ডা. উজ্জ্বল কুমার রায়
প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪:০৬ পিএম
ইসলামের প্রতিটি ইবাদত খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বহুবিধ কল্যাণের এই রোজায় মানুষের জন্য ক্ষতি বা অকল্যাণকর কিছু থাকতে পারে না। লিভার হচ্ছে মানবদেহের সর্ববৃহৎ অভ্যন্তরীণ অঙ্গ এবং শরীরে সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। মানুষের ধারণা প্রচলিত আছে রোজায় দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকায় লিভার রোগীদের বিশেষ করে যারা নিয়মিত অ্যাসিডিটির মেডিসিন গ্রহণ করেন কিংবা একটু ভাজাপোড়া খেলেই যাদের অ্যাসিডিটি ভোগায় তারা রমজানের ইফতারিতে ভয়ে ভয়ে খাবার গ্রহণ করেন। অনেকেরই ইফতারের পর পেটফুলে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। রোজায় না খেয়ে থাকায় লিভারের কোনো ক্ষতি হয় না। এমনকি যারা অ্যাসিডিটি ও ফ্যাটি লিভারে ভুগছেন তাদেরও ক্ষতির থেকে উপকার বহুগুণে বেশি। বরং উপবাসের জন্য লিভারের গ্লাইকোজেন স্টোরেজ ব্যবহৃত হওয়ায় লিভারের কোষ আরও সচেতন ও কর্মক্ষম হয়। যাদের অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত লিভার আছে এক্ষেত্রে ফ্যাট ভেঙে লিভার সেলের কার্যক্রম সহজতর হয়। লিভার রোগ যেমন হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের রমজানে না খেয়ে থাকায় লিভারের কার্যকারিতা কোনো ব্যাঘাত হয় না।
ইফতার বা সেহরিতে ঘরে তৈরি খাবার খাওয়া সবচেয়ে ভালো। দোকানের ভাজা জাতীয় খাবার বদহজম, পেট ফাঁপার কারণ হতে পারে। রোজা রাখার পর শরীরের চাহিদা অনুযায়ী সুষম খাবার খেতে হবে। শর্করা, আমিষ ও চর্বিজাতীয় খাবারের পরিমিত সংমিশ্রণে সেহরি, ইফতার ও রাতের খাবার খেতে হবে। বিশুদ্ধ পানি পানের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রাপ্তবয়স্কদের ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত দুই থেকে আড়াই লিটার পানি পান করা উচিত।
ইফতারে খেজুর, ছোলা, শরবত ও প্রচুর পানি
পরিশোধিত শর্করা দ্রুত হজম হয়ে যায় এবং রক্তে দ্রুত গ্লুকোজের মাত্রা বাড়িয়ে শরীরকে চাঙ্গা করে তোলে। এ ধরনের খাবার হজমে সময় নেয় তিন-চার ঘণ্টা। তাই এ ধরনের খাবার ইফতারে গ্রহণ করা উচিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব রমাদান ফাস্টিং রিসার্চ’ জার্নালে। দ্রুত হজম হয় এ ধরনের শর্করা জাতীয় খাবারের মধ্যে রয়েছে রিফাইন্ড ময়দা ও চিনি জাতীয় খাবার। খেজুর হতে পারে ইফতারের একটি অন্যতম খাবার। খেজুর হচ্ছে চিনি, তন্তু বা ফাইবার, শর্করা, পটাশিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়ামের উৎস। ইফতারে দু-তিনটা খেজুরই শরীরকে দ্রুত চাঙ্গা করে দিতে পারে, তবে সঙ্গে পানি পান করতে হবে প্রচুর পরিমাণে। ঠান্ডা পানি বা লেবুর শরবত পান করা ভালো। শরবত তৈরির গুড়াজাতীয় জিনিস বা তরল ও রঙিন বোতলের উপাদান দিয়ে শরবত বানিয়ে পান না করাই ভালো। ভেজা চিড়া ও সামান্য আখের গুড় মিশিয়ে পানি দিয়ে শরবতও খাওয়া যেতে পারে। বেল বা দই দিয়ে তৈরি শরবতও শরীরের জন্য উপকারী। শরবতে বেশি চিনি বা গুড় দেবেন না। ডাবের পানি পান করতে পারলে ভালো। সেক্ষেত্রে কচি হতে হবে। শাঁসযুক্ত হলে হিতে বিপরীত হবে। যেকোনো ফল ইফতারে খাওয়া শরীরের জন্য উপকারী। মাঝেমধ্যে ফলের রস পান করতে পারেন, তবে বাজারে পাওয়া রস পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ইফতারে কাঁচা ছোলা অনেকেরই পছন্দ। ছোলাগুলো চার-পাঁচ ঘণ্টা ভিজিয়ে খোসাসহ বা খোসা ছাড়িয়ে খাওয়া যেতে পারে। যাদের কোষ্ঠকাঠিন্য আছে তারা খোসাসহ খেলে উপকার পাবেন, সঙ্গে ইসবগুলের ভুসির শরবত খাবেন। ইসবগুলের ভুসি কখনোই ভিজিয়ে রেখে খাওয়া যাবে না। যখন খাবেন পানিতে দিয়ে মিশিয়ে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে পান করবেন। যারা ডায়াবেটিসের রোগী, তারা ইফতারে মিষ্টিজাতীয় খাবার খাবেন না, শরবতের বদলে পাতলা দুধ বা পরিমিত ডাবের পানি ভালো। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে খাওয়া ভালো। যাদের পেপটিক আলসার আছে, তারা একেবারে পেটভরে খাবেন না, পরিমাণে একটু কম খাবেন। একই সঙ্গে খাওয়ার আগে পানি খাবেন। খাবার খাওয়ার ৩০ মিনিট আগে পানি খেলে অ্যাসিডিটি হবে। সহজে ক্ষুধা লাগবে না, বাড়বে অস্বস্তি।
রোজায় দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকতে হয় বলে সেহরিতে কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট বা জটিল শর্করা গ্রহণ করা উচিত। এই জটিল শর্করা ধীরগতিতে হজম হয় এবং হজম হতে প্রায় ৮ ঘণ্টা সময় লাগে। ফলে দিনের বেলায় ক্ষুধা কম অনুভূত হয়। জটিল শর্করা জাতীয় খাবারের মধ্যে রয়েছে শস্যদানা বা বীজ জাতীয় খাবার, অপরিশোধিত বা নন-রিফাইন্ড আটা, ময়দা এবং ঢেঁকিছাঁটা চাল। সেহরিতে ভাত বা রুটির সঙ্গে মাছ বা মাংস এবং কিছুটা সবজি খাওয়া ভালো। রান্না করা ডিম প্রোটিনের ভালো উৎস। ডালেও প্রচুর প্রোটিন আছে। ঘন করে ডাল রান্নার সঙ্গে রুটি ও এক কাপ দুধও স্বাস্থ্যসম্মত। সঙ্গে শুধু কিছুটা সালাদ অর্থাৎ শসা, টমেটো, গাজর থাকলে ভালো। গুরুপাক খাবার হজমে ব্যাঘাত ঘটায়, সেহরিতে সহজপাচ্য খাবার খাওয়া উচিত। আর দেহের কোষগুলোর কাজ সঠিকভাবে চালানোর জন্য পানি বেশি করে পান করতে হবে। অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত, মসলাদার খাবার, ডুবো তেলে ভাজাপোড়া খাবারের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। রাস্তায় উন্মুক্ত খাবার, রঙমিশ্রিত, বাইরের শরবত লিভারের মারাত্মক বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করে। মোদ্দাকথা যার যে খাবারগুলো সমস্যা সৃষ্টি হয়, সেগুলো এড়িয়ে চললেই সুস্থতার সঙ্গে ভালো থাকা সম্ভব।
লেখক : মেডিসিন ও গ্যাসট্রোএন্টারওলজিস্ট
গ্লোবাল স্পেশালাইজড হসপিটাল