আমির খসরু সেলিম
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
আঁকা : মেহেরুন্নিসা, অষ্টম শ্রেণি, রানী নীহার দেবী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মানিকছড়ি, খাগড়াছড়ি
ফুটবল খেলাটা তোতনের ভালোই লাগে। ও যখন আরেকটু ছোট, খেলার বলটা ছিল রাবারের। এখন যেটা আছে, সেটা আসল ফুটবল। ছোট্ট লাথি দিলেই সেটা ফড়িংয়ের মতো আলত করে উড়ে যায়। ওটা দিয়ে কয়েকটা ফুলের টব আর সিরামিকের বাসন ভাঙার পর মা বলেছেÑ ফুটবল ‘আউটডোর’ গেম। তাই বাইরে খেলতে হবে।
মাঠ তো নেই, ‘আউটডোর’ বলতে বিল্ডিংয়ের সামনে একটুখানি ঘাসের বিছানা। সেখানে একা আর কতুটুকু খেলা যায়!
এটা জানার পর বাবা অবশ্য দারুণ একটা কাজ করে দিয়েছে। কয়েকটা দুই লিটারের প্লাস্টিকের বোতলে পানি ভরে দাঁড় করিয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। তোতন ফুটবল দিয়ে সেগুলোর ওপর নিশানা প্র্যাকটিস করে। বোতলগুলো কখনও ‘গোলবার’, কখনও পুরোদমে ‘গোলকিপার’। তোতনের ফুটবলের গুঁতোয় সেগুলো দমাদম উল্টে পড়ে, বাবাও সময় পেলে খেলে ওর সাথে।
রোদভরা দুপুরে খেলার জায়গাটা বেশ ফাঁকা। তোতন খেলছিল একাই। ফারিসাকে আসতে দেখে থেমে গেল। ওকে একটু ভয়ই পায় সে। কখন কী বলে বসে ঠিক-ঠিকানা নেই। প্রথমবার যখন পরিচয়, তখনও তোতন এখানেই খেলছিল। দোতলার বারান্দা থেকে ফারিসা চিৎকার করে বলেছিলÑ ‘এই ছেলে, তোমার নাম কী?’
‘তো-তোতন।’
ফারিসা কয়েক সেকেন্ডে নিচে নেমে এসে আবার বলেÑ ‘তুমি তোতলা নাকি?’
‘নাহ, খে-খেলছি তো, তা-তাই একটু হাফিয়ে গেছি, আ-আর ওরকম বলে ফেলেছি।’
‘তোমার খেলার স্টাইলটা আমার পছন্দ, আমিও খেলব’Ñ বলেই ফারিসা ফুটবলে লাথি মেরে বসে। বল গিয়ে ফেলে দেয় একটা লাল বোতলকে।
এরপর থেকে এটা ওদের নিয়মিত খেলা হয়ে দাঁড়ায়। বল ছুটিয়ে লাল বল ফেলে দিতে পারলে ১০ পয়েন্টে, নীল বোতলে পাঁচ।
সমস্যা শুরু হলো ফুটবল বিশ্বকাপের খবর যখন টিভিতে বেশি বেশি বলা শুরু হলো, কখন থেকে। সবাই যে যার পছন্দের দল নিয়ে বড় বড় কথা বলা শুরু করে দিল। এবার বিশ্বকাপে নাকি ৪৮টা দল খেলবে। তবে সবচে বেশি শোনা যাচ্ছে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার নাম। তোতন-ফারিসা সবে ক্লাস ফোরে পড়লেও ‘নেট থেকে কীভাবে সব জানতে হয়’ সেটা ভালোই জানে। দুজনেই আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের ফুটবলযাত্রার ইতিহাস জেনে মুগ্ধ।
এদিকে সব বিল্ডিংয়ের ছাদে উড়ছে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা। সব বাড়ির বেশিরভাগ মানুষ এই দুই দলে ভাগ হয়ে গেছে। তোতনের মা ব্রাজিল, বাবা আর্জেন্টিনা। ফারিসার বাসায় তার উল্টোটা। সমস্যা অবশ্য দুজনের বাসায়তেই একই। মা-বাবা দুজনেই নিজেদের দলে সাপোর্টার টানার চেষ্টা করছেন। ওরা অবশ্য এখনও স্বীকার করেনি, কাকে সাপোর্ট করে। তবে মনে হচ্ছেÑ এভাবে আর বেশি দিন ঠেকিয়ে রাখা যাবে না।
ফারিসা যখন জানালÑ আর্জেন্টিনাকে সাপোর্ট না দিলে মায়ের পক্ষ থেকে চকলেট বন্ধ, তখন ব্যাপারটা বেশ সিরিয়াস হয়ে গেল। তোতনও প্রায় শক্ত চাপের মধ্যে পড়েছে নিজের বাসায়। বাবা-মা সময় পেলেই ফুটবল নিয়ে তর্ক করে আর সাপোর্ট চায়।
বিকালে নিজেরা কথা বলে একটা বুদ্ধি বের ফেলল। দুই পরিবার আজ একসঙ্গে রাতের খাবার খাবে। সেখানেই ‘বুদ্ধিটা’ প্রয়োগ করা হবে।
রাতের বেলায়, খাবারের টেবিলে যখন দুজনের বাবা-মায়েরা আবার তর্ক জুড়ে দিল, যখন তোতন আর ফারিসাকে ওরা প্রায় চেপে ধরল, বললÑ ‘বল, ব্রাজিল নিবি নাকি আর্জেন্টিনা?’
তোতন বললÑ ‘আমার দুটো টিমকেই ভালো লাগে। তাই বিশ্বকাপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমার নাম আর্জিল। মানে বুঝলে তো? আর্জেন্টিনা+ব্রাজিল।’
ফারিসা বললÑ ‘আমিও দুটো দলকেই পছন্দ করে ফেলেছি। আমার নাম তবে হোক ব্রাজেন্টিনা। মানে, ব্রাজিল+আর্জেন্টিনা।
নামগুলো শুনে প্রথমে চোখগুলো গোল হয়ে উঠল মা-বাবাদের। তারপর সেগুলো প্রায় কপালে গিয়ে ঠেকল। তারপর ওদের হাসিতে ভরে গেল পুরো ঘরটা।