ক্ষতির কারণ হতে পারে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পেশাগত রোগ
জাহাজ ভাঙা শিল্পে কর্মরত শ্রমিকরা নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি হন। দীর্ঘ সময় ধোঁয়া, ধুলাবালি ও বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকার কারণে অনেক শ্রমিক শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ ও ত্বকের সমস্যায় আক্রান্ত হন। পুরনো জাহাজে থাকা অ্যাসবেস্টস অত্যন্ত বিপজ্জনক। এটি মানবদেহে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। এ ছাড়া ভারী যন্ত্রপাতির শব্দের কারণে অনেক শ্রমিক শ্রবণ সমস্যায় ভোগেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার এবং উন্নত চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা ছাড়া এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক সমালোচনা ও মানবাধিকার প্রশ্ন
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে সীতাকুণ্ডের শিপ ব্রেকিং শিল্প নিয়ে সমালোচনা করে আসছে। বিশেষ করে শ্রমিক নিরাপত্তাহীনতা, শিশুশ্রম, পরিবেশ দূষণ এবং দুর্ঘটনায় প্রাণহানির বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা দাবি করেছে, উন্নত দেশগুলোর পুরনো ও বিষাক্ত জাহাজ দরিদ্র দেশগুলোতে পাঠানো হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও পড়তে হয়েছে।
হংকং কনভেনশন ও বাংলাদেশের অগ্রগতি
নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব শিপ রিসাইক্লিং নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (IMO) ‘হংকং কনভেনশন’ প্রণয়ন করে। এই কনভেনশনের লক্ষ্য হলো শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিষাক্ত বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা করা এবং পরিবেশ দূষণ কমানো। বাংলাদেশ ২০২৩ সালে এই কনভেনশন অনুমোদন করে। এরপর থেকে সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন ইয়ার্ড আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয়।
গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং : নতুন যুগের সূচনা
বর্তমানে সীতাকুণ্ডের অনেক ইয়ার্ড ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ হিসেবে গড়ে উঠছে। এসব ইয়ার্ডে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনির্বাপণ ইউনিট, অ্যাসবেস্টস অপসারণ ব্যবস্থা এবং শ্রমিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম চালু করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মান পূরণ করতে পারলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক শিপ রিসাইক্লিং বাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিল্পের বর্তমান সংকট ও চ্যালেঞ্জ
যদিও শিল্পটি আধুনিকায়নের পথে এগোচ্ছে, তবুও এখনও নানা সংকট রয়েছে। ডলার সংকট, ব্যাংকঋণের জটিলতা, জাহাজ আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত শর্ত পূরণে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা অনেক উদ্যোক্তাকে চাপে ফেলেছে। একসময় যেখানে শতাধিক ইয়ার্ড সক্রিয় ছিল, বর্তমানে অনেক ইয়ার্ড বন্ধ হয়ে গেছে। ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তর করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার, দক্ষ শ্রমিক তৈরি এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে পারলে বাংলাদেশের শিপ রিসাইক্লিং শিল্প ভবিষ্যতে আরও বড় বৈদেশিক আয় ও বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। সরকারি সহায়তা, সহজ ঋণ সুবিধা, আধুনিক ড্রাই ডক ব্যবস্থা এবং নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে সীতাকুণ্ড বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ও নিরাপদ শিপ রিসাইক্লিং কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। দেশের স্টিল শিল্প, নির্মাণ খাত, পুনর্ব্যবহার অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানে এই শিল্পের অবদান অপরিসীম। তবে একই সঙ্গে শ্রমিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণের মতো বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
বর্তমানে ‘গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং’ ধারণা বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিল্পটি নতুন রূপান্তরের পথে এগোচ্ছে। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ শিল্পব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে বিশ্ব শিপ রিসাইক্লিং শিল্পে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।