× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জিরাতিগাঁও - বছরে একবার দেখা মেলে যে গ্রামের

রাসেল আহমদ

প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:১৮ পিএম

জিরাতিগাঁও - বছরে একবার দেখা মেলে যে গ্রামের

হাওরের গহিনে জলের বুক ছিঁড়ে যে মাটি জেগে ওঠে, সেখানে শুধু ফসলই জন্মায় না, জেগে ওঠে হারিয়ে যাওয়া এক গ্রাম। নাম তার মোখশেদপুর। তবে এখন আর কেউ একে গ্রাম বলে না। প্রতি বোরো ধানের মৌসুমে ফিরে আসা মানুষদের মুখে এর নতুন নাম ‘জিরাতিগাঁও’।

বাংলাদেশের ঈশান কোণে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মোড়ানো সুনামগঞ্জ জেলার ভাটি অঞ্চলে জীবন মানেই জল আর স্থলের পালাবদল। এখানে ছয় মাস জল, ছয় মাস মাটি। এই ছন্দে প্রকৃতি যেমন নিজেকে বদলায়, তেমনি বদলায় মানুষের জীবনও। 

হাওর-বাওর, খাল-বিল আর নদ-নদীর জালে আবদ্ধ এই ভূখণ্ডে প্রকৃতি যেমন উদার, তেমনি নির্মমও। এখানকার মানুষের জীবন তাই প্রকৃতির সঙ্গে নিরন্তর বোঝাপড়ার গল্প। এই জল-জলার ভূখণ্ডে কৃষি ও মৎস্য একসময় ছিল জীবনের মূল ভিত্তি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ভিত্তির নিচে জমেছে ভয়, অনিশ্চয়তা আর বঞ্চনার স্তর।

যে গ্রাম মানচিত্রে আছে, বাস্তবে নেই

মধ্যনগর উপজেলার চামরদানী ইউনিয়নের অন্তর্গত ঘুরমার হাওরের গহিনে, বউলাই নদীর পাড়ঘেঁষে মোখশেদপুর একসময় ছিল জনবসতিপূর্ণ সম্পদ-সমৃদ্ধিতে পূর্ণ একটি গ্রাম। প্রায় দেড় শতাব্দীর বসতির ইতিহাস বহনকারী এই গ্রামটি আজ বাস্তবে নেই। নেই ঘরবাড়ি, নেই স্থায়ী মানুষ। অথচ সরকারের ভূমি রেকর্ডে, দাগ-খতিয়ানে আজও তার নাম রয়ে গেছে, একটি অদৃশ্য গ্রামের মতো। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে মোখশেদপুর গ্রামটি ধীরে ধীরে মানুষশূন্য হয়ে পড়ে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকেই শুরু হয় অবক্ষয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বারবার ফসলহানি, নদীর আগ্রাসন আর জলদস্যুদের দাপট একসময় মানুষের সহ্যসীমা ভেঙে দেয়।

বর্ষাকালে ডাকাতির আতঙ্ক ছিল নিত্যসঙ্গী। ধান বিক্রির খবর পেলেই রাতের অন্ধকারে নৌকা ভিড়ত ঘাটে। প্রাণ বাঁচাতে মানুষ টাকা লুকাত, জমা রাখত বাজারের দোকানদারের কাছে। তবু রেহাই মিলত না। জিরাতিগাঁওয়ে প্রতি বছরেই বোরো ধান মৌসুমে সপরিবারে আসেন ৭৫ বছর বয়সী ব্রজেন্দ্র চন্দ্র সরকার। অতীতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ধান বিক্রির খবর পাইলে রাইতেই ডাকাইত আইতো। টাকা না পাইলে মারধর করত। একবার তো আমি কোনোমতে জানে বাঁচছি। মামলা করলেও কাম অইত না। এই দুঃখেই আমরা গাঁও ছাড়ছি।’ ভয়ই শেষ পর্যন্ত মানুষকে উজানের দিকে ঠেলে দেয়।

উজানে ঘর, ভাটিতে শিকড়

গ্রাম ছেড়ে গেলেও জমি ছাড়েনি তারা। ভিটেমাটি বিক্রি করেনি অধিকাংশ পরিবার। কারণ ওই মাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের অস্তিত্ব, স্মৃতি আর বেঁচে থাকার স্বপ্ন।

মোখশেদপুরের অধিকাংশ পরিবার বর্তমানে মধ্যনগর উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী বংশীকুণ্ডা উত্তর ইউনিয়নের বাঁকাতলা গ্রামে বসবাস করে। এ ছাড়া উপজেলার নিয়ামতপুর, খলাপাড়া, কেশবপুর, বাট্টা, দরাপপুরসহ আশপাশের উজান এলাকায় বসবাস করছে আরও কিছু পরিবার। কেউ স্থায়ীভাবে, কেউ অস্থায়ীভাবে। কিন্তু বোরো ধানের মৌসুম এলেই তারা আবার ফিরে আসে পূর্বপুরুষের বসতিতে, নিজেদের জমিতে ফসল ফলাতে।

বোরো ধানের জন্য গড়ে ওঠা অস্থায়ী গ্রাম

বর্ষার জল সরে গেলে ঘুরমার হাওরের পাড়ে জেগে ওঠে ৬-৭ মাসের এই অস্থায়ী জনপদ। নিচু ভিটায় খড়, বাঁশ, কঞ্চি আর প্লাস্টিকের ত্রিপাল দিয়ে গড়া হয় অস্থায়ী ঘর। নেই বিদ্যুৎ, নেই পাকা রাস্তা, নেই হাসপাতাল কিংবা স্কুল। এই মৌসুমি জনপদ থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘জিরাতিগাঁও’। শুধুই বোরো ধান চাষের জন্য তৈরি হওয়া এক অদ্ভুত গ্রাম, যেখানে মানুষ থাকে, কিন্তু ঠিকানাহীনভাবে। ছয় মাস উজানে সংসার, ছয় মাস জিরাতিওগাঁওয়ে কৃষিকাজ, এই চক্রেই চলে তাদের জীবন। কাজ শেষ হলে আবার সব গুটিয়ে ফিরে যায় উজানে। গ্রাম আবার শূন্য হয়ে পড়ে, হাওরের নীরবতায় মিশে যায় মানুষের চিহ্ন। জলের তলায় হারিয়ে যাওয়া জিরাতিগাঁওয়ের বুকে খেলা করে হাওরের উত্তাল ঢেউ।

হাওর আছে, মাছ আছে, নেই অধিকার

একসময় ঘুরমাসহ আশপাশের হাওরের জলে ছিল জীবিকার অবাধ উৎস। মাছ ধরার ছিল স্বাধীনতা। এখন সেই হাওরের মালিকানা বদলেছে। মাছের মালিক এখন ইজারাদার। এ কথা বলতে গিয়ে মধ্যবয়সী দিলীপ সরকার ক্ষোভ চাপতে পারেন না, বলেন, ‘আগে ঘুরমা, ঝিনাইরা, কাট্টুয়ার হাওরে অবাধে মাছ ধরছি। এখন পানিও ছোঁওন যায় না। ঝিনাইরা বিল আমরার রেকর্ডের সম্পত্তি, তবু মাছ ধরতে পারি না।’ মাছ ধরার অধিকার হারিয়ে মানুষ আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে ধানের ওপর।

দুর্বিষহ জীবনের মৌসুম

কৃষি মৌসুমে জিরাতিগাঁওয়ের জীবন সবচেয়ে কঠিন। শিশুদের লেখাপড়া বন্ধ থাকে। কোনো স্কুল নেই। অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। বিশুদ্ধ পানির সংকট ভয়াবহ। রান্না করার জন্য গোবরের দলায় ঘুঁটি দিতে দিতে শিবানী সরকার বলেন, ‘কলের পানি তো দূরের কথা, চৈত (চৈত্র) মাসে সপ্তাহে একবারও গোসল করতে পারি না। গাঙের পানিতে সব ময়লা। গরু মরলে ভাসায়া দেয়। ভালা পানি নাই। উজানে গেলেই একটু শান্তি।’ রোগবালাই, অপুষ্টি আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই কাটে এই সময়।

পরিশ্রমে ভর করে উৎপাদন

তবু এই মানুষগুলো থেমে থাকে না। প্রতি বছর জিরাতগাঁওয়ে উৎপাদিত হয় প্রায় ১৫-২০ হাজার মণ ধান। গৃহপালিত গরুর সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। এর মধ্যে দুধেল গাভি প্রায় দেড় হাজার। বিস্তীর্ণ চারণভূমিতে প্রাকৃতিক ঘাস থাকায় গরু পালন তুলনামূলক সহজ। কৃষিকাজে তাদের দক্ষতা আর পরিশ্রম চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। হাওরের নির্জন গহিনে তারা ধান চাষে যেন একাকার হয়ে যায়, সব ভুলে, সব কষ্ট ভুলে।

দাদনের অদৃশ্য ফাঁস

এই নির্জনতার সুযোগ নেয় সুদখোর মহাজনরা। দাদনের ফাঁদ পাতা হয় গেরস্তালি মৌসুমে। বাজার নেই, তাই অস্থায়ী দোকানিরা নিত্যপণ্য বিক্রি করে চড়া দামে। বাকির হিসাব জমে লাল খাতায়। ধান উঠতেই শুরু হয় হিসাব। চড়াসুদে কষা অঙ্ক। ‘আট আনার মাল পাঁচ সিঁকা’ দামে ধান তুলে নেয় মহাজন। দেনা শোধ করতে গিয়ে বিক্রি হয় গরু, শেষ সম্বলটুকুও।

শেষে থাকে শুধু প্রত্যাবর্তন

সবশেষে তাদের হাতে থাকে কিছু হাঁস-মুরগি, এক-আধ বস্তা ধান, ভাঙা হাঁড়ি-পাতিল, প্লাস্টিকের ত্রিপাল আর আবার ফিরে আসার সংকল্প। যুবক সুজন বিশ্বাসের কথায় সেই বাস্তবতা স্পষ্ট, ‘এই কাম ছাড়া তো আর কুনু কাম পারি না। এইটাই আমরার গতি।’

একটি প্রশ্ন রেখে যায় জিরাতিগাঁও

মোখশেদপুর আজ আর গ্রাম নয়, তবু সে হারিয়ে যায়নি। বোরো ধানের মৌসুম এলেই সে ফিরে আসে। মানুষের পায়ে পায়ে, ঘামে ঘামে। জিরাতিগাঁও আসলে ভাটি অঞ্চলের এক নীরব দলিল। যেখানে মানুষ ঘরহীন হয়েও ভূমিহীন নয়, গ্রামহীন হয়েও শিকড়ছিন্ন নয়।

এই গ্রাম আমাদের প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়Ñ উন্নয়ন, নিরাপত্তা আর ন্যায্যতার বাইরে পড়ে থাকা এই মানুষগুলো কবে স্থায়ী ঠিকানা পাবে?

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা