লাবিবা ইরম
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৬ ১৪:১৫ পিএম
দূর হোক বাবার সঙ্গে দূরত্ব
বাবার হাত ধরে হাঁটতে শেখা, চলতে শেখা বা স্কুলে যাওয়ার দিনগুলো পার করে আস্তে আস্তে বড় হওয়া পথে অনেক সময়ই আমরা বাবার সঙ্গে সুন্দর, সাবলীল সম্পর্ক হারিয়ে ফেলি। একটা বয়সে এসে এরপর আমরা ভীষণভাবে আক্ষেপ করি এর জন্য। অনেক সময়ই আমরা বাবার সঙ্গে সেই সহজ স্বাভাবিক মধুর সম্পর্কটি ফিরে পেতে চাই কিন্তু বুঝে উঠতে পারি না, কীভাবে সেটা করব। আসছে বাবা দিবস, এই দিবসে বাবার সঙ্গে মানসিক দূরত্ব কাটানোর জন্য রইল কিছু টিপস।
মানসিক দূরত্ব কেন বাড়ে
আচ্ছা বাবাদের সঙ্গে আমাদের মানসিক দূরত্ব কেন হয়? যে মানুষটা তার পুরো জীবন আমাদের নামে উৎসর্গ করে দেয়, তাকেই কেন আমরা বলতে পারি না ‘ভালোবাসি’? নেপথ্যে চলুন কিছু কারণ জানার চেষ্টা করি।
নিজস্ব মতামত তৈরির পথে বাধা
মানুষ বড় হতে হতে নানাভাবে তার নিজস্ব মতামত তৈরি হতে থাকে। বাবাদের সঙ্গে সন্তানদের জেনারেশনাল গ্যাপের জন্য অনেক সময়ই তারা সন্তানদের এসব সিদ্ধান্ত মানতে বা বুঝতে পারেন না। ফলে দেখা যায় সম্পর্কে তৈরি হয়েছে বৈরিতা।
সন্তান বড় হচ্ছে এটা বুঝতে না পারা
বাবাদের কাছে সন্তানরা সব সময়ই ছোট থাকেন। কিন্তু কখনও কখনও সন্তানরা বড় হচ্ছেÑ এই বিষয়টা অনেকেই মেনে নিতে পারেন না। ফলে অধিকারবোধ থেকেই হোক বা বুঝতে না পারা থেকেই হোক, তারা সন্তানদের নিজস্ব মতামতে হস্তক্ষেপ করেন বেশি। ফলে সন্তানের সঙ্গে মানসিকভাবে সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হয়।
সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে না পারা
সন্তান ঠিক যে মুহূর্তে বেড়ে উঠছে, দেখা যায় সে সময়গুলোতে বাবারা কাজের জন্য অনেক ব্যস্ত হয়ে পড়েন বা জীবিকার জন্য পরিবার রেখে অন্যত্র বাস করেন। ফলে সন্তানের সঙ্গে কখনোই সেভাবে মানসিক সম্পর্কটা তৈরি হয় না।
মানসিক দূরত্ব কাটিয়ে ওঠার উপায়
এবার আসি কীভাবে বাবার সঙ্গে এই সম্পর্কের দূরত্ব কাটিয়ে উঠতে পারবেন সেই আলোচনায়। আসলে মানসিক যেকোনো ব্যাপারেই আমাদের আগ্রহ ও চেষ্টা না থাকলে সম্ভব হয় না। তাই ছোট ছোট চেষ্টা ও কাজ হতে পারে বাবার সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে গড়ে তোলার এক দারুণ উপায়।
বাবাকে নতুনভাবে চেনার চেষ্টা করুন
আপনার কাছে যে মানুষটা খুব রাগী, গম্ভীর, হতেই পারে সেই মানুষটি আসলে মনের দিক থেকে একদমই অন্যরকম। তারও আছে নানা ভয়, নানা জয়, ভালোবাসা বা দুঃখ কষ্টের গল্প। এই গল্পগুলো জানার চেষ্টা করুন। ভয় দূরে ঠেলে সময় পেলে বাবার পাশে বসুন, কথা বলুন। বাবাকে তার ছোটবেলার কথা জিজ্ঞেস করুন, মজার ঘটনা, ভয়ের ঘটনা জানতে চান। এমন ছোট ছোট আলাপেই বাবা হয়ে উঠবেন আপনার একজন সেরা বন্ধু।
প্রজন্মগত পার্থক্য
আজকের তরুণদের জীবনযাপন, চিন্তাভাবনা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং মূল্যবোধ অনেক ক্ষেত্রেই আগের প্রজন্মের থেকে আলাদা। এই পার্থক্য যদি আলোচনার বদলে বিরোধের কারণ হয়, তাহলে দূরত্ব বাড়ে।
বাবাকে নিজের জগৎ চেনান
বাবা আপনাকে তার অভিজ্ঞতা, তার বেড়ে ওঠা এসব দিয়ে বোঝেন। আপনার সঙ্গে তাই মতপার্থক্য তৈরি হয়। বাবাকে আপনার জগৎটা বুঝতে সাহায্য করুন। ডিজিটাল দুনিয়া চেনান, আপনার ভাবনাকে তুলে ধরুন। ধীরে ধীরে ধৈর্য ধরে বোঝান। আস্তে আস্তে জেনারেশনাল গ্যাপের মাত্রাটা কমে আসবে, সম্পর্কও সহজ হবে।
ছোট ছোট আলাপে গুরুত্ব দিন
শুধু প্রয়োজন হলেই বাবার সঙ্গে কথা না বলে ছোট ছোট আলাপ করুন। বাবার খোঁজ-খবর নিন। দিনটা কেমন গেল শুনুন। একসঙ্গে চা খান, ছোটখাটো আড্ডা দিন। দেখবেন খুব দ্রুত মানসিক সম্পর্কটা ঠিক হয়ে আসছে।
বাবার শখকে জাগিয়ে তুলুন
জীবনের কঠিন করাঘাতে বাবারা হারিয়ে ফেলেন নিজস্ব শখ বা ইচ্ছা। বাবার সেই সমস্ত শখ জানার চেষ্টা করুন। বাবার সেসব শখ পূরণে সাহায্য করুন। অথবা নিজেরাও শখ তৈরি করতে পারেন। যেমন ধরুন, বাবার সঙ্গে বাগান তৈরি করুন, বিকালে প্রতিদিন অল্প সময় হলেও হাঁটতে যান। বাবার সঙ্গে বই পড়ুন, খেলা দেখুন বা বাবার সঙ্গে বিভিন্ন খেলা খেলুন। এভাবে বন্ধুত্ব আবারও তৈরি হতে কোনো সমস্যাই হবে না।
বিচার নয়, বোঝার চেষ্টা করুন
মানুষ মাত্রই ভুল হয়। হয়তো অতীতে যেসব কারণে আপনার বাবার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে সেগুলো তিনিও ইচ্ছা করে করেননি। হয়তো পরিস্থিতি অন্যরকম ছিল, হয়তো কোনো কারণ ছিল যা আপনি জানতেন না। এগুলো নিয়ে কোনো সংঘাত নয়, বরং বোঝার চেষ্টা করুন। প্রয়োজন হলে সরাসরি কথাও বলুন।
বাবার সঙ্গে সব সময় কানেক্টেড থাকুন
বাবাকে কল দিন, মেসেজ করুন। বাবার সঙ্গে প্রতিদিন অল্প হলেও কথা বলুন। বাবাকে নিজের মনের কথা জানান। কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা প্রকাশ করুন। এগুলোতে লজ্জা বা সংকোচের কিছু নেই। দিনশেষে তিনিই আপনার বাবা।
আমরা যখন ছোট ছিলাম, বাবা আমাদের হাত ধরে পথ দেখিয়েছেন। বড় হওয়ার পর হয়তো আমাদেরই উচিত তার দিকে আরেকবার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। কারণ সম্পর্কের সৌন্দর্য এখানেইÑ যত দূরেই সরে যাই না কেন, ফিরে আসার পথটি সব সময় খোলা রাখা যায়।