শেরপুরের গারো, কোচ, হাজং, বর্মণ, বানাই, হদি ও ডালু সম্প্রদায়
গারো পাহাড়ে কালচারাল একাডেমি স্থাপনের দাবি, মান্দি ভাষা পড়ানোর জন্য জেলায় মাত্র ১২ জন শিক্ষক
মো. নাঈম ইসলাম, শেরপুর
প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:২১ পিএম
‘চিঙ্গনী আগানগিম্মিন খুরাং সালনা-সালনা জিমাংজক’ (আমাদের ভাষা দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে) আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন শেরপুরের শ্রীবর্দীর বালিঝুড়ি অফিসপাড়ার ঋণিকা সাংমা।
ভারতের মেঘালয়ঘেঁষা শেরপুর জেলায় গারো, কোচ, হাজং, বর্মণ, বানাই, হদি ও ডালু সম্প্রদায়ের লোকজন বাস করে। এসব পরিবারের সুখ-দুঃখের গল্পটা চলে মায়ের মুখের ভাষাতেই। কিন্তু ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনতে সব জায়গায় হাঁটতে হয় বাংলা ভাষার হাল ধরে। স্কুল-কলেজ থেকে হাটবাজার, অফিস-আদালত সব জায়গায় চলে বাংলা ভাষার ব্যবহার। দিনের পর দিন চর্চার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে নৃগোষ্ঠীদের নিজস্ব মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি। তাই নৃগোষ্ঠীর লোকজনের জোরালো দাবি, বর্তমান সরকার যেন গারো পাহাড়ে একটি কালচারাল একাডেমি করে দেয়।
গারো পাহাড়ে বাস করা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জীবনমান ও ভাষা নিয়ে কাজ করা সংগঠনের নেতারা জানান, পরিবারে চর্চা কমে যাওয়া ও প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় নিজস্ব বর্ণপরিচয় ও লেখাপড়ার সুযোগ না থাকায় নৃগোষ্ঠীদের হাজার বছরের সংস্কৃতি, ভাষা আজ বিলুপ্তির পথে। তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার্থে দরকার একটি সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্র ও পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি প্রতিটি স্কুলে নৃগোষ্ঠীর শিক্ষক।
-699e94ca1aba0.jpg)
জেলায় সাতটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ৬০ হাজারের বেশি মানুষ বাস করছে। গারো, কোচ, হাজং ভাষা কোনোমতে টিকে থাকলেও অন্যসব ভাষা হারাতে বসেছে। ইতোমধ্যে ডালু, বানাই, বর্মণ ও হদিদের ভাষা হারিয়ে গেছে। গারো পাহাড়ে বাস করা এ চার জাতিসত্তার কেউ তাদের মায়ের ভাষা বলতে ও লিখতে পারে না। সবাই ভুলে গেছে তাদের মায়ের মুখের ভাষা। বানাই, বর্মণ ও হদিদের ভাষা অনেক আগেই হারিয়ে গেলেও ডালু ভাষাটি একেবারে হারিয়ে যায় ২০২০ সালের গোড়ার দিকে।
বেসরকারি সংস্থা আইইডির আদিবাসী সক্ষমতা উন্নয়ন প্রকল্পের তথ্যমতে, জেলায় গারো ২৬ হাজার ৫০০, বর্মণ ২২ হাজার, হাজং ৩ হাজার ৭০০, হদি ৩ হাজার ৫০০, কোচ ৪ হাজার, ডালু ১ হাজার ৫০০, বানাই ১৫০ জন রয়েছে।
নৃগোষ্ঠীদের জন্য নিজস্ব ভাষায় বই প্রকাশে ২০১০ সালে আইন প্রণীত হয়। সে মোতাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের জন্য ছয়টি নৃগোষ্ঠী ভাষায় বই প্রণয়ন করে। সেগুলো হলোÑ চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, সাঁওতাল ও সাদ্রি ভাষা। আর শেরপুরে গারো ভাষার বই থাকলেও নেই পড়ানোর জন্য শিক্ষক। জেলার পাঁচটি উপজেলার ৫২টি ইউনিয়নে মাত্র ১২ জন শিক্ষক আছে নৃগোষ্ঠীর ভাষা পড়ানোর জন্য। আবার তাদের যথেষ্ট প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় পড়াতে গিয়ে হিমশিম পোহাতে হয়। ফলে বইগুলো শিশুদের আদতে তেমন কোনো কাজেই আসছে না।
শিক্ষার্থী ঋতি মারাক বলেন, ‘আমরা স্কুলে খালি বাংলা ভাষাতেই পড়ি, বাংলাতেই কথা বলি। তাই আমরা বাড়িতে গিয়েও বাংলা ভাষায় ব্যবহার করি। মান্দি (গারো) ভাষা তেমন একটা বলতে পারি না।’
বানাইপাড়ার বাসিন্দা বানাই সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থী ঝিনিয়া পাল বলেন, ‘আমাদের বানাই ভাষায় পড়া বা লেখার কোনো ব্যবস্থা নেই। এ ভাষার কোনো অক্ষর নেই, বর্ণমালাও নেই, তাই ভাষাটি পাঠ্যবইয়ে জায়গা পায়নি। আর এজন্য আমাদের নিজস্ব ভাষার প্রতি আগ্রহ কমতে কমতে এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পল্লীর কেউ বানাই ভাষাতে কথা বলতে পারে না। আমরা বাঙালি ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে স্কুলে পড়াশোনা ও খেলাধুলা করায় ছোটবেলা থেকেই বাংলা ভাষা আয়ত্ত করে ফেলেছি। আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য মায়ের ভাষাটি বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।’
নালিতাবাড়ী উপজেলার দাওধারার হাজংপাড়ার মেহেদী হাজং বলেন, ‘পল্লীর কয়েকজন হাজং ভাষায় কথা বলতে পারলেও বাকিরা আয়ত্ত করতে পারেনি। আমরা শিক্ষার্থীরাও মায়ের ভাষা কেবল চর্চার অভাবে ভুলে গেছি। নতুন সরকারের কাছে দাবি, আমার মায়ের মুখের ভাষা শেখা আমার অধিকার। আর সরকার এ অধিকার বাস্তবায়নে একটি কালচারাল একাডেমি স্থাপন করে দিয়ে দায়িত্ব নিয়ে নিক।’
নাকুগাঁও স্থলবন্দরের পেছনে ডালু সম্প্রদায়ের শতাধিক লোকজন বাস করে। চল্লিশোর্ধ্ব সুপ্রিয়া দেবী বলেন, ‘আমরা যখন ছোট ছিলাম, বাপ-দাদার মুখে আমাদের ডালু ভাষায় কথা শুনতাম। চাঁদের সময়ের সঙ্গে মিল রেখে প্রতি মাসে আয়োজন হতো নানান ধর্মীয় অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে সারা রাত ডালু ভাষায় গান হতো, আড্ডা হতো, খাওন হতো। আমাদের এখানে আমার এক বড় জেঠা ডালু ভাষা জানত। কিন্তু করোনায় তিনি মারা যান। তাই এখন আর ডালু ভাষায় কথা বলার কেউ নেই। সবাই ভুলে গেছে মায়ের মুখের ভাষা, চর্চা নেই নিজস্ব সৃংস্কৃতির।’
বর্মণ সম্প্রদায়ের নেতা অনিন্দ্র চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘হাজার বছরের লালিত আমাদের নিজস্ব ভাষা পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। বর্মণ ভাষা সংগ্রহের জন্য আমি ও হিরেন্দ্র চন্দ্র বর্মণ রাজশাহী, বগুড়া, দিনাজপুর ও রংপুরের বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি। কিন্তু সব জায়গায় একই অবস্থা, চর্চার অভাবে ভাষাটি হারিয়ে গেছে। সরকারিভাবে উদ্যোগ নিলে হয়তো আমাদের মায়ের মুখের ভাষাটি উদ্ধার করা যেত।’
শেরপুর বর্মণ কল্যাণ পরিষদের নেতা পবিত্র চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘আমাদের গারো পাহাড়ে বসবাসরত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও সৃংস্কৃতি নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। কিন্তু ডালু, বানাই, বর্মণ ও হদিদের ভাষার লিখিত কোনো রূপ না থাকায় ভাষাগুলো উদ্ধার করা মুশকিল হয়ে গেছে। আর কিছু ভাষা বিভিন্ন সময় লাতিন অক্ষরে লিপিবদ্ধ করা হয়। যা আবার সবাই পড়তেও পারে না। তা ছাড়া এসব পাহাড়ি এলাকায় সব বিদ্যালয়ে মাতৃভাষার শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভাষা শিক্ষা হতে বঞ্চিত হচ্ছে।’
গারো পাহাড়ে ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করেন সৃষ্টি হিউম্যান রাইটস সোসাইটির যুগ্ম আহ্বায়ক কাঞ্চন মিস্টার মারাক। তিনি বলেন, চিঙ্গনী আগানগিম্মিন খুরাং সালনা-সালনা জিমাংজক’ (আমাদের ভাষা দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে)। ‘গারো, কোচ, বর্মণ, হাজং, ডালু, বানাই ও হদিদের ছিল নিজস্ব ভাষা ও আচার, অনুষ্ঠান। কিন্তু কালের বিবর্তনে গারো, কোচ ও হাজংদের ভাষা টিকে থাকলেও ডালু, বানাই, বর্মণ ও হদিদের মাতৃভাষা হারিয়ে গেছে। এসব সম্প্রদায় তাদের মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারে না। তারা এখন বাংলা ভাষাতেই কথা বলে। প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় নিজস্ব বর্ণপরিচয়, চর্চা ও লেখাপড়ার সুযোগ না থাকায় এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। মান্দি ভাষার বই থাকলেও পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বইগুলো পড়ানো যাচ্ছে না। ফলে শিকড় থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে এসব জাতিগোষ্ঠীর উত্তরসূরিরা। তাই বর্তমান সরকার যদি গারো পাহাড়ে নেত্রকোণার বিরিশিরির আদলে একটা কালচারাল একাডেমি স্থাপন করে দেয়, তাহলে এখানকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অর্ধ লাখ মানুষের নিজস্ব ভাষা ও সৃংস্কৃতি টিকে থাকবে। ’
বেসরকারি সংস্থা আইইডির আদিবাসী সক্ষমতা উন্নয়ন প্রকল্পের ফেলো সুমন্ত বর্মণ বলেন, ‘ভারতীয় উপমহাদেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে এই নৃগোষ্ঠীদের ছিল সক্রিয় অংশগ্রহণ। আর এখানে বসবাসরত প্রত্যেক সম্প্রদায়ের ছিল নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি। নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা ছাড়া শিক্ষা বা কোনো কাজেই তাদের নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করতে পারে না। প্রবীণরা নিজ ভাষায় কথা বলতে পারলেও নতুন প্রজন্ম তাদের ভাষা হারাতে বসেছে। আমাদের গারো পাহাড়ে ইতোমধ্যে ডালু, বানাই, বর্মণ ও হদিদের মাতৃভাষা হারিয়ে গেছে। হারানো ভাষাগুলো সংগ্রহের ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা বিভাগের কয়েকজন অধ্যাপকের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছি। আশা করছি দ্রুতই বর্মণ ভাষাটা ফিরিয়ে আনা হবে।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সায়েদুল ইসলাম বলেন, ‘জেলায় এখম ১২ জন শিক্ষক নৃগোষ্ঠীদের বই পড়াচ্ছেন। চাহিদা যদিও অনেক বেশি। আশা করছি দ্রুত কর্তৃপক্ষের সহায়তায় নৃগোষ্ঠীদের নিজস্ব ভাষার বই পাব এবং শিক্ষক পেলে আমরা এই ভাষার চর্চা অব্যাহত রাখতে পারব।’
জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘আমরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দিয়ে বিভিন্নভাবে তাদের সংযুক্ত করছি। এরই মধ্যে কালচারাল একাডেমি স্থাপনের জন্য প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। আমরা সবার ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’