হায়াত মাহমুদ
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:১৬ পিএম
বর্তমানে পৃথিবীতে কম্পিউটার শুধু একটি ডিভাইস নয়, দৈনন্দিন কাজ, পড়াশোনা অথবা ব্যবসায় এটি আমাদের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। অনলাইন ক্লাস থেকে শুরু করে ফ্রিল্যান্সিং অথবা গেমিংÑ সব ক্ষেত্রেই কম্পিউটারের পারফরম্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর এই পুরো পারফরম্যান্স নির্ভর করে কম্পিউটারের একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কম্পোনেন্টের ওপর যাকে বলা হয় প্রসেসর (অথবা CPU)।
অনেকেই কম্পিউটার কেনার সময় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন র্যাম অথবা স্টোরেজের দিকে। কিন্তু প্রসেসরই হলো কম্পিউটারের ব্রেইন। ভুল প্রসেসর নির্বাচন করলে যতই দামি র্যাম বা গ্রাফিক্স কার্ড থাকুক সেই কম্পিউটার সঠিক পারফরম্যান্স দিতে ব্যর্থ হয়। তাই প্রসেসর নির্বাচনে বেশকিছু দিক খেয়াল রাখা খুবই জরুরি।
প্রসেসর মূলত কি কাজ করে?
প্রসেসর বা CPU হলো কম্পিউটারের মেইন কাউন্টিং পার্ট। এটি আমাদের ইনপুট করা সব ধরনের কমান্ড রিসিভ করে এবং এনালাইজ করে সেই অনুসারে আউটপুট দেয়। ব্রাউজিং, ভিডিও প্লে অথবা গেমিং সব কিছুর পেছনেই প্রসেসর কাজ করে।
কোর ও থ্রেড : সংখ্যাই কি সব?
প্রসেসর কেনার সময় আমরা শুনে থাকি Dual Core, Quad Core, Hexa Core, Octa Core ইত্যাদি। তবে অনেকেই এ ব্যাপারে স্পষ্ট করে জানেন না। তবে কোর প্রসেসরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
মূলত কোর হলো প্রসেসরের স্বাধীনভাবে কাজ করার ইউনিট। অর্থ্যাৎ একটি প্রসেসর একসঙ্গে কয়টি কাজ করতে পারে তা কোর দিয়ে বোঝানো হয়। ধরুন কোনো প্রসেসরের কোর ৪টি মানে সে একসঙ্গে ৪টি কাজ কম্পিউটারের পারফরম্যান্স ঠিক রেখে করতে পারে। থ্রেড তাহলে কী? থ্রেড হলো এই কোরের ভার্চুয়াল কাজের লাইন। মানে কোর কোন কাজটা আগে করবে, কোনটা একটু পরে করবে সেটাই ঠিক করে দেয় থ্রেড। মানে থ্রেড হলো অনেকটা বসের মতো যে কোরকে কাজের লাইন, অর্ডার ঠিক করে দেয়।
কাজের ধরণ অনুযায়ী প্রসেসরের কোর সিলেক্ট করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খুব ভারী কাজের জন্য না হলে, বেশি কোর না নিয়ে মাঝামাঝি সংখ্যার কোর নেওয়া ভালো। কারণ অনেক বেশি কোর সাধারণত ভারী কাজের জন্য ব্যবহার করা হয়। এটি চালাতে পাওয়ার যেমন বেশি লাগে তেমনই গরম হয়ে যায় সিপিইউ ও অন্যান্য হার্ডওয়্যার। ফলে প্রয়োজন হয় বাড়তি কুলিং ফ্যানের। আবার এভাবে মাত্রাতিরিক্ত গরম হলে সিপিইউয়ের ক্ষতিও হতে পারে।
ক্লক স্পিড
একটি প্রসেসর প্রতি সেকেন্ডে কত বিলিয়ন সাইকেল কমপ্লিট করতে পারে সেটিই মূলত প্রসেসরের ক্লক স্পিড। এটিকে গিগাহার্জ (GHz) দিয়ে বোঝানো হয়। ধরুন কোনো প্রসেসরের ক্লক স্পিড 4.0 GHz মানে সেটি প্রতি সেকেন্ডে চার বিলিয়ন সাইকেল কমপ্লিট করতে পারে।
তাহলে মনে হতে পারে যে গিগাহার্জ যত বেশি প্রসেসর তত ভালো। আধুনিক প্রযুক্তিতে সেটা সব সময় ঠিক না। বর্তমানে গিগাহার্জ কম থাকলেও আধুনিক স্ট্র্যাকচারের কারণে প্রসেসরের পারফরম্যান্সে খুব একটা হেরফের হয় না।
কোন ব্র্যান্ডের প্রসেসর নেওয়া ভালো?
কম্পিউটার প্রসেসরের বাজার দখলে বিশ্বব্যাপী আছে দুটো ব্র্যান্ড। একটি হলো Intel অন্যটি হলো AMD। প্রসেসর নিতে গেলে স্বভাবতই প্রশ্ন আসবে তাহলে কোনটা নিলে ভালো হবে? আমরা যদি এই দুই ব্র্যান্ডের বৈশিষ্ট্য একটু লক্ষ্য করি তাহলে দেখা যাবেÑ
Intel-এর প্রসেসর
• স্থিতিশীল পারফরম্যান্স
• সিঙ্গেল কোর পারফরমেন্স বেশ শক্তিশালী
• অফিস বা সাধারণ কাজের জন্য বেশ ভালো
AMD-এর প্রসেসর
• বেশি কোর হলেও দাম হাতের নাগালে
• গেমিং ও মাল্টিটাস্কিং এর জন্য বেশ ভালো
• গ্রাফিক্স কার্ডসহ প্রসেসরের পারফরম্যান্স ভালো
দুটি ব্র্যান্ডের প্রসেসরই কিছু না কিছু সুবিধা আছে। তাই আপনার প্রয়োজন মাথায় রেখে বেছে নিতে হবে।
জেনারেশন বুঝে প্রসেসর নিন
জেনারেশন মূলত প্রসেসরের আপগ্রেশন ভার্সন বোঝায়। যেমনÑ Intel core i5 4th gen-এর চেয়ে Intel core i5 12th gen প্রায় দ্বিগুণ শক্তিশালী। কারণ যত দিন যাচ্ছে প্রযুক্তি তত আধুনিক হচ্ছে, উন্নত হচ্ছে সবকিছু।
গ্রাফিক্স কার্ড কি লাগবেই?
কিছু প্রসেসরের সঙ্গেই গ্রাফিক্স ইউনিট যুক্ত থাকে। এটিকে ইন্টিগ্রেটেড গ্রাফিক্স বলে। সাধারণ ব্যবহারের জন্য প্রসেসরের সঙ্গে মানানসই গ্রাফিক্স থাকেই। কিন্তু হাই-গ্রাফিক্স গেমিং, ছবি-ভিডিও এডিটিং, গ্রাফিক্স ডিজাইনিং অথবা থ্রিডি এনিমেশনের মতো কাজ করলে আলাদা করে গ্রাফিক্স কার্ড নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
প্রসেসর কেনার সময় যে ভুলগুলো করা যাবে না
প্রসেসর কেনার সময় সাধারণ কিছু ছোট ভুলের কারণেই হতে পারে বড় সমস্যা। তাই যে ভুলগুলো করা যাবে নাÑ
দাম দেখে প্রসেসর নির্বাচন
অনেক সময় আমরা দাম দেখেই প্রসেসর নির্বাচন করে ফেলি। আমরা ভাবি দামি হলেই ভালো অথবা এটা আমার বাজেটের মাঝে আছে তাই নিয়ে নিই। কিন্তু এটা একদম ঠিক নয়। বরং কাজের ধরন বুঝে প্রসেসর নেওয়া উচিত। অনেক সময় দাম কম হলেও সঠিক প্রসেসর নির্বাচন করলে অনেকদিন পর্যন্ত সেটি ভালোভাবে ব্যবহার করা যায়।
পুরনো জেনারেশন কেনা
প্রসেসর কেনার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় ভুল হলো পুরনো জেনারেশনের প্রসেসর কেনা। যেহেতু এগুলো সাধারণত পুরনো ভার্সন হয়ে থাকেÑ দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রেই আরও উন্নত ও আধুনিক কম্পিউটারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভালো পারফরম্যান্স দিতে পারে না। তাই সব সময় সবচেয়ে লেটেস্ট ভার্সনের প্রসেসর নেওয়া উচিত।
কাজের ধরন বিবেচনা না করা
কোন কাজের জন্য প্রসেসর নিচ্ছেন সেটি মাথায় না রেখে কিনলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যবহার করে কোনো আরাম পাওয়া যাবে না। ভারী কাজে ব্যবহারের জন্য সাধারণ প্রসেসর নিলে দেখা যাবে কম্পিউটার বেশি গরম হয়ে যাচ্ছে বা আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না।
মাদারবোর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে না নেওয়া
মাদারবোর্ডের সঙ্গে প্রসেসরের আছে গভীর সম্পর্ক। তাই এই দুটোর কম্প্যাটিবিলিটি মাথায় রেখে প্রসেসর নির্বাচন করা উচিত।
ভবিষ্যতের কথা মাথায় না রাখা
একটি প্রসেসর গড়ে ৩-৫ বছর পর্যন্ত ব্যবহৃত হতে পারে। তাই ভবিষ্যতের ভাবনা মাথায় রেখে যেটি সবচেয়ে সুবিধার হবে সেটিই বেছে নেওয়া উচিত।
প্রসেসর নির্বাচন কোনো আবেগের বিষয় নয়, এটি সম্পূর্ণ একটি টেকনিক্যাল ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। আপনার বাজেট, কাজের ধরন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাÑ সব কিছু বিবেচনা করেই প্রসেসর নির্বাচন করা উচিত।