× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নাই আর নাইওর

মারুফ কামাল খান

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

কামরুল হাসানের চিত্রকর্ম ‘নাইওর’

কামরুল হাসানের চিত্রকর্ম ‘নাইওর’

নাইওর কথাটি শুনলেই এখনও বুকের ভেতর ছলকে ওঠে রক্ত। ফিরে যাই স্মৃতিময় শৈশব-কৈশোরে। আমার ওই বয়সটা কেটেছে দাদাবাড়িতে। দাদা-দাদির কাছে ‘মানুষ’ হয়েছি আমি। যদি সত্যিই তা হয়ে থাকি। পূর্ব বগুড়ার গ্রাম থেকে টাঙ্গাইলের করটিয়া। দূরের পথ। আমার দাদি বছরে একবার কদিনের জন্য নাইওর যেতেন তার বাবার বাড়ি। আমি হতাম তার সফরসঙ্গী। গরুর গাড়ি কিংবা পালকি করে যমুনার ঘাট। সেখান থেকে লঞ্চ কিংবা নৌকা চড়ে যেতে হতো জগন্নাথগঞ্জে। তারপর রেল এবং অন্তত দুরকমের মোটর গাড়ি করে পৌঁছাতে হতো করটিয়া।

আমার মায়ের সঙ্গে একবার জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে তার বাবার বাড়ি যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। ছোট চাচির সঙ্গে একবার গিয়েছিলাম তাদের বাপের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ফুলপুরে। বড় চাচিকেও একবার আমি জামালপুর জেলার ইসলামপুরের কুলকান্দিতে তার বাবার বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলাম। অবশ্য তখন আমি বেশ বড়। কলেজে পড়ি। আমার সালিমা ফুপুকেও একবার জামালপুর শহর থেকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসার দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল আমাকে। নাইওরের সরাসরি অভিজ্ঞতা আমার এটুকুই। তবে অভিজ্ঞতা দীর্ঘ না হলেও আমার স্মৃতিতে তা বিপুল হয়ে আছে।

শরতের শিউলিঝরা ভোর কিংবা হেমন্তের কুয়াশামাখা সোনালি সকাল প্রকৃতির রূপবদলের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার গ্রামীণ বধূর মনে এক অদ্ভুত চঞ্চলতা খেলা করে যেত। মাটির ঘরের দাওয়ায় বসে চাল ঝাড়তে ঝাড়তে কিংবা পুকুর ঘাটে কলসি কাঁখে বধূটি যখন দূর আকাশের পানে চেয়ে উদাস হতো, তখন তার চোখের কোণে ভেসে উঠত এক চিলতে চেনা উঠোন, চেনা তুলসীতলা আর শৈশবের সেই চেনা বকুল গাছটি। এই উদাসীনতা কোনো বিষাদের নয়, এ হলো এক পরম প্রাপ্তির প্রতীক্ষা। এই প্রতীক্ষার নাম ‘নাইওর’। 

নাইওর কেবল কটি অক্ষরে গড়া একটি শব্দমাত্র নয়; এ হলো বাঙালির আবহমান সংস্কৃতির এক অনন্য দলিল, নারীর হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক টুকরো খণ্ডিত আকাশ। বিয়ের পর যে মেয়েটি চেনা উঠোন, চেনা মানুষ আর চেনা বাতাসকে এক লহমায় পর করে দিয়ে অন্যের ঘরের পিঞ্জরে বন্দি হয়েছিল, তার জন্য নাইওর ছিল সেই খাঁচার দুয়ার খুলে দেওয়ার চাবিকাঠি। বাবার বাড়ি যাওয়ার এই আনন্দযাত্রার সঙ্গে মিশে থাকত একাধারে তীব্র আনন্দ, দীর্ঘদিনের জমানো দীর্ঘশ্বাস, আর শৈশবের ধুলোবালি মাখা স্মৃতির রোমন্থন। এটি যেন এক চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক ক্যানভাস, যেখানে রঙ-তুলির আঁচড়ে আঁকা থাকে এক বাঙালি নারীর জীবনকাব্য।

আগেকার দিনে যোগাযোগব্যবস্থা আজকের মতো এত মসৃণ কিংবা যান্ত্রিক ছিল না। কিন্তু সেই অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার বুকেই লুকিয়ে ছিল এক প্রবল আবেগমাখা এক নান্দনিক রোমাঞ্চ। নাইওরের দূরত্ব এবং অঞ্চলভেদে যানবাহনের বৈচিত্র্য ছিল দেখার মতো।

নতুন বধূর নাইওরের সবচেয়ে অভিজাত এবং রোমান্টিক মাধ্যম ছিল পালকি। কাঠের তৈরি নান্দনিক নকশাখচিত পালকি যখন চারজন বেহারার কাঁধে চড়ে গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে যেত, তখন বেহারাদের মুখের সেই চিরাচরিত গান ‘হুম না, হুম হুনা’ বাতাসে এক মায়াবী সুরের জলতরঙ্গ তুলত। পর্দার আড়াল থেকে নতুন বউটি ঘোমটা একটুখানি সরিয়ে উঁকি দিয়ে দেখত তার চেনা গ্রামটি কতদূর। আর দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত পরিবারে চলছিল বাঁশের তৈরি ‘ডুলি’র।

শুকনো মৌসুমে ফসলের মাঠের বুক চিরে চলা ধূলিধূসরিত পথে নাইওরের প্রধান বাহন ছিল ছইতোলা গরুর গাড়ি কিংবা টমটম (ঘোড়ার গাড়ি)। গাড়ির চাকার ‘কিচ কিচ’ শব্দ আর বলদের গলায় বাঁধা ঘণ্টির টুংটাং আওয়াজ যেন নাইওরের আগমনী গান গেয়ে যেত। খড়ের গদিতে কাঁথা বিছিয়ে কোলের শিশুকে নিয়ে বধূটি যখন বসত, তখন তার চোখে থাকত বাবার বাড়ির সান্নিধ্য পাওয়ার এক তীব্র ব্যাকুলতা।

নদীমাতৃক বাংলাদেশের বর্ষা বা শরতের নাইওরের রূপ ছিল আরও অপার্থিব। থই থই জলের বুক চিরে যখন গহনার নৌকা বা ছইওয়ালা নাও নাইওরিদের নিয়ে ছলাৎ ছলাৎ শব্দে এগিয়ে চলত, তখন নদীর বাতাস বধূর উড়ন্ত আঁচল ছুঁয়ে যেত। মাঝির ভাটিয়ালি গান আর পানির কলতান মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত নববধূর মনের গুঞ্জনের সঙ্গে।

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। আর এই প্রতিটি পার্বণই ছিল নাইওরের একেকটি সোনালি উছিলা। গ্রামীণ সমাজে বধূদের সারা বছর নিজের ইচ্ছায় বাপের বাড়ি যাওয়ার সুযোগ মিলত না। তাই ক্যালেন্ডারের পাতা ঘুরে যখনই কোনো উৎসবের আগমন ঘটত, বধূর মনও তখন ডানা মেলার জন্য আকুল হয়ে উঠত।

শীতের আমেজ আসতেই গ্রামীণ বধূর মন চঞ্চল হয়ে উঠত। ঢেঁকিশালে চাল কোটার শব্দ আর খেজুর রসের সুবাস যখন বাতাসে ভাসত, তখন বাপের বাড়ির পিঠা উৎসবের নিমন্ত্রণ এসে পৌঁছাত। নতুন ধানের চালের গুঁড়ো দিয়ে মা-চাচিদের তৈরি ভাপা, পুলি আর পাটিসাপ্টার স্বাদ নেওয়ার জন্য নাইওরের চেয়ে বড় কোনো আনন্দ হতে পারত না।

হেমন্তে যখন মাঠের সোনালি ধান কাটা শেষ হতো, তখন গ্রামীণ জীবনে আসত নবান্ন। এই নতুন ধানের অন্ন মুখে দেওয়ার জন্য মেয়েকে বাপের বাড়ি আনা ছিল এক অলিখিত নিয়ম। আবার জ্যৈষ্ঠের তীব্র গরমে যখন আম, জাম, কাঁঠাল পাকত, তখন মধুমাসের নাইওরের ধুম পড়ে যেত। জামাইসহ মেয়েকে বাপের বাড়ি এনে আম-কাঁঠাল খাওয়ানোর সেই উৎসব ছিল মধুময়।

মুসলমানের দুই ঈদ কিংবা হিন্দুর দুর্গাপূজার মতো বড় ধর্মীয় উৎসবগুলোতে নাইওর ছিল বাধ্যতামূলক। ঈদের চাঁদ দেখার আনন্দ কিংবা পূজার ঢাকের আওয়াজ যেন বাপের বাড়ির আঙিনাকে আরও বেশি মুখরিত করে তুলত। নতুন শাড়ি পরে চেনা বান্ধবীদের সঙ্গে শৈশবের গল্পে মেতে ওঠার এইতো মোক্ষম সুযোগ।

এ ছাড়া অনেক পরিবারে ছিল ‘সাংবাৎসরিক নাইওর’-এর চল। বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে নিয়ম করে মেয়েকে বাপের বাড়ি নিয়ে আসা হতো, যা ছিল গ্রামীণ পারিবারিক সম্পর্কের এক মজবুত সুতো।

নাইওর কেবলই আনন্দের নয়, এর পরতে পরতে লুকিয়ে থাকে গভীর বেদনা আর স্মৃতিকাতরতা। বাপের বাড়িতে কাটানো দিনগুলো যেন এক পলকেই শেষ হয়ে যেত। নাইওরের দিনগুলো যখন ফুরিয়ে আসত, তখন বধূর মনে মেঘ জমতে শুরু করত। মায়ের চোখের জল, বাবার ম্লান মুখ আর ভাই-বোনের আকুল বিদায় নাইওরের আনন্দকে এক মুহূর্তে বেদনার সাগরে ভাসিয়ে দিত।

শ্বশুরবাড়ির কঠোর নিয়মের বেড়াজাল থেকে কদিনের জন্য মুক্তি পেয়ে যে মেয়েটি আবার মুক্ত পাখির মতো ডানা মেলেছিল, বিদায়লগ্নে তার ডানা দুটি যেন ভারী হয়ে উঠত। চেনা মেঠোপথ দিয়ে যখন সে আবার শ্বশুরবাড়ির পথে রওনা হতো, তখন তার পেছনে পড়ে থাকত শৈশবের সোনালি দিনগুলো, আর সামনে অপেক্ষা করত এক একঘেঁয়ে যান্ত্রিক জীবন। নাইওরের এই আসা-যাওয়ার মাঝেই একজন বাঙালি নারী তার জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পেত। এটি ছিল তার মনের ব্যাটারি রিচার্জ করার মতো; যা তাকে আগামী একটি বছর শ্বশুরবাড়ির সব ঝড়ঝাপটা সহ্য করার শক্তি জোগাত।

বাঙালির এই চিরন্তন আবেগ সাহিত্যিকদের কলমেও বারবার নান্দনিকভাবে ফুটে উঠেছে। পল্লীকবি জসীমউদ্‌দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ কিংবা ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’-এ গ্রামীণ নারীর এই নাইওরের আকুতি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চিত্রিত হয়েছে। লোকসংগীতে নাইওরের আকুলতা যেন আরও বেশি হৃদয়স্পর্শী :

‘প্রাণ কান্দে রে বাপের বাড়ীর লাগিয়া...’

কিংবা

‘বাজানে কয় যাও, মাওজানে কয় যাও

হায় হায় শ্বশুর-পুতে নিবার আইছে লইয়া ছৈয়াল নাও’

অথবা ‘কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া/ আমার ভাইধনরে কইয়ো নাইওর নিতো বইয়া’

এই গানগুলো কেবল সুরের মূর্ছনা নয়, এগুলো হলো শত শত বছর ধরে বাঙালি নারীর বুকের ভেতর চেপে রাখা কান্নার শব্দরূপ। নাইওরের লোকগাথা ও পালাগানগুলো প্রমাণ করে যে, এটি কেবল একটি সামাজিক প্রথাই ছিল না, বরং এটি ছিল আমাদের লোকসংস্কৃতির এক অন্যতম প্রধান উপাদান।

আজকের একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে যখন আমরা পেছনের দিকে তাকাই, তখন দেখি মহাকালের নিয়মে অনেক কিছুই বদলে গেছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতি আর নগরায়ণের ছোঁয়ায় গ্রামীণ জীবন থেকে হারিয়ে গেছে সেই পালকি, হারিয়ে গেছে গরুর গাড়ির চাকার সেই চেনা আওয়াজ। গহনার নৌকা আজ কেবলই স্মৃতির পাতায় বন্দি, তার জায়গায় দখল নিয়েছে দ্রুতগতির যান্ত্রিক স্পিডবোট কিংবা ট্রলার।

যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন অনেক সহজ। এখন বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য কোনো বিশেষ তিথি, নক্ষত্র কিংবা উৎসবের অজুহাত খুঁজতে হয় না। মুঠোফোনের এক ক্লিকেই মা-বাবার মুখ দেখা যায়, নিমেষেই পৌঁছে যাওয়া যায় চেনা চৌকাঠে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় যোগাযোগের এই অতি-আধুনিকতা কি নাইওরের সেই চিরাচরিত মায়াকে টিকিয়ে রাখতে পেরেছে?

আজকের ব্যস্ত জীবনে নাইওরের সেই ‘প্রতীক্ষার আনন্দ’টুকু কোথাও যেন হারিয়ে গেছে। আগেকার দিনে নাইওরের যে আকুলতা ছিল, মাসের পর মাস ধরে যে চিঠি চালাচালির প্রতীক্ষা ছিল, আজ তা যান্ত্রিকতার ভিড়ে ম্লান। তবুও রূপ পাল্টালেও নাইওরের মূল চেতনা কিন্তু হারিয়ে যায়নি। আজও ঈদের ছুটিতে কিংবা পূজার আমেজে যখন শহরের ইট-কাঠের খাঁচা থেকে নারীরা শেকড়ের টানে গ্রামের বাড়ির দিকে ছুটে যায়, তখন সেই যাত্রার ভেতরেও লুকিয়ে থাকে একবিংশ শতাব্দীর এক আধুনিক ‘নাইওর’।

নাইওর হলো আমাদের শেকড়ের টান। এটি মনে করিয়ে দেয়, নারীরা যতই অন্যের ঘরের লক্ষ্মী হোক না কেন, তাদের একটা নিজস্ব আকাশ ছিল, যেখানে তারা মুক্ত মনে শ্বাস নিতে পারত। নাইওর বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতির এমন এক অনিন্দ্য অলংকার, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারীর আনন্দ, বেদনা, ত্যাগ আর ভালোবাসাকে ধারণ করে আসছে। পালকি বা গহনার নৌকা আজ জাদুঘরে স্থান পেলেও বাঙালি নারীর হৃদয়ে বাপের বাড়ির প্রতি যে চিরন্তন টান, তা চিরকাল অক্ষয় থাকবে। নাইওর বেঁচে থাকবে বাঙালির মনস্তত্ত্বে, মরমি গানে আর মেঠোপথের ধুলোয় লেখা স্মৃতির আলপনায়।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা