প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
ক্র্যাফটস ভিলেজেস আজীবন সম্মাননায় ভূষিত প্রতিমাশিল্পী হরিপদ পাল
বাংলাদেশের প্রখ্যাত প্রতিমাশিল্পী হরিপদ পালকে ‘ক্রাফটস ভিলেজেস আজীবন সম্মাননা ২০২৬’ প্রদান করা হয়েছে। শনিবার ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয় মিলনায়তনে বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে তাঁকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়। সম্মাননার অংশ হিসেবে তাঁকে সম্মাননাস্মারক, ফুলের তোড়া ও এক লাখ টাকা প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ফারহানা শারমিন সূচি বলেন, আর্থিক, রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক নানা প্রতিকূলতার কারণে পরিষদের কার্যক্রম দীর্ঘদিন কিছুটা স্থবির ছিল। তবে নতুন উদ্যমে আবারও কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং আজীবন সম্মাননা প্রদান সেই পুনর্জাগরণেরই একটি অংশ।

কারুশিল্প পরিষদের সহ-সভাপতি শাহীন হোসেন শামীম বলেন, ১৯৮৫ সালে সংগঠন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কর্মরত কারুশিল্পীদের স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। একসময় নিয়মিতভাবে শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পী পুরস্কার দেওয়া হলেও বিভিন্ন কারণে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। তবে কারুশিল্পীদের স্বীকৃতি দেওয়ার প্রচেষ্টা কখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান ক্রাফটস ভিলেজেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরুণ কুমার পাল বলেন, বাংলাদেশের কারুশিল্প দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গ্রামীণ কারুশিল্পী, নারী উদ্যোক্তা এবং প্রান্তিক সৃজনশীল মানুষদের আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে তাঁদের প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে।
অনুষ্ঠানে ‘ঐতিহ্য কূটনীতি ও কারুশিল্পের অধিকার সুরক্ষা’ বিষয়ে বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মাসউদ ইমরান মান্নু। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বহু ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে সম্ভাবনাময় হলেও যথাযথ ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) সনদ, নকশা সুরক্ষা এবং মেধাস্বত্ব অধিকার না থাকায় শিল্পীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি কারুশিল্পের নকশা ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।

দক্ষিণবঙ্গের মৃৎশিল্পীদের নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা সাংবাদিক সুশান্ত ঘোষ প্রতিমা ও মৃৎশিল্পীদের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শিল্পীদের প্রধান কাঁচামাল মাটি সংগ্রহ করতেও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। মাটি সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক ও স্থানীয় জটিলতা তাদের কাজকে কঠিন করে তুলছে।
‘বাংলাদেশের প্রতিমাশিল্প ও শিল্পীসমাজ’ বিষয়ক বক্তব্য উপস্থাপন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক উদয় শংকর বিশ্বাস। তিনি বলেন, প্রতিমাশিল্পীরা শিল্পীসমাজের অন্যতম অবহেলিত অংশ। পূজার বিশাল আয়োজন তাদের শ্রম ছাড়া সম্ভব নয়, অথচ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে তারা এখনও পিছিয়ে রয়েছেন। অধিকাংশ শিল্পীকেই ঋণ নিয়ে কাজ শুরু করতে হয় এবং কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রেও নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়।
সম্মাননাপ্রাপ্ত শিল্পী হরিপদ পালের জন্ম ঢাকার অদূরে আশুলিয়ার কুড়লিয়া গ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী শিল্পী পরিবারে। দাদু ও বাবার হাত ধরে তাঁর শিল্পচর্চার শুরু। পরে তিনি কলকাতার কুমারটুলিতে প্রতিমা নির্মাণের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। স্বাধীনতার প্রাক্কালে দেশে ফিরে পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারে নিজস্ব কর্মশালা প্রতিষ্ঠা করেন। গত ছয় দশকে তিনি অসংখ্য প্রতিমা, ভাস্কর্য ও শিল্পকর্ম নির্মাণ করেছেন।
সম্মাননা গ্রহণের পর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে হরিপদ পাল বলেন, “আমি শুধু চাই, যতদিন হাত চলে, ততদিন যেন মাটির মাধ্যমে ঈশ্বরের অনুভূতি মানুষের মাঝে পৌঁছে দিতে পারি। যতক্ষণ বানাতে পারি ততক্ষণ আমাকে রাখো, আর বানাতে না পারলে নিয়ে যেয়ো।”
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন, “কোনো পুরস্কার দিয়ে আসলে কাউকে সম্মানিত করা যায় না। বরং আমরা এই সম্মাননার মাধ্যমে নিজেদেরই সম্মানিত করি।”
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের ডিন অধ্যাপক বজরুল রশিদ খান এবং ২০১৬ সালে আজীবন সম্মাননাপ্রাপ্ত মৃৎশিল্পী বিশ্বেশ্বর পাল। সমাপনী বক্তব্যে বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের সভাপতি চন্দ্রশেখর সাহা অতিথি, কারুশিল্পী ও গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কারুশিল্প অধিকারকর্মী ও হাল ফ্যাশনের কনসালট্যান্ট শেখ সাইফুর রহমান।