নুসরাত মুনা
প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:৪৫ পিএম
রমজান আমাদের জীবনে আসে রহমত, মাগফিরাত আর নাজাতের বার্তা নিয়ে। এটি আসে মানুষের ভেতরকার মানুষটাকে জাগিয়ে তুলতে। এই মাসে বড়দের ইবাদত যেমন অর্থবহ হয়, তেমনি শিশুদের জন্যও রমজান হতে পারে জীবনের প্রথম ‘আত্মসংযম শেখার শুরু’। কিন্তু অনেক অভিভাবকের মনে দ্বিধা কাজ করে ‘শিশুকে রোজা রাখতে বাধ্য করব কি না?’ কিংবা ‘কীভাবে তাকে রোজার জন্য প্রস্তুত করব?’ কোনো চাপ না দিয়ে কীভাবে শিশুর মনে রোজার প্রতি ভালোবাসা তৈরি করা যায়?
ইসলাম আমাদেরকে এই প্রস্তুতির ক্ষেত্রে খুবই সুন্দর ভারসাম্য শেখায়। শিশুর ওপর রোজা ফরজ নয়, রোজা ফরজ হয় বালেগ হওয়ার পর। কিন্তু শিশুকে রোজার সঙ্গে ভালোবাসা ও কৌশলের মাধ্যমে পরিচিত করা, ধীরে ধীরে অভ্যাস তৈরি করানো। এটি একটি প্রশংসনীয় চেষ্টা। শিশুকে রোজার জন্য প্রস্তুত করা মানে তাকে কষ্ট দেওয়া নয়, বরং তাকে ধীরে ধীরে শক্তিশালী করা, শিখিয়ে দেওয়া সংযমের সৌন্দর্য।
যেভাবে শিশুকে রোজার জন্য প্রস্তুত করবেন
উৎসবমুখর ইবাদতের আবহ তৈরি করা শিশুরা দ্রুত পরিবেশ থেকে দেখে শেখে। তারা যখন দেখবে, সেহরিতে পরিবার একসঙ্গে বসছে, ইফতারের আগে দোয়ার সময় সবাই শান্ত হচ্ছে, টিভি বা ফোনের বদলে কুরআনের তিলাওয়াত হচ্ছে, কথাবার্তায় রাগ কমছে, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই অনুভব করবে, রমজান একটি বিশেষ মাস। শিশুর মনে ইবাদতের প্রতি আগ্রহ তৈরির জন্য এটি প্রথম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী ধাপ।

রোজা কেবল না খেয়ে থাকা নয়, সংযম শেখা
শিশুকে সহজ করে বোঝাতে হবে, রোজা মানে শুধু খাবার বন্ধ নয়; রোজা মানে মিথ্যা না বলা, ঝগড়া না করা, কাউকে কষ্ট না দেওয়া, দরিদ্র মানুষের কষ্ট বোঝা, আল্লাহকে খুশি করা। শিশু তাকওয়ার সংজ্ঞা বুঝবে না। কিন্তু বুঝবে ‘আল্লাহ খুশি হন’। তাই কৌশল হতে পারে, প্রতিদিন শিশুকে ছোট করে বলা, ‘আজ রোজায় তোমার একটা ভালো কাজ কী ছিল?’ এতে রোজা তাদের কাছে নৈতিক উন্নতির অভ্যাস হয়ে উঠবে। প্রতিদিন শিশুকে একটি ভালো কাজের উপদেশ দিন। ভালো কাজের জন্য প্রশংসা করুন। ঝগড়া, বিবাদ ও কটুকথা থেকে নিজেরা বিরত থাকুন, শিশুকেও তা শেখান।
ধাপে ধাপে অভ্যাস গড়ে তোলা
শিশুকে প্রথম দিন থেকেই পূর্ণ রোজা করাতে হবেÑ এমন ধারণা ঠিক নয়। বরং সময়কে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করে দিনÑ কেউ হয়তো ২-৩ ঘণ্টা পারবে, কেউ দুপুর পর্যন্ত, কেউ আসর পর্যন্ত। এই ট্রেনিং রোজা শিশুর আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। এখানে একটি কার্যকর কৌশল হলো শিশুর কাছে এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থাপন করা। আজ আমরা ৩ ঘণ্টা রোজা রাখব, পারবে? এরপর ধীরে ধীরে সময় বাড়ানো। শিশুরা চ্যালেঞ্জ পছন্দ করে, আর সেই আনন্দই তাদের রোজার প্রতি আগ্রহ তৈরি করবে।
শিশুকে রোজায় ব্যস্ত রাখার কৌশল ইসলামী ঐতিহ্যের অংশ। আজকের সময়ে খেলনার পাশাপাশি শিশুকে ব্যস্ত রাখতে ইসলামী গল্প শোনানো, কাগজে রমজান চার্ট বানানো, ইফতারের টেবিল সাজাতে সাহায্য করা, মসজিদে নামাজ পড়তে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি করা যেতে পারে।
রোজাকে পারিবারিক অংশগ্রহণ বানানো
শিশুকে ইফতার প্রস্তুতিতে ছোট দায়িত্ব দিন। যেমনÑ খেজুর গুনে রাখা, টেবিল সাজানো, শরবত বানানো, দোয়ার সময় হাত তুলতে শেখানো, ইফতার পাঠানো। এতে তারা মনে করবে ‘আমি রমজানের অংশ।’ এই অংশগ্রহণই রোজার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক গভীর করে।
সেহরি ও ইফতারের রুটিনকে শিশুবান্ধব করা। অনেক শিশু সেহরিতে উঠতে পারে না, আবার উঠলেও খেতে চায় না। তাদের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম নয়, বরং সহজ পরিকল্পনা দরকার। যেমনÑ সেহরিতে তাদের পছন্দের পুষ্টিকর খাবার দেওয়া, রোজার সময় খেলাধুলা কমিয়ে বিশ্রাম বাড়ানো, দুপুরে ঘুম নিশ্চিত করা- এসব শিশুর রোজা সহজ করে দেয়। কারণ শিশুকে রোজার জন্য শুধু মানসিকভাবে নয়, শারীরিকভাবেও প্রস্তুত করতে হয়।
আরেকটি কার্যকর কৌশল হলো, ইফতারের আগে শেষ এক ঘণ্টাকে শান্ত সময় বানানো। এই সময় শিশুরা সাধারণত বেশি অস্থির হয়। তখন তাদের সঙ্গে বসে দোয়া শেখানো, ছোট্ট কুরআনের আয়াত পড়ানো, আজ কার জন্য দোয়া করব? এমন প্রশ্ন করা। শিশুর মনকে খাবারের চিন্তা থেকে সরিয়ে ইবাদতের দিকে নিয়ে যায়।
অনেকে শিশু রোজা রাখলে পুরস্কার দেন- এটা ভালো উৎসাহ। কিন্তু কৌশল হলো পুরস্কারকে যেন ইবাদতের বিকল্প উদ্দেশ্য না বানানো হয়। বরং শিশুকে বলা যায় ‘আল্লাহ খুশি হয়েছেন তাই আমরা তোমাকে ভালোবাসার উপহার দিচ্ছি।’ এতে শিশুর মনে রোজা থাকবে আল্লাহর জন্য, পুরস্কার থাকবে পরিবারের ভালোবাসা হিসেবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া। শিশুর যদি দুর্বলতা থাকে, অসুস্থ থাকে, গরমে বেশি কষ্ট হয়, তাহলে তাকে রোজা রাখতে বাধ্য করা যাবে না। শিশুর রোজা শেখার উদ্দেশ্য হলো প্রস্তুতি, কষ্ট নয়। কল্যাণই ইসলামের লক্ষ্য।
শিশুদের রোজার জন্য প্রস্তুত করা মানে তাদের ভেতরে একটি সুন্দর জীবনদর্শন তৈরি করা। সংযম, ধৈর্য, দয়া, আল্লাহভীতিÑ এসবই রোজার শিক্ষা। যদি আমরা এই শিক্ষা শিশুর হৃদয়ে ভালোবাসা দিয়ে বসিয়ে দিতে পারি, তাহলে রোজা তার কাছে আর কষ্টের বিষয় থাকবে না, এটি হয়ে উঠবে গর্বের ইবাদত। আর সেই ছোট্ট রোজাদার যখন বলবে, ‘আজ আমি আল্লাহর জন্য রোজা রেখেছি।’ তখন সেটাই হবে আমাদের রমজানের সবচেয়ে সুন্দর অর্জন।