× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নাইওর এক প্রতীকী প্রত্যাবর্তন

জফির সেতু

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

দেবদাস চক্রবর্তীর চিত্রকর্ম ‘নাইওর’

দেবদাস চক্রবর্তীর চিত্রকর্ম ‘নাইওর’

বছরে দুইবার বাপের বাড়ি নাইওর যাওয়া মায়ের জীবনচক্রের একটা বিশেষ দিক ছিল। মা-পাগল মানুষ ছিলাম আমি, প্রথম সন্তান; তাই বোধশক্তি পাওয়ার পর থেকে মায়ের শরীর, মন, আবেগ সবই খেয়াল করেছি। আর শৈশব-কৈশোরের এমন একটাও নাইওর-যাত্রা নেই যে মায়ের সঙ্গী আমি হইনি। নাইওরের আগে মা কেমন হয়ে যেত, তন্বী দেহখানি যেন বাতাসে উড়ত; আনন্দের সঙ্গে ঘরের সকল কাজ করত, বেতের পাটি কিংবা কাঁথা বুনতে বুনতে গুন গুন করে গান গাইত। এটা-ওটা খুঁজত, বিশেষ করে শাড়ি-ব্লাউজ-গয়নাপত্র আলাদা করে রাখত। আর বাপের বাড়িতে সন্দেশসহ যা উপঢৌকন নেবে তারও জোগাড় ও গোছগাছ করত। সেটা শুরু হতো পক্ষকাল আগে থেকেই। তারপর আসত সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সেই যাত্রা হয় হেঁটে, নয়তো নৌকা করে। শীতকালে, আর বর্ষাকালে। এই দুইবার নাইওরে যাওয়া সিলেটে চল।

আমাদের পিতৃকুলে বড়ো গৃহস্থালি। ভাটির অঞ্চলে গোয়ালভরা গরু, তিন ধরনের ধানিজমি; আর নানা ধরনের ফল-ফসলের ক্ষেত। তাই নাইওরে যাওয়া অত সহজ ব্যাপার ছিল না। সবকিছু গুছিয়ে তবে যাওয়া হতো। বিশেষ করে বাটনা বাটা, কুটনা কুটা এবং কয়েক মণ চাল ঢেঁকিতে ছাঁটাই করে মটকি ভরে তবে বাপের বাড়ি। বড় পরিবারের অনেক বউ ঘরে, কিন্তু মা-ই ছিলেন প্রধান। ছিলেন করিৎকর্মা ও স্পষ্টভাষী। তাই দাদির সঙ্গে সব সময় একটা ‘মুখোমুখি’ হতে দেখেছি। নাইওরে যেতে হলেও দাদিকে তাই আগে ম্যানেজ করতে হতো। আমাদের ঘর ছিল মাতৃতান্ত্রিক; দাদি ঘরের সর্বময় কর্ত্রী। তার হুকুমে বাঘে-মোষে একঘাটে জল খায়। হুঁকাতে টান দিয়ে কিংবা বিড়ি টেনে দাদি অনুমতি দিলে পরে খবর পাঠানো হতো নাইওর নিতে আসতে। মাঠ পেরিয়ে, বন পেরিয়ে, হাওর পেরিয়ে দূরের গ্রাম থেকে ছোট মামা হেঁটে, কিংবা নৌকা নিয়ে আসতেন। অবশ্য বিয়ের পর পর কয়েকবার নাকি মা সওয়ারি করে নাইওর যেতেন, আমি দেখিনি। মায়ের সঙ্গে নাইওর যাওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে মধুর স্মৃতি।

নাইওর যাত্রার সময় মায়ের সঙ্গে থাকত কাপড়-চোপড়ভরা একটি টিনের বাক্স, সন্দেশের ঝুড়ি, বিভিন্ন ধরনের চালের পোঁটলা, বড়ো মাছ, মোরগ, কলার কাঁদিসহ নানা উপঢৌকন। অবশ্য সবই দাদির পক্ষ থেকে। বেয়াইন-বেয়াইরের উদ্দেশে। যাত্রার আগে থেকেই বাবা কেমন গম্ভীর হয়ে যেতেন, মায়ের সঙ্গে কথা এতটা হতো না। আম্মা শুধু গড় গড় করে কথা বলতেন। আব্বা বলতেন, আইও তাড়াতাড়ি। আম্মা হয়তো বলতেন, আর আইতাম নায়। বাবা আরও মলিন হয়ে উঠতেন। এদিকে বছর বছর আমার সঙ্গীসংখ্যা বাড়ছিল; বাড়ছিল মায়ের কাছে যেমন মামাবাড়িতেও মায়ার ভাগবাটোয়ারা। আমারও ঈর্ষা বাড়ছিল দিনকে দিন; আগে আমাকেই গুরুত্ব দেওয়া হতো, এখন তাতে কমতি পড়ছে। আবার বাপের বাড়িতে মায়ের নাইওর একার ছিল না। তখন তার বোনেরাও নাইওর আসত; আসত আরও অনেক নিকট ও দূরাত্মীয়েরা। আর সারাবেলা নানা ধরনের মৌসুমি ফল ও খাবারের আয়োজন লেগেই থাকত বাড়িজুড়ে। হুটোপুটি, দৌড়াদৌড়ি, গান-গীত আর ধামাইলনাচ চলত গভীর রাত অবধি। জোসনা রাতে উঠোনে গোল হয়ে কত যে গালগল্প ইয়াত্তা নেই।

মা বাপের বাড়ি পৌঁছালে বাড়ি ভেঙে সকলে বাড়িতে ঢোকার রাস্তায় নেমে আসত কিংবা নৌকাঘাটে। প্রথমেই নানা ও নানিকে জড়িয়ে ধরত মা, কাঁদত; কদমবুসি করত শ্রেণিমতো। তারপর ঘরে খাটের ওপর বসত। পাখা দিয়ে অনেকে আমাদের বাতাস করত। আর সকলে মিলে আমাকে ও আমার ভাইবোনদের কত আদর-যত্ন করত; আমাদের পা মাটিতে পড়ে না। স্বামীর বাড়িতে যেখানে বিশ্রামহীন কাজ আর কাজ; কথা কওয়ার ফুরসত নাই, বাপের বাড়িতে সেই মায়ের কত যে কথা সকলের সঙ্গে। তখন মাকে অনেক সুন্দর লাগত। মা সেজে-গুঁজে থাকত; পরনে নতুন শাড়ি, গায়ে গয়না আর গয়না। মায়ের বাইশ ধরনের গয়না ছিল। সোনার আর রুপার। মাকে বউ বউ লাগত। কানের ঝাপটা আর বাজুবন্দ বেশি পছন্দ করতাম আমি। মায়ের মাঝারি স্বাস্থ্য, কটা চোখ আর সোনার বরণ চামড়ার ঔজ্জ্বল্য চারদিক ভরে তুলত। আমিও কাছাকাছি থাকতাম সব সময়। মায়ের নাইওরের সময়সীমা ছিল দশ দিন থেকে পক্ষকাল পর্যন্ত। তারপর বিদায়ের দিন আসত, আর মাও বেদনায় ঘনীভূত হয়ে উঠত।

নাইওরে বাবা কখনও মায়ের সঙ্গী হয়েছেন বলে আমার মনে পড়ে না। সন্তানাদি হওয়ার পরে সিলেটে একমাত্র বউপাগলেরা বউয়ের সঙ্গী হতো, এটা অনেকটা নিন্দার বিষয় ছিল। নাইওর নিতে আসবে বাপের বাড়ির কেউ, বড়জোর ফেরত আনতে স্বামী যেতে পারে। তবে সঙ্গে বাপের বাড়ির কেউ থাকতে হবে। এটা অবশ্যই মর্যাদার প্রশ্নে। বাপের বাড়ি থেকে কী আসছে সেটাও একটা বিষয় ছিল। ফেরার সময় বুঁচকা-বুঁচকিতে আমাদের নাও ভরে যেত। শুকনার মৌসুমে ছোটোমামা ভার নিয়ে আসতেন। অথবা সন্দেশ ছাড়াও নানা ধরনের ফসল, বিভিন্ন ধরনের চাল, মোরগ, কখনও ছাগল ও গরু, কাঁথা, বেতের পাটি নাওয়ে ঠাঁই পেত। স্বামীর বাড়ি থেকে কী নিয়ে গিয়েছিলেন মা, এটা বড়ো প্রশ্ন কখনও ছিল না; সঙ্গে কী নিয়ে আসতেন এটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঘরের চেয়ে পাড়ার লোকদের চোখ এতে চেয়ে বেশি সজাগ থাকতে দেখেছি।

আমাদের পাশের পাড়া ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। বারো মাস ওখানে পূজা-পার্বণ লেগেই থাকত। আমরা বেশ উপভোগ করতাম দুর্গাপূজা। সেই ছোটবেলায় দুর্গাপূজার মহালয়া থেকে বিসর্জন পর্বের সঙ্গে মায়ের নাইওয়ের অদ্ভুত মিল দেখতাম আমি। নাইওরের যাওয়ার সময় অর্থাৎ বাপের বাড়িতে পৌঁছে মায়ের কী হাসিখুশি, আর ফেরত আসার বেলায় কী কান্নাকাটি মায়েঝিয়ে। মা কাঁদতে কাঁদতে চোখ লাল করে ফেলত। আর বারবার পেছন ফিরে তাকাত। বাপের বাড়ি অদৃশ্য হওয়ার পরেও সেদিকে তাকিয়ে থাকত। আর মায়ের রোদন দেখে আমারও কান্না পেত, কিন্তু মা কেন কাঁদত আমি বুঝে উঠতে পারতাম না।

এই যে আমার মায়ের নাইওরের গল্প লিখলাম তা কেবল আমার মায়ের নয়, বলতে গেলে সকল বাঙালি মায়েরই। কারণ নাইওর বাঙালির নৃতত্ত্ব ও সংস্কৃতির অংশ; জ্ঞাতিত্ব, লিঙ্গ-সম্পর্ক, সামাজিক বিনিময় ও সংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এ ছাড়া নাইওরের সঙ্গে পুরনো দিনের পারিবারিক, সামাজিক ও সংস্কৃতিক প্রথাই জড়িত নয়, এর সঙ্গে আবেগের প্রতীকও বিদ্যমান। শব্দটির ব্যুৎপত্তি হয়েছে প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষার ‘জ্ঞাতিগৃহ’ শব্দ থেকে। বাংলায় শব্দটি গৃহীত হয়েছে নৃতাত্ত্বিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক পরিভাষা হিসেবে। সঙ্গে পরিভাষাটির বদলে গেছে অর্থও। প্রথমে অর্থ সংকোচন হয়েছে, তারপর অর্থের বিস্তারও ঘটেছে। মূলেও ‘আত্মীয়ের গৃহ’ থেকে ‘পিতৃকুলের গৃহ’তে অর্থপরিবর্তন ঘটে এবং তা পিতৃতান্ত্রিক সমাজকাঠামোর ইঙ্গিত দেয়। তাই বাঙালির পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কালে শব্দটি গৃহীত হয় এমনটা ভাবাই যায় এবং পরিভাষাটিও পিতৃতন্ত্রকে বহন করে।

বাঙালির সংস্কৃতি অনুযায়ী বিয়ের পর নারীকে পিতৃগৃহ ত্যাগ করতে হয় এবং তার স্থায়ী আবাস হয় শ্বশুরগৃহ বা স্বামীর পরিবারে। এই পরিস্থিতিতে বিয়ের পর নারীটি মাঝে মাঝে সামায়িক কালের জন্য পিতৃগৃহে অবস্থানের সুযোগ পায়। পিতৃগৃহে এমন সাময়িক অবস্থানের আচার বা প্রথাটিই ‘নাইওর’ নামে অভিহিত করা হয়; পিতৃগৃহে অবস্থানের সূত্রেই এমন নামকরণ। কিন্তু পরবর্তীকালে শুধু পিতৃগৃহে নয়, পিতৃতুল্য কিংবা মাতৃতুল্য কিংবা রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়, এমনকি রক্তের বন্ধন নেই এমন কুটুম্বের বাড়িতে সাময়িক অবস্থানের প্রথাটিও ‘নাইওর’ নামে অভিহিত হয়। অর্থাৎ এক্ষেত্রে নাইওর শব্দের অর্থের প্রসার ঘটে। অবশ্য এমনও হতে পারে নাইওর প্রথমে জ্ঞাতিগৃহে অবস্থান থেকে বৈবাহিক সূত্রে পরবর্তীকালে নারীর পিতৃগৃহে অবস্থান অর্থে অর্থসংকোচ ঘটেছে। এটি যদিও গবেষণার বিষয়। অবশ্য নাইওর বলতে মূলত পিতৃতান্ত্রিক বাঙালি সমাজে বিয়ের আচার হিসেবে নারীর পিতৃগৃহে সাময়িক যাত্রা ও অবস্থানকে বোঝায়; যা আবার অনেক আচারের সমবায়ে গঠিত। 

এমন আচার বা প্রথা উদ্ভবের পেছনে রয়েছে ভূগোল, উৎপাদন-ব্যবস্থা, জ্ঞাতিত্ব, সমাজকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রভৃতি কারণ। বিয়ের মাধ্যমে আমাদের সমাজব্যবস্থায় নারীরা জন্মপরিবার থেকে ভৌগোলিক ও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আগেকার দিনে যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার জন্য নারীর জন্য বিয়েটা অনেকটা পিতৃকুল থেকে নির্বাসনের মতোই ছিল। অথচ নাইওরের আচারের মাধ্যমে সবরকম বিচ্ছিন্নতার মধ্যে একটা পুনঃসংযোগের সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা রাখা হয়। বিষয়টা এমন দাঁড়ায় যে নাইওর নারীর ক্ষেত্রে সামাজিকভাবে স্বীকৃত ও আচারবদ্ধ পিতৃগৃহে প্রত্যাবর্তন। এই প্রত্যাবর্তন নানা দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ বটে। কেননা আচারটি কিছু বাস্তব ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছিল। কেবল যে রক্তসম্পর্কীয় ও বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়তার সম্পর্কের ভারসাম্যের জন্য ব্যবস্থাটি তৈরি হয়েছিল তা নয়। এটি সামাজিক দায়িত্ব, সম্পদ বণ্টন, পারস্পরিক সহযোগ দেওয়া ও আবেগের একটি ক্ষেত্র ছিল। জ্ঞাতিত্ব টিতে থাকে আত্মীয়তায়, নাইওর তাই একটি আত্মীয়-ব্যবস্থাও। এ ছাড়া নারীর মনোদৈহিক স্থিতাবস্থা ও ভারসাম্যের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। 

কৃষিভিত্তিক সমাজে পিতৃতন্ত্রে বিয়ে নারীকে শেকড়চ্যুত করে। নারীর এই স্থানান্তরে মানসিক অভিঘাত তৈরি করে। কারণ এতে পরিচিত পরিবেশ, মা-বাবা, পরিজন, প্রতিবেশী, শৈশবের স্মৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নারী এক নতুন সামাজিক পরিবেশে প্রবেশ করে। নাইওর যদিও এই শেকড়চ্যুতির সম্পূর্ণ অবসান ঘটায় না, তবু এটি নারীকে সাময়িকভাবে নিজের শেকড়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। ফলে নারীর মানসিক ভারসাম্য ও পারিবারিক সম্পর্ক ও বন্ধুন অটুট থাকে। অর্থাৎ বিয়ের পর একজন নারী এমন এক মধ্যবর্তী অবস্থায় থাকে যেখানে সে পুরনো পরিচয় ছেড়ে এসেছে এবং নতুন পরিচয়ে পুরোপুরি স্থিত হয়নি। এই অবস্থায় নাইওর একটি সংযোগ সেতু তৈরি করে। এটি এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিসর যে নারীটি সাময়িকভাবে পুরনো পরিচয়ে ফিরে যেতে পারে, আবার নতুন পরিচয়েও ফিরে আসার শক্তি অর্জন করতে পারে। আবার অনেক সময় স্বামীগৃহে নারী দিনের বেলায় স্বামীর সঙ্গে সহজে মেশার সুযোগ পায় না। নাইওরে এলে স্বামীকে সে সারাবেলা কাছে পায় এবং পিতৃগৃহে অবাধে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে তোলার একটা সুযোগ ঘটে। এ ছাড়াও রক্তের সম্পর্ক নেই এমন একটি মানুষ মেয়েজামাইকে যত্ন-আত্তিতে পরম আত্মীয় করে তোলারও একটা পরিসর এখানে মেলে। এতে জামাইয়ের সঙ্গে শ্বশুরবাড়ির সম্পর্কও সহজ হয়ে ওঠে।

নাইওরের নানা উপলক্ষ থাকত। যেমন বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব, ফল ও ফসলের ঋতু, সামাজিক ও ধর্মীয় আচার প্রভৃতি। এমন সব সময়ে একদিকে আত্মীয় সমাগম যেমন ঘটে, তেমনি উপহার ও পারস্পরিক বিনিময়েরও একটা গভীর সম্পর্কও বিদ্যমান। নাইওরে যেমন মেয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে অনেক কিছু নিয়ে আসে, তাতে ওই পরিবারে তার অধিকার ও নিরাপত্তাকে প্রমাণ করে। আবার বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে আসা উপঢৌকনকে নিছক বস্তুগত বিষয় ভাবা চলে না। সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা ছাড়াও তা একটি সাংস্কৃতিক পদ্ধতি। উপহার বিনিময়ের মাধ্যমে পারস্পরিক দায়বদ্ধতা ও সহযোগ, সম্পর্ক ও বন্ধনকে পুনর্ব্যক্ত করে। সুতরাং বিষয়টি অর্থনৈতিক মাত্র নয়, মেয়েটি স্বামীবাড়ি চলে যাওয়ার পরেও সে যে এ পরিবারের একজন এবং সম্পত্তিতে তারও ভাগ আছে তাও জানান দেওয়া হয়। স্বামীর বাড়ি চলে যাওয়া মানেই পর হয়ে যাওয়া নয়, সবকিছু আগের মতো আছে এই মানসিক শক্তি দিয়ে নারীকে এই আচার উজ্জীবিত করে।

আধুনিককালে আবেগকে কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতি হিসেবে দেখা হয় না, বরং এটি বিবেচিত হয় সাংস্কৃতিকভাবে নির্মিত এবং সামাজিকভাবে নিয়ন্ত্রিত অভিজ্ঞতা হিসেবে। নাইওরকে কেন্দ্র করে যে-স্মৃতি, উদ্বিগ্নতা, প্রতীক্ষা, আকুলতা, আনন্দ, কান্না, বিচ্ছেদ তা কেবল ব্যক্তিক নয়, তা সামাজিভাবে স্বীকৃত ও সাংস্কৃতিকভাবে চর্চিত। বাপের বাড়ির কাকপক্ষী দেখে হর্ষ প্রকাশ, নাইওরে এসে কিংবা বিদায়ে বিলাপ করে কান্না প্রভৃতি প্রত্যাশিত সাংস্কৃতিক আচরণ।

নাইওর বাঙালি লোকজীবনের প্রধান একটি অনুষঙ্গ হিসেবে আমাদের লোকসাহিত্যে এমনকি আধুনিক সাহিত্যে তা নানাভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য, লোকগান, পালাগান, ভাটিয়ালি, সারি, পল্লীগীতি; বিশেষ করে বিয়ের গীত ও ধামাইলে নাইওর অনুষঙ্গে বাঙালির ঘরকন্না, আবেগ, বিরহ ও বিচ্ছেদ যেভাবে রূপায়িত হয়েছে তার তুলনারহিত। বিশেষ করে নারীর জবানিতে নারীজীবনের যন্ত্রণা, দাম্পত্যদুঃখ, মর্মপীড়া যেভাবে অনুভূত হয়েছে তাতে নারীর পিতৃগৃহ থেকে বিচ্ছেদের স্বরূপ উন্মোচিত হয়। এমনকি আধুনিক কবি জসীমউদ্‌দীনের কাব্যে কিংবা ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কথাসাহিত্যে নাইওরের যে স্মৃতি, বিচ্ছেদ, পরিচয় ও প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা রূপায়িত হয়েছে তাতে নাইওর এক আবেগের ভাষাই নির্মাণ করেছে। সাহিত্যে নাইওর আবার কারও কাছে নিজের শেকড়ে, শৈশবে ও হারিয়ে যাওয়া পরিচয়ে ফিরে যাওয়া; কারও-বা কাছে স্রষ্টার কাছে প্রত্যাবর্তনেরও রূপক। অবশ্য সে ভিন্ন প্রসঙ্গ।

কিন্তু জীবন পরিবর্তনশীল। পরিবর্তনশীল জীবনে বদলে গেছে বেঁচে থাকার ধরন ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গগুলো। তাই নাইওর আধুনিক বাঙালিজীবনে আগের মতো আর নেই। তবে নাইওরের মূল চেতনা আমাদের লোকসংস্কৃতিতে এখনও বিদ্যমান। তাই নানা উপলক্ষ, উৎসব ও আয়োজনে স্থানচ্যুতি ও স্থানচ্যুতির বিপরীতে সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার এক মানবিক প্রচেষ্টা হিসেবে নাইওর আমাদের জীবনে আকাঙ্ক্ষিত। এই আকাঙ্ক্ষা এই কারণে যে এই আচার, এই প্রত্যাবর্তন আত্মীয়তা-সংস্কৃতি কিংবা জ্ঞাতিত্বকে পুনরুৎপাদন করে, বিস্তৃত করে এবং আত্মনির্মাণ করে।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা