কামরুল হাসানের চিত্রকর্ম।
খুব পানি চারপাশে। কেউ কেউ বলছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মতো এই পানিও হলো দ্বিতীয় ফ্রন্ট হানাদারদের দৌড়ে রাখার। ‘ওরা পানিরে ডরায়’, বলে রাতের বেলা আমার কাকা মোবারক এক হাতে হারিকেন আরেক হাতে কোঁচ নিয়ে নেমে পড়েন উঠানে। আলোয় দেখা যায় শিং মাগুর শোল উঠানের গিড়া পানিতে মনের আনন্দে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। আমাদের বুবু দরজায় দাঁড়িয়ে মাছের কথা না বলে বলছেন সকালে দুধ দোয়াতে যেন দেরি না করে সে কথা। তারপর নারকেলগুলো ছেলা হয় নাই কী নিয়ে যাবেন তিনি বাপের বাড়ি, সে কথা। খেজুরের গুড়ের কলসটা কার থেকে নামানো হয়নি, সে কথা। কাকা মন দিয়ে মাছ ধরে যাচ্ছেন। একটা শোল মাছ কোঁচের আগায় বিঁধিয়ে দরজায় দাঁড়ানো আমাদের দেখাচ্ছেন। আমরা ডুলা এগিয়ে দেওয়ার ছলে একটু পানিতে নামতে চাই কিন্তু মায়ের শ্যেনদৃষ্টি এড়ানো যাচ্ছে না। দাদা বলছেন, ‘মাঝি কিন্তু বিয়ানবেলা আইব, রাইতেই গুছাইয়া না রাখলে দেরি হইব। আর যদি বিষ্টি নামে তো...।’
কাল বুবু নাইওর যাবেন বাপের বাড়ি নাগদা। বছরে এই একবারই যান। দাদা যাবেন কি না জানি না, আগে কখনও গেছেন কি না তাও জানি না। বুবুর কথা শুনে মনে হলো না তিনি সাথে যান কখনও। তবে আমরা যে তার সাথে যাওয়ার বায়না করে রেখেছি এবং তিনি মাকে রাজি করতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন সেটা ভেবে আমরা খুব দোলাচলে আছি। বুলির মা, যাইতে দাও, আমি চোহে চোহে রাখুম। বুলি, খোকন আর নাসুরে দাও। আম্মা আপনে আকথা কয়েন না, একটাও সাঁতার জানে না!
রাতের খাবার খাওয়া হয়ে গেছে, বিবিসি শোনা হয়ে গেছে, এম আর আখতার মুকুলের চরমপত্রও। এশার নামাজ পড়ছেন দাদা। দাদার মুখ খুব হাসিখুশি। কারণ বুবু আজকে এক সপ্তাহ দাদার সাথে মারাত্মক ভালো ব্যবহার করছেন। মানে যে শুক্রবার তারিখ হলো পরের শুক্রবার বাপের বাড়ি নাইওর যাবেন, চিঠি লিখে দিয়েছেন কাকা, তারপর থেকে বুবুর ঝাড়ির বদলে মোম আর মধু। কাকি আম্মাও খুব খুশি, কেননা বুবু ফিরে এলে তিনি যাবেন। আমার মায়ের নাইওর নাই, নানা-নানিরা এখন হানাদার-কবলিত মুন্সীগঞ্জে। পাঁচ দিনের ভাইকে নিয়ে মা মামাকে নিয়ে কোনো রকম শ্বশুরবাড়ি এসে পড়েছে।
সত্যি কথা, আমার বুবু খুব তেজি মানুষ, তার কথায় সংসার চলে। দাদা খুবই মান্য করেন, মাঝে মাঝে শুনি তিনি বলছেন, খাঁয়ের ঝিয়ের বুদ্ধি পাকনা! তারপরও বাপের বাড়ি নাইওর দিতে দাদার গড়িমসি। বুবু এই কথা পাড়লেই দাদার মুখে কুলুপ। আমার মা-কাকি মুখ দেখাদেখি করে। কাকি চায় বুবু আগে ঘুরে আসুক তবে তার যাওয়ার পথ সুগম হয়।
আজকের ভোরটা আলাদা, সকালে একটু মেঘ ছিল কিন্তু এখন ঝকঝকে রোদ। মেঘ দেখে দাদা বোধহয় একটু খুশি খুশি ছিলেন কিন্তু তাতে বুবুর আয়োজনে কোনো ভাটা পড়তে দেখা যায় না। সুখের খবর হলো আমি আর ভাই মায়ের অনুমোদন পেয়েছি বুবুর সাথে যাওয়ার। যাবে চাচাতো ভাই তিনজন। মানে বহরে মানুষ হলাম মোট সাতজন। আমরা পাঁচ ভাইবোন, বুবু আর বুবুর ভাইয়ের ছেলে আলী আকবর মামা। আলী আকবর মামা চিঠি পেয়ে তিন দিন আগে এসেছেন ফুপুকে নিতে। অহ বলা হয়নি, আলী আকবর মামা হলো আমাদের কাকির আপন ভাই। মানে দাঁড়াল কাকি আমার বুবুর ভাইঝি!
তো ভোরটা আলাদা, ঝলমলে আলো। উঠানের পানি এক সপ্তাহ ধরে স্থিতিশীল। ফলে দাদা ঘোষণা দিয়েছিলেন, পানি আর বাড়বে না। সকালে উঠে দেখি গত রাতের তুলনায় পানি অনেকটাই নেমে গেছে। আজকে হয়তো কাকার মাছ ধরা হবে না। বাড়ির সকলেই যেন খানেকটা নিশ্চিন্ত। বুবুর আয়োজন চলল মধ্য সকাল পর্যন্ত। আজ সকালে আমাদের ক্ষুধা কোথায় উবে গেছে। আনন্দ, আনন্দ! অন্যদিনের মতো একসাথে খাওয়া হলো আজও, মুগডাল আর কৈ মাছের বিরন। আর এক চিমটি করে বেগুন ভর্তা। এ বাড়ির নিয়ম হলো সকালে উঠেই এক পুরা করে মুড়ি আর তারসি নিয়ে বসবে। তারসি মানে ঝোলা গুড়। তারপর ৯টার দিকে গরম ভাত তরকারি।
গোড়ালি ডুবিয়ে ডুবিয়ে বাড়ির ভেতরে ছোট পুকুরে নোঙর করা নৌকা দেখে এসেছি তিনবার। এই পুকুরের চারপাশে মোরতাকের ঝাড়, এই মোরতাক দিয়ে বুবু আর কাকিআম্মা খুব সুন্দর পাটি বোনেন। দাদা পাটিকে বলেন মইল্যা। নানা মাপের নানা রঙের নকশাদার মইল্যা বিছানায় বিছান, মেঝেতে বিছিয়ে ভাত খান, নামাজ পড়েন, ছোট নকশাদার হাতপাখা নিয়ে আমরা টানাটানি করি।
যা হোক নৌকায় বিছানা পাতা হয়েছে ভারী কাঁথা দিয়ে, দুটো শক্ত বালিশ তাতে। তারপর এক এক করে উঠল দুধেভরা পিতলের কলস, এক বস্তা ছেলা নারিকেল, মাটির কলস ভরা খেজুরের গুড়, ছোট-বড় নানা পদের মাটির হাঁড়ি, তার ভেতরে যে কী আমাদের যাবার উত্তেজনায় সে সবের তত্ত্ব-তালাশ করতে পারিনি। দাদা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের যাত্রার তদারকি করলেন। নৌকায় উঠলেন সবার শেষে বুবু। যেন বছরখানেকের জন্য যাচ্ছেন, নৌকায় উঠেও কাকিকে বললেন, লাল মুরগাডার কুড়চা ভাঙতাছে না, ওরে একটু পানিতে চুবান দিও তো! দাদা খিকখিক হাসলেন, তারপর বললেন তিন দিনই তো, থাউক কুরচা, তুমি আইলে ভাঙব!
বুবু ঘোমটা টেনে বললেন, পাঁচ দিন, পাঁচ দিন!
এত সব কাণ্ড করতে সকালটা ফুরিয়ে এলো। দাদা মা কাকি দাঁড়িয়ে রইলেন পুকুর পাড়ে, কাকা স্কুলে থাকায় এই যজ্ঞে তাকে পাওয়া গেল না। আলী আকবর মামা আমাদের দেখভালের দায়িত্ব নেওয়ায় মা রাজি হয়েছে। শেষ বারের মতো মা তাকে বলল, আলী আকবর অগো একটু চোখে চোখে রাইখ ভাই, একটাও সাঁতার জানে না, চারদিকে পানি।
নৌকা ছাড়ল মাঝি বদর বদর বলে। বুবু আকাশ দেখে মাঝিকে কী যেন পরামর্শ দেন। আসলে তো বড় নদী পড়বে না, খাল-বিল দিয়ে দিয়েই চলে যাওয়া যাবে। বুবু এবার মাটির কলসি গোনেন, কিছু ফেলে এলেন কি না! আমরা জানি না বুবুর বাপের বাড়ি নাগদা আদতে কয় ঘণ্টার রাস্তা। নৌকা চলতে শুরু করলে বুবুকে দেখি কী সুখী মুখ! ঘন ঘন পানের বাটা খোলেন আর মুচরে মুচরে মুখে পান ঢোকান। লগি পড়ে, লগি ওঠে। পানি আর লগির এক অদ্ভুত সরসর শব্দ। পানির দিকে তাকিয়ে দেখি শাপলা সব বুজে আছে কালো পানির ওপর। পাতাগুলো দুলে দুলে দূরে সরে যাচ্ছে। নানা রকমের পানাকে ঠেলে ঠেলে লগি বেয়ে চলেছে মাঝি। মাঝে মাঝে দুয়েক কলি সুরও ভাঁজে বুবুর দেওয়া পান মুখে। চাচাতো ভাইরা সবাই সাঁতার জানে, তাদের নিয়ে চিন্তা নাই বুবুর। চিন্তা আমাদের দুই ভাইবোনকে নিয়ে। একটু পর পর টেনে কোলের কাছে বসাচ্ছেন, মাথায় হাত বুলিয়ে জানতে চান আমরা কেমন আনন্দবোধ করছি। ভাই মাথা দোলায়, আমিও। মানে খুব আনন্দ হচ্ছে বুবু, অনেক আনন্দ। বুবুর যে কী হচ্ছে, কত আনন্দ সে কথা কেউ জিজ্ঞাসে না। পাঁচজন নাবালক শিশু, বয়স যাদের সাত থেকে এগারো। যাচ্ছে বুবুর বাপের বাড়ি নাগদা খাঁয়েদের বাড়ি।
নৌকা হঠাৎ থেমে গেল, তাকিয়ে দেখি নৌকার ওপর বিশাল এক গাছ। চাইয়া দেখ বাই গাছে কত বড় বড় চাইলতা! কথাটা আমার ভাইকে বলা। আমরা সবাই চালতা চিনি, চালতার চুয়া রান্না করে মা ইলিশ মাছের মাথা কি চিংড়ি মাছ দিয়ে ঢাকায়। বুবু বলেন, কই মাগুর দিয়া বেশি মজা, উছা দিয়াও মজা। বিলে গলা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা চালতা গাছের সাথে কিছুক্ষণ কাটল। মাঝি দু-চারটা পাড়ল টপাটপ। বুবু বললেন, পাড়নের দরকার নাই, গাছখান যে পানির মিদ্যেও ফল নিয়া খাড়ায় রইছে এইডা তো পোলাপানগো দেহান দরকার!
দুপুর হয়ে এলে মাঝি নামাজের জন্য বিরতি চাইল আর এই সুযোগে বুবু আমাদের দুপুরের খাবার দিলেন সকালের লাল চালের ভাত কৈ মাছের বিরন আর ঘন মুগডাল। একটা মাটির সরার ওপর অনেকগুলো ভাজা শুকনা লাল মরিচ রোদে ঝলমল করছে। নৌকায় বসে খাওয়া, কী যে আনন্দ, চারদিকে বিলের পানি, শাপলা-শালুক আর কচুরিপানার জলজ গন্ধ। মাথার ওপর মেঘ রোদের আলো-ছায়া খেলা। আমাদের খাওয়া হলে মাঝি খেতে বসে, মাছ-ডালের সাথে সে সব কয়টা শুকনা মরিচ মুচমুচ করে খেয়ে ফেলে আমাদের বিস্ময় জাগিয়ে। মনে হয় যেন সে মরিচ খেতেই বসেছে, অন্যগুলো ফাও!
বিকালে গিয়ে আমাদের নৌকা পৌঁছে বুবুর বাপের বাড়ির ঘাটে। অবাক কাণ্ড, ঘাটে যে কত মানুষ আমাদের অপেক্ষায়! মনে হয় পুরো গাঁয়ের লোক জুটে গেছে ঘাটে!
বুবুর মা-বাবা কেউ বেঁচে নাই, আরেক বোন এসেছেন নাইওরি, তারই বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে মা-বাবার স্মরণে কান্নাকাটি, হঠাৎ দেখলে মরাকান্না মনে হবে! বুবুর দুই ভাই বড়ো বোনের পা ছুঁয়ে সালাম করে আবেগে চোখ মোছেন ঘন ঘন। আমরা কাঁদিও না, হাসিও না, বেকার তাকিয়ে দেখি বোকার মতো!
আজকে পঞ্চান্ন বছর পর মনে পড়ে, বুবুর বাবা-মায়ের সেই লাল রঙ দেয়ালে পাশাপাশি কবর দুখানা। বুবু পাঁচ দিনই ভোরবেলা আমাকে নিয়ে সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন আর প্রতিদিনই চোখ মুছতে মুছতে বলতেন, আমার বাপজি মাজি এনো ঘুমায়, আহারে! সারি সারি সুপারি গাছের ভেতর কবর দুখানা, পাশে আর কোনো কবর নাই। শুধু পাখি ডাকে নানা স্বরে-সুরে, বাকিটা খুব নিরিবিলি ঠান্ডা ঠান্ডা শান্তি শান্তি।
লাল ইটের বেষ্টনীর ভেতর বর্ষীয়ান লাল ঝুমকা জবায় জায়গাটা আলোয় ভরা। সেই আলোয় নশ্বর কি অবিনশ্বর মহাকাব্যিক জীবন বারবার পড়া যায়। যদিও সে পড়া দুয়েক প্রজন্মের বেশি প্রলম্বিত হয় না।