× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ভালোবাসা তোমার ঘরে বৃষ্টি হয়ে নেমে আসুক

মাহবুবা মিতু

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪:৫২ পিএম

ভালোবাসা তোমার ঘরে বৃষ্টি হয়ে নেমে আসুক

‘ভালোবাসা তোমার ঘরে বৃষ্টি হয়ে নেমে আসুক, ইচ্ছেগুলো— তোমার ইচ্ছেগুলো জ্যান্ত হয়ে বুকের ভেতর তুমুল নাচুক’- আবিদা করিমের গাওয়া এই গানটি শোনেননি এমন সংগীতপ্রেমী বোধহয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। গানটি শুনতে শুনতে এর মাঝে ডুবে যান প্রতিটি মানুষ। ঠিক তখনই ভালোবাসার মানুষটির কথা মনে হয়, একসঙ্গে দুজনে মিলে পথচলার যে আশ্বাস সেটা পরিণত হতে থাকে বিশ্বাসে। এর সবটাই হয় শুধু ভালোবাসার কারণে। এই ভালোবাসার জন্য প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য বিশ্বজগৎ তন্ন তন্ন করে খুঁজে আনতে পারে ১০৮টা নীল পদ্ম, হাঁটতে পারে জোসনা রাতে পথের পর পথ, অপেক্ষা করতে পারে জনম জনম। ভালোবাসা যদি স্বচ্ছ হয় তাহলে দুজনে মিলে পাড়ি দেওয়া যায় অজস্র কঠিন পথ। প্রতিবছর ভালোবাসা দিবসে ভালোবাসার রঙ যেন আরও রঙিন হয়। 

ভালোবাসা দিবস- একটি দিন, কিন্তু অনুভূতির ব্যাপ্তি যেন শতাব্দীজুড়ে। যান্ত্রিক এই শহরে কংক্রিটের দেয়ালে যখন আমরা হাঁপিয়ে উঠি, তখন ক্যালেন্ডারের ১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখটি আসে একপশলা বৃষ্টির মতো। যেখানে বসন্ত উৎসবের (পহেলা ফাল্গুন) সঙ্গে ভালোবাসার দিনটি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আজকের এই ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে গোলাপ, চকলেট আর সোশ্যাল মিডিয়ার লাল হৃদয়ের ইমোজির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ যাত্রাপথ। প্রাচীন রোমানদের ‘লুপারকালিয়া’ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের রোমান্টিক ধারণা এবং আধুনিক বিশ্বের বাণিজ্যিকীকরণ, ভালোবাসার প্রকাশ বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে কিন্তু ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা আজও সেই একই রয়ে গেছে। ভালোবাসা দিবস এখন আর কেবল পশ্চিমা সংস্কৃতি নয়, বরং বাঙালির ঋতু উৎসবের সঙ্গে মিলেমিশে একাত্ম হয়ে গেছে। 

ভালোবাসা দিবসের ইতিহাস

ভালোবাসা দিবসের ইতিহাস সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের আত্মত্যাগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যদিও একাধিক ভ্যালেন্টাইনের গল্প প্রচলিত আছে, সবচেয়ে জনপ্রিয় কিংবদন্তীটি তৃতীয় শতাব্দীর রোমের এক পুরোহিতকে ঘিরে। সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস বিশ্বাস করতেন যে অবিবাহিত পুরুষরা বিবাহিতদের চেয়ে ভালো সৈনিক হয়, তাই তিনি তরুণদের বিবাহ নিষিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু পুরোহিত ভ্যালেন্টাইন সম্রাটের আদেশ অমান্য করে গোপনে প্রেমিক যুগলদের বিবাহ দিতেন। এই অপরাধে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি তার শিরশ্ছেদ করা হয়। কথিত আছে, মৃত্যুর আগে তিনি তার কারারক্ষীর মেয়ের কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেন, যার শেষে ছিল ‘ফ্রম ইওর ভ্যালেন্টাইন’ কথাটি। এই আত্মত্যাগই পরবর্তীতে ভালোবাসা দিবসের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। পোপ গেলাসিয়াস প্রথম ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে লুপারকালিয়া উৎসবের পরিবর্তে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে হিসেবে ঘোষণা করেন, যা খ্রিস্টান ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রাচীন রোমান প্রথার এক মেলবন্ধন ঘটায়।

যেভাবে কাটাবেন বিশেষ দিনটি 

ভালোবাসা দিবস উদযাপনের জন্য রয়েছে নানা ধরনের আয়োজন। যুগলরা তাদের পছন্দ এবং বাজেট অনুযায়ী বিভিন্ন পরিকল্পনা করে থাকেন। সৈয়দ নাজমুস সাকিব ও তাহমিনা ভূঁইয়া মিনা দম্পতি বিয়ে করেছেন কিছুদিন আগেই। নতুন জীবনে প্রবেশ করে শত ব্যস্ততা তাদের ঘিরে থাকলেও দুজনে মিলে বিশেষ এই দিনটি উদযাপন করেন নিজেদের মতো করেই। বিশেষ এই দিনটি আপনজনের সঙ্গে কীভাবে কাটাতে ভালো লাগে জিজ্ঞেস করলে এই দম্পতি জানালেন, ছিমছাম ভিড় এড়িয়ে নিজেদের মতো থাকতে সবচেয়ে ভালো লাগে। ঘুরতে গেলেও নিজেরাই বেছে নেন এমন জায়গা যেখানে নিজেদের মতো সময় কাটানো যাবে। 

রোমান্টিক ডিনার

ঢাকা শহরের বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও ক্যাফে ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে বিশেষ মেন্যু ও ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের আয়োজন করে। গুলশান, উত্তরা এবং পুরান ঢাকার অনেক রেস্তোরাঁয় লাইভ মিউজিকের ব্যবস্থাও থাকে, যা ভালোবাসার মুহূর্তগুলোকে আরও স্মরণীয় করে তোলে।

ঘরোয়া আয়োজন

যারা ভিড় এড়িয়ে নিরিবিলি সময় কাটাতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য ঘরোয়া আয়োজন হতে পারে সেরা বিকল্প। প্রিয়জনের সঙ্গে মুভি দেখা, পছন্দের খাবার রান্না করা, অথবা একসঙ্গে বসে গল্প করাÑ এই ছোট ছোট মুহূর্ত ভালোবাসাকে আরও গভীর করে তোলে।

প্রকৃতির সান্নিধ্যে

শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানোও ভালোবাসা দিবসের একটি জনপ্রিয় আয়োজন। লংড্রাইভে যাওয়া, অথবা ঐতিহাসিক স্থান যেমন সোনারগাঁ পানাম সিটি, আহসান মঞ্জিল, লালবাগের কেল্লাতে ঘুরে আসা এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা দিতে পারে।

নতুন ট্রেন্ড

তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভালোবাসা দিবস উদযাপনে নতুন কিছু ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত র‍্যাপ ব্যাটেল বা স্ট্যান্ড-আপ কমেডি শোতে অংশ নেওয়া বা দেখতে যাওয়াও এখন বেশ জনপ্রিয়।

ভালোবাসার দিনে কেমন সাজপোশাক

ফাল্গুন আর ভালোবাসা দিবস একই দিনে হওয়ায় সাজপোশাকে এখন এক দারুণ ফিউশন লক্ষ করা যায়। হলুদ আর লালের সেই চিরাচরিত দ্বন্দ্ব মিটিয়ে দিয়ে তরুণ-তরুণীরা এখন বেছে নিচ্ছেন সমন্বিত এক বসন্ত-লুক। বাসন্তী হলুদ আর টকটকে লালের বাইরেও এখন তরুণ-তরুণীদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে প্যাস্টেল কালার বা ল্যাভেন্ডার শেড। শাড়ির পাড়ে ছোট ফুলের কারুকাজ কিংবা পাঞ্জাবিতে আভিজাত্যের ছাপ সব মিলিয়ে এক নান্দনিক উপস্থিতি লক্ষ করা যায় নগরের পথে পথে। এই দিনকে ঘিরে ঘরের সাজেও ছোট্ট কিছু পরিবর্তন যেনম ফেইরি লাইট, ফুল বা সুগন্ধি মোমবাতি মুহূর্তটাকে করে তুলতে পারে আরও রোমান্টিক।

ভালোবাসার উপহার 

উপহার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ভালোবাসা দিবসে প্রিয়জনকে কী উপহার দেবেন, তা নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় ভোগেন। এখানে কিছু জনপ্রিয় উপহারের ধারণা দেওয়া হলো :

মেমোরি লেন

ভালোবাসায় মেমোরি লেন বেশ ভালো একটি উপহার। তবে এটা সরাসরি ঠিক হাতে উপহার দেওয়া নয়, বরং এই দিনটি যে দুজনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেটা প্রকাশ করা। যে জায়গায় প্রথম দুজনের দেখা হয়েছিল, প্রথম যেখানে ডেটে গিয়েছিলেন, যেখানে একে অপরকে প্রথম ভালোবাসি বলেছিলেন সেসব জায়গায় নিয়ে যান ভালোবাসার মানুষকে। সেই একই পোশাক বা সাজে যেতে পারেন। একই খাবার বা কফি অর্ডার করতে পারেন। গল্পে গল্পে কাটিয়ে দিতে পারেন খানিকটা সময়। সুন্দর মুহূর্ত তৈরি হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। 

চিরায়ত উপহার

গোলাপ ভালোবাসার চিরায়ত প্রতীক। এর সঙ্গে সুস্বাদু চকলেটের একটি বক্স ভালোবাসার অনুভূতি প্রকাশে অতুলনীয়।

ব্যক্তিগত স্পর্শ

প্রিয়জনের ছবি বা নাম খোদাই করা মগ, টি-শার্ট, অথবা গহনা হতে পারে একটি বিশেষ উপহার। নিজের হাতে তৈরি কার্ড, পেইন্টিং বা সেলাই করা জিনিসও ভালোবাসার গভীরতা প্রকাশ করে।

বই

বইপ্রেমীদের জন্য পছন্দের লেখকের একটি বই বা কবিতার সংকলন হতে পারে সেরা উপহার। এটি রুচির পরিচায়ক এবং দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি তৈরি করে।

বাজেটবান্ধব উপহার 

কম বাজেটেও ভালোবাসা দিবস উদযাপন করা সম্ভব। হাতে লেখা চিঠি, প্রিয়জনের জন্য পছন্দের খাবার তৈরি করা, অথবা একসঙ্গে পার্কে হেঁটে সময় কাটানো। এই সাধারণ জিনিসগুলোও ভালোবাসাকে আরও মধুর করে তোলে।

ইকো-ফ্রেন্ডলি উদযাপন 

আধুনিক বিশ্বে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভালোবাসা দিবসের উদযাপনেও এসেছে নতুনত্ব। ইকো-ফ্রেন্ডলি বা পরিবেশবান্ধব উদযাপন এখন একটি জনপ্রিয় প্রবণতা। প্রচলিত উপহার ও আয়োজনের পরিবর্তে প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীলতা বজায় রেখে এই দিনটি পালন করা হচ্ছে। যেমনÑ প্লাস্টিকমুক্ত উপহার, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য ব্যবহার, গাছ লাগানো, অথবা পরিবেশ সুরক্ষায় স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে অংশ নেওয়া। এটি কেবল পরিবেশের জন্যই ভালো নয়, বরং সম্পর্ককে আরও গভীর ও অর্থবহ করে তোলে।

ভালোবাসা কেবল যুগলদের নয় 

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দিবসের সংজ্ঞায় পরিবর্তন এসেছে। ভালোবাসা কেবল প্রেমিক-প্রেমিকার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। এই দিনে সময় দিন পরিবারকে, মা-বাবাকে ধন্যবাদ জানান একটি ফোনকল, কার্ড অথবা তাদের প্রিয় কিছু উপহার দিয়ে। ভাইবোন বা বন্ধুদের নিয়ে আয়োজন করুন ছোট্ট একটি রিইউনিয়নের। গেমস খেলুন, পুরনো দিনের গল্প করুন। বন্ধুদের জন্য সারপ্রাইজ উপহার পাঠান। পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘সেলফ-লাভ’ বা নিজেকে ভালোবাসার ধারণা। নিজেকে একটি সুন্দর দিন উপহার দেওয়া, নিজের পছন্দের খাবার খাওয়া, একা সিনেমা দেখতে যাওয়া কিংবা নিভৃতে সময় কাটানো এই যত্নগুলোও ভালোবাসারই এক ভিন্ন রূপ।

ভালোবাসা দিবস শুধু একটা দিন নয়, এটি ভালোবাসার প্রতিদিনের অনুশীলন। আর ভালোবাসা দিবস মানেই বিশাল কোনো আয়োজন নয়; বরং এটি হৃদয়ের ছোট ছোট অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। এই একটি দিন অন্তত মান-অভিমান ভুলে প্রিয়জনকে বলা যাক, ‘তুমি আছ বলেই পৃথিবীটা সুন্দর…।’ বসন্তের দখিনা বাতাসে ভালোবাসার এই রঙ ছড়িয়ে পড়ুক সবার মনে, কেবল একদিনের জন্য নয়, বছরের প্রতিটি দিনের জন্য।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা