× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সাহিত্য জার্নাল

সাহিত্যের দেশ সাহিত্যের ভাষা

ইমতিয়ার শামীম

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ১ ঘণ্টা আগে

চিত্রকর্ম: ধ্রুব এষ

চিত্রকর্ম: ধ্রুব এষ

সাহিত্যের দেশ থাকে কী? থাকে কি সাহিত্যিকের? সাহিত্যের ভাষা কি দেশভেদে, অঞ্চলভেদে আলাদা হতে হতে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে?

এক কথায় এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো দেওয়া যায়। কিন্তু তা না দেওয়াই ভালো। খোলা চোখেই তো দেখতে পাচ্ছি, সাহিত্যের কোনো দেশ নেই, এক ভূগোল থেকে অনায়াসে সে চলে যেতে পারে অন্য ভূগোলে। পাড়ি জমাতে পারে অন্য ভূখণ্ডে। চীনের প্রাচীর দিয়েও আটকে রাখা সম্ভব না তাকে। উপচে পড়ে, গড়িয়ে পড়ে, ভেঙে ফেলে এবং বিশাল স্রোতধারা হয়ে সে বয়ে চলে সীমান্ত পেরিয়ে দশ দিগন্তের দিকে। এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের সেতুবন্ধন তৈরি করে দেয় তো সাহিত্যই। সঙ্গী হতে পারে সে দেশ-রাষ্ট্র, ধর্ম-অধর্ম, জাতি-গোষ্ঠী, সমাজ-শ্রেণি নির্বিশেষে যে কোনো মানুষের। এদিক দিয়ে বলতে গেলে, সাহিত্য সর্বভাষাভাষী। নিজস্বতার, মৌলিকত্বের কথা আমরা বলে থাকি বটে; কিন্তু ওসবও আসলে একধরনের অনুবাদসক্ষমতা। মানুষের চিন্তাশক্তির অনুবাদ, ভাবনার অনুবাদ, সাহিত্যচর্চার জন্যে দীর্ঘ প্রস্তুতির অনুবাদ সম্পূর্ণভাবে কখনোই সম্ভব হয় না; অনুবাদের পথে তা বারবার আপনাআপনিই নতুন কোনো আস্বাদ যুক্ত করে। এ কথাও সত্য, মুখ ও মনের ভাষা থেকে লিপিবদ্ধ হতে গিয়ে সাহিত্যের যে কোনো শাখার সম্পদই খানিকটা রক্ত-মাংস-হাড় হারিয়ে ফেলে। সম্পূর্ণভাবে কখনোই তা প্রকাশ করা সম্ভব হয় না।

আবারও এ-ও তো সত্যি, সাহিত্য-ভাষা এসব সুনির্দিষ্টভাবে একটি দেশেরও বটে। কোনো ভৌগোলিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমিতে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর আত্মপ্রকাশের প্রয়াস ঘটে তার ভাষা-সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে। জনগোষ্ঠীরই বলি আর নাগরিকদেরই বলি, তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য-ধারাবাহিকতা যেমন, তেমনি জীবনবোধ ও জীবনযাপনের যাবতীয় প্রকরণ তার সাহিত্যই ধরে রাখে। যে কোনো জনগোষ্ঠীই অনুসন্ধানপ্রবণ, আর সেই প্রবণতা একসময় আত্মপ্রকাশপ্রবণতারও জন্ম দেয়। সাহিত্য শৈল্পিকতার সঙ্গে তার সেই আত্মপ্রকাশ ঘটায়; তার চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা, বেঁচে থাকার সংগ্রাম ও অর্জন সব কিছুকে ধারণ করে, আত্মস্থ করে নিজস্ব কৌশল ও কথকতায়। 


এই অনুসন্ধান, আত্মপ্রকাশ ও অর্জনের পাটাতনে দাঁড়িয়ে এখন অনেকের পক্ষেই বলা সম্ভব, বাংলাদেশের সাহিত্য আলাদা, বলা সম্ভব বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের রাজধানী ঢাকা। মুশকিল হলো, সব সময় এই বলার মধ্যে নিরীহ, অনুসন্ধানী গাঢ় উপলব্ধি থাকে না।

এতে কোনো সংশয় নেই, বাংলা সাহিত্য ও ভাষার দেশ বা রাষ্ট্র এখন বাংলাদেশ। তাই বলে বাংলা সাহিত্য ও বাংলাদেশের সুদীর্ঘ পথপরিক্রমা সমান বয়সী নয়। এমন একটি সময় ছিল বাংলা ভাষার যখন কোনো রাষ্ট্র ছিল না; রাষ্ট্র তো দূরের কথা দৃঢ় সামাজিক গণ্ডিও ছিল না। অনেক ধাক্কা আর অপমান সহ্য করতে করতে এই অচ্ছুৎ ভাষা তার গোল খুঁজে ফিরেছে এবং সুদীর্ঘ পথপরিক্রমার মধ্য দিয়ে একটি রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। ভারতবর্ষের অতীত ইতিহাস খুঁজে পাওয়া দুষ্কর; তার পরও জোর গলায় বলা যায়, দূর অতীতে কুলীন বা অভিজাত কারোরই ভাষা বাংলা ছিল না। যাকে এখন বাঙালির সংস্কৃতি বলা হয়, বাঙালির ভাষা বলা হয়, তা ছিল অন্ত্যজ বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতিপরাজিত মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি। কোনো শাসক ও সামন্তরাজ এই ভাষা-সংস্কৃতিকে পৃষ্ঠপোষকতা করেনি। আর্যরা সরাসরি বলত, বাঙালির ভাষা পক্ষী ভাষা, পিশাচ, রাক্ষস, ম্লেচ্ছ কিংবা কুকুরের ভাষা। বর্ণপ্রথার জোয়াল কাঁধে ক্লান্ত হয়ে ওঠা অন্ত্যজ বাঙালি মুক্তির অন্বেষণে ধর্ম পাল্টেছে; কিন্তু সেখানেও বর্ণপ্রথার আদলে প্রচলিত ‘আশরাফ’ ও ‘আতরাফ’ বিভাজন তাদের তাড়িয়ে বেরিয়েছে। সম্ভ্রান্ত বর্ণের হিন্দুদের জন্যে ছিল মর্যাদাসম্পন্ন ভাষা সংস্কৃত, সম্ভ্রান্ত রাজদরবারি মুসলমানদের জন্য ছিল ফারসি ভাষা, মুসলমান কুলীনদের জন্যে আরও ছিল উর্দু। কিন্তু বাংলার ঠাঁই ছিল না কোনোখানে। দাপটি সব ভাষার নাকানিচুবানি খেয়েও অন্ত্যজ বাঙালিরা বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখে। বার বার ধর্ম ত্যাগ করলেও ধরে রাখে বাংলা ভাষাকে। নির্দ্বিধায় বলা যায়, ভাষিক সাম্প্রদায়িকতা প্রত্যাখ্যান করতে করতেই বেড়ে ওঠে বাংলা ভাষা।

অন্ত্যজ বাঙালি যে বাংলা ভাষাকে আগলে রেখেছিল, ইংরেজ শাসকদের আগমনের পর তার আপন গতিতে বিকাশের পথে আরও বড় প্রতিবন্ধকতা এলো। ইংরেজদের আধিপত্য হিন্দু ও মুসলমানদের বিচ্ছেদকে সুস্পষ্ট করে তুলল, বিশেষত এই দুই ধর্মের বাংলা ভাষাভাষীদের বাংলা চর্চার গড়নেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভিন্নতা দেখা দিল। একশ্রেণির মুসলমান বাঙালি জোর করেই হেলে পড়লেন ‘মুসলমানি বাংলা’ বা ‘মিশ্ররীতির বাংলা লেখার দিকে, আবার একশ্রেণির গোড়া হিন্দুদের দেখা গেল অতিরিক্ত সংস্কৃতবহুল বাংলা লেখায় মেতে উঠতে। অনেকেরই মনে আছে, গোঁড়া হিন্দুরা এ সময় রামরাম বসুর গদ্যে ‘পেঁয়াজ-রশুনের গন্ধ’ পেয়েছিলেন। এই বিষয়টি আমরা অনেকেই মনে রাখি না যে, বাঙালি হিন্দুদেরও ‘ভাষিক সাম্প্রদায়িকতা’র বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হয়েছে, অতিরিক্ত সংস্কৃত-নির্ভরতার ব্যাপক সমালোচনা করতে হয়েছে, হিন্দু লেখকদের ভাষায় আরবি-ফারসি মিশ্রণের সহজাত প্রক্রিয়ার সপক্ষে দাঁড়াতে হয়েছে। উনিশ শতকের গোড়ায় যখন বিভিন্ন সাময়িকপত্রে ভাষাবিতর্ক চলছিল, তখন সংস্কৃতের পক্ষে ও ফারসি ভাষার বিরুদ্ধে গোড়া বাঙালি হিন্দুরা কট্টর অবস্থানও বেশির ভাগ বাঙালি হিন্দু লেখকই ওই পথে হাঁটেননি। 

ভাষা চিনতে গিয়ে সৈয়দ মুজতবা আলী দেখতে পেয়েছিলেন, বিদ্যাসাগরি বাংলার সঙ্গে রয়েছে হিন্দির মিল, অন্যদিকে প্যারিচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ হয়ে উঠেছিল উর্দুর ভাই-ভাতিজা। তবে দুর্দান্ত প্রতাপে টিকে থাকা বাংলা তো ওইখানেই থেমে থাকেনি। লিখেছেন সৈয়দ মুজতবা, বাংলা ভাষার বড় দিকটাই ছিল এই যে, ওই বিদ্যাসাগরি আর আলালি দুটো বাংলাকেই এই ভাষা বর্জন করতে পেরেছিল; আবার কথাটা এমন করেও বলা সম্ভব, দুটোকেই সে সাদরে বুকে টেনে নিয়েছিল, আত্মস্থ করে ফেলেছিল। পরশুরাম বা রাজশেখর বসুর উদাহরণ দিয়ে সৈয়দ মুজতবা আলী দেখিয়ে গেছেন, কী নিপুণতার সঙ্গেই না তিনি প্রাণের আবেগে কখনও সংস্কৃতঘেঁষা বাংলা লিখেছেন, কখনওবা লিখেছেন ফারসিঘেঁষা বাংলা, একটির সঙ্গে আরেকটির বিজড়ন ঘটিয়ে তিনি সুধারস ঢেলেছেন বাংলা সাহিত্যে। একই বিষয় আমরা দেখতে পাই কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যেও। এমনকি এসবের বহু আগেও দেখা গেছে মুকুন্দরাম বা ভারতচন্দ্রের কাব্যে অজস্র আরবি-ফারসি শব্দ, আবার দৌলত কাজী বা আলাওলের কাব্যে দেখা গেছে সংস্কৃত শব্দের প্রবল উপস্থিতি। বাংলায় সংস্কৃত বা সংস্কৃতজাত শব্দের সঙ্গে আরবি, ফারসি ও তুর্কি শব্দকে তারা প্রয়োগ করেছে সহজাত ভঙ্গিতে। এমন অনেক উদাহরণ সামনে থাকার পরও ভাষা-সাহিত্যকে ‘বিশুদ্ধ’ করে তোলার প্রবণতায় অনেকে তাদের সৃষ্টিকর্মকে অসহ্য করে তোলেন, তেমনি অনেকে আবার বিশেষ উদ্দেশ্য থেকে কৃত্রিমভাবে জোর করে অন্য ভাষার শব্দ ব্যবহার করে সাহিত্যকে খেলো করে ফেলেন।

ইংরেজদের শাসন ভারতবর্ষীয়দের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল ইউরোপীয় আধুনিকতার সঙ্গে, সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে। কিন্তু সেই কালপর্বে বাঙালি মুসলমান যে বাংলা সাহিত্যের মূল স্রোতের বাইরে এসে, ভাষা মিশ্রণের স্বাধীন ও স্বতন্ত্র প্রক্রিয়ার বাইরে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে ‘মুসলমানি বাংলা’ চালু রেখেছিল, তাও অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই দেখা যায়, সেই বন্ধন থেকে বাঙালি মুসলমানদের মুক্তির সম্মিলিত প্রয়াস। যারা এই প্রক্রিয়ার সূত্রপাত করেছিলেন, তাদের অনেককেই এখন হয়তো আমরা এখন আর চিনতে পারব না, কিন্তু চিনতে পারব এমন মানুষও কম নেই। যেমন, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী অনেকেরই পরিচিত। সেই ১৯০২ সালে তিনি বলে গেছেন যে, আরবি, ফারসি, উর্দু এবং ইরেজিতে আমরা যত পণ্ডিতই হই না কেন, যতদিন আমরা বাংলার আলোচনায় বদ্ধপরিকর না হব, ততদিন জাতীয় উন্নতির আশা করা নিতান্তই মূর্খতা। আবার ১৯১৫ সালে সৈয়দ নবাব আলী বলেছিলেন, আমাদের বর্তমান মুসলমানি বাংলা থেকে অনেক অনাবশ্যক আরবি ফারসি শব্দ ত্যাগ করে অনেক সংস্কৃত শব্দ সাদরে গ্রহণ করতে হবে। বলেছিলেন তিনি, আমরা হিন্দু বাংলাও চাই না, মুসলমানি বাংলাও চাই না, আমরা চাই খাঁটি বাংলা, যা বাংলার হিন্দু-মুসলমান সবাই বুঝতে পারে।

প্রশ্ন উঠবে, এমন সব কথা বলার প্রেক্ষাপট কী ছিল? অল্প কথায় বলতে গেলে, মুসলমানদের মধ্যে তখন যে রাজনৈতিক জাগরণ দেখা দিয়েছিল, সে ক্ষেত্রে বাংলার মুসলমানদের ওপর শুরু থেকেই অভিজাত মুসলমানদের লক্ষ্য ছিল উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার। ১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ববঙ্গে এসে যে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এই ঘোষণার বীজ পোঁতা হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকেই। আলী আনোয়ারের একটি প্রবন্ধ আছে ‘বাংলা ভাষার সঙ্গে বাঙালী মুসলিম সমাজের সম্পর্ক : পারস্পরিক প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া।’ তা পড়ে জানা যায়, সেই ১৯০০ সালে ‘নূর অল ইমান’ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছিল, ‘বাঙ্গালা ভাষাকে হিন্দুর ভাষা বলিয়া ঘৃণা না করিয়া আপনাদের অবস্থা ও সময়ের উপযোগী করিয়া লউন।’ আবার কয়েক বছর পরেই ‘নবনূর’ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, ‘বঙ্গ ভাষা ব্যতীত বঙ্গীয় মুসলমানের মাতৃভাষা আর কি হইতে পারে?’ লেখা হয়েছিল, ‘যাহারা জোর করিয়া উর্দুকে বঙ্গীয় মুসলমানের মাতৃভাষার আসন প্রদান করিয়া সমস্ত ভারতে মুসলমানদের একই ভাষা করিতে চান, তাহারা কেবল অসাধ্য সাধনের প্রয়াস করেন মাত্র।’ মুসলিম লীগ গঠন হওয়ার পর এই অপচেষ্টা আরও ঘনীভূত ও সংঘবদ্ধ হয়। ১৯০৯-১০ সালের ‘বাসনা’ নামের পত্রিকাটিতে এসবের প্রতিবাদে লেখা হয়েছিল, ‘বাঙ্গালার পরিবর্তে উর্দুকে মাতৃভাষা করার মোহ’ আসলে ‘দুর্বল ব্যক্তির অলৌকিক স্বপ্ন দর্শন।’ ১৯১৬ সালের ‘আল-এসলাম’ পত্রিকাতেও লেখা হয়েছিল, ‘এক শ্রেণীর বাঙালি মুসলমানের উর্দুপ্রীতি বা বাংলা-অপ্রীতিপর্ব’ হলো এক ‘মারাত্মক রোগ।’ আরও পরে ১৯৩৭ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে দেখা যায়, উর্দুকে মুসলিম লীগের দাপ্তরিক ভাষা ঘোষণার প্রস্তাব করতে। কিন্তু শেরে বাংলা ফজলুল হকের তীব্র প্রতিবাদের মুখে মুখ বন্ধ করতে হয়েছিল তাকে। তবে মনে মনে জিন্নাহ যে বিষয়টি পুষে রেখেছিলেন, তার পুনঃপ্রকাশই দেখি ১৯৪৮ সালে। 

ইতিহাসের এই সব বিষয়আশয় আবারও মনে করছি, মাঝেমধ্যেই মনে করে নিতে হয়; কেননা পুরনো দুষ্ট ক্ষত বারবার ফিরে আসে। ভুলে যাই ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ভাষা ও সাহিত্য সপ্তাহের কথা যেখানে ঘোষণা করা হয়েছিল, ‘তাই বলে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার পরিবর্তে আমরা মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার কবলে পড়তে চাই না।’ 

সাহিত্যের ভাষা হয়ে ওঠার জন্যে বাংলার যে সংগ্রাম, তা এতই দীর্ঘ যে, মাঝেমধ্যে মনে হয়, এত প্রাণশক্তি এই ভাষার এসেছে কোত্থেকে! এবং লেখাই বাহুল্য, এখনও এ সংগ্রাম শেষ হয়নি। রাষ্ট্র খুঁজে পাওয়ার পরও বাংলার প্রতি আমাদের অবহেলা এখনও একেবারে কম নয়। তাই সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর ঘোষণা অধরাই রয়ে যায়। তার ওপর মাঝেমধ্যেই নানা ধূম্রজাল তৈরি করা হয় ভাষাকে নিয়ে। অথচ এটা অনস্বীকার্য, ইতিহাসের নিজস্ব গতিতেই বাংলা ভাষা সামনের দিকে এগোচ্ছে যার ওপর সংস্কৃতের যেমন নিয়ন্ত্রণ নেই, তেমনি নিয়ন্ত্রণ নেই আরবি-ফারসি-উর্দুর, কিংবা নেই ‘কলকাতার বাংলা’, ‘প্রমিত বাংলা’ ও ‘মুখের ভাষার’। এ ভাষা এমনই স্বাধীন যে,  সর্বাত্মক রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে বাংলাদেশের পক্ষেও সম্ভব নয় বাংলা ভাষা-সাহিত্য বিকাশের গতিপথ নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করা। ইদানীং আবার নতুন এক ধূম্রজাল তৈরি হচ্ছে ‘বাংলাদেশি রবীন্দ্রনাথ’ অন্বেষণের নামে। পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আসা-যাওয়া আর তার সাহিত্যে এখানকার জল-বায়ু-প্রাণ-প্রকৃতির অস্তিত্ব নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। গোলাম মুরশিদ লিখেছেন ‘রবীন্দ্রবিশ্বে পূর্ববঙ্গ ও পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রচর্চা’, আহমদ রফিক লিখেছেন ‘বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ’। লিখেছেন আরও অনেকেই। কোনো সংশয়-সন্দেহ নেই, পূর্ববঙ্গ আর এখানকার নদীময় প্রকৃতি, গ্রাম ও কৃষিজীবন, বাউলধারা আর অবারিত আকাশ তার অস্তিত্বের সঙ্গেই সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে; কিন্তু তা দিয়ে ‘বাংলাদেশি রবীন্দ্রনাথের’ অবয়ব দাঁড় করানোর অর্থ আসলে তার সাহিত্যের সর্বজনীনতা ও বিশ্বজনীনতাই উপলব্ধি না করা বা অস্বীকার করা। পাকিস্তান আমলে ‘ভারতীয় রবীন্দ্রনাথের’ ধারণা দাঁড় করিয়ে অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল পূর্ববঙ্গের বাংলা ও বাঙালি থেকে রবীন্দ্রনাথকে বিচ্যুত করার, এখন আবার ‘বাংলাদেশি রবীন্দ্রনাথের’ ধারণা দাঁড় করানোর মধ্যে দিয়ে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে যে, ভূগোলের বৃত্তে কোনো শিল্পী-সাহিত্যিককে বেঁধে ফেলা সম্ভব হয় না, সম্ভব হয় না সাহিত্যের ভাষাকে কোনো রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন-নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে স্তব্ধ করা। এই তো এই বছরকয়েক হয় দস্তয়েভস্কির দ্বিশততম বার্ষিকী আর ফ্রান্‌ৎস কাফকার শততম মৃত্যুবার্ষিকী নিয়ে বহু দূরের দেশ বাংলাদেশেও যে ব্যাপক আলোচনা চলছে, বিস্তর লেখালেখি হচ্ছে তার কারণও ওই দস্তয়েভস্কি নিছক রুশ দেশের কিংবা রুশ ভাষার রুশি দস্তয়েভস্কি নন, চেক লেখক কাফকাও কেবল জার্মান ভাষার কাফকা নন।

সাহিত্য কিংবা শিল্পচর্চা তো এই যে তা জীবনের অপূর্ণতাগুলোকে খুঁজে দেখে, জীবনের পাওয়াগুলোকে ছাপিয়ে চাওয়াগুলোও যদি থাকত তাহলে জীবনের অর্থময়তা কী দাঁড়াত, সেই সম্ভাব্যতার নিরীক্ষা করে চলে। কিংবা হতে পারে, তা ট্রমা থেকে মুক্তি পাওয়ারই নিরীক্ষা; উদ্দীপ্ত করার ও হয়ে ওঠার অনুশীলন। এই নিরীক্ষা ও অনুশীলন ব্যক্তির হলেও তা সম্পৃক্ততা খুঁজে নেয় বহুজনের সঙ্গে। এভাবে তা নানা শিল্পরীতিরও উৎস ও বিকাশের পথ হয়ে ওঠে, নান্দনিকতা বা সৌন্দর্য সৃষ্টির সূত্র হয়ে ওঠে। এরকমই যদি ঘটতে থাকে, তা হলে সাহিত্যের পক্ষেই বা কী করে সম্ভব কোনো বিশেষ দেশ বা ভূগোলে থাকা? সম্ভব কি কোনো বিশেষ ভাষায় সংরচন ঘটলেও সেখানেই আটকে থাকা?  

২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, ৭ জুন ২০২৬ রবিবার

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা