প্রতি বছর বাবা দিবস আসে। একদিন যে সন্তান বাবার হাত ধরে বড় হয়েছে, বাবার হাত ধরে নামাজে যাওয়া, বাজার করা শিখেছে, বাবা দিবস উপলক্ষে উপহার এনে বাবাকে চমকে দিতে চেয়েছে, সময়ের পরিক্রমায় সেই সন্তানই আজ বাবা হয়েছে। প্রথমবার সন্তানের মুখ দেখে অঝোরে কেঁদেছে, রাতের পর রাত মায়ের মতো নবজাতক সন্তানের সাথে সেও হয়তো জেগে আছে। বাবা হলে জীবনে কী কী পরিবর্তন আসে, কী কী ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, সেসব না জানা ছেলেটাও যখন বাবা হয়, তখন থেকে শুরু হয় নতুন এক জীবন। সদ্য বাবা হওয়া কয়েকজনের সাথে কথা বলে তাদের অনুভূতি জানাচ্ছেন আরফাতুন নাবিলা
জীবন বদলে যাওয়া মুহূর্ত
ডাক্তার যখন আমাকে ডেকে বললেন, ‘আপনার একটা ছেলে আর একটা মেয়ে হয়েছে,’ তখন আমি যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, আমি কি ঠিক শুনেছি? তাই আবারও জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কী হয়েছে?’ আমরা আগে থেকে জানতাম না আমাদের সন্তান ছেলে হবে নাকি মেয়ে। তাই খবরটা ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজগুলোর একটি। যখন প্রথম ওদের আমার কাছে নিয়ে আসা হলো, আমি কাঁপা কাঁপা গলায় ওদের কানে আযান দিলাম। আজও সেই মুহূর্তটা মনে পড়লে বুকের ভেতর অন্যরকম একটা অনুভূতি জেগে ওঠে। মনে হয়, ঠিক ওই মুহূর্ত থেকেই আমার জীবনটা বদলে গিয়েছিল।
বাবা মিজানুর রহমানের সাথে ধ্রুব
সন্তানের মুখ প্রথম দেখার পর যে অনুভূতি হয়, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আনন্দ, কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ- সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত অনুভূতি। এটা কাউকে বুঝিয়ে বলা যায় না; শুধু একজন বাবা-ই জানেন সেই অনুভূতির গভীরতা। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত আমি প্রতিদিন বাবা হওয়া শিখছি। ডায়াপার বদলানো, খাওয়ানো, গোসল করানো, ঘুম পাড়ানোÑ সবকিছুতেই নিজেকে জড়িয়ে রাখতে চাই। আমি চাই, আমার সন্তানদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয় হতে। তবে বাবা হওয়ার এই যাত্রায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি আমি শিখেছি, তা হলো সন্তানের মাকে খুশি রাখা। কারণ মা ভালো থাকলে সন্তানও ভালো থাকে। মা হাসলে ঘর হাসে, সন্তান হাসে। একজন সুখী মা-ই সবচেয়ে সুন্দরভাবে সন্তানের যত্ন নিতে পারেন।
এখন যখন দেখি ওদের মা আর আমার ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে খেলছে, হাসছে, সময় কাটাচ্ছেÑ তখন মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য বোধহয় এটাই। জীবনে অনেক স্বপ্ন ছিল, অনেক চাওয়া ছিল। কিন্তু এই ছোট্ট পরিবারটাকে দেখে আজ মনে হয়, আমি আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিগুলোর মাঝেই বসে আছি।
সারা জীবনের সব অর্জন এখন তুচ্ছ লাগে
বাবা দিবস নিয়ে আমার প্রথম স্মৃতি ২০১৩ সালের দিকে, আব্বুকে একটা মানিব্যাগ আর কলম উপহার দিয়েছিলাম। আব্বু সেগুলো তার ড্রয়ারে রেখে দিয়েছিলেন। কিছু বলেননি। আসলে চার বোন, এক ভাইয়ের দায়িত্ব খুব অল্প বয়সে নিজের ওপর চলে আসায়, আমার আব্বুকে বড় হতে হয়েছে অনেকটা আবেগ অনুভূতিহীন হিসেবে, মুখ ফুটে ভালোবাসার কথাগুলো প্রকাশ করা হয়নি সেভাবে। সে তুলনায় আমরা অনেক বেশি প্রিভিলেজড। নিজেদের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে পুঙ্ক্ষানুপুঙ্ক্ষভাবে প্রকাশ করার সুযোগ হয়েছে। আমার মেয়ের জন্ম গত বছর শেষের দিকে, এই ৬ মাসের প্রতিটা সেকেন্ড তাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। সকালে ঘুম ভাঙার পর পাশে তাকিয়ে আগে তার ঘুমন্ত মুখটা দেখে দিন শুরু হয়। আর সে যখন ঘুম ভাঙার পর আমার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দেয়, সত্যি বলতে সেই মুহূর্তে আমার সারাজীবনের সব অর্জন তুচ্ছ মনে হয়। এই হাসিমুখের জন্য আমি কত সহজে বাকি সব বিসর্জন দিতে পারি, ভাবতেই অবাক লাগে।
মেয়েকে কোলে নিয়ে মো. আসিফ উর রহমান
যতক্ষণ অফিসে থাকি, তাকে মিস করি। মন খারাপ লাগলে গ্যালারিতে গিয়ে তার ছবি দেখি। আমার প্রতিটা কাজ, প্রতিটা সিদ্ধান্ত তাকে মাথায় রেখে নেওয়া। আর এর মধ্যেই একটা উপলব্ধি হয়, আমার আব্বু আমার জন্য কেন এমন করেন, সেটা নিজের মেয়ে না হলে সত্যি সত্যি কখনও বুঝতাম না। সেই অর্থে বলতে গেলে, আমার মেয়ে শুধু আমাকে পিতৃত্বের স্বাদ দিয়েছে তা নয়, সন্তান হিসেবেও আমাকে বদলে দিয়েছে। বাবা দিবসের শুভেচ্ছা জানাই সকল বাবাকে, সাথে সন্তানদেরও, যারা আগামী দিনের বাবা-মা হতে যাচ্ছে।
একটুকরো স্বর্গ এবং আমাদের ‘রায়িফ’
জীবন কখনও কখনও এমন কিছু মুহূর্ত উপহার দেয়, যা শব্দের ফ্রেমে বন্দি করা অসম্ভব। গত ২২ মে, ২০২৬ (রোজ শুক্রবার) সন্ধ্যা ৬টা ৪২ মিনিটে উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে আমার জীবনে তেমনই এক মহিমান্বিত মুহূর্তের আগমন ঘটে। কোরবানি ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে ঈদের মাত্র ৫ দিন আগে, আমার ও নাফিসার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার হয়ে পৃথিবীর আলো দেখে আমাদের প্রথম সন্তান— ইরভান নুজাইর রায়িফ। ২০২৩ সালের ১৯ অক্টোবরের পরিণয় সূত্র ধরে আমাদের সংসারে সে নিয়ে এলো এক টুকরো স্বর্গ। রায়িফের আগমনকে ঘিরে হাসপাতালে জমে উঠেছিল এক টুকরো আনন্দমেলা। ওর নানা-নানি আর ছোট্ট দুই মামা তো শুরু থেকেই পাশে ছিলেন। আর ওর জন্মের খবর পেয়েই খুলনা থেকে ছুটে এসেছিলেন ওর দাদা, সাথে আমার দুই বোন, দুলাভাই, আর তিন ভাগ্নে-ভাগ্নি। ওরাও ওদের নতুন জন্ম নেওয়া ভাইকে দেখে ছিল অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত। সাথে ছিলেন ওর ফুপারা। চারপাশের এই অনাবিল আনন্দের মাঝে কেবল একজন মানুষের শূন্যতা বুকটা খাঁ খাঁ করে দিচ্ছিল— তিনি হলেন আমার আম্মা। আজ তিনি বেঁচে থাকলে নাতিকে কোলে নিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হতেন, হয়তো ওপর থেকে তিনি আমাদের দেখছেন ও আশীর্বাদ করছেন।
রায়হান মাহমুদ রাকিব ও নাফিসা ইসলামের কোলে ছোট্ট রায়িফ
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, রায়িফের জন্ম হয়েছে ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনার ঠিক মাঝখানে। একজন কট্টর লিওনেল মেসি ভক্ত হিসেবে এটি আমার জন্য এক চরম পাওয়া! আমাদের পরম যত্নে জড়িয়ে রাখা রায়িফকে যখন আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিতে দেখি, তখন বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। আমার স্বপ্ন, মাঠের জাদুকর লিওনেল মেসির মতোই রায়িফও যেন ক্ষুরধার মেধা, বিনয় আর অনন্য গুণের অধিকারী হয়ে বড় হয়। বিশ্বমঞ্চে ও যেন নিজের একটা আলাদা পরিচয় তৈরি করতে পারে।
রায়িফ শুধু আমাদের সন্তানই নয়, ও আমাদের জীবনের নতুন এক অধ্যায়ের নাম। ওর ওই ছোট্ট তুলতুলে হাত আর নিষ্পাপ চাহনিতে আমি ও নাফিসা আমাদের পুরো পৃথিবী খুঁজে পেয়েছি। বাবা হওয়ার এই অনন্য অনুভূতি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম অর্জন। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, আমাদের রায়িফ যেন সুস্থ, সুন্দর এবং একজন সত্যিকারের আদর্শ মানুষ হিসেবে বড় হয়ে ওঠে। দোয়ায় রাখবেন আমাদের।