আবু হাসান শাহরিয়ার
ধ্রুব এষ
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৬ ১৩:২৭ পিএম
আবু হাসান শাহরিয়ার, জন্ম: ২৫ জুন ১৯৫৯। প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল
একার সন্ন্যাস আয়ত্ত করা কঠিন।
আবু হাসান শাহরিয়ার আয়ত্ত করেছেন।
সন্ন্যাস কী?
শাস্ত্রমতে চতুর্থ আশ্রম। এবং এটা সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক।
দুই ধরনের সন্ন্যাসীর কথা বলা আছে। নৈষ্ঠিক সন্ন্যাসী, বিরক্ত সন্ন্যাসী। গৃহী সন্ন্যাসী বহু পরের ন্যারেটিভ। সন্ন্যাসের সঙ্গে গৃহত্যাগ জড়িত। আবু হাসান শাহরিয়ার কোন একার সন্ন্যাসের কথা বলেন?
সাহিত্যগত প্রাণ এই মানুষটা। সাহিত্যে থাকেন, সাহিত্যে বাঁচেন। অতএব তার যে একার সন্ন্যাস, যে একার সন্ন্যাসের কথা তিনি বলেন, সেটাও সাহিত্যগত, শিল্পগত এবং সৎÑতর্কে বহু দূর হতে পারে। অনেকের মধ্যে থেকেও বিকল্প এক জগৎ যেনবা। ‘আর্টিস্ট’ তার সেই জগতে ‘একা’ থেকে যেতে পারেন।
আবু হাসান শাহরিয়ার আর্টিস্ট। কবি ও কোবিদ। তাকে পড়ে তাকে বুঝে নিতে হবে। ‘বালিকা আশ্রম’ হাতের কাছে আছে। ‘নিরন্তরের ষষ্ঠপদী’, ‘অব্যর্থ আঙুল’, ‘যাইতাছি যাইতাছি কই যাইতাছি জানি না’Ñ আবু হাসান শাহরিয়ারের বই এসব। ২৫ জুন এই কবির জন্মদিন। জন্ম ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে। ৬৭তম জন্মদিন তবে। শুভ জন্মদিন কবি আবু হাসান শাহরিয়ার।
ফর্মালিটি শেষ। সামান্য ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা করি। আবু হাসান শাহরিয়ার অ্যাজ (AS) শাহরিয়ার ভাই। এক জীবনের পকেটে মানুষ কয়টা জীবন আসলে কাটায়? অসীম সংখ্যক! তবে কয়েকটা জীবন আমাদের শাহরিয়ার ভাইয়ের সঙ্গ সান্নিধ্যে কেটেছে। মাসুক হেলাল, উত্তম সেন, ইমতিয়ার শামীম, শওকত আলী তারা, সাহিদুল আলম টুকু, বাহার রহমান, আমি ইত্যাদি। শাহরিয়ার ভাইয়ের ‘গতি’ ছিল, শাহরিয়ার ভাইয়ের ‘রূপকথা’ ছিল। ‘গতি’ অ্যাড ফার্ম। আমার প্রথম একটা গতি হলো গতি-তে। শাহরিয়ার ভাইয়ের কাছে গিয়েছিলাম। শাহরিয়ার ভাই চাকরি দিয়ে ছিলেন, ‘তুমি কাজ করো আমার এখানে।’
করব। কী কাজ?
‘লোগো করতে পারো?’
‘লোগো কী?’
হা হা! হো হো!
লোগো কী জানি না, অ্যাড ফার্মে কাজ করব!
গতির প্রধান ডিজাইনার ছিলেন ডাব্লিউ ভাই। রাজিউদ্দিন চৌধুরী ডাব্লিউ। এমনিতে আমরা রুমমেট। চারুকলার শহীদ শাহনেয়াজ ছাত্রাবাসের তিন নম্বর রুমে থাকি। লোগো, গ্রিপার মার্ক শেখালেন ডাব্লিউ ভাই। সেট স্কয়ার, ড্রাফটিং পেনের ব্যবহার শেখালেন। জীবনের প্রথম চাকরিÑ পার্টটাইমÑ খুব বেশিদিন করি নাই। পালিয়েছিলাম। মন মতো আরেকটা পার্ট টাইম চাকরি ততদিনে হয়ে গিয়েছিলÑ কাজী আনোয়ার হোসেন সম্পাদিত রহস্যপত্রিকার শিল্প নির্দেশক হিসেবে। বন্ধু সোহেল শিকদারের মাধ্যমে এ সময় নাইম ভাইয়ের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়। নাইম ভাই সাপ্তাহিক পত্রিকা করবেনÑ ‘খবরের কাগজ।’ সেই পত্রিকার শিল্প বিভাগে ডাব্লিউ ভাই, বিপ্লব (বিপ্লব সাহা) ও আমি জয়েন করি। নাইম ভাইয়ের বন্ধু শাহরিয়ার ভাই, যুক্ত ‘খবরের কাগজের’ সঙ্গে। সাপ্তাহিকের পর দৈনিক। ‘খবরের কাগজের’ পর ‘আজকের কাগজ।’ শাহরিয়ার ভাই আজকের কাগজের সাময়িকী সম্পাদনা করতেন। সে এক উজ্জ্বল উদ্ধার। দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী বলতে গৎবাধা যে প্যাটার্নটা ছিল, আজকের কাগজের সাময়িকী তার খোল-নলচে পাল্টে দিয়েছিল। শাহরিয়ার ভাই সবসময়ই আইডিয়ার জাহাজ। আজকের কাগজের পর দৈনিক যুগান্তরের সাহিত্য সাময়িকী, দৈনিক মুক্তকণ্ঠের সাময়িকী, ‘খোলা জানালা’Ñ যতদিন সম্পাদনা করেছেন, নিজের জাতপাত চিনিয়ে করেছেন। একসময় ‘রূপকথা’ প্রকাশনা করলেন। পেপার ব্যাক বইয়ের প্রকাশনা। বিখ্যাত ‘সেবা’ ঘরনার বাইরের পেপারব্যাক। সুমুদ্রিত। আর্ট কার্ডে প্রচ্ছদ ছাপা হতো। রমরমিয়ে চলেছিল। কিন্তু একটা জিনিস নিয়ে বেশিদিন পড়ে থাকবেন, এমন বান্দা কি আমাদের ভাই? গুডউইল সমেত ‘রূপকথা’ একদিন অতি সস্তায় বিক্রি করে দিলেন। আরও বহু আগের কথা বলি। ভিউকার্ড ব্যবসায়ী ‘আজাদ প্রোডাক্টস’ তখনও হয় নাই। শাহরিয়ার ভাই বারোটা ভিউকার্ড প্রকাশ করেছিলেনÑ ‘আগামীকাল’ প্রকাশনার ব্যানারে। হিন্দি সিনেমার নায়ক নায়িকা না, নানা ক্ষেত্রে দেশের তরুণ খ্যাতিমানদের নিয়ে ভিউকার্ডÑ কবি, লেখক, শিল্পী, আলোকচিত্রী, অভিনেতা এক সেট ভিউকার্ডেÑ নজিরবিহীন জিনিস! চলেছিল। শাহরিয়ার ভাই যদি সেই প্রকাশনা অব্যাহত রাখতেন! রাখেন নাই, তাতে কিছু হয় নাই। রাখলে কী হতো তার ধার কি ধারেন? কখনোই শাহরিয়ার ভাই? সব সময়ই নিত্য নতুন ধারণার বশবর্তী ওয়ার্কোহলিক এই আলাদা মানুষটা। এখন তার একার সন্ন্যাসে আছেন। থাকুন। বহুকিছু তার কাছে শিখেছি।
অনেক ভালোবাসা, শাহরিয়ার ভাই
আমি একটা দিনও ভুলি নাই।
Ñআপনার ধ্রুব
১৭.০৬.২৬