সানজিদা ইমু
প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:২৯ পিএম
টিম কোডব্ল্যাক অর্জন করেছে স্বর্ণপদক ও একটি বিশেষ পুরস্কার
অসাধারণ মেধা ও নিষ্ঠার অনন্য নিদর্শন স্থাপন করে টিম কোডব্ল্যাক দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত মর্যাদাপূর্ণ ইন্টারন্যাশনাল ক্রিয়েটিভ পেপারস কনফারেন্স (ICPC) ২০২৬-এ অর্জন করেছে স্বর্ণপদক (গোল্ড মেডেল) ও একটি বিশেষ পুরস্কার। এ বছর প্রতিযোগিতায় ১৩টি দেশের প্রায় ২০০ জন অংশগ্রহণকারী ১০০টিরও বেশি উদ্ভাবনী গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
এই গৌরবজনক সাফল্য টিম কোডব্ল্যাকের অটুট পরিশ্রম, দলগত সহযোগিতা এবং জ্ঞান ও সৃজনশীলতার অগ্রযাত্রায় তাদের গভীর অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন। দলের সদস্যরা এই অর্জনের জন্য সৃষ্টিকর্তা, তাদের মেন্টর এবং যাত্রাজুড়ে পাশে থাকা সকল শুভানুধ্যায়ী ও সমর্থকদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও একীভূত স্বপ্নই এই সাফল্যের মূল ভিত্তি। এই সম্মান শুধু তাদের কঠোর পরিশ্রমের স্বীকৃতিই নয়, বরং ভবিষ্যতে আরও বড় লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণাও জোগাবে। একই সঙ্গে এটি গবেষণা ও উদ্ভাবনের পথে অন্যদের উৎকর্ষ সাধনে উদ্বুদ্ধ করবে। বৈশ্বিক অঙ্গনে ইতিবাচকতা ও সৃজনশীলতা ছড়িয়ে দিয়ে অবদান অব্যাহত রাখার প্রত্যয়ে টিম কোডব্ল্যাক ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
ফিরে দেখা
তিনজন নারী সদস্য নিয়ে ২০২১ সালের ৮ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে টিম কোড ব্ল্যাক। সারা দেশ থেকে যেসব মেয়ে রোবটিক ও স্টেমের প্রতি আগ্রহী, তাদের গ্রুমিং এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শুরু হয় বাছাই পর্ব। বর্তমানে দেশের ২৮টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭০ জন সদস্য যুক্ত আছেন টিম ব্ল্যাক কোডের সঙ্গে। বিভিন্ন প্রকল্পে অনেকে অনলাইন মাধ্যমে এবং অনেকে ল্যাবে এসে কাজ করে যাচ্ছেন এই টিমের সঙ্গে। ব্ল্যাক কোডের এই লড়াইয়ের প্রথম সৈনিক ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস, বায়োটেকনোলজি বিভাগের নুসরাত জাহান সিনহা, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির তথ্যবিজ্ঞান বিভাগের তাহিয়া রহমান। এর পরে দলটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন উত্তরা সরকারি কলেজের নুসরাত জাহান ও সনিয়া ইসলাম।
অর্জন
তিন বছরের কিছু বেশি বয়স কোড ব্ল্যাকের। কিন্তু এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির সাফল্যের ঝুড়িতে এসেছে একাধিক পদক ও স্বীকৃতি। ইন্দোনেশিয়ার বালিতে আয়োজিত ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্স অ্যান্ড ইনোভেশন ফেস্ট ২০২২-এ স্বর্ণপদক, ওয়ার্ল্ড রোবট অলিম্পিয়াডে ২০১৯ ও ২০২২ সালে ব্রোঞ্জপদক, আইটেক এক্সপো টেক ফেস্ট আইআইটি বম্বে ২০২২-এর প্রথম রানার্সআপসহ বেশ কিছু জাতীয় অর্জন আছে দলটির। এ ছাড়া এ বছরের মে মাসে ইন্দোনেশিয়ান ইয়ং সায়েন্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত ‘ওয়ার্ল্ড সায়েন্স, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কমপিটিশন’-এ প্রযুক্তি ক্যাটাগরিতে অংশ নিয়ে স্বর্ণপদক জয় করেছে কোড ব্ল্যাক। এ ছাড়া পেয়েছে মালয়েশিয়ান ইয়ং সায়েন্টিস্ট অর্গানাইজেশনের (মাইসো) বিশেষ পুরস্কার। বিশ্ব উদ্ভাবন প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনী (WICE) ২০২৪-এ অংশ নিয়ে স্বর্ণপদক টিম কোড ব্ল্যাক স্বর্ণ জিতেছে। এবার টিম কোডব্ল্যাক দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত মর্যাদাপূর্ণ ইন্টারন্যাশনাল ক্রিয়েটিভ পেপারস কনফারেন্স (ICPC) ২০২৬-এ অর্জন করেছে স্বর্ণপদক (গোল্ড মেডেল) ও একটি বিশেষ পুরস্কার।
সমস্যা সমাধানের চেষ্টা
কোড ব্ল্যাক মূলত দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের সমস্যা সমাধানের কথা বিবেচনায় রেখে কাজ করে। যেমন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার কথা বিবেচনায় রেখে তারা কাজ করেছে রেসকিউ রোবট নিয়ে। কৃষিভিত্তিক দেশে কৃষি ও কৃষকদের কথা বিবেচনায় রেখে কোড ব্ল্যাক ফিমো নামে তৈরি করেছে একটি রোবট। এটিকে তারা ডাকে কৃষকের রোবট বলে।
স্কুলশিক্ষার্থীদের সঙ্গে
বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করে তোলার চেষ্টা করে কোড ব্ল্যাক। এ স্কুল প্রোগ্রাম থেকে অনেকে পরবর্তীকালে কোড ব্ল্যাকের সঙ্গে যুক্ত হন। বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের প্রতি শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, অভিভাবকেরাও বেশ আগ্রহী। কোডিংয়ের ক্ষেত্রে ছেলেশিশুদের পাশাপাশি মেয়েশিক্ষার্থীরা ভীষণ আগ্রহী।
উদ্ভাবন
শিক্ষার্থীদের বেশকিছু কাজ ইতোমধ্যে বেশ আলোচিত হয়েছে। টিম ব্ল্যাক কোডের তৈরি রোবট ফিমো কৃষককে জানিয়ে দেবে জমির মাটির পিএইচের পরিমাণ কিংবা সার ব্যবহারের তথ্য। আবার ধানের চারা রোপণ ও কাটার কাজও করে দেবে ফিমো। এজন্য তাকে নির্দিষ্ট তথ্য সরবরাহ করতে হবে।
দেশের কৃষকের কথা বিবেচনায় রেখে রোবটগুলোকে বাংলায় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আবার ভয়েস কমান্ডের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছেÑ যাতে কোনো কৃষক পড়তে না পারলেও শুনে শুনে বুঝতে পারেন এবং ভয়েস কমান্ডের মাধ্যমে যন্ত্রটিকে চালাতে পারেন। এ ছাড়া তাদের তৈরি যন্ত্র ব্যবহার করার জন্য ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থাও করছে টিম ব্ল্যাক কোড।
কোড ব্ল্যাকের রেসকিউ রোবট প্রহরীর চতুর্থ সংস্করণ বেশ আলোচিত হয়েছিল। রেসকিউ রোবটটি অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে উদ্ধারকাজে সাহায্য করতে সক্ষম। প্রহরীতে আছে ভ্যাকিউম ক্যান ফিচার। এতে ধোঁয়ার কারণে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে প্রাণহানির ঘটনা কমে যাবে।
রোবটটি আগুন লাগা জায়গায় গিয়ে নিজেই আগুনের মাত্রা ও উৎস বুঝে তা নিভিয়ে ফেলতে সক্ষম। এটি জীবিত ও মৃত মানুষের সন্ধান করতে সক্ষম। সে ক্ষেত্রে প্রহরী নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে আগে কাকে বাঁচাতে হবে। কাজের সময় সামনে শক্ত দেয়াল থাকলে ভেঙে কাজ করার সামর্থ্য আছে প্রহরীর। এটি ১২৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। বাইরে থেকে একে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। রোবটটিতে একটি ড্রোন যুক্ত করে ওয়াটার প্রুফ বডি যুক্ত করার জন্য কাজ করছে কোড ব্ল্যাক। এতে সফল হলে প্রহরী নামের রোবটটি বন্যা কবলিত জায়গায় ত্রাণ বণ্টনের কাজ করতে পারবে।
কোড ব্ল্যাক আমাদের স্বপ্নবাজ তরুণীদের প্রযুক্তি বিষয়ক উদ্যোগ। তাদের সাম্প্রতিক সাফল্য শুধু তাদের কঠোর পরিশ্রমের স্বীকৃতিই নয়, বরং ভবিষ্যতে আরও বড় লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণাও জোগাবে।