রকিবুল হাসান রকেট
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) এখন আর কেবল কল্পবিজ্ঞানের পাতা বা গবেষণাগারের চার দেয়ালে বন্দি নেই। চ্যাটজিপিটি, ক্লদ কিংবা মিডজার্নির মতো জেনারেটিভ এআই এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। ইমেইল লেখা, কোডিং করা, জটিল সমস্যার সমাধান কিংবা শৈল্পিক ছবি আঁকাÑ সবই চোখের পলকে করে দিচ্ছে এআই। প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব উন্নয়ন যেমন জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি মানব সভ্যতার সামনে ছুঁড়ে দিয়েছে এক বড় মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ। যখন একটি ক্লিকেই সব উত্তর পাওয়া যায়, তখন কি আমাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও বুদ্ধিমত্তা অলস হয়ে পড়ছে? এই এআইয়ের যুগে নিজের মস্তিষ্ককে সচল, ক্ষুরধার এবং বুদ্ধিমান রাখতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে মানুষের মৌলিক চিন্তাশক্তি হুমকির মুখে পড়বে। প্রশ্ন হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই প্লাবনের মাঝে কীভাবে আমরা নিজেদের বুদ্ধিমত্তা শানিত রাখব?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার মানুষের চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও জিজ্ঞাসু মনকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে যুক্তরাজ্যের ঐতিহাসিক বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান রয়্যাল অবজারভেটরি গ্রিনিচ। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলেছেন, তাৎক্ষণিক উত্তর পাওয়ার অভ্যাস মানুষকে ধীরে ধীরে প্রশ্ন করা ও যাচাই করার সংস্কৃতি থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জ্ঞান ও উদ্ভাবনের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
বিবিসি জানায়, যুক্তরাজ্যের অন্যতম প্রাচীন বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান রয়্যাল অবজারভেটরি গ্রিনিচের তত্ত্বাবধায়ক সংস্থা রয়্যাল মিউজিয়ামস গ্রিনিচের পরিচালক প্যাডি রজার্স বলেন, গবেষণার দীর্ঘ ইতিহাস মানবজ্ঞান ও কৌতূহলের শক্তিকে সামনে এনেছে। রজার্সের এই মন্তব্য এসেছে রয়্যাল অবজারভেটরির চলমান রূপান্তর প্রকল্প ‘ফার্স্ট লাইট’-এর প্রেক্ষাপটে। তিনি বলেন, প্রকল্পটির লক্ষ্য গত সাড়ে ৩০০ বছরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধিৎসা ও আবেগকে নতুনভাবে তুলে ধরা।
তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার সম্ভব হতো না। তবে মানুষ নিজে প্রশ্ন না করলে, উত্তর খুঁজে না বের করলে এবং অপ্রত্যাশিত তথ্যের মুখোমুখি না হলে এসব আবিষ্কারও সম্ভব হতো না। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনেক সময় এমন তথ্য সামনে আনে না।
রজার্সের মতে, প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আকাশ সম্পর্কে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে এমন সব কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, যার কথা তারা নিজেরাও ভাবেননি। তাদের কাজের মধ্যে এমন অনেক বিষয় ছিল, যা কোনো যন্ত্র করত না। অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিবাচক ব্যবহারও বাড়ছে। ২০২৪ সালে কম্পিউটার বিজ্ঞানী স্যার ডেমিস হাসাবিস জীবনের গঠন উপাদান প্রোটিন নিয়ে ‘বিপ্লবাত্মক’ কাজের জন্য রসায়নে নোবেল পুরস্কার ভাগ করে নেন। গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান ডিপমাইন্ডের প্রধান নির্বাহী হিসেবে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে প্রায় সব পরিচিত প্রোটিনের গঠন পূর্বাভাস দেন এবং ‘আলফাফোল্ড টু’ নামের একটি সরঞ্জাম তৈরি করেন। ইতোমধ্যেই গুগল অনুসন্ধানের ফলাফলে সংক্ষিপ্ত তথ্য বা লিংকের তালিকার পরিবর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সারসংক্ষেপ দেখানো শুরু করেছে।
‘কগনিটিভ অফলোডিং’ এড়িয়ে চলুন
প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা আমাদের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। যেমনÑ জিপিএস আসার পর মানুষের পথ চেনার স্বাভাবিক ক্ষমতা বা হিপোক্যাম্পাসের ব্যবহার কমে গেছে। একইভাবে সব প্রশ্নের উত্তরের জন্য এআইয়ের ওপর নির্ভর করলে মস্তিষ্কের নিউরোপ্লাস্টিসিটি বা নতুন নিউরাল সংযোগ তৈরির ক্ষমতা হ্রাস পায়।
করণীয় : কোনো বিষয়ে চিন্তা করার সময় শুরুতেই এআইয়ের সাহায্য নেবেন না। প্রথমে নিজের মস্তিষ্ককে খাটান, খসড়া তৈরি করুন এবং নিজস্ব লজিক দাঁড় করান। এআইকে ব্যবহার করুন আপনার চিন্তার পরিপূরক হিসেবে, বিকল্প হিসেবে নয়।
‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ বা বিশ্লেষণাত্মক চিন্তার চর্চা
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) ‘ফিউচার অব জবস রিপোর্ট’ অনুযায়ী, এআইয়ের যুগে সবচেয়ে মূল্যবান দক্ষতা হলো ক্রিটিক্যাল থিংকিং বা বিশ্লেষণাত্মক চিন্তা এবং সৃজনশীলতা। এআই তথ্য দিতে পারে, কিন্তু তথ্যের পেছনের সত্যতা বা নৈতিকতা যাচাই করতে পারে না।
তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস : এআইয়ের দেওয়া তথ্য অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে সেটিকে প্রশ্ন করুন। এর উৎস কী? এর পেছনে অন্য কোনো যুক্তি থাকতে পারে কি?Ñ এই ধরনের প্রশ্ন মস্তিষ্ককে সচল রাখে। মেটা-লার্নিং : আপনি কীভাবে শিখছেন, তা নিয়ে ভাবুন। নিজের শেখার প্রক্রিয়াকে বিশ্লেষণ করা বুদ্ধিমত্তা বাড়ানোর একটি দারুণ উপায়।
‘ডিপ রিডিং’ বা গভীর পঠন
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের রিলস বা শর্টসের যুগে আমাদের মনোযোগের ব্যাপ্তি (Attention Span) আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। আমরা এখন বড় লেখার শুধু স্কিমিং বা ওপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে যাই। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, গভীর মনোযোগ দিয়ে বই পড়ার অভ্যাস মস্তিষ্কের কার্যনির্বাহী ক্ষমতা (Executive Function) বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
বই পড়ার অভ্যাস : প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট কোনো জটিল বিষয়ের বই, বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ বা ক্লাসিক সাহিত্য পড়ুন। এটি মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে উদ্দীপিত করে এবং দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ায়। মস্তিষ্ককে একটি পেশির মতো বিবেচনা করুন। ব্যবহার না করলে এটি দুর্বল হয়ে যায়, আর সঠিক অনুশীলনে এটি আরও শক্তিশালী হয়।
প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং ও লজিক্যাল কোয়েশ্চেনিং
এআইকে দিয়ে সঠিক কাজ করিয়ে নেওয়ার জন্য এখন ‘প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং’ একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। এআইকে সঠিক নির্দেশ দিতে হলে নিজের চিন্তাভাবনা অত্যন্ত স্পষ্ট এবং যৌক্তিক হতে হয়।
সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করার ক্ষমতা : এআইকে যত নিখুঁত এবং জটিল কমান্ড দেবেন, আপনার নিজের চিন্তার গভীরতা তত বাড়বে। এআইকে আপনার ‘স্পারিং পার্টনার’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিপক্ষ হিসেবে ব্যবহার করুন। তাকে বলুন আপনার যুক্তির উল্টো যুক্তি দেখাতে। এতে আপনার চিন্তার অন্ধত্ব (Blind Spots) দূর হবে।
নতুন এবং জটিল দক্ষতা অর্জন (Neurogenesis)
মস্তিষ্ককে চিরতরুণ ও শানিত রাখার সেরা উপায় হলোÑ সম্পূর্ণ নতুন কোনো জটিল বিষয় শেখা। যখন আমরা নতুন কিছু শিখি, তখন মস্তিষ্কে ‘নিউরোজেনেসিস’ বা নতুন কোষের জন্ম হয়।
গণিত ও কোডিং : এআই কোড করতে পারলেও, কোডিংয়ের পেছনের লজিক বা গণিত নিজে সমাধান করার চেষ্টা করুন। সুডোকু, দাবা বা জটিল পাজল সমাধান করা বুদ্ধিমত্তা শানিত রাখার প্রমাণিত উপায়।
পরিকল্পিত বিরতি : সপ্তাহে অন্তত একদিন বা প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা ডিজিটাল ডিভাইস থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকুন। ডিভাইস ছাড়া হাঁটতে যান বা প্রকৃতির মাঝে সময় কাটান। এই নিস্তব্ধতা আপনার চিন্তাভাবনাকে গুছিয়ে নিতে সাহায্য করবে।