বিশ্ব বাবা দিবস
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
বিশ্ব বাবা দিবসে তারুণ্যের প্রতিনিধিত্ব করা তরুণরা লিখেছেন নিজের বাবাকে নিয়ে
বটবৃক্ষের ছায়ার মতো সন্তানের এগিয়ে চলায় যার থাকে নীরব ভূমিকা তিনি হলেন বাবা। বাবার আদর্শ, মূল্যবোধ, চিন্তাচেতনা সন্তানের ওপর দারুণভাবে প্রভাব বিস্তার করে। এজন্য বলা হয়ে থাকে বাবার হাত ধরেই সন্তানের চলতে শেখা। সন্তানের প্রতি বাবার ভালোবাসা চিরকালের। আজ বিশ্ব বাবা দিবসে তারুণ্যের প্রতিনিধিত্ব করা তরুণরা লিখেছেন নিজের বাবাকে নিয়ে।

অপেক্ষায় থাকতাম বাবা কখন ফোন করবেন
ফারহাত মাইশা অর্পা, শিক্ষার্থী, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
আমার সব আবদার ও আহ্লাদের খোরাক জোগান আমার বাবা। ছোট মেয়ে হিসেবে ছোটবেলা থেকেই বাবার কাছে সবচেয়ে বেশি আদর ও ভালোবাসা আমি পেয়ে থাকি। আমার যত ইচ্ছে সবকিছুই আজ পর্যন্ত বাবা পূরণ করেছেন।বাবা যেহেতু প্রবাসী ছিলেন; তাই বাবার সঙ্গে খুব বেশি সময় কাটানোর সুযোগ হয়ে ওঠেনি। বাবা যখনই দেশে আসেন তখনই আমার সব ইচ্ছে পূরণ করার চেষ্টা করেন। ছোটবেলায় যখন আকাশে প্লেন উড়ে যেতে দেখতাম তখন মনে হতো এই উড়োজাহাজে চড়েই বুঝি বাবা আসছেন আমার কাছে। উড়োজাহাজ দেখলেই নিজের মধ্যে অন্যরকম আনন্দ কাজ করত। বাবা যখনই দেশে আসতেন তখন আমার খুশির যেন কোনো বাঁধ থাকত না। বাবা দেশে আসার আগে থেকেই আমি আমার পছন্দের জিনিসের লম্বা লিস্ট পাঠিয়ে দিতাম বাবার কাছে। বাবাও আমার আবদার মেটাতে খুঁজে খুঁজে বের করে নিয়ে আসতেন আমার সেসব পছন্দের জিনিস। বাবা আর সাথে ঝুড়ি ঝুড়ি উপহার পেয়ে আমি খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়তাম। সারা দিন বাবার সঙ্গেই থাকতাম। বাবা যখন প্রবাসে ফিরে যেতেন তখন আমার মধ্যে কাজ করত ভীষণ রকমের শূন্যতা। বাবাকে প্রচুর মিস করতাম যখন তিনি চলে যেতেন। অপেক্ষায় থাকতাম আবার কবে বাবা ফিরে আসবেন উড়োজাহাজে চড়ে। অপেক্ষায় থাকতাম বাবা কখন ফোন করবেন। আর বাবার ফোন এলেই সবার আগে দৌড়ে গিয়ে বাবার ফোন ধরতাম। আজও বাবার ফোনের অপেক্ষায় থাকি। এই বুঝি বাবা ফোন করে বলবেন, ‘মা, তুমি কেমন আছো?’ বাবার মুখে ‘মা’ ডাকটি শোনার অপেক্ষায় থাকি। বাবা যখন মা বলে ডাকেন সেই মুহূর্তের অনুভূতি ও আনন্দ কখনও ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

না বলা ভালোবাসা
ফাইজা আক্তার আলো, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
বাবা দিবস এলে মনে পড়ে যায় আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির কথা। ছোটবেলায় যখন বাবার হাত ধরে বেড়ে ওঠার কথা ছিল, তখনই পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য তিনি প্রবাসে পাড়ি জমান। তার অনুপস্থিতিতেই কেটেছে আমার শৈশব, কৈশোর, পড়াশোনা এবং বড় হয়ে ওঠার প্রতিটি ধাপ। দূরত্ব ছিল, কিন্তু তার ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ কখনও দূরে ছিল না। বাবা আমার সকল স্বপ্ন পূরণের নীরব কারিগর। তিনি আমার সব আবদার পূরণ করেন, প্রতিটি কাজে উৎসাহ দেন এবং ভেঙে পড়ার মুহূর্তে সাহস জোগান। একজন অভিভাবকের পাশাপাশি তিনি আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। অথচ তাকে কখনও বলা হয়নিÑ ‘বাবা, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’ না বললেও তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা সকল অনুভূতিতে মিশে আছে। একজন বাবার গুরুত্ব শুধু পরিবারের উপার্জনকারী হিসেবে নয়; তিনি সন্তানের সাহস, ভরসা ও পথপ্রদর্শক। তাই সন্তানের দায়িত্ব হলো বাবার ত্যাগকে সম্মান করা, তার স্বপ্ন ও কষ্টের মূল্য দেওয়া এবং জীবনের প্রতিটি অর্জনের মাধ্যমে তাকে গর্বিত করা। বাবা দূরে থাকলেও তার ভালোবাসা, ত্যাগ ও প্রেরণাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমার কাছে না বলা ভালোবাসার এক সুন্দর নামÑ বাবা।

সংগ্রামের পথচলায় রথের সারথি
অর্ণব দাশ, শিক্ষার্থী, চণ্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত
ছোটবেলায় বাবা আমার কাছে ছিল এক কঠোর, শাসনভরা উপস্থিতি। তার প্রতি একধরনের ভয় কাজ করত, কারণ পড়াশোনার বিষয়টাই ছিল আমাদের সম্পর্কের মূল কেন্দ্র। কিন্তু সেই কঠোরতার ভেতরেই ছিল নিঃশব্দ যত্ন- দিনশেষে ক্লান্ত শরীর নিয়েও তিনি আমার পড়াশোনার খোঁজ নিতে ভুলতেন না। তখন থেকেই বাবার প্রতি সেই ভয়ের ভিত তৈরি হয়েছিল, যা সময়ের সাথে ধীরে ধীরে শ্রদ্ধা ও নির্ভরতায় রূপ নেয়।
আমি সবসময় পড়াশোনার গণ্ডির বাইরে গিয়ে ব্যতিক্রম কিছু করতে চাইতাম। বাবাকে না জানিয়ে অনেক এক্সট্রা কারিকুলার কাজে যুক্ত হতাম, যা তিনি শুরুতে পছন্দ করতেন না। কিন্তু আমি থামিনি। সময়ের সাথে বুঝেছি, আমার সেই চেষ্টা আর তার শাসনÑ দুটোই আমাকে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছে। এখন তিনি সরাসরি কিছু না বললেও, তার চোখে আমার জন্য গর্ব স্পষ্ট দেখা যায়। বাবা এমন একজন মানুষ, যিনি ছায়ার মতো আমাদের আগলে রাখেন, অথচ নিজের কষ্ট আড়াল করে রাখেন। পরিবারের দায়িত্ব তিনি নীরবে বহন করেন। দূরে থাকলে বোঝা যায়, তার উপস্থিতি কতটা নিরাপত্তার ছিল। কম কথা বললেও তার ক্লান্ত চোখ আর হালকা হাসিই সব অনুভূতি প্রকাশ করে দেয়। শৈশবের বাবার আঙুল ধরে হাঁটা যত সহজ ছিল, বড় হয়ে সেই মানুষটাকে ভালোবাসি বলা ততটাই কঠিন। তবুও সত্যি হলো, বাবাই জীবনের সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি, যিনি ভাঙার মুহূর্তেও আমাদের ধরে রাখেন। ছেলেরা একসময় বাবা হয়, কিন্তু বাবারা আর কখনও ছেলে হয়ে ওঠে না। তাই তাদের ভালোবাসা কোনো দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তবুও এই দিনে একটাই কথাÑ ভালো থাকুক আমার বাবা, ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল বাবা।

উপমা নেই সেই প্রিয় মানুষের
মেহনাজ আফরিন মেঘ, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
বাবা এমন একজন, যিনি পাশে থাকলে জীবনের সব খারাপ সময়ে অবিশ্বাসে ঘেরা এই পৃথিবীতে নির্ভয়ে সব বাধা পার করা যায়। বাবার দেওয়া একটু উৎসাহ, ভরসা, আস্থা একটা সন্তানের কাছে অনেক বড় পাওয়া। প্রতিটি সন্তানের কাছেই বাবা একটা বটবৃক্ষের মত- কখনও শত আঘাতের প্রতিরোধোক ঢাল, আবার কখনও তিনি একাধারে সন্তানের কাছে আলাদীনের চেরাগের দৈত্য। বাবা তার সন্তানের আবদার মেটাতে কখনও ক্লান্ত হন না। এককথায় বলতে গেলেÑ নিঃস্বার্থ ভালোবাসার অপর নাম বাবা, অনুপ্রেরণার আরেক নাম বাবা। নিজের সমস্ত শখ, চাওয়া-পাওয়া অপূর্ণ রেখে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর মানুষটাই হলো বাবা। আসলে বাবার সংজ্ঞা কখনও এক বাক্যে দেওয়া যায় না। বাবাকে বাইরে থেকে অনেক শক্ত মনে হলেও, ভেতরে সন্তানের প্রতি তার ভালোবাসা যে কতটা স্নিগ্ধ তা কখনও মাপা যায় না। দায়িত্ব ও কর্তব্যের আরেক বলিষ্ঠ নাম বাবা। ভালো থাকুক দুনিয়ার সব বাবা। আমি আমার বাবাকে বলতে চাই- ‘পৃথিবীতে এখন আমার বাবা, মা দুই-ই তুমি। অনেক ভালোবাসি তোমাকে বাবা। তুমি যেন সুস্থ থাকো, ভালো থাকো এই কামনা করি। আমার মুখের হাসিটা বেঁচে আছে তোমারই জন্য। আমার পৃথিবীটা আজও সুন্দর শুধু তোমার জন্য। বাবা, তুমি আমার সুপার হিরো, আমার সামনে আগানোর প্রেরণা।’