ভোলায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
জুয়েল সাহা বিকাশ, ভোলা
প্রকাশ : ১৭ জুন ২০২৬ ১৩:১৩ পিএম
ভোলায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দুশ্চিন্তায় ৩ লাখ জেলে
চলতি বর্ষার মৌসুমেও ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে জেলেদের জালে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। এতে বিপাকে পড়েছে ভোলার প্রায় ৩ লাখ জেলে। আর নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ ধরা না পড়ায় এটির প্রভাব পড়েছে দেশের প্রায় ৩৩ ভাগ ইলিশ আহরণের জেলা ভোলার বাজারে। ইলিশ এখন ভোলার বাজারে সোনার হরিণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে ইলিশ কিনতে এসে খালি হাতে ফিরছেন ক্রেতারা। এদিকে বর্ষার মৌসুমে এ বছর নদীতে ইলিশের হাহাকারকে জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব বলছেন ইলিশ গবেষকরা।
সরেজমিন গিয়ে কথা হয় ভোলার সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের কাঠির মাথা, ধনিয়া ইউনিয়নের তুলাতলি, শিবপুর ইউনিয়নের ভোলার খাল, ভেদুরিয়া ইউনিয়নের হাজির হাটসহ বেশ কয়েকটি এলাকার জেলেদের সঙ্গে। এদের মধ্যে ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের কাঠির মাথা গ্রামের জেলে মো. সৈয়দ মাঝি ও মো. মনির হোসেন মাঝি জানান, তারা দুই জন মিলে সকাল ও বিকাল পর্যন্ত সদরের তুলাতুলি মেঘনা নদীতে একটি নৌকা নিয়ে দুবারে প্রায় ৫-৬ ঘণ্টা জাল ফেলেন। কিন্তু তাদের জালে একটিও ইলিশ ধরা পড়েনি। তবে বেশ কয়েকটি বিভিন্ন সাইজের বাটা ও ছুড়া বা তাপসী মাছ পেয়েছেন। তা ঘাটে বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ৫০০ টাকা।

তারা আরও জানান, প্রায় ২০ বছর ধরে তারা জেলে পেশার সঙ্গে জড়িত। নদীতে অনেকবার ইলিশের হাহাকার ছিল। তখনও তারা ২-৪টি ইলিশ পেয়েছেন। কিন্তু এমন শূন্য কখনই হয়নি। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় তারা।
তুলাতুলি গ্রামের জেলে মো. শাজাহান মাঝি ও মজনু মাঝি জানান, প্রতি বছর বৃষ্টিপাত শুরু হলে তাদের জালে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ ধরা পড়ত। কিন্তু এ বছর মে মাসে প্রচুর বৃষ্টিপাত হলেও এখন পর্যন্ত তাদের জালে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ ধরা পড়ছে না। এ বছরের মতো এমন কখনই তারা দেখেননি তাদের জেলে পেশার প্রায় ১৫ বছরেও বলে দাবি করেন তারা। নদীতে ইলিশের এমন সংকট হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা।
ভোলার খাল এলাকার জেলে মো. রাসেল মাঝি ও নজরুল মাঝি জানান, কয়েক দিন আগে নদীতে নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে। ওই সময় অনেক ধার-দেনা করে সংসার চালিয়েছি। এখন আজ বেশ কয়েক দিন ধরে ইলিশ মাছ পাচ্ছি না। এতে সংসার চালাতে মুশকিল হয়ে পড়েছেন। এনজিওর কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। প্রতিদিনই সংসার ও সমিতির কিস্তির চাপ রয়েছে বলে দাবি করেন তারা।
এদিকে নদীতে ইলিশ ধরা না পড়ায় এটির প্রভাব পড়েছে দেশের ৩৩ ভাগ ইলিশ আহরণের জেলা ভোলায়। সরেজমিন গিয়ে কথা হয় ভোলার শহরের কিচেন মার্কেটের ক্রেতা মো. আরিফুর রহমান ও মো. হোসেন জানান, ভোলার শহরের এই মাছ বাজারে আগে বেশিরভাগ মাছ বিক্রেতারাই প্রতিদিন বিভিন্ন সাইজের ইলিশ নিয়ে আসতেন বিক্রি করতে। কিন্তু বেশ কয়েক দিন ধরে ২-৩ জন ইলিশ নিয়ে এসেছেন বিক্রি করতে। তাও আবার হাতেগোনা কয়েকটি ইলিশ। আর তা বিক্রি হচ্ছে উচ্চমূল্যে। বাজারে ইলিশ এখন সোনার হরিণ ও ইলিশের দাম বেশি হওয়ায় উচ্চবিত্তদের খাবারে পরিণত হয়েছে বলে জানান তারা।
অন্যদিকে মাছ বিক্রেতা মো. রুহুল আমিন ও মো. নাগর জানান, তারা আগে প্রতিদিন ইলিশ মাছ বাজার বিক্রি করতেন। কিন্তু বেশ কয়েক দিন ধরে বিক্রি করতে পারছেন না। কারণ ঘাটে ইলিশের সংকট। জেলে মাছ নিয়ে এলে ডাক উঠলে দাম অনেক বেশি উঠে। ঢাকা, বরিশাল ও চাঁদপুরের আড়তে যারা পাইকারি বিক্রি করেন তারাই বেশি দাম দিয়ে কিনে নেয়। আর আমরা লোকাল বাজারে তো বেশি দাম দিয়ে কিনে বিক্রি করতে পারব না। তাই কিনতে পারি না। এজন্য এখন ছোট ছোট মাছ বাজারে বিক্রি করি। এতে তেমন লাভ হয় না। তবে ইলিশ বিক্রি করলে অল্প সময়ের মধ্যে মাছ বিক্রি হয়ে যেত আবার লাভও বেশি হতো।
মাছ বিক্রেতা মো. ইব্রাহীম জানান, ঘাটে আগের মতো ইলিশ কেনা যায় না। অল্প কয়টা কিনে আনি তাও আবার বেশি দাম দিয়ে। আর বাজার দাম বেশি হওয়ায় বিক্রি করতে অনেক সময় লাগে। আগে ৫০০ গ্রামের ইলিশ বাজারে আমরা খুচরা বিক্রি করতাম সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা এখন বিক্রি করি ২২০০-২৫০০ টাকা, ৩০০-৩৫০ গ্রামের ইলিশ আগে ছিল ৫০০-৬০০ টাকা বেশি এখন তা ১৫০০-১৬০০ টাকা, জাটকা আগে বিক্রি করতাম ২০০-৩০০ টাকা কেজি এখন তা বিক্রি করি ১২০০ টাকা কেজি এবং ১ কেজির ওজনের ইলিশ আগে বিক্রি করতাম ১৭০০-২০০০ টাকা এখন তা বিক্রি করি ৪০০০ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা।
এদিকে ভোলার সাত উপজেলায় মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশসহ বিভিন্ন মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন প্রায় ৩ লাখের অধিক জেলে। এদের মধ্যে সরকারিভাবে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা মাত্র ১ লাখ ৬৭ হাজার ৯৭০ জন।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ইলিশ গবেষক ড. মো. আনিসুর রহমান জানান, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে খুব কম পরিমাণ ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। তবে এ নিয়ে গবেষণা করে সঠিক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ইলিশ সম্পদ হুমকির মুখে পড়বে মনে করছেন তিনি। এ ছাড়া জাটকা ও মা ইলিশ ধরার ফলে ধীরে ধীরে ইলিশ উৎপাদনের ওপর প্রভাব পড়ে থাকে বলেও জানান তিনি।