জারাদ ত্রিস্তান
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ১ ঘণ্টা আগে
অলংকরণ : মিথিলা ভৌমিক, দশম শ্রেণি, ভিকারুননিসা, নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা
বিশ্বকাপ এলে বাসায় পুরো হৈ হৈ রৈ রৈ ব্যাপার পড়ে যায়। বাসায় একজনের একেক দল করা নিয়ে সারা দিন হিন্দি সিরিয়ালের মতো ঝগড়াঝাটি এবং ধিন তানা তানা তেরেনা... চলছে।
বাবা, দিদা, মামা এবং আমার ছোট বোন করে আর্জেন্টিনা। মা, ফুফি, রহিমা খালা করে ব্রাজিল। আর এই অভাগা আমি করি পর্তুগাল।
বাসা এখন দুই ভাগ হয়ে গেছে। সব কাজকর্ম দুই ভাগ। পালা করে দুইবার রান্না হয়। রান্নাবান্নাগুলো এখন জানি কেমন অদ্ভুত হয়ে গেছে। সকালবেলা মা ফুফি এবং রহিমা খালা মিলে দেখলাম হলুদ রঙের খিচুড়ি (যা মার খুবই অপছন্দ), সবুজ রঙের গ্রিন চিকেন (যা ফুফি খায় না) এবং নীল রঙের লেমোনেড (যা রহিমা খালা খেলে বমি করে), খুবই আগ্রহের সাথে খাচ্ছে। প্রিয় দলের পতাকা রঙের খাবার, বিতৃষ্ণা নিয়ে হলেও খেতে হবে।
ওদিকে বাবা মামা এবং দিদা মিলে আরও অদ্ভুত অদ্ভুত খাবার রান্না করছে। বাবা রান্না করেছে সাদা ভাত। দিদা দেখলাম ছাদ থেকে অনেকগুলো অপরাজিতা ফুল নিয়ে আসে এক ধরনের নীল চা বানাল। আর মামা দেখলাম অপরাজিতা আর ভাত মিলিয়ে নেসি কাবু নামের একটা খাবার বানিয়েছে। তারপর দেখলাম চারজনে মিলে নাক মুখ বন্ধ করে সেগুলো খাচ্ছে।
জার্সিও কেনা হয়েছে। নীল সাদা, হলুদ সবুজ জার্সিতে ঘর ভরে আছে। অবশ্য আমার বোনের জার্সিটা গোলাপি। তার প্রিয় রঙের এই গোলাপে জার্সি মেসি পরে দেখি তার আর্জেন্টিনা সমর্থন।
বাবা দেখলাম নীল সাদা ডোরাকাটা লুঙ্গি পরে ঘুরছে। মামার গায়ে নীল সাদা শার্ট। দিদা তার প্রধান শিক্ষিকা জীবনের নীল সাদা রঙের একটা শাড়ি বের করে পরেছেন। মা রহিমা খালা আর ফুফি হলুদ রঙের শাড়ি, প্যান্ট টপ এবং মেক্সি পরে ঘুরছে।
সেদিন আবার দেখলাম মামা মার সাথে গিয়ে খাতির করছে। বলছি দিদি দেখছি তুমি কদিনে খুব শুকিয়ে গেছো। যাও যাও টেবিলে খাবার রাখা আছে খেয়ে এসো।
মা তো আনন্দে আত্মহারা, মামা নিশ্চয়ই মায়ের দলে এসে যোগ দিয়েছে।
আনন্দচিত্তে মা টেবিলে গিয়ে দেখল মামা গোল গোল সাতটা নাড়ু প্লেটে রেখে এসেছে। মা কিছু না বলে নাড়ুগুলো গিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিল।
সেদিন আবার ফুফি চায়ের কাপ নিয়ে বাবার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ইচ্ছা করে খানিকটা চা বাবার সাদা জার্সিতে ফেলে দিল। বাবা তাকাতেই বললÑ ‘ও কিছু না, আমি ফেলিনি, ঈশ্বরের হাতের কারণে পড়ে গেল যে।’
বাবা তাকিয়ে থাকলেন আর কিছু বলতে পারলেন না।
দিদা অপেক্ষায় ছিলেন রহিমা খালার জন্য। সেদিন রহিমা খালা দিদাকে এসে এক গ্লাস পানি দিল। দিদা তো খুশি রহিমা খালা নিশ্চয়ই তার দলে ভিড়েছে। কিন্তু দিদা পানি মুখে দিতে থু থু করে ফেলে দিলেন। পানিতে যে লবণ মেশানো। কিন্তু রহিমা খালা মুচকি এসে বললেন, ‘ও কিছু না খালাম্মা, পবিত্র পানি।’
কিন্তু খেয়াল করলাম কেউই আমার সাথে কিছু করতে এলো না। এবং কয়দিন ধরে আমাকে বাইরের খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। কয়েক বেলায় অবশ্য বিভিন্ন পর্তুগাল সমর্থক বন্ধুবান্ধবদের বাসায় যাও গিয়ে খেয়ে এসেছি।
আমার ছোট বোনও দেখলাম আনন্দে আত্মহারা। কারণ সে বাবার দলে থাকায় প্রতিনিয়তই মা যেসব কাজ করতে দেয় না, সেসব করে বেড়াচ্ছে। যেমন পানি নাড়া, সারা ঘরের রঙ করা ইত্যাদি।
ও ভুলেই গেছি,
এর ফাঁকে আমাদের বাসায় নতুন একটা জিনিস কেনা হয়েছে। আমাদের আগে ৩২ ইঞ্চি টিভি ছিল, সেই টিভি নিয়ে ঝগড়া করে দুই দল এগিয়ে দুটো ৬৫ ইঞ্চি করে টিভি কিনে নিয়ে এসেছে। একটা মার রুমে, একটা বাবার রুমে। আমার তো এর মধ্যে লাভ, ৩২ ইঞ্চি টিভিটা আমি আমার ঘরে এনে রেখে দিয়েছি।
কিন্তু এসব গণ্ডগোলে আমার পুরো বিতৃষ্ণা চলে এসেছে। বেশিরভাগ সময়েই এই চাদি ফাটা গরমে ছাদে এসে বসে থাকি। এবং খেয়াল করে ছাদে আসা পাখি এবং কাকরাও এখন আর একসঙ্গে ভাত খায় না। তাদের আলাদা আলাদা জায়গায় ভাত দেওয়া লাগে। একদল বসে আর্জেন্টিনার পতাকার খুঁটিতে, আরেকদল বসে ব্রাজিলের পতাকার খুঁটিতে। তবে আজকে আনন্দিত হয়ে দেখলাম একটা চড়ুই পাখি আমার পর্তুগালের পতাকার খুঁটিতে এসে বসেছে। আমি লাফাতে লাফাতে তার জন্য রীতিমতো পোলাও আনতে গেলাম। সেও নিশ্চয়ই আমার মতো অভাগা!
ষষ্ঠ শ্রেণি, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা