প্লাবন শুভ, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর)
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে মেয়েদের ঝরে পড়া চুলের গুটি থেকে চুল বাছাই ও পরিষ্কারের কাজ করছেন নারী শ্রমিকরা
যে চুল নারীর শোভা, তা দিয়েই এখন কর্মের সুযোগ তৈরি করেছেন নারীরা। আসলে কোনো কিছুই যে ফেলনা নয়, তাই প্রমাণ করেছেন তারা। ভিন্ন ধরনের এই কাজ করছেন দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার ৫নং খয়েরবাড়ী ইউনিয়নের নলডাঙ্গা গ্রামের ১৬ জন নারী শ্রমিক। তারা দৈনিক হাজিরার চুক্তিতে মেয়েদের ঝরে পড়া চুলের গুটি থেকে চুল বাছাই ও পরিষ্কারের কাজ করছেন। এতে দিন মজুরি হিসেবে তারা পাছেন ৭০ টাকা। সেই হিসেবে একজন নারী শ্রমিক মাসে এই কাজ করে আয় করছেন ২ হাজার ১০০ টাকা। তবে দলনেত্রীর মজুরি ৮০ টাকা এবং মাসে আয় হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ টাকা।
সরেজমিন নলডাঙ্গা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের জহুরুল শেখের খোলানের এক পার্শ্বে ওই গ্রামেরই একদল নারী দলবেঁধে মেয়েদের ঝরে পড়া চুলের গুটি থেকে চুল ঝেড়ে বাছাই এবং পরিষ্কার করছে। এ কাজের দলনেত্রী হিসেবে কাজ করছেন একই গ্রামের নূর আলমের স্ত্রী জহুরা বেগম। তিনিই মূলত এ কাজের পুরোটাই দেখভাল করেন।
চুল বাছাই কাজে নিয়োজিত রাজিয়া বেগম বলেন, এক মাস ধরে এ কাজে যোগ দিয়েছেন। সকাল ৭টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত গুটির চুল ঝাড়ার কাজ করতে হয় তাদের। চুল কারখানার লোকজন সকালে গুটি চুল দিয়ে যান এবং দুপুর ২টার পর ঝাড়া চুল নিয়ে যান। দীর্ঘ সময় কাজ করলেও মজুরি খুবই কম। তবু বেকার থাকার চেয়ে এ কাজ করে হলেও কিছু আয় হচ্ছে বলে কাজ করছেন তারা।
মনিকা বেগম বলেন, আগে কোনো কাজ না থাকায় বাড়ির রান্নাবান্নার পর অলস সময় কাটত। সময় না কাটলে এ বাড়ি-ও বাড়ি গিয়ে সময় কাটাতে হতো। কিন্তু চুল ঝাড়া কাজে যোগ দিয়ে সকাল থেকে সারা দিন ব্যস্ততার মধ্যে দিন কাটছে এবং কিছু আয়ও হচ্ছে; যা সংসারের অনেক কাজে লাগছে।
দলনেত্রী জহুরা বেগম বলেন, শুধু নলডাঙ্গা নয়, পার্শ্ববর্তী গোয়ালপাড়া, খয়েরবাড়ী ডাঙ্গা, শিবপুরসহ উপজেলার প্রায় সব গ্রামেই নারীরা মেয়েদের ঝরে পড়া চুল ঝাড়ার কাজ করছেন। আমরা গরিব মানুষ দিন আনি দিন খাই। বাসায় বসে না থেকে এখানে চুলের কাজ করি। সারা দিন কাজ করে ৮০ টাকা পাই। মাসে ৩০ দিন কাজ করলে ২ হাজার ৪০০ টাকা পাই। বর্তমান বাজারে সবকিছুর দাম বেশি কিন্তু আমাদের মতো নারী শ্রমিকদের মজুরি কম। মেয়েদের মাথা থেকে পড়ে যাওয়া চুলের কাজ করি। এ চুলগুলো জটলা লেগে থাকে, সেগুলো আমরা কাটা দিয়ে আস্তে আস্তে খুলি। সকালবেলা বাড়ির কাজ করে ৭টার দিকে খোলানে আসি। আবার নাশতার জন্য ১০টার সময় ৩০ মিনিট ছুটি পাই। নাশতা খেয়ে আমার বসি কাজে। এরপর দুপুর ২টায় কাজ শেষ করে নিজ নিজ বাড়ি চলে যাই। এ টাকা দিয়ে সংসার চলে না। কিন্তু উপায় না পেয়ে কষ্ট হলেও কাজ করতে হয়।
জানা যায়, এই গুটি চুল প্রথমে নারীশ্রমিকের মাধ্যমে গুটি ছাড়িয়ে আলাদা করে প্রাথমিক পরিষ্কার ও বাছাই করা হয়। এরপর এই বাছাই করা চুলগুলো ডিটারজেন্ট পাউডার ও শ্যাম্পু দিয়ে পানিতে ভিজিয়ে রেখে পরিষ্কার করা হয়। দ্বিতীয়বারের মতো পরিষ্কার করা এই চুল কারখানার ভেতরে নিয়ে কাটিং মেশিনের মাধ্যমে কাঁচি করা হয়। কাঁচি করা চুলগুলোকে একই সঙ্গে রাবার দিয়ে ছোট ছোট গোছায় বেঁধে আলাদা করা হয়। কারখানায় এই ছোট ছোট গোছা করা চুলগুলোকে বলা হয় লাচি। প্রক্রিয়াজাতকরণ চুলের দৈর্ঘ্যের ওপরই এর মূল্য নির্ভর করে। চুল যত লম্বা হবে, বাজারদরও তত বেশি হবে। চুলের এই দৈর্ঘ্যের ওপর ভিত্তি করে এর বাজারমূল্য সর্বনিম্ন ৬ ইঞ্চি চুল ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২২-৩২ ইঞ্চি সাইজের চুল প্রতি কেজি ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ২২ ইঞ্চি থেকে ৩২ মাপের লম্বা চুলকে সর্বোচ্চ গ্রেডের চুল বলা হয়। চুল বাছাই কাজের কারখানার স্থানীয় ম্যানেজার আরজন আলী বলেন, ফুলবাড়ী উপজেলার ১২টি কেন্দ্রে চুল ঝাড়ার কাজ চলছে। প্রতি কেন্দ্রে ৮ থেকে ১৬ জন নারীর একেকটি গ্রুপ রয়েছে। এদের একজন রয়েছেন দলনেত্রী। স্থানীয়ভাবে চুলগুলো ঝাড়ার পর নবাবগঞ্জ মতিহারা কারখানায় নিয়ে সেগুলো আরও কিছু কাজ করে তারপর সেগুলো ঢাকায় পাঠানো হয়। ঢাকা থেকে চীনসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। ফুলবাড়ী ও নবাবগঞ্জসহ কয়েকটি উপজেলায় এ কাজে অন্তত চার হাজার নারী নিয়োজিত রয়েছেন।