শাহিনুর সুজন, চারঘাট (রাজশাহী)
প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:০৫ পিএম
দেশীয় শিল্পের ইতিহাসে খয়ের একটি অনন্য নাম। আর সেই নামের কেন্দ্রবিন্দু রাজশাহীর চারঘাট। যেখানে শত বছরের ঐতিহ্য, কৃষি ও শিল্প মিলেমিশে গড়ে তুলেছিল খয়েরের নিজস্ব সাম্রাজ্য। হারিয়ে যাওয়া সেই সোনালি অতীত আবার ফিরে আসছে। কাঁচামালের সংকটে ধুঁকতে থাকা খয়ের শিল্প এখন নবজাগরণের দ্বারপ্রান্তে।
চারঘাটে একসময় ১১৩টি কারখানা পূর্ণ উদ্যমে কাজ করলেও কাঁচামালের অভাব আর বিদেশি কৃত্রিম খয়েরের দাপটে ২০০০ সালের পর তা কমে আসে ৬টিতে। তবে গত ১০ বছরের পরিকল্পিত বনায়ন, প্রশাসনিক তৎপরতা ও কৃষকদের অংশগ্রহণে আজ চারঘাট আবারও হয়ে উঠছে দেশের সবচেয়ে বড় খয়ের উৎপাদন এলাকা।
খয়ের শিল্পের উৎপত্তি ও চারঘাটের ইতিহাস
চারঘাটে খয়ের শিল্পের যাত্রা শুরু প্রায় ১০০ বছর আগে। শলুয়া, নিমপাড়া ও ভায়ালক্ষ্মীপুর এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশে খয়ের গাছের সহজ বৃদ্ধি, নদীপথে পরিবহন ব্যবস্থার সুবিধা এবং স্থানীয় মানুষের কারিগরি দক্ষতা সব মিলিয়ে চারঘাটের প্রাণকেন্দ্র পদ্মা নদীর পাড়ে চন্দন শহর, গোপালপুর, বাবুপাড়া ও থানাপাড়া গ্রামে গড়ে ওঠে খয়ের ভাটা বা প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র।

১৯৪৭ সালে মুন্সী নুরুল হকের উদ্যোগে চারঘাটে আধুনিক খয়ের উৎপাদনের সূচনা হয়। পরে পঞ্চাশের দশকে ভারত ও পাকিস্তান থেকে আগত বিহারিরা শিল্পটিকে আরও উন্নত প্রযুক্তি এবং দক্ষতায় সমৃদ্ধ করেন।
প্রথমদিককার কারিগররা বিভিন্ন গ্রামে ছোট আকারে খয়ের গাছ জ্বাল করে গুড়ের মতো লালি (ঝোলা) তৈরি করে তা বাজারজাত করতেন। তবে পঞ্চাশের দশকে ভারত ও পাকিস্তান থেকে আগত বিহারীরা শিল্পটিকে নতুন প্রযুক্তি ও দক্ষতায় সমৃদ্ধ করেন। তখনকার দিনে খয়ের রপ্তানি হতো লাহোর, করাচিসহ পশ্চিম পাকিস্তান ও ভারতের বিভিন্ন শহরে।
স্থানীয় চন্দন শহর গ্রামের আশি-ঊর্ধ্ব বাসিন্দা ও খয়ের প্রস্তুতকর্মী আব্দুল কাদের বলেন, ষাট, সত্তর ও আশির দশক ছিল খয়ের শিল্পের সুবর্ণ সময়। এলাকার অর্ধেক মানুষই জীবিকা নির্বাহ করতেন খয়েরের ওপর নির্ভর করে। চারঘাটের যত বংশীয় ধনী মানুষ সবাই খয়ের শিল্পের ওপর ভর করে হয়েছে। কিন্তু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবাই বেকার হয়ে গেছে। বর্তমানে আবার কিছুটা সুবাতাসের কথা শুনতে পাচ্ছি।
খয়েরের বহুমুখী ব্যবহার
খয়েরকে অনেকেই শুধু পানের সঙ্গী ভাবেন। কিন্তু বাস্তবে এর ব্যবহার ব্যাপক এবং যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন শিল্পে তা অপরিহার্য। খয়ের কারখানা মালিকরা বলছেন, খয়েরের ট্যানিন থেকে তৈরি হয় প্রাকৃতিক গাঢ় বাদামি রঙ, যা টেকসই ও পরিবেশবান্ধব। গ্যাস্ট্রিক, আলসার, সংক্রমণ ও দাঁতের সমস্যা প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয় খয়ের নির্যাস। ফেসমাস্ক, স্ক্রাব, স্কিনটোনারসহ প্রাকৃতিক কসমেটিকসে ব্যবহৃত হয় ট্যানিন সমৃদ্ধ খয়ের পাউডার।
চামড়া ট্যানিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালও খয়ের। খয়ের গাছ মাটিতে জৈব উপাদান বাড়ায়, জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে এবং আইলে রোপণ করলে মাটির ক্ষয় রোধ করে। ফলে খয়ের ক্রমেই হয়ে উঠছে পরিবেশবান্ধব শিল্পের অপরিহার্য উপাদান।
স্থানীয় কলেজের সহকারী অধ্যপক ও একসময় খয়ের শিল্পে জড়িত থাকা মো. কামরুজ্জামান বলেন, একসময় কাপড়ের রঙ, ওষুধ ও কসমেটিকসের কাঁচামাল এবং চামড়া শিল্পে ব্যবহারের জন্য ঝোলা খয়ের সংগ্রহ করতে আসত সেসব কারখানা মালিকরা। কিন্তু পর্যাপ্ত খয়ের সরবরাহ করতে না পারা ও বিদেশি কৃত্রিম খয়ের সহজলভ্য হওয়ার কারণে এসব মালিকরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
কেন সংকটে পড়েছিল খয়ের শিল্প
বিগত কয়েক দশকে কৃষিজমি সম্প্রসারণ, নির্বিচারে গাছকাটা এবং বন উজাড়ের কারণে চারঘাট ও আশপাশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় খয়ের গাছের সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে যায়। একটি মাঝারি কারখানার দৈনিক খয়ের গাছের প্রয়োজন ছিল ৮-১০ টন। স্থানীয়ভাবে গাছের চাহিদা মেটাতে না পেরে উৎপাদকদের নির্ভর করতে হয় দূরবর্তী উৎসের ওপর, এতে কাঁচামালে ব্যয় বাড়ে এবং উৎপাদন কমে যায়। অন্যদিকে ভারত, মিয়ানমার ও ইন্দোনেশিয়া থেকে নিম্নমানের কৃত্রিম খয়ের বাজার দখল করতে থাকে। ফলে স্থানীয় কারখানাগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যায়।
খয়ের ব্যবসায়ী মাইনুল হক বলেন, ইন্দোনেশিয়া, ভারত কিংবা মিয়ানমারের এসব খয়ের তৈরিতে খয়ের গাছে তেমন একটা প্রয়োজন হয় না। তারা নানা রকম কাঁচামাল দিয়ে কৃত্রিমভাবে খয়ের তৈরি করে। এজন্য আমাদের দেশীয় খয়েরের তুলনায় বিদেশ খয়েরের দাম কম। আবার বিদেশি খয়ের আমদানিতে বড় রকমের কোনো শুল্কও ধার্য করেনি সরকার। এজন্য খয়ের শিল্পের আরও প্রসার লাভ করাতে হলে বিদেশি খয়েরের ওপর পর্যাপ্ত শুল্ক আরোপ করে দেশি খয়েরের সমপরিমাণ দাম রাখতে হবে।
কীভাবে তৈরি হয় খয়ের
খয়ের তৈরির প্রক্রিয়া বহু দিন ধরে প্রায় একই। এই শিল্প নিয়ে সরকার কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া নেই বললেই চলে। চারঘাট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে সপ্তাহে সাত দিনই খয়ের গাছ বিক্রির হাট বসে। বেপারীরা দূর-দূরান্ত থেকে গাছ সংগ্রহ করে বিক্রির জন্য হাটে তোলেন।

সেখান থেকে দামদর করে ঠিকা দামে খয়ের গাছ সংগ্রহ করা হয়। এরপর কারখানায় নিয়ে পরিপক্ব খয়ের গাছ কুড়াল দিয়ে কেটে ছোট ছোট টুকরো করা হয়। বড় ভাটায় বা কড়াইয়ে কাঠ দীর্ঘ সময় ধরে সিদ্ধ করা হয়। তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাঠ থেকে নির্যাস বের হতে থাকে। সিদ্ধ নির্যাস আলাদা পাত্রে এনে ঘন করা হয়। নির্যাস ঘন হয়ে জমাট বাঁধলে মাটির ছাঁচে ঢেলে অবশিষ্ট আর্দ্রতা শুকানো হয়। এরপর খয়ের ঝোলা কিংবা দানা বা ব্লক আকারে বাজারজাত করা হয়।
গোপালপুর গ্রামের খয়ের তৈরির কারিগর আফরোজা বেগম বলেন, বিভিন্ন জেলা থেকে গাছ সংগ্রহ, বাজার থেকে কেনা, বাড়িতে এনে ছোট ছোট টুকরো করা, এরপর ৫-৬ ঘণ্টা ধরে জ্বাল করা অনেক কঠিন কাজ। শ্রমঘন এই প্রক্রিয়া আমাদের কর্মসংস্থানের একটি বড় মাধ্যম। এক কেজি খয়ের তৈরি হয় বহু মানুষের শ্রম ও ঘামের বিনিময়ে। কিন্তু বিদেশে আধুনিক কারখানায় তৈরি খয়েরের কারণে আমরা শ্রমের দাম পাচ্ছি না।
কাঁচামাল সংকট সমাধানে প্রশাসনের উদ্যোগ
খয়ের গাছ দেশি গাছ। বাংলাদেশ, ভারত ও দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশে স্বাভাবিকভাবে এই গাছ জন্মায়। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি রাজশাহী, নাটোর ও পাবনা অঞ্চলে এই গাছ পাওয়া যায়। খয়েরের কাঁচামাল সংকট দূর করতে ২০১৪ সাল থেকে চারঘাটে খয়ের গাছের ব্যাপক বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করে প্রশাসন। চারঘাট উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা বন বিভাগ ও উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে কৃষি বিভাগ রোপণ করেছে ২২ হাজার ২০০টি খয়ের গাছ, বন বিভাগ রোপণ করেছে ৩৫ হাজার ৫৫০টি খয়ের গাছ ও উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে রোপণ করেছে প্রায় ৪০ হাজার খয়ের গাছ। ২০১৪ সাল থেকে কয়েক লাখ খয়ের গাছ রোপণ ও বিতরণ করেছে তারা। অল্প সময়ের মধ্যেই এসব গাছ কারখানার কাঁচামাল সংগ্রহ শুরু হবে; যা দীর্ঘদিন টিকে থাকবে।
উপজেলা বন কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, কয়েক বছর ধরে আমরা অন্য চারার তুলনায় খয়ের চারা বেশি তৈরি করছি। এখনও আমার কাছে প্রায় দুই হাজার খয়ের চারা রাখা আছে। উপজেলা প্রশাসন এবং কৃষি বিভাগের প্রয়োজন হলে আমরা সেগুলো সরবরাহ করছি। খয়ের গাছের বয়স ১৫-২০ বছর হলেই তা খয়ের তৈরির উপযোগী হয়। আগে রোপণকৃত কিছু গাছ ইতোমধ্যে বাজারে আসতে শুরু করেছে। বছর পাঁচেকের মধ্যে কাঁচামালের সংকট পুরোপুরি সমাধান হবে।
হাট ও কারখানায় ফিরে আসছে প্রাণ
বছর পাঁচেক আগে ছয়টি কারখানা থাকলেও বর্তমানে চারঘাটে অন্তত ১২টি কারখানা খয়ের উৎপাদন করছে। চারঘাটে এক মণ লালি খয়ের বিক্রি হয় ১২-১৫ হাজার টাকায় ও শুকনো গুটি খয়ের ৩০ হাজার টাকায়।
চারঘাট খয়ের হাটের গাছ (কাঠ) ব্যবসায়ী আকবর হোসেন বলেন, বছর দুই তিনেক আগেও চারঘাটে কোনো খয়ের তৈরির উপযোগী খয়ের গাছ চোখে পড়ত না। আমরা নওগাঁ, নাটোর ও পাবনা থেকে গাছ সংগ্রহ করতাম। কিন্তু এখন চারঘাটেও কিছু গাছ পাওয়া যাচ্ছে। রাস্তা ও জমির আশপাশে যে পরিমাণ গাছ রোপণ হয়েছে আশা করছি কয়েক বছরের মধ্যে সেগুলো উপযোগী হলে কাঁচামাল সংকট তেমন একটা থাকবে না।
উৎপাদনকারী ও খয়ের সমিতির সিনিয়র সদস্য এনামুল হক বলেন, কাঁচামালের সংকট অনেকটা দূর হয়েছে। মাঝখানে উৎপাদন একেবারে নাই হয়ে গিয়েছিল। এখন কারখানাগুলো মাসে ৩-৪ লাখ টাকার খয়ের বিক্রি করছে। সরকারিভাবে গাছ লাগানোর পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ বিতরণ, আধুনিক প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ ও বিদেশের কৃত্রিম খয়েরের ওপর শুল্ক আরোপ করা গেলে আবারও এর সুদিন ফিরবে।
জিআই স্বীকৃতির পথে চারঘাট খয়ের
খয়েরের ঐতিহাসিক মূল্য, স্থানীয় উৎপাদন পদ্ধতির স্বাতন্ত্র্য এবং মান বিবেচনায় জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উপজেলা প্রশাসন। স্বীকৃতি মিললে চারঘাটের খয়ের আলাদা ব্র্যান্ড হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান শক্ত হবে। উৎপাদকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন।
সরেজমিন দেখা যায়, উপজেলার পুঠিমারী, পরানপুর, নন্দনগাছী, ভায়ালক্ষ্মীপুর, শলুয়া ও ইউসুফপুরসহ বিভিন্ন সড়কের দুই পাশে শোভা পাচ্ছে সারি সারি খয়ের গাছ। বাড়ির আঙিনায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা এই গাছ লালন করছে। খয়ের গাছ বিক্রির হাটে লোকসমাগমও বেড়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল মামুন হাসান বলেন, প্রশাসনের দূরদৃষ্টি, কৃষকের পরিশ্রম এবং উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগ সব মিলিয়ে চারঘাট আজ দাঁড়িয়ে আছে খয়ের শিল্পের সম্ভাবনার নতুন পাঠশালায়। আমরা এ বছর কৃষকদের মাধ্যমে পাঁচ হাজার নতুন খয়ের গাছ বিভিন্ন জমির আইল ও বাড়ির আঙিনায় রোপণ করেছি। অন্য গাছের কারণে কৃষি আবাদ ব্যাহত হলেও খয়ের গাছ জমির পাশে থাকলে উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি পায়।
চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রাহাতুল করিম মিজান বলেন, চারঘাটের খয়ের শিল্প শুধু অর্থনীতির নয় এটি চারঘাটের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও এখনকার মানুষের জীবনের অংশ। এজন্য আমরা একবার জিআই স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেছি। কিছু সংশোধন করে আগামীতে আবারও আবেদন করা হবে। খয়ের শিল্পের মান উন্নয়নে এর সঙ্গে জড়িত সব পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।