অনাথ মণ্ডল, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা)
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
বাঘ-বিধবা মাহফুজার বেঁচে থাকার লড়াই
জীবনের প্রতিটি সকাল শুরু হয় এক কাপ চা দিয়ে। কিন্তু সেই চায়ের কাপের আড়ালে লুকিয়ে আছে দীর্ঘ সংগ্রাম, বেদনা আর বেঁচে থাকার নিরন্তর লড়াই। শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের পূর্ব কালিনগর গ্রামের বাসিন্দা মাহফুজা খাতুন, যিনি স্থানীয়দের কাছে ‘বাঘ বিধবা’ হিসেবে পরিচিত, আজও স্বামীর স্মৃতি বুকে নিয়ে কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন।
জীবিকার তাগিদে ২০০২ সালে সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন মাহফুজার স্বামী সাত্তার গাজী। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, বনের গভীরে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান তিনি।
স্বামী হারানোর পর ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে চরম বিপাকে পড়েন মাহফুজা। নিয়মিত আয়ের কোনো উৎস না থাকায় নদীতে জাল টানতেন, কখনও মানুষের বাড়িতে কাজ করেছেন বাচ্চা দুটোর মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য। বর্তমানে উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর কদমতলা গ্রামের হাজী সাহেবের বাড়ির পাশে সরকারি জায়গা বসবাস করেন। তারপরও দিনমজুরির কাজ করে সংসার চালাতে হয়। তাদের নিজস্ব কোনো জায়গা-জমি নেই।
সারা দেশের জ্বালানি তেলের সংকটের মুহূর্তে উপজেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফিলিং স্টেশন থেকে তেল সংগ্রহ করতে হতো। শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ডেলমা ফিলিং স্টেশন থেকে সপ্তাহে তিনটি ইউনিয়নের ৩ দিন তেল দেওয়া হতো। তেল আগে নেওয়ার জন্য ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালকরা আগের দিন থেকে সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষায় থাকত।
সেই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ক্লান্তি কিছুটা লাঘব করতে রাস্তার পাশে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান বসান মাহফুজা। বাঁশ-তাঁবুর ছাউনি আর কয়েকটি বেঞ্চÑ এতেই গড়ে উঠেছে তার ক্ষুদ্র ব্যবসা। গভীর রাত থেকে শুরু করে পরের দিন রাত ৯ থেকে ১০টা পর্যন্ত সিদ্ধ ডিম, পানি, কলা, কেক, চা বিস্কুট বিক্রি করতেন মাহফুজা খাতুন। প্রতিদিন ২ থেকে ৩ হাজার টাকা বেচাকেনা হতো। কিছু দিন পরে জ্বালানি তেলের সংকট কেটে যায়। ওই কয়েক দিনে তিনি কিছু টাকা জমান। বর্তমানে সেই টাকা দিয়ে নিজের বসত ঘরের সঙ্গে ছোট একটি চায়ের দোকান দিয়েই সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন তিনি। প্রতিদিন ভোরে দোকান খুলে রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করলেও আয় খুবই সীমিত। তবুও হাল ছাড়েননি এই সংগ্রামী নারী।
মাহফুজা বলেন, স্বামী চলে যাওয়ার পর মনে হয়েছিল সব শেষ হয়ে গেছে। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে কীভাবে বাঁচব, সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে বাঁচার শক্তি পেয়েছি। নিজের সাহসেই টিকে আছি। অনেক কষ্ট করেছি, এখনও করছি। স্বামী বেঁচে থাকাকালীন কোনো সময় বাইরে এসে কাজ করতে হয়নি, মানুষের সামনে দাঁড়াতে হয়নি। এখন বয়স হয়েছে, শরীরে রোগ-ব্যাধি বাসা বেঁধেছে আর কাজ করতে পারি না। তেল সংকটের সময় চায়ের দোকান দিয়ে কিছু টাকা জমিয়ে ছিলাম। তা দিয়ে বাড়ির সঙ্গে ছোট একটি চায়ের দোকান করেছি। সেই দোকান থেকেই যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছি। তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সংসার চালানো দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে বলে জানান তিনি।
তার ভাষ্য, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কিছু সহযোগিতা পেলে দোকানটি আরও বড় করতে পারবেন। তাতে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে।
সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চলে এখনও অনেক পরিবার রয়েছে, যাদের সদস্যরা বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন। এসব পরিবারের অধিকাংশই আর্থিক সংকটে ভুগছে। তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা জরুরি বলে মনে করেন, লেখক-গবেষক পীযুষ বাউলিয়া পিন্টু।