আরফাতুন নাবিলা
প্রকাশ : ৫১ মিনিট আগে
আপডেট : ৪৮ মিনিট আগে
মডেল : রোশান জাহান, মো. আজাদ হোসাইন ও শৈলী মাহবুব, পোশাক : লাবণ্য ছবি : এস এম আরিফুল আমিন
শহরের যে মানুষগুলোর বড় হয়ে ওঠা গ্রামে, তাদের কাছে প্যাচওয়ার্ক খানিকটা কেতাবি শব্দই বটে। জোড়াতালি দিয়ে কাঁথা সেলাই করা, পোশাকের কোনো ছিঁড়ে যাওয়া জায়গাকে অন্য কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া, শিশুদের পোশাক তৈরিতে বেঁচে যাওয়া টুকরো কাপড়ের নিত্য ব্যবহার- এসব তো সেই কবে থেকেই বাঙালির সাথে জড়িয়ে ছিল। গল্পের বদলে যাওয়াটা নজরে আসে তখনই, যখন থেকে এই টুকরো কাপড়গুলো জড়িয়ে যায় ফ্যাশন দুনিয়ার সঙ্গে।
ইতিহাসে প্যাচওয়ার্ক
প্যাচওয়ার্কের ইতিহাস প্রায় ৫,০০০ বছর পুরনো, যার সন্ধান প্রাচীন চীন ও মিসরের সমাধিগুলোতে পাওয়া যায়। এই কাজের চর্চা হয়ে আসছে বহু শতাব্দী ধরে। মূলত এটি ব্যবহারিক ও আলংকারিক উভয় ধরনের কারুশিল্প হিসেবেই জনপ্রিয় ছিল। সমাজের নানা পরিবর্তনের সাথে সাথে এর জনপ্রিয়তাতেও নানা উত্থান-পতন ঘটেছে। শুধু তাই নয়, কারিগরের সামাজিক মর্যাদা ও প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধার (সহজলভ্য উপাদান) ওপর ভিত্তি করে প্যাচওয়ার্ক নকশার বিস্তার ঘটেছে।
পোশাকে প্যাচওয়ার্কের প্রথম ব্যবহার শুরু হয়েছিল মূলত সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে। কাপড়ের ফেলে দেওয়া অংশ বা টুকরোগুলো পুনরায় ব্যবহার করার অথবা কোনো পোশাকের ব্যবহারযোগ্যতা ও স্থায়িত্ব বাড়ানোর এক উপায় হিসেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, সাংবাদিক অ্যান স্কট-জেমস ‘পিকচার পোস্ট’ (Picture Post)-এর জন্য একটি বিশেষ প্রতিবেদন লিখেছিলেন। সেখানে তিনি প্যাচওয়ার্ককে এমন একটি দারুণ কৌশল হিসেবে তুলে ধরেন, যা একজন ব্যক্তির কাপড়ের রেশন কুপন (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে কাপড়ের জন্য রেশন কুপন দেওয়া হতো) খরচ করবে না। তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘হালকা রঙের সুতি ও গিংহাম (চারকোনা নকশার সুতি কাপড়) এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো মানায়, যার মাঝখানে মাঝে মাঝে ভিক্টোরিয়ান যুগের বেগুনি বা লাল রঙের তালি থাকতে পারে।’

অবশ্য তার মানে এই নয় যে, প্যাচওয়ার্কের জন্য ব্যবহৃত কাপড়গুলো জাঁকজমক ছিল নাÑ যুক্তরাজ্যের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামের সংগ্রহে ১৯৫০-এর দশকে তৈরি এমন কিছু অনন্য পোশাক রয়েছে, যেগুলো লন্ডনের বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার ডিগবি মটন (Digby Morton) ও নরম্যান হার্টনেল (Norman Hartnell)-এর বাতিল কাপড়ের টুকরো (Off-cuts) জোড়া দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল।
সাসটেইনেবল ফ্যাশন
সাম্প্রতিক সময়ে প্যাচওয়ার্ক বিপুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এর পেছনে কি শুধুই নতুন ডিজাইনের আইডিয়া কাজ করেছে নাকি পৃথিবীর ভার কিছুটা কমানোর চেষ্টাও রয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত দুইয়ে মিলিয়েই। ফ্যাশন ডিজাইনার যারা আছেন তারা অন্তত বুঝতে পারছেন কীভাবে কতটুকু করে দিন দিন পৃথিবী ক্ষয়ে যাচ্ছে। তাই তো পৃথিবীকে শ্বাস নিতে দেওয়ার নতুন একটি চেষ্টা এই প্যাচওয়ার্ক। সারা বিশ্বের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি থেকে রোজ কয়েক মেট্রিক টন বর্জ্য ফেলা হয়। বাতিল হয়ে যাওয়া কাপড়ের টুকরো রিসাইকল করে বর্তমানে তৈরি হচ্ছে নতুন পোশাক, স্কার্ফ, ব্যাগ, জুতো, টেবিল ম্যাট থেকে বিছানার চাদর, কুইল্ট। প্যাচওয়ার্ক যে সব সময়েই সুতি, সিল্ক ম্যাটারিয়ালেরই হবে এমন নয়। পশমিনা, ভেলভেট, জুট, লেদার যেকোনো কিছুর হতে পারে।
হাই এন্ড ফ্যাশনে প্যাচওয়ার্ক
ফ্যাশনের বিস্তৃত গোষ্ঠীতে ঠাঁই করে নিতে প্যাচওয়ার্কের সময় লেগেছিল ঠিকই, কিন্তু জায়গা করে নেওয়ার পরে এই আর্টফর্ম এখনও আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। মূল কাপড়ে অন্য কাপড়ের অংশ আগে বসিয়ে, তার সঙ্গে এমব্রয়ডারি বা স্টোন এমবেলিশ করে যে ভিন্ন ধারার জমকালো পোশাক তৈরি করা যায়, নজর কাড়া যায় ফ্যাশনপ্রেমীদেরÑ এই ধারণা পোক্ত হওয়ার পর থেকেই ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি প্যাচওয়ার্ককে আপন করে নিয়েছে। এর আগে হিপি আন্দোলন এই স্টাইলকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়। আর আগে তুরস্ক, মরক্কোর মতো মধ্য ইউরোপীয় দেশে কাফতান বা লং জ্যাকেটে এই স্টাইলের প্রচলন ছিল। মূলত আশির দশক থেকে নামি বিভিন্ন ফ্যাশন ব্র্যান্ড এই আর্টফর্ম ব্যবহার করতে শুরু করে।
আমজনতার ফ্যাশন
ডেনিম, জ্যাকেট, ড্রেস থেকে শাড়ি, ব্লাউজ, কুর্তিÑ সবকিছুতেই এই কনসেপ্ট মানানসই। পুরনো ডেনিমকে চটকদার করতে আলমারিতে বন্দি হয়ে থাকা ভারী কাজ করা ওড়নার খানিকটা অংশ কেটে ডেনিমের পকেটের কাছটায় বসিয়ে নিতে পারেন। চাইলে পাশ দিয়ে এমব্রয়ডারিও করিয়ে নিতে পারেন। পুরনো কোনো পোশাকের একটি মোটিফ হয়তো আপনার পছন্দের। সেই মোটিফ কেটে নিয়ে শার্ট, গেঞ্জিতে বসিয়ে দিন। এভাবে সিল্ক, সুতি, ভেলভেটের বাতিল পোশাক থেকে অংশ কেটে নিয়ে জ্যাকেট, টপ, ড্রেস সবকিছুই ডিজাইন করা যায়। সলিড, টেক্সচার, প্রিন্ট সব রকম মিলিয়ে মিশিয়েই পোশাক ডিজাইন করা হয় প্যাচওয়ার্কে। এই কাজে দুই ধরনের টোন থাকে। কখনও ভিন্টেজ, অ্যান্টিক ফিনিশ দেওয়া হয়, আবার জমকালো বা বোহেমিয়ান স্টাইলও অনুসরণ করা হয়।

লাবনী নবী ইতি প্যাচওয়ার্ক নিয়ে নিয়মিত কাজ করছেন। তার উদ্যোগের নাম লাবণ্য। ফ্যাশনের ভিন্নধর্মী এই ধারা নিয়ে কীভাবে কাজ হচ্ছে, গ্রাহকদের কেমন সাড়া মিলছে এ সম্পর্কে জানতে চাইলে লাবণী বলেন, ‘আমরা এ পর্যন্ত প্যাচওয়ার্ক শাড়ি, ব্লাউজ, বোহো কোট, পাঞ্জাবি, প্যাচওয়ার্ক দিয়ে বেবি ড্রেস, ওড়না, শাল, বেডশিট, কুশন কভার, প্যাচওয়ার্ক গজ তৈরি করেছি। সব প্রোডাক্টে আমরা খুব ভালো সাড়া পেয়েছি। এর মাঝে শাড়ি আর বোহো কোট অন্যতম। প্যাচওয়ার্ক করার আগে আমরা কাপড়ের গুণগত মান ও কালার কম্বিনেশনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই, যাতে প্রতিটি প্রোডাক্ট হয় দীর্ঘস্থায়ী ও আরামদায়ক সাথে রঙের গ্যারান্টি থাকে। প্যাচওয়ার্কের কাপড় নির্বাচনের ক্ষেত্রে ডাই করা কাপড়ের প্রাধান্য থাকে বেশি।
আমি নিজে প্যাচওয়ার্কের কাজ করব এই আইডিয়াটা আসে প্রথমে অনেক দুশ্চিন্তা থেকে, বেশকিছু স্টক জমে যায় গজ কাপড়ের। সেখান থেকে প্যাচওয়ার্কের যাত্রা শুরু। আমরা অনেক কম্বো ড্রেস তৈরি করি তাই প্রচুর গজ তৈরি করি, ন্যাচারাল ডাই ও কেমিক্যাল ডাই দুটাই করা হয়। সেই বেঁচে যাওয়া কাপড় থেকে প্যাচওয়ার্ক করা শুরু করি। এরপর তো সেগুলো শেষ হয়ে আমাকে আলাদা করে গজ তৈরি করতে হয়েছে চাহিদার জন্য। আমার ক্রেতাবন্ধুদের পজিটিভ রিভিউ ও ভালোবাসা আমাদের কাজের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।’
সাধারণত ব্যবহৃত পুরনো সুতি কাপড় দিয়েই হয়ে থাকে প্যাচওয়ার্ক। একরঙা কাপড়ও ব্যবহৃত হয়, প্রিন্টের কাপড়ও। প্যাচওয়ার্কের কাপড়ে নানা রঙের সমাহার থাকে। কাপড় আর সুতার কাজে বৈচিত্র্যময় নকশা ফুটে ওঠে প্যাচওয়ার্কের কাপড়ে। তবে হাতে করা সেলাই ছাড়াও ব্লক প্রিন্ট, স্ক্রিন প্রিন্ট, মোম বাটিক থাকতে পারে প্যাচওয়ার্কের কাপড়ে। সুতায় করা আলপনা থাকতে পারে। কোনোটার নকশায় হয়তো ফুটে ওঠে মানুষের মুখ, মাছ কিংবা পাখি, কোনোটাতে পাতা কিংবা ভিন্ন ধাঁচের নকশা। কোনোটা আবার খুব সাধারণ নকশা।
পোশাকে কেমন নকশা হতে পারে
নকশা মূলত নির্ভর করে ডিজাইনারের ওপর। গ্রাহক কীভাবে গ্রহণ করবে সেটার ব্যাপার আসে খানিক পরে। পোশাকের পুরোটাতেও প্যাচওয়ার্ক থাকতে পারে, থাকতে পারে খানিকটা অংশেও। যেমনÑ সাধারণত এই নকশার জন্য শাড়িই বেশি পছন্দ। তবে শাড়ির পুরো অংশে প্যাচওয়ার্ক করা হলে বেশ ভারী হয়ে যায়, পরতে ভালো নাও লাগতে পারে, তাই মূলত পাড়ে ও আঁচলেই থাকে এর ব্যবহার। অন্য পোশাকের কাঁধে, হাতায়, পকেটে, কলারে বা পোশাকের অর্ধেকটাতে প্যাচওয়ার্ক থাকতে পারে। পোশাক পরার ব্যাপারটাও নিজ পছন্দে হয়। হয়তো আপনি প্যাচওয়ার্কের টপ বেছে নিলেন, সঙ্গে পরলেন একরঙা প্যান্ট বা স্কার্ট। আবার উল্টোভাবে কামিজের সঙ্গে পরার মতো কটিতেও পাবেন প্যাচওয়ার্ক। মেয়েদের হুডি শার্ট, শ্রাগও হচ্ছে ইদানীং।

প্যাচও-য়ার্কে তৈরি পোশাক ও অনুষঙ্গের বিশেষত্ব নজরকাড়া। কৌশলগত কারণে এই মাধ্যমে পোশাক হয়ে ওঠে রঙিন। যেহেতু বেশকিছু ফেব্রিক একত্র করে তৈরি করা হয়, তাই বিভিন্ন রঙ এতে দৃশ্যমান হয়। একটির সঙ্গে অন্য কাপড়ের টুকরা জুড়ে দেওয়া হয় সেলাইয়ের মাধ্যমে। তাই সুতার ব্যবহার চোখে পড়ে। এটি বিভিন্ন ধরনের প্যাটার্নের হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় প্যাচ ব্লক, লগ কেবিন ব্লক, স্টার ব্লক। কাপড় টুকরো করে নেওয়ার ক্ষেত্রেও প্যাটার্নের ভিন্নতা দেখা যায়। যেমনÑ চারকোনা, আয়তাকার, ত্রিভুজ, স্ট্রিপ-শেপড, ডায়মন্ড, হেক্সাগন, ক্লামশেলস। প্যাচওয়ার্কের বেশকিছু টেমপ্লেট রয়েছে, সেগুলো ব্যবহার করেও নকশা করতে দেখা যায়। কাপড়ের টুকরাগুলো জুড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকমের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এখানেও দেখা যায় বৈচিত্র্য। যেমন- চেইন সেলাই, স্ট্রিপ, দুটি ট্রায়াঙ্গেল ইউনিট একত্রীকরণ, সমারসেট, রিভার্সড পিস পিয়ার্সিং, সেমিনোল ইত্যাদি।
নিজেই করতে পারেন প্যাচওয়ার্ক
দেখতে নজরকাড়া বলে অনেকেই ভাবেন প্যাচওয়ার্ক করা হয়তো বেশ কঠিন কোনো কাজ। অথচ যতটা জটিল দেখতে লাগে মোটেও এটা ততটা জটিল নয়। কাপড় বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা নকশা ও রঙের কাপড় নির্বাচন করা যায়। এতে প্যাচওয়ার্কে তৈরি পোশাকটি হয়ে উঠবে নজরকাড়া। একাধিক ফেব্রিক ব্যবহার করে তৈরি করা প্যাচওয়ার্কের পোশাকে বিভিন্ন প্যাচ বা কাপড়ের টুকরাতে রঙ ও প্যাটার্নের বৈচিত্র্য অনেকটাই আবশ্যক।