দুই শতকের ঐতিহ্যে আধুনিকতার ছোঁয়া
মনির হাসান, দেলদুয়ার (টাঙ্গাইল)
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
টাঙ্গাইলে বাঁশ - বেত শিল্পে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার ডুবাইল ইউনিয়নের বর্ণী গ্রাম। খানাখন্দে ভরা পিচঢালা কাঁচা-পাকা পথ, চারপাশে বৃক্ষরাজির সবুজ সমারোহ আর অবারিত ফসলি প্রান্তর ঘেরা এই গ্রামীণ জনপদে গড়ে উঠেছে বাঁশ ও বেত শিল্পের এক ব্যতিক্রমী কর্মযজ্ঞ। শত বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে এখানকার কারুশিল্পীরা আজ আধুনিকতার ছোঁয়ায় সৃষ্টি করছেন নান্দনিক ও দৃষ্টিনন্দন হস্তশিল্প।
বাঁশ ও বেত মানবসভ্যতার প্রাচীনতম উপকরণগুলোর অন্যতম। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই মানুষ আশ্রয় নির্মাণ, শিকার সামগ্রী ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিস তৈরিতে বাঁশ ব্যবহার করে আসছে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে হাজার বছর ধরে এই শিল্পের চর্চা চলে আসছে।
টাঙ্গাইলের বর্ণী, কোপাকী, প্রয়াগজানী ও বারোপাখরিয়া গ্রামের বাঁশ-বেত শিল্পের ইতিহাস প্রায় দুই শত বছরের। একসময় এই অঞ্চলে ধামা, কুলা, মাথাইল, পলো, চালনি, টুকরি, চাটাই, হাতপাখা ও হালচাষের জোয়াল তৈরি হতো। কৃষকরা চৈত্র-বৈশাখের প্রচণ্ড রোদে মাথাইল ব্যবহার করে মাঠে কাজ করতেন। গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল এসব পণ্য।
সময়ের পরিবর্তনে প্লাস্টিক ও আধুনিক সামগ্রীর ব্যবহার বাড়লেও এই শিল্পকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন কারুশিল্পী শাহ আলম। তার সৃজনশীল চিন্তা ও আধুনিক নকশার মাধ্যমে বাঁশ-বেত শিল্পে যুক্ত হয় নতুন মাত্রা। বর্তমানে তিনি ও তার সহকর্মীরা তৈরি করছেন আধুনিক বাস্কেট, টেবিল ল্যাম্প, প্লেসম্যাট, ট্রে, মোড়া, ফলের ঝুড়ি, টিস্যু বক্স, গহনার বাক্স, জানালার পর্দা, পেপার ওয়েট, ড্রিংকস, বোতলের ঝাড়সহ শতাধিক শৌখিন ও ব্যবহারিক পণ্য। এমনকি বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি হচ্ছে আকর্ষণীয় সোফা সেট ও চেয়ারও।
স্থানীয়দের মতে, আধুনিক বাঁশ ও বেত হস্তশিল্পের বিকাশে শাহ আলমের অবদান অনন্য। তার হাত ধরেই অনেক মানুষ সফল উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন এবং আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
কারুশিল্পী শাহ আলম বলেন, ‘সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এই শিল্প আরও এগিয়ে যাবে। উন্নত ডিজাইন ও দ্রুত উৎপাদনের মাধ্যমে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।’
তরুণ উদ্যোক্তা শাকিল বলেন, ‘আমি প্রায় ১০-১২ বছর ধরে এই কাজ করছি। আমার বাবা ও চাচা দীর্ঘদিন ধরে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। ভবিষ্যতেও আমি এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে চাই। এই পেশায় আমি স্বাবলম্বী এবং ভালো আছি।’
৪০ বছরের অভিজ্ঞ কারুশিল্পী মতিয়ার রহমান বলেন, ‘এই কাজ করেই আমাদের সংসার চলে। আমার দুই ছেলে লেখাপড়া করছে। মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় হয়।’
বর্তমানে বর্ণী, কোপাকী, প্রয়াগজানী ও বারোপাখরিয়া গ্রামের দুই শতাধিক পরিবারের সাত শতাধিক কারুশিল্পী এই শিল্পে জড়িত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাদের হাতে তৈরি পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রির পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশিক্ষণ ও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ পেলে বাঁশ ও বেত শিল্প গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন বিপ্লব ঘটাতে পারে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম খাত হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে এই শিল্প।
টাঙ্গাইলবাসীর প্রত্যাশা, শতবর্ষের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও বিশেষ সহায়তা পাবে, যা দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।