লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:১৬ পিএম
যেকোনো দলকে ক্ষমতায় আনার জন্য নারী ভোটারদের অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী কাঠামোয় এই প্রান্তিক নারীদের অবস্থান আসলে কতটুকু গুরুত্ব বহন করে?
শাসক বদলায়, গদি বদলায়, কিন্তু সাধারণ খেটে খাওয়া নারীর ভাগ্যের চাকা কতটা ঘোরে? বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অভ্যুত্থান, আন্দোলন আর ক্ষমতার পালাবদলের অভাব নেই। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান- ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে নারীরা রাজপথে নেমেছেন, বুকের রক্ত দিয়েছেন এবং ব্যালট বাক্সে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন। কিন্তু ক্ষমতার মসনদে যখন নতুন কোনো সরকার আসীন হয়, তখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী কাঠামোয় এই প্রান্তিক নারীদের অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?
রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের বড় বড় বুলি প্রায়শই চাপা পড়ে যায় সেই নারীদের দীর্ঘশ্বাসে, যাদের ঘামে সচল থাকে অর্থনীতির চাকা অথচ যাদের শ্রমের কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। নির্বাচনের পর রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, ধানমন্ডি ও জুরাইন এলাকার বিভিন্ন শ্রেণিপেশার প্রান্তিক নারীর সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে তাদের হতাশা, বঞ্চনা ও আকাঙ্ক্ষার চিত্র। রাষ্ট্র ও সরকারের কাছে তাদের প্রত্যাশা খুবই সামান্যÑ বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার। কিন্তু তা পূরণে রাষ্ট্রের উদাসীনতা যেন আকাশসমান।
উচ্ছেদ আতঙ্কে ফুটপাতে আমেনা
ক্ষমতার পালাবদল প্রান্তিক নারীর জীবনে কতটা প্রভাব ফেলে, তা বোঝা যায় তাদের প্রাত্যহিক সংগ্রামের দিকে তাকালে। মোহাম্মদপুরের টাউন হল ও বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ১৫ বছর ধরে ফুটপাতে পিঠা ও চা বিক্রি করছেন আমেনা। থাকেন পাশেরই এক বস্তিতে। সরকার পরিবর্তনের প্রভাব তার জীবনে কেবল ‘উচ্ছেদ আতঙ্ক’ হিসেবেই ধরা দেয়। আমেনা আক্ষেপ করে বলেন, ‘টিভিতে দেখি বড় বড় কথা, গরিবের জন্য নাকি সরকার কত কিছু করে! কিন্তু আমাদের তো একটা স্থায়ী জায়গাই জুটল না। আজ পুলিশ তাড়া করে, কাল লোকাল নেতা চাঁদা চায়। নতুন সরকারের কাছে আমার একটাই দাবিÑ আমাদের মতো যারা রাস্তায় খেটে খায়, তাদের জন্য একটা স্থায়ী বসার জায়গা দিক আর বস্তি উচ্ছেদ না করে মাথা গোঁজার একটু নিশ্চয়তা দিক।’
বাজারের আগুনে পুড়ছে রহিমার সংসার
আদাবরের একটি ছোট পোশাক কারখানায় কাজ করেন রহিমা। মাস শেষে যা বেতন পান, ঘরভাড়া আর চাল-ডাল কিনতেই তা পনেরো দিনে ফুরিয়ে যায়। তার কণ্ঠে ঝরে পড়ে তীব্র হতাশা, ‘সরকার বদলায়, কিন্তু বাজারের আগুন তো নেভে না। বেতন বাড়ে দশ টাকা, আর জিনিসের দাম বাড়ে একশ টাকা। জমানো টাকা তো দূরের কথা, উল্টো মুদির দোকানে প্রতি মাসে ধার বাড়ে। যে সরকারই আসুক, তারা যেন আমাদের বাঁচার মতো একটা বেতন দেয় আর দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করে।’
চিকিৎসাসেবা ও নাসিমার অভিজ্ঞতা
জুরাইন এলাকার বাসিন্দা নাসিমার স্বামী পেশায় রিকশাচালক। আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা নাসিমাকে কিছুদিন আগে শারীরিক জটিলতায় পড়তে হয়েছিল। তার অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রের চিকিৎসাব্যবস্থার করুণ চিত্রই তুলে ধরে। নাসিমা বলেন, ‘সরকারি মাতৃত্বকালীন কেন্দ্রে গিয়েছিলাম, ডাক্তার বলল পেটের ছবি তোলার (আলট্রাসনোগ্রাফি) মেশিন নাকি নষ্ট। বাধ্য হয়ে এলাকার এক প্রাইভেট ক্লিনিকে হাজার টাকা খরচ করে টেস্ট করিয়েছি। আমাদের মতো গরিবের তো অসুখ হওয়ারও উপায় নেই। নতুন সরকার যেন সরকারি হাসপাতালগুলোতে নজর দেয়, গরিব মানুষ যেন অন্তত বিনা পয়সায় চিকিৎসাটা পায়।’
শ্রমের স্বীকৃতিহীন খাদেজা
রায়েরবাজারের বস্তি থেকে প্রতিদিন সকালে হেঁটে ধানমন্ডির অভিজাত এলাকার তিনটি ফ্ল্যাটে ‘ছুটা বুয়া’র কাজ করেন খাদেজা। তার কোনো সাপ্তাহিক ছুটি নেই, অসুস্থ হলে বেতন কাটা যায়। রাষ্ট্রের কাঠামোর ওপর তার ক্ষোভ স্পষ্ট, ‘সারা দিন বড়লোকদের ঘর সামলাই, আর তারা দেশ চালায়। কিন্তু আমাদের কোনো দাম নেই। আমাদের কাজের না আছে কোনো নির্দিষ্ট সময়, না আছে কোনো নিয়ম। সরকার অনেক আইন করে, কিন্তু আমাদের মতো কাজের মানুষদের জন্য তো কোনো আইন দেখি না।’
রাষ্ট্র ও কাঠামোগত অন্ধত্ব
উপরিউক্ত চিত্রগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটিই বাংলাদেশের লাখো প্রান্তিক নারীর প্রতিদিনের বাস্তবতা। রাষ্ট্র যখন ‘নারী উন্নয়ন’ নিয়ে কথা বলে, তখন তা সাধারণত সীমাবদ্ধ থাকে মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য কিংবা সংসদে কয়েকটি সংরক্ষিত আসনের মধ্যে। কিন্তু যারা অর্থনীতিকে নিজেদের কাঁধে বয়ে বেড়াচ্ছেন, সেই গার্মেন্টস কর্মী, কৃষি শ্রমিক বা গৃহকর্মীদের রাষ্ট্র কেবল ‘সস্তা শ্রমের জোগানদাতা’ হিসেবেই দেখে। তাদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, ডে-কেয়ার বা মাতৃত্বকালীন ছুটির মতো বিষয়গুলো এখনও মালিকপক্ষের দয়ার ওপর নির্ভরশীল।
সবচেয়ে বড় বঞ্চনার শিকার হন খাদেজার মতো নারীরা, যারা গৃহশ্রম বা কেয়ার ওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। একটি সমাজ ও অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার মূল ভিত্তি এই শ্রম অথচ জিডিপিতে এর কোনো প্রতিফলন নেই। যারা অন্যের ঘরে শ্রম বিক্রি করেন এবং যারা নিজের ঘরে অবৈতনিক শ্রম দেনÑ উভয়ই রাষ্ট্রের সমান অংশীদার। একটি আধুনিক ও গণসার্বভৌম রাষ্ট্র গড়তে হলে গৃহশ্রমকে আনুষ্ঠানিক শ্রমের স্বীকৃতি দিতে হবে। গৃহশ্রমিকদের জন্য কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, ন্যূনতম মজুরি এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের কোনো ঐচ্ছিক কাজ নয়, বরং এটি তাদের নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকার।
নতুন সরকারের প্রতি প্রত্যাশা
সরকার বদল হলেও রাষ্ট্রের ভেতরে একটি নীরব ‘পিতৃতান্ত্রিক ঐক্য’ রয়ে যায়। রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হলেও, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সাধারণ নারীদের প্রবেশাধিকার প্রায় শূন্য। এই কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ভাঙতে নতুন সরকারকে কিছু সুনির্দিষ্ট ও জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে-
১. আইনি সুরক্ষা : গৃহশ্রমিক সুরক্ষা ও কল্যাণনীতি প্রণয়ন করে সেটির কঠোর আইনি বাস্তবায়ন করতে হবে। শ্রম আইনে গৃহশ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করে তাদের কর্মঘণ্টা ও ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
২. স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ : জুরাইনের নাসিমার মতো নারীদের জন্য প্রতিটি পাড়ামহল্লায় সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে আধুনিক ও দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। গর্ভবতী ও প্রান্তিক নারীদের জন্য বিনামূল্যে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
৩. আবাসন ও পুনর্বাসন : মোহাম্মদপুরের আমেনাদের মতো ভাসমান খেটে খাওয়া মানুষদের উচ্ছেদ করার আগে তাদের স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। মেহনতি মানুষের জন্য সহজ শর্তে আবাসন বা ডরমেটরির ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের আবশ্যিক দায়িত্ব।
৪. রেশনিং ব্যবস্থা : মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা আরও সম্প্রসারিত করতে হবে, যাতে রহিমার মতো পোশাক শ্রমিকরা ঋণের জালে আটকে না পড়েন।
রাজনীতির মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন জরুরি
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব বলতে মূলত রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকারনির্ভর নেতৃত্বকেই বোঝানো হয়ে আসছে। তৃণমূল থেকে উঠে আসা সাধারণ নারীদের জন্য রাজনীতির মাঠ এখনও প্রচণ্ড অমসৃণ।
নৃবিজ্ঞানী অধ্যাপক মানস চৌধুরীর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে জনপরিসরে যারা আধিপত্য বিস্তার করেছেন, তাদের মধ্যেও একটি অভাবনীয় ‘পিতৃতান্ত্রিক ঐক্য’ লক্ষ করা গেছে। নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোও অনেক ক্ষেত্রে নারী প্রশ্নে বিদ্যমান পিতৃতান্ত্রিক জনমতের সঙ্গে আপস করে নিচ্ছে।
অধিকারকর্মীরা মনে করেন, সংসদে পরোক্ষ মনোনয়নে সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে নারীর প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় না। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের মরিয়ম নেছার মতে, নারী ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি কেবল অধিকারচর্চা নয়, বরং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বলিষ্ঠ দাবি। এই কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়নে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ করা সময়ের দাবি।
একটি গণতান্ত্রিক ও গণসার্বভৌম রাষ্ট্র কখনোই তার অর্ধেক জনসংখ্যাকে কাঠামোগত শোষণের মধ্যে রেখে সামনে এগোতে পারে না। নতুন সরকারকে বুঝতে হবে, নারীর অধিকার মানে কেবল নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কয়েকটি গতানুগতিক প্রকল্প নয়। রাষ্ট্রের সামষ্টিক অর্থনীতি, শ্রম আইন, স্বাস্থ্যনীতি এবং নগর পরিকল্পনার প্রতিটি স্তরে এই প্রান্তিক ও সাধারণ নারীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
রাষ্ট্রের দর্শন যদি না বদলায়, তবে সাধারণ মানুষের কাছে সেই পালাবদল স্রেফ এক রাজনৈতিক প্রহসনে পরিণত হয়। নতুন সরকার কি পারবে এই পিতৃতান্ত্রিক ও পুঁজিতান্ত্রিক শোষণযন্ত্র ভেঙে খেটে খাওয়া নারীদের রাষ্ট্রের প্রকৃত অংশীদার করতে? সেই উত্তরের অপেক্ষায় এখন পুরো বাংলাদেশ।